ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমলেও ডেমোক্র্যাটদের ছয় বাধা

৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে অর্থনীতি ও ট্রাম্প প্রশাসন নিয়ে অসন্তোষ ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে। কিন্তু ভোটের জাতীয় প্রবণতা সরাসরি কংগ্রেসের আসনে রূপান্তরিত হয় না—সিনেটের মানচিত্র, ভোটার উপস্থিতি, অর্থ ও জরিপের সীমাবদ্ধতা ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমেছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে, আর জাতীয় জরিপে প্রতিনিধি পরিষদের ভোট-ইচ্ছায় ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে। তবু এই পরিস্থিতি নিজে থেকেই কংগ্রেসে বড় জয়ের নিশ্চয়তা দেয় না। কারণ প্রেসিডেন্টের প্রতি অসন্তোষ, সারা দেশের ভোটের হিসাব এবং প্রতিটি আসনে জয়—তিনটি আলাদা রাজনৈতিক বাস্তবতা।
নির্বাচনটি হবে ৩ নভেম্বর। প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হবে।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের ২৮ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত করা জরিপে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ বলেছেন, প্রতিনিধি পরিষদে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে সমর্থন করবেন; রিপাবলিকান প্রার্থীর পক্ষে বলেছেন ৩৬ শতাংশ। একই জরিপে ট্রাম্পের কাজের অনুমোদন ছিল ৩০ শতাংশ—তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে সর্বনিম্ন। তবে এটি জাতীয় ভোট-ইচ্ছার ছবি, আসনভিত্তিক পূর্বাভাস নয়।
অর্থনীতি দুই দলের ভোটারদের কাছেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই পিউ জরিপে ৮৪ শতাংশ নিবন্ধিত ভোটার বলেছেন, অর্থনীতি তাঁদের ভোটের সিদ্ধান্তে খুব গুরুত্বপূর্ণ; স্বাস্থ্যসেবা, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ, অভিবাসন ও পররাষ্ট্রনীতিও বহু ভোটারের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন কম
জাতীয় ভোটে কয়েক পয়েন্ট এগিয়ে থাকা মানেই প্রতিনিধি পরিষদে একই হারে আসন পাওয়া নয়। রাজনৈতিক মেরুকরণ ও নির্বাচনী সীমানা পুনর্নির্ধারণের ফলে বহু আসন এক দলের জন্য নিরাপদ হয়ে গেছে। রয়টার্সের সঙ্গে কথা বলা বিশ্লেষকদের হিসাবে, ৪৩৫টি আসনের মধ্যে মাত্র ৪০ থেকে ৫০টি আসন প্রকৃত প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকতে পারে। এমন হলে ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য লাভের সীমা সংকুচিত হবে, যদিও তাঁরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে পারেন।
সিনেটের মানচিত্র ডেমোক্র্যাটদের জন্য কঠিন
সিনেটের নিয়ন্ত্রণ পেতে ডেমোক্র্যাটদের চারটি আসন নিট বাড়াতে হবে। তাঁদের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যগুলোর কয়েকটি এমন রাজ্যে, যেখানে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে জিতেছিলেন। ফলে জাতীয়ভাবে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোটের হাওয়া থাকলেও নির্দিষ্ট রাজ্যে জেতার জন্য আরও বিস্তৃত সমর্থন দরকার।
কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট ৬ অক্টোবর ডেমোক্র্যাটদের সম্ভাব্য আসনলাভের পরিসর দুই থেকে ছয় বলে জানিয়েছিল—অর্থাৎ সিনেটের নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় চার আসনটি ওই সম্ভাব্য পরিসরের মাঝখানে। পূর্বাভাসটি সুযোগের ইঙ্গিত দেয়, নিশ্চয়তা নয়।
