নিখোঁজ শিশু: ২,০৩৮ জন এখনো অমীমাংসিত

পুলিশ বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি–জুলাইয়ে নিখোঁজ হিসেবে নথিভুক্ত ১৫,৭১৭ শিশুর মধ্যে ১৩,৬৭৯ জনকে উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে। বাকি ২,০৩৮ জনের সন্ধান মেলেনি। এই হিসাবের অর্থ পাচার বা হত্যার প্রমাণ নয়; তবে প্রতিটি অমীমাংসিত নিখোঁজের ঘটনা দ্রুত অনুসন্ধান ও নিয়মিত হালনাগাদের দাবি জানায়।
পূর্ণ প্রতিবেদন
কুমিল্লার ১৩ বছর বয়সী ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম ১৮ সেপ্টেম্বর বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল মায়ের আইফোন নিয়ে—বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলবে বলে। পরদিন লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার জঙ্গল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। কয়েক দিনের মধ্যে পুলিশ জানায়, ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টার সময় তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে বলে তাদের তদন্তে উঠে এসেছে। চারজনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়; ২০ সেপ্টেম্বর তিন আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে আদালত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানায় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরে বদলানো হয়; ২৫ সেপ্টেম্বর নতুন কর্মকর্তা দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়ার আশা প্রকাশ করেন। অভিযোগ ও স্বীকারোক্তির চূড়ান্ত বিচার আদালতের কাজ।
অপ্রতিমের মৃত্যু এক পরিবারের শোকের ঘটনা—একই সঙ্গে এটি নিখোঁজ শিশুর খোঁজে পুলিশের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া, তদন্তের ধারাবাহিকতা এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রস্তুতির প্রশ্নও সামনে আনে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলেছে, নিখোঁজ হওয়ার পর কোনো শিশুর মরদেহ উদ্ধার হলে ঘটনাটিকে শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধ হিসেবে দেখলে চলবে না; শিশুটি কীভাবে নিখোঁজ হলো, উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল এবং কোথাও অবহেলা বা সমন্বয়হীনতা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার।
৮৭ শতাংশ উদ্ধার: হিসাবটি কী বলে, কী বলে না
পুলিশ সদর দপ্তরের ৩ সেপ্টেম্বরের বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে ১৭ বছরের কম বয়সী ১৫,৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। তাদের মধ্যে ১৩,৬৭৯ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে বা তারা পরিবারের কাছে ফিরেছে; ২,০৩৮ জন তখনো শনাক্ত বা উদ্ধার হয়নি։ ১৩,६७९-ը ընդհանուր թվի շուրջ ૮૭ տոկոսն է, իսկ ૨,૦૩૮-ը՝ લગભગ ૧૩ ટકા։
কিন্তু এই শতাংশকে “বাকি ১৩ শতাংশের পরিণতি” বলা যাবে না। পুলিশি হিসাবে তারা এখনো অমীমাংসিত বা খুঁজে না পাওয়া শিশু; তাদের সবাই নিহত, পাচারের শিকার, কিংবা একই ধরনের বিপদের মধ্যে—এমন কোনো প্রমাণ এই সংখ্যাটি দেয় না। বিপরীতভাবে, “উদ্ধার” বা “পরিবারে ফেরা” মানেই সব ঝুঁকি কেটে গেছে—এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। পরিসংখ্যানটি অনুসন্ধানের অগ্রগতি বোঝায়, প্রতিটি শিশুর পরবর্তী অবস্থা বা নিখোঁজ হওয়ার কারণ নয়।
