আমেরিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে সংশয়, গণতন্ত্র নিয়েও উদ্বিগ্ন অধিকাংশ নাগরিক

স্বাধীনতার ২৫০ বছরে বিভক্ত আমেরিকা: আরও ২৫০ বছর টিকবে কি যুক্তরাষ্ট্র?আমেরিকার ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়ছে সংশয়, গণতন্ত্র নিয়েও উদ্বিগ্ন অধিকাংশ নাগরিক
স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্র এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে জাতীয় পতাকা, আতশবাজি, সামরিক প্রদর্শনী, দেশাত্মবোধক সঙ্গীত এবং “আমেরিকা ফিরে এসেছে” ধরনের রাজনৈতিক স্লোগান; অন্যদিকে নতুন জনমত জরিপ বলছে, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মার্কিন নাগরিকই আর নিশ্চিত নন যে তাঁদের দেশ আরও ২৫০ বছর একক রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকবে।
Reuters/Ipsos-এর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, ৩৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন না যে যুক্তরাষ্ট্র ২৫০ বছর পরও একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে থাকবে। সংখ্যাটি শুধু রাজনৈতিক হতাশার পরিমাপ নয়; এটি আমেরিকার আত্মবিশ্বাসের ভেতরে তৈরি হওয়া গভীর ফাটলের ইঙ্গিত।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে স্বাধীনতা দিবস সবসময়ই ছিল জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে যে রাষ্ট্রের জন্ম, সেটি নিজেকে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক শাসনের পরীক্ষাগার হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কিন্তু ২০২৬ সালে, স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদযাপনের মুহূর্তে, সেই পরীক্ষাগারই যেন নতুন করে নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নের মুখোমুখি।
জরিপে আরও দেখা গেছে, ৬৪ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন আমেরিকার গণতন্ত্র ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এক বছর আগেও এই হার ছিল ৫৭ শতাংশ। অর্থাৎ উদ্বেগ শুধু স্থায়ী নয়, বাড়ছেও। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি হলেও রিপাবলিকান এবং স্বতন্ত্র ভোটারদের মধ্যেও উদ্বেগ স্পষ্ট।
রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়েও উদ্বেগ প্রবল। ৭৭ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন আগামী পাঁচ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়তে পারে। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটল হামলা, নির্বাচনী ফল নিয়ে অবিশ্বাস, রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে হামলার চেষ্টা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রমবর্ধমান ঘৃণার ভাষা—সব মিলিয়ে অনেকের কাছে আমেরিকার রাজনীতি এখন আর শুধু মতাদর্শের লড়াই নয়, বরং সামাজিক স্থিতির প্রশ্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকালীন সময়েই বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিন সতর্ক করেছিলেন—“A republic, if you can keep it.” অর্থাৎ প্রজাতন্ত্র পাওয়া যত কঠিন, তা ধরে রাখা তার চেয়েও কঠিন। ২৫০ বছর পর সেই সতর্কবাণী যেন নতুন করে ফিরে এসেছে। কারণ গণতন্ত্র শুধু সংবিধানে লেখা শব্দ নয়; এটি প্রতিষ্ঠান, আস্থা, নাগরিক সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।
আব্রাহাম লিংকন গেটিসবার্গ ভাষণে বলেছিলেন, “government of the people, by the people, for the people”—জনগণের, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য সরকার যেন পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত না হয়। কিন্তু আজকের আমেরিকায় প্রশ্ন উঠছে, জনগণ কি এখনও একই জাতীয় গল্পে বিশ্বাস করে? নাকি রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই রাজনৈতিক শিবির এতটাই ভিন্ন বাস্তবতায় বসবাস করছে যে “এক আমেরিকা” ধারণাটিই দুর্বল হয়ে পড়ছে?