ভোটে আগ্রহকে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতিতে বদলাতে হবে
জরিপে ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের নির্বাচনী আগ্রহ বেশি দেখা গেলেও সেটি ভোট দেওয়ার নিশ্চয়তা নয়। তরুণ, কৃষ্ণাঙ্গ ও হিস্পানিক ভোটাররা অতীতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের তুলনায় মধ্যবর্তী নির্বাচনে কম হারে ভোট দিয়েছেন—রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিশ্লেষকেরা এ ঝুঁকির কথা বলেছেন। ২০২২ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে নাগরিক ভোটার-জনসংখ্যার ৫২.২ শতাংশ ভোট দিয়েছিলেন; সেনসাস ব্যুরোর হিসাবে ২০১৮ সালে হারটি ছিল ৫৩.৪ শতাংশ।
এটি কোনো গোষ্ঠীর ভোটারদের অনাগ্রহের স্থায়ী বৈশিষ্ট্য নয়। প্রার্থী, স্থানীয় প্রচার, ভোট দেওয়ার সুযোগ ও নির্বাচনের গুরুত্ব—সবই উপস্থিতিকে বদলাতে পারে। তাই ডেমোক্র্যাটদের জন্য সমর্থনকে ভোটে রূপান্তর করাই বড় পরীক্ষা।
রিপাবলিকানদের অর্থের সুবিধা
রয়টার্সের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত সর্বশেষ ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, রিপাবলিকান জাতীয় কমিটি ও সংশ্লিষ্ট কংগ্রেসভিত্তিক রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটির হাতে ছিল প্রায় ৬১৪ মিলিয়ন ডলার নগদ; ডেমোক্র্যাটদের হাতে ছিল প্রায় ৩৯২ মিলিয়ন। সেপ্টেম্বরের শুরুতে ট্রাম্প-সমর্থিত সুপার প্যাক MAGA Inc.-এর হাতে ছিল আরও ৪১৬ মিলিয়ন ডলার। অর্থের এই ব্যবধান ঘনিষ্ঠ প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিজ্ঞাপন, প্রচারকর্মী ও শেষ মুহূর্তের প্রচেষ্টায় কাজে লাগতে পারে।
তবে অর্থই ফল নির্ধারণ করে না। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রিপাবলিকান-সমর্থিত একটি সুপার প্যাক কয়েকটি প্রতিযোগিতাপূর্ণ আসনে বিজ্ঞাপন ব্যয় কমিয়ে অন্য জেলায় সরিয়েছে; ডেমোক্র্যাটরাও নতুন আসনে প্রচার বাড়ানোর চেষ্টা করছে। অর্থাৎ উভয় দলই সীমিত সম্পদ কোথায় কাজে লাগবে, তা নিয়ে কৌশল বদলাচ্ছে।
জরিপে রিপাবলিকান সমর্থন কম ধরা পড়ার নজির
সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনে জরিপ রিপাবলিকান সমর্থন কম দেখিয়েছিল—বিশেষত ট্রাম্প ব্যালটে থাকা নির্বাচনে। এ বছরের নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন, তাই অতীতের ভুল সরাসরি একইভাবে পুনরাবৃত্ত হবে এমন বলা যায় না। তবু জরিপের নমুনা, ভোটার উপস্থিতি সম্পর্কে অনুমান এবং সিদ্ধান্তহীন ভোটারদের পছন্দ—এসব অনিশ্চয়তা রয়ে যায়। রয়টার্সের উদ্ধৃত জরিপে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের জাতীয় ভোট-ইচ্ছায় ৪৩–৩৫ ব্যবধানে এগিয়ে; পিউয়ের জরিপে ব্যবধান ৪৪–৩৬। দুই জরিপই ডেমোক্র্যাটদের অগ্রগতি দেখায়, কিন্তু এগুলো আসনজয়ের সরাসরি গণনা নয়।
‘সমাজতন্ত্রী’ আক্রমণ কিছু দোদুল্যমান ভোটারকে প্রভাবিত করতে পারে
ট্রাম্প ও রিপাবলিকান প্রার্থীরা ডেমোক্র্যাটদের ‘সমাজতন্ত্রী’ বা ‘চরমপন্থী’ হিসেবে তুলে ধরছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বিশ্লেষকেরা বলেছেন, এমন বার্তা কিছু দোদুল্যমান ভোটারের কাছে কার্যকর হতে পারে—বিশেষত যেখানে ব্যবধান খুব কম। তবে এ আক্রমণ পুরো ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে এক ছাঁচে ফেলে; দলের বিভিন্ন মত ও প্রার্থীর অবস্থান এক নয়। নির্বাচনে এর প্রভাব নির্ভর করবে স্থানীয় প্রার্থী, প্রচারের বিষয় এবং ভোটাররা কোন সমস্যাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন তার ওপর।