পুলিশ বলেছে, ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে শিশু নিখোঁজের বিষয়ে যথাক্রমে ১৭,৮০৮, ১৬,৪১৪ ও ২২,৫৫০টি জিডি হয়েছিল। সদর দপ্তর অনলাইন জিডির কারণে নথিভুক্তির সংখ্যা বেড়েছে বলেও জানিয়েছে। তবে আগের বছরগুলোর কত শিশু শেষ পর্যন্ত ফিরেছে বা এখনো নিখোঁজ—সেই পূর্ণাঙ্গ তুলনামূলক হিসাব একই বিবৃতিতে দেওয়া হয়নি। ফলে বার্ষিক সংখ্যাগুলোকে সরাসরি নিখোঁজ শিশুর স্বতন্ত্র সংখ্যা বা অপরাধ বৃদ্ধির প্রমাণ হিসেবে পড়ার আগে সংজ্ঞা, পুনরাবৃত্তি এবং মামলার হালনাগাদ বোঝা জরুরি।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, জানুয়ারি–জুলাইয়ে ১০–১৭ বছর বয়সী শিশুদের বিরুদ্ধে ১৫,২৪৩টি নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডি হয়েছিল; ১,৯৭০ জন তখনো অমীমাংসিত ছিলেন। ০–৯ বছর বয়সীদের ক্ষেত্রে ৪৭৪টি জিডির মধ্যে ৬৮ জনের সন্ধান মেলেনি। কিশোর-কিশোরীদের নিখোঁজ হওয়ার কারণ হিসেবে পুলিশ পারিবারিক বিরোধ, পড়াশোনার চাপ, বন্ধুদের প্রভাবসহ কয়েকটি সম্ভাব্য কারণের কথা বলেছে। এগুলো পুলিশের ব্যাখ্যা—প্রতিটি ঘটনার তদন্তে প্রতিষ্ঠিত কারণ নয়।
নিখোঁজের পর মরদেহ: উদ্বেগের বাস্তব ভিত্তি
তবে উদ্বেগকে শুধু পরিসংখ্যানের ভুল পাঠ বলে উড়িয়ে দেওয়ারও সুযোগ নেই। আসকের ২০ সেপ্টেম্বরের বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। একই বিবৃতিতে সংস্থাটি শিশুদের ওপর সহিংসতা ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং নিখোঁজ, উদ্ধার ও অমীমাংসিত মামলার জন্য নিয়মিত হালনাগাদ জাতীয় তথ্যব্যবস্থার দাবি জানায়।
এই সংখ্যাটি গুরুতর; তবে এর সীমাও স্পষ্ট করা দরকার। আসক জানায়, তাদের পরিসংখ্যান সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে সংগৃহীত। তাই এটি সব ঘটনার পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক গণনা নয়। তাছাড়া আসকের বিবৃতিতে একই আট মাসে শিশু-মৃত্যুর মোট সংখ্যা ২৫৪ বলা হয়েছে, আর প্রথম আলো-র একটি প্রতিবেদনে আসকের নামে ১৫৫ মৃত্যুর কথা এসেছে। এই ব্যবধানের সংজ্ঞা বা কারণ প্রকাশিত তথ্য থেকে পরিষ্কার নয়। সংশ্লিষ্ট সংস্থার উচিত কোন ধরনের মৃত্যু কোন হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা ব্যাখ্যা করা।
নিখোঁজ মানেই পাচার নয়—তবু পাচারের ঝুঁকি উপেক্ষণীয় নয়
নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন (এনপিএ) বলেছে, নিখোঁজ শিশুদের খোঁজে বিশেষ ট্র্যাকিং সেল গঠন এবং শিশু পাচার ও নির্যাতনের চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সংগঠনটি কুমিল্লায় শিশুহত্যার দ্রুত বিচারও দাবি করেছে। এগুলো সংগঠনের দাবি ও মূল্যায়ন; নিখোঁজ শিশুদের একটি নির্দিষ্ট অংশ পরিকল্পিতভাবে হত্যা বা পাচার করা হচ্ছে—এই অভিযোগকে প্রমাণিত তথ্য হিসেবে দেখানোর মতো প্রমাণ এখানে নেই।
তবে বাংলাদেশে মানব পাচার যে বাস্তব সমস্যা, তার স্বতন্ত্র প্রমাণ রয়েছে। ২০২৫ সালের Trafficking in Persons প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ যৌন পাচার ও জোরপূর্বক শিশুশ্রমসহ কিছু পাচার অপরাধ ব্যাপক রয়ে গেছে; একই সঙ্গে সরকার পাচারকারীদের তদন্ত, বিচার ও দণ্ডিত করার ক্ষেত্রে আগের সময়ের তুলনায় কম অগ্রগতি করেছে বলে প্রতিবেদনে মূল্যায়ন করা হয়। ওই প্রতিবেদন পাচারের ঝুঁকি ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া নিয়ে—এটি বাংলাদেশের ২,০৩৮ অমীমাংসিত নিখোঁজ শিশুর পরিণতি নির্ধারণ করে না। দুটি তথ্যকে এক করে দেখলে প্রমাণের সীমা অতিক্রম করা হবে।