America 250 উদযাপনকে ঘিরেও বিভাজন স্পষ্ট। জরিপে ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তির অনুষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত রাজনৈতিক হয়ে উঠেছে। ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে এই ধারণা বেশি হলেও রিপাবলিকানদের অর্ধেকেরও বেশি একই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ জাতীয় উৎসবও এখন আর পুরোপুরি নিরপেক্ষ আবেগের জায়গা নয়; সেটিও রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই উদযাপনের কেন্দ্রে নিজেকে দৃশ্যমানভাবে স্থাপন করেছেন। তাঁর ভাষায়, আমেরিকা আবার ফিরে এসেছে, দেশ নতুন স্বর্ণযুগে প্রবেশ করেছে। কিন্তু জরিপের তথ্য দেখাচ্ছে, দেশটির নাগরিকদের বড় অংশ সেই আত্মবিশ্বাসে শরিক নন। জাতীয় গৌরবের মঞ্চের নিচে জমে আছে অর্থনীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা, গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক বিভক্তি নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমেরিকার বৈশ্বিক আত্মপরিচয়। জরিপে মাত্র ৩০ শতাংশ উত্তরদাতা বলেছেন, তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের সেরা দেশ মনে করেন। ২০১৭ সালে এই হার ছিল ৩৮ শতাংশ। রিপাবলিকানদের মধ্যে এই বিশ্বাস তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী থাকলেও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এটি শুধু দেশপ্রেমের পরিমাণ কমার প্রশ্ন নয়; বরং আমেরিকার নিজস্ব প্রতিশ্রুতি—স্বাধীনতা, সমতা, সুযোগ ও গণতন্ত্র—এসবের বাস্তবায়ন নিয়ে হতাশার বহিঃপ্রকাশ।
ডুইট আইজেনহাওয়ার তাঁর বিদায়ী ভাষণে “military-industrial complex” নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ক্ষমতা ও স্বার্থ যখন অতিরিক্ত কেন্দ্রীভূত হয়, তখন গণতান্ত্রিক ভারসাম্য বিপন্ন হতে পারে। আজকের আমেরিকায় সেই সতর্কতা নতুন রূপে ফিরে এসেছে—শুধু সামরিক শিল্প নয়, অর্থনৈতিক বৈষম্য, প্রযুক্তি-নিয়ন্ত্রিত জনমত, দলীয় সংবাদমাধ্যম, আদালত নিয়ে অবিশ্বাস এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি সন্দেহ—সবই গণতন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি করছে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও আমেরিকার ইতিহাস আশাবাদের জায়গা রেখে যায়। দেশটি গৃহযুদ্ধ পার করেছে, মহামন্দা পার করেছে, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সংঘাত পার করেছে, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, ওয়াটারগেট, ৯/১১ এবং ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের মতো বড় ধাক্কা সামলেছে। প্রতিবারই আমেরিকা ভেঙে পড়ার বদলে নিজেকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার চেষ্টা করেছে।
সেই কারণেই ২৫০ বছর পূর্তির আসল প্রশ্ন শুধু “আমেরিকা টিকবে কি না” নয়। প্রশ্ন হলো—কোন আমেরিকা টিকবে? বিভক্ত, সন্দেহপ্রবণ ও ক্রুদ্ধ আমেরিকা? নাকি সংবিধান, প্রতিষ্ঠান, নাগরিক অধিকার এবং বহুত্ববাদের ওপর দাঁড়ানো একটি নবায়িত আমেরিকা?
স্বাধীনতার ২৫০ বছর তাই শুধু উদযাপনের মুহূর্ত নয়; এটি আত্মসমালোচনারও সময়। আতশবাজির আলো নিভে গেলে, সামরিক বিমানের শব্দ মিলিয়ে গেলে এবং রাজনৈতিক ভাষণ শেষ হলে যে প্রশ্নটি থেকে যায়, সেটি গভীর: প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্নের প্রজাতন্ত্র কি এখনও নাগরিকদের হাতে নিরাপদ?
বেঞ্জামিন ফ্র্যাঙ্কলিনের সতর্কতা, লিংকনের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার এবং আইজেনহাওয়ারের ক্ষমতা সম্পর্কে সাবধানবাণী—সব মিলিয়ে আজকের আমেরিকার সামনে বার্তাটি স্পষ্ট: গণতন্ত্র জন্মদিনে নয়, প্রতিদিন রক্ষা করতে হয়।
➖➖
মাহবুব আহমেদ। সম্পাদক,সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি
#America250 #USPolitics #Democracy #ReutersIpsos #DonaldTrump #UnitedStates #PoliticalViolence #AmericanDemocracy #WorldNews #BreakingNews




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।