এআইয়ের ক্ষুধায় বইয়ের মৃত্যু? কোটি কোটি বই স্ক্যান করে ধ্বংসের অভিযোগে প্রযুক্তি শিল্পের নতুন বিতর্ক

এআইয়ের ক্ষুধায় বইয়ের মৃত্যু? কোটি কোটি বই স্ক্যান করে ধ্বংসের অভিযোগে প্রযুক্তি শিল্পের নতুন বিতর্ক
মাহফুজ আহমেদ।আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি
একটি বই কি কেবল তার ভেতরের শব্দের সমষ্টি? নাকি বই মানে ইতিহাস, স্মৃতি, সংস্কৃতি এবং মানুষের স্পর্শে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত উত্তরাধিকার?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) দ্রুত অগ্রগতির এই সময়ে বিশ্বজুড়ে ঠিক এই প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এসেছে। কারণ সাম্প্রতিক আদালতের নথি, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের অনুসন্ধান এবং বিরল বই বিক্রেতাদের অভিজ্ঞতা ইঙ্গিত দিচ্ছে—এআই মডেলকে আরও শক্তিশালী করতে কিছু প্রযুক্তি কোম্পানি বিপুল পরিমাণ মুদ্রিত বই কিনে তাদের মলাট কেটে, পৃষ্ঠা স্ক্যান করে পরে সেই বইগুলো পুনর্ব্যবহার বা ধ্বংস করছে।
প্রযুক্তির ইতিহাসে এটি হয়তো আরেকটি তথ্য সংগ্রহের অধ্যায়। কিন্তু বইপ্রেমী, লেখক, প্রকাশক, গ্রন্থাগারিক এবং সংস্কৃতি গবেষকদের কাছে এটি মানবসভ্যতার স্মৃতি সংরক্ষণ নিয়ে এক গভীর নৈতিক বিতর্ক।
‘Project Panama’: আদালতের নথিতে যে তথ্য সামনে এলো
মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান Anthropic–এর বিরুদ্ধে চলা কপিরাইট মামলার আদালতের নথিতে এমন একটি অভ্যন্তরীণ প্রকল্পের কথা প্রকাশ পায়, যার নাম ছিল Project Panama।
সেখানে উল্লেখ ছিল, প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ছিল বিপুল সংখ্যক বই সংগ্রহ করে দ্রুতগতির “destructive scanning” প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল লাইব্রেরি তৈরি করা। এই প্রক্রিয়ায় বইয়ের বাঁধাই কেটে প্রতিটি পৃষ্ঠা আলাদাভাবে স্ক্যান করা হয়। পরে বইয়ের কাগজ পুনর্ব্যবহার বা বাতিল করা হয়।
প্রতিষ্ঠানটি আদালতে জানায়, এসব বই আইনসম্মতভাবে কেনা হয়েছিল এবং ডিজিটাল কপি ব্যবহার করা হয়েছে এআই প্রশিক্ষণের জন্য।
কেন হঠাৎ বই এত মূল্যবান হয়ে উঠল?
২০২২ সালের আগে লেখা বইগুলো এখন AI শিল্পের কাছে “সোনার খনি”।
কারণ—
এগুলো মানুষের লেখা।
এতে AI-উৎপাদিত লেখা নেই।
ভাষা, যুক্তি ও সাহিত্যিক গঠন অনেক সমৃদ্ধ।
দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞানভাণ্ডার হিসেবে এগুলো অত্যন্ত কার্যকর।
AI গবেষকদের ভাষায়, ভবিষ্যতে যদি AI ক্রমাগত AI-র লেখা থেকেই শেখে, তাহলে “Model Collapse” নামে পরিচিত একটি সমস্যা তৈরি হতে পারে—যেখানে নতুন মডেলের মান ধীরে ধীরে কমতে থাকে।
তাই পুরোনো বই এখন AI শিল্পের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সম্পদগুলোর একটি।
বই বিক্রেতারা কেন আতঙ্কিত?
অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপের বহু বিরল বই বিক্রেতা সম্প্রতি জানিয়েছেন, তারা অস্বাভাবিক বড় বড় অর্ডার পাচ্ছেন।
কিছু ক্ষেত্রে একসঙ্গে হাজার হাজার বই।
আবার কোথাও কয়েক লাখ পর্যন্ত বইয়ের চাহিদা এসেছে।
বই বিক্রেতাদের অভিযোগ—
ক্রেতারা নিজেদের পরিচয় গোপন রাখছে।
মধ্যস্বত্বভোগী কোম্পানির মাধ্যমে বই সংগ্রহ করা হচ্ছে।
অনেক সময় ক্রেতারা বইয়ের বিষয়বস্তু নয়, ISBN নম্বর অনুযায়ী পুরো সংগ্রহ কিনতে চাইছে।
ফলে সন্দেহ তৈরি হয়েছে, এসব বই AI প্রশিক্ষণের জন্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
বিরল বই কি সত্যিই ধ্বংস হচ্ছে?
এখানেই বিতর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বর্তমানে এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই যে Anthropic বা অন্য কোনো AI প্রতিষ্ঠান পরিকল্পিতভাবে অমূল্য, একমাত্র কপি বা জাদুঘর-মানের বিরল বই কিনে ধ্বংস করছে।
বরং Anthropic বলেছে—
তারা সচেতনভাবে rare বা antiquarian বই লক্ষ্যবস্তু করে না।
তবে বিরল বই বিক্রেতারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, বাজারে যেহেতু বিশাল পরিমাণ বই সংগ্রহ চলছে, তাই আউট-অফ-প্রিন্ট কিংবা সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বইও এই সরবরাহ শৃঙ্খলে ঢুকে পড়তে পারে।
লেখকদের ক্ষোভ কোথায়?