বাংলাদেশে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমনে ২০১২ সালের আইন রয়েছে। আইন থাকা জরুরি, কিন্তু তা একা শিশুকে দ্রুত খুঁজে বের করে না। প্রয়োজন এমন ব্যবস্থা, যেখানে নিখোঁজের খবর পাওয়ার পর বিভিন্ন থানার তথ্য, শিশুর পরিচয়, ছবি, সম্ভাব্য যাত্রাপথ ও তদন্তের অগ্রগতি সমন্বিতভাবে দেখা যায়। আসকও নিখোঁজ ও উদ্ধার হওয়া শিশুদের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদের জাতীয় ব্যবস্থার প্রয়োজনের কথা বলেছে।
পরিসংখ্যানের পরের দায়িত্ব
অপ্রতিম হত্যা মামলায় পুলিশ দ্রুত সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা ও গ্রেপ্তারের কথা জানিয়েছিল। কিন্তু পরে তদন্ত কর্মকর্তা বদলানো হয়েছে; নতুন কর্মকর্তা নথি হাতে পাওয়ার পর তদন্ত শুরু করে অভিযোগপত্র দেওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন। এ পরিবর্তন নিজে থেকেই গাফিলতির প্রমাণ নয়, তবে মামলার অগ্রগতি, ফরেনসিক তথ্য ও অভিযোগপত্রের সময়সীমা জনসমক্ষে পরিষ্কার রাখা জরুরি—বিশেষত এমন একটি ঘটনায়, যা শিশুদের নিরাপত্তা নিয়ে দেশজুড়ে প্রশ্ন তুলেছে।
পুলিশের ৮৭ শতাংশ উদ্ধারের হিসাবকে অস্বীকার না করেও বাকি ১৩ শতাংশের জন্য জবাবদিহি চাওয়া যায়। জরুরি কাজ হলো অমীমাংসিত প্রতিটি শিশুর হালনাগাদ অবস্থা প্রকাশ, নিখোঁজের অভিযোগকে দ্রুত অনুসন্ধানের আওতায় আনা, এবং পাচার বা সহিংসতার প্রমাণ পাওয়া গেলে আলাদা তদন্তে তা অনুসরণ করা। সংখ্যার ভাষা শোককে মুছে দেয় না; বরং কোন শিশুর খোঁজ এখনো বাকি, তা নির্দিষ্ট করে রাষ্ট্রের দায়িত্ব দেখায়।
যা জানা আছে / যা এখনো অস্পষ্ট
যা জানা আছে: পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি–জুলাইয়ে ১৫,৭১৭ শিশুর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে জিডি হয়; ১৩,৬৭৯ জনকে উদ্ধার বা পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয় এবং ২,০৩৮ জন তখনো অমীমাংসিত ছিলেন। আসক বলেছে, জানুয়ারি–আগস্টে নিখোঁজ হওয়ার পর ৩৬ শিশুর মরদেহ উদ্ধার হয়।
যা এখনো অস্পষ্ট: ২,০৩৮ শিশুর বর্তমান অবস্থা, নিখোঁজ-সংক্রান্ত জিডির মধ্যে একই শিশুর পুনরাবৃত্তি আছে কি না, এবং আগের বছরগুলোর অমীমাংসিত মামলার চূড়ান্ত ফল কী। আসকের শিশু-মৃত্যুর মোট হিসাবে প্রকাশিত দুই প্রতিবেদনের পার্থক্যও স্পষ্ট করা দরকার। এসব তথ্যের কোনোটিই অনুপস্থিত শিশুদের সবাই পাচার বা হত্যার শিকার—এমন প্রমাণ দেয় না।
সূত্র ও যাচাই-নোট
কুমিল্লার ঘটনাটি ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ঘটে; “আজ কুমিল্লায়” বাক্যটি তাই প্রকাশের সময় অনুযায়ী হালনাগাদ করা হয়েছে। পুলিশি ৮৭ শতাংশের হিসাবকে বাকি শিশুদের মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়নি। মূল সূত্র: পুলিশ সদর দপ্তরের বিবৃতি—BSS, আসকের বিবৃতি, কুমিল্লা মামলার তদন্ত হালনাগাদ—bdnews24.com, মানব পাচার প্রতিবেদন—যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর, প্রথম আলো: নিখোঁজ শিশুদের মরদেহ উদ্ধারের প্রতিবেদন।
#শিশুনিরাপত্তা #নিখোঁজশিশু #অপ্রতিম #কুমিল্লা #বাংলাদেশ #জবাবদিহি #ChildSafety #Bangladesh




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।