অসন্তোষ ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে, কিন্তু ফলের বিকল্প নয়
অর্থনীতি নিয়ে অসন্তোষ যে শুধু ডেমোক্র্যাট ভোটারদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, তা নয়। ৯ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্স/ইপসস জরিপে ৭৮ শতাংশ আমেরিকান বলেছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার জন্য হোয়াইট হাউসের কিছু দায় আছে—এর মধ্যে রিপাবলিকান ও স্বতন্ত্র ভোটারও রয়েছেন। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অবশ্য বলেছেন, ট্রাম্প প্রশাসন আগের সরকারের মূল্যস্ফীতি সংকট কাটিয়ে পরিবারগুলোর জন্য বাস্তব সুবিধা এনেছে।
এখানেই নির্বাচনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব: ভোটারদের একাংশ ব্যয়ের চাপকে প্রশাসনের নীতির সঙ্গে যুক্ত করছেন, আর প্রশাসন বলছে তারা অর্থনীতিকে উন্নত করছে। কিন্তু অসন্তোষের ভোট কোন দল পাবে, তা নির্ভর করবে ভোটাররা বিকল্প হিসেবে ডেমোক্র্যাটদের কতটা গ্রহণযোগ্য মনে করেন এবং তাঁদের সমর্থকেরা ভোট দিতে আসেন কি না তার ওপর।
ফলে “ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা কমছে” একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংকেত, কিন্তু “ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় নিশ্চিত”—এটি তার থেকে অনেক বড় দাবি। ৩ নভেম্বরের ফল নির্ভর করবে জাতীয় মনোভাব কতটা প্রতিযোগিতাপূর্ণ আসনে পৌঁছায়, ভোটার উপস্থিতি কেমন হয়, এবং দুই দল প্রচারের শেষ পর্যায়ে নিজেদের বার্তা ও সম্পদ কতটা কার্যকরভাবে কাজে লাগায় তার ওপর।
কী জানা, কী এখনো অনিশ্চিত
যা জানা: নির্বাচনের তারিখ ৩ নভেম্বর; প্রতিনিধি পরিষদের সব আসন এবং সিনেটের এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি আসন ভোটে যাবে। পিউয়ের অক্টোবর জরিপে প্রতিনিধি পরিষদের জাতীয় ভোট-ইচ্ছায় ডেমোক্র্যাটরা এগিয়ে এবং ট্রাম্পের অনুমোদন ৩০ শতাংশ।
যা অনিশ্চিত: জরিপের ব্যবধান কতটা আসনে রূপ নেবে, কোন দলের সমর্থকেরা বেশি হারে ভোট দেবেন, এবং সিনেটের কয়েকটি ঘনিষ্ঠ দৌড়ের ফল কী হবে। জরিপ, বিশ্লেষক-রেটিং ও তহবিলের পরিমাণ—কোনোটিই নির্বাচনের ফল নিশ্চিত করে না।
সূত্র ও যাচাই নোট
প্রতিবেদনটি পিউ রিসার্চ সেন্টার, রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, কুক পলিটিক্যাল রিপোর্ট, যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশন ও USA.gov-এর প্রকাশিত তথ্য মিলিয়ে লেখা হয়েছে। জরিপের ফলকে জরিপ হিসেবেই দেখানো হয়েছে; বিশ্লেষকদের সম্ভাব্যতা-ভিত্তিক মূল্যায়নকে নিশ্চিত ফল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
মাহবুব আহমেদ | বাংলাদেশি-আমেরিকান উদ্যোক্তা|লেখক|সম্পাদক ও নাগরিক অধিকারকর্মী।
প্রধান সূত্র
Pew Research Center: ২০২৬-এর মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের মনোভাব ও ট্রাম্পের অনুমোদন
U.S. Census Bureau: ২০২২ মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি
Federal Election Commission: ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনের তারিখ
Associated Press: হাউসের প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনে প্রচার-ব্যয়ের পরিবর্তন
#USMidterms2026 #DonaldTrump #Democrats #Republicans #USCongress #USSenate #Election2026




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।