বিতর্ক শুধু বই ধ্বংসে সীমাবদ্ধ নয়।
বড় প্রশ্ন হলো—
AI কি লেখকদের শ্রম ব্যবহার করছে তাদের অনুমতি ছাড়া?
এই প্রশ্নে বহু লেখক ও প্রকাশক আদালতে গেছেন।
মামলায় অভিযোগ ছিল—
পাইরেটেড বই ব্যবহার
কপিরাইট লঙ্ঘন
লেখকের আর্থিক ক্ষতি
ভবিষ্যৎ বাজারে প্রভাব
২০২৬ সালে Anthropic একটি ঐতিহাসিক ১.৫ বিলিয়ন ডলারের সমঝোতায় সম্মত হয়, যা মার্কিন কপিরাইট ইতিহাসের অন্যতম বড় নিষ্পত্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তবে আদালত একই সঙ্গে মন্তব্য করে, আইনসম্মতভাবে কেনা বই স্ক্যান করে AI প্রশিক্ষণে ব্যবহার “fair use” হতে পারে, যদিও পাইরেটেড কপি ব্যবহার বৈধ নয়।
প্রযুক্তি শিল্প কী বলছে?
AI কোম্পানিগুলোর যুক্তিও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
তাদের মতে—
মানুষ যেমন বই পড়ে শেখে,
AI-ও ভাষা শেখার জন্য বই পড়ছে।
আইনসম্মতভাবে কেনা বই ব্যবহার করা হয়েছে।
ডিজিটাল কপি তৈরি গবেষণার অংশ।
নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্য বড় তথ্যভাণ্ডার অপরিহার্য।
তাদের মতে, এটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতির স্বাভাবিক ধাপ।
অন্য পক্ষ কী বলছে?
সংস্কৃতি গবেষকরা পাল্টা প্রশ্ন তুলছেন—
একটি বই কি কেবল তার লেখার জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
নাকি—
প্রথম সংস্করণ,
লেখকের স্বাক্ষর,
হাতে লেখা টীকা,
কাগজের গুণ,
বাঁধাই,
প্রকাশনার ইতিহাস—
এসবও মানবসভ্যতার অংশ?
একটি ডিজিটাল স্ক্যান কি এসব সংরক্ষণ করতে পারে?
তাদের উত্তর—না।
বই বনাম ডেটা: এই বিতর্ক আসলে সভ্যতার বিতর্ক
ইতালীয় লেখক উমবের্তো একো তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার নিয়ে বলেছিলেন—
মানুষের অজানা জ্ঞানের সবচেয়ে বড় স্মারক হলো লাইব্রেরি।
এই ধারণা আজও সমান প্রাসঙ্গিক।
একটি বই কেবল তথ্য নয়।
এটি সময়ের সাক্ষী।
একটি পুরোনো বইয়ের গন্ধ, তার কাগজের রং, পাঠকের দাগ, মালিকের নাম—এসব কোনো AI মডেলের ভেতরে সংরক্ষিত হয় না।
নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ: দুই পক্ষেরই যুক্তি আছে
সংবাদপত্রের দায়িত্ব একপাক্ষিক অবস্থান নেওয়া নয়।
এই বিতর্কেও দুটি বাস্তবতা রয়েছে।
প্রথম বাস্তবতা
AI উন্নয়নের জন্য উচ্চমানের তথ্য দরকার।
মানবজাতির জ্ঞান ব্যবহার না করলে উন্নত ভাষা মডেল তৈরি করা কঠিন।
দ্বিতীয় বাস্তবতা
প্রযুক্তির নামে যদি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, লেখকের অধিকার এবং দুর্লভ বইয়ের অস্তিত্ব ঝুঁকির মুখে পড়ে, তবে তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য প্রযুক্তিগত সুবিধার চেয়েও বড় হতে পারে।
সুতরাং ভবিষ্যতের নীতি হওয়া উচিত—
লেখকদের ন্যায্য পারিশ্রমিক,
লাইব্রেরি সংরক্ষণ,
বিরল বইয়ের বিশেষ সুরক্ষা,
AI প্রশিক্ষণে স্বচ্ছতা,
আন্তর্জাতিক কপিরাইট কাঠামোর আধুনিকায়ন।
প্রযুক্তি ও সংস্কৃতিকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে নয়, বরং একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়াই হবে সবচেয়ে টেকসই পথ।
উপসংহার
হাজার বছর ধরে মানুষ বই লিখেছে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য।
আজ সেই বইগুলো আবার নতুন এক বুদ্ধিমত্তার শিক্ষক হয়ে উঠছে।
প্রশ্ন হলো—
মানুষের জ্ঞান কি শুধু অ্যালগরিদমের খাদ্য হবে, নাকি মানবসভ্যতার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হিসেবেও সমান গুরুত্ব পাবে?
এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে AI যুগে বইয়ের ভবিষ্যৎ।
#ArtificialIntelligence #AI #Anthropic #Books #RareBooks #Copyright #AITechnology #Publishing #DigitalHumanities #BookCulture #Ethics #AITraining #CaliforniaChithi




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।