ক্যালিফোর্নিয়ার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক লড়াই স্বাস্থ্যসেবা বাঁচাতে বিলিয়নিয়ার ট্যাক্স, নাকি ধনীদের রাজ্যছাড়া? ভোট দেবে ক্যালিফোর্নিয়া

ক্যালিফোর্নিয়ায় ‘বিলিয়নিয়ার ট্যাক্স’ নিয়ে ঐতিহাসিক ভোটযুদ্ধ: স্বাস্থ্যসেবার জন্য ১০০ বিলিয়ন ডলারের বাজি, নাকি ধনীদের রাজ্যছাড়া করার ঝুঁকি?
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ধনকুবেরদের ওপর এককালীন সম্পদকর (Wealth Tax) আরোপের প্রস্তাবকে ঘিরে শুরু হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিতর্ক। বহু আলোচনার পর প্রস্তাবটি প্রত্যাহার না করায় আগামী নভেম্বরের নির্বাচনে বিষয়টি সরাসরি ভোটারদের রায়ের জন্য ব্যালটে যাচ্ছে।
‘ক্যালিফোর্নিয়া বিলিয়নিয়ার ট্যাক্স অ্যাক্ট’ নামে পরিচিত এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ার বাসিন্দা ছিলেন—এমন ১ বিলিয়ন ডলার বা তার বেশি সম্পদের মালিকদের ওপর এককালীন ৫ শতাংশ কর আরোপ করা। প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে রাজ্যের কোষাগারে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার যোগ হতে পারে বলে দাবি করছেন এর উদ্যোক্তারা। সেই অর্থের বড় অংশ ব্যয় করা হবে ফেডারেল স্বাস্থ্যখাতের অনুদান কমে যাওয়ার ফলে সংকটে পড়া ক্যালিফোর্নিয়ার মেডিকেইড (Medi-Cal) কর্মসূচি, হাসপাতাল, শিক্ষা ও খাদ্য সহায়তা কর্মসূচিতে।
প্রস্তাবটির পেছনে রয়েছে স্বাস্থ্যখাতের শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন SEIU–United Healthcare Workers West। সংগঠনটির দাবি, ফেডারেল বাজেট কাটছাঁটের কারণে ক্যালিফোর্নিয়ার বহু হাসপাতাল ও জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাদের মতে, অতি-ধনীদের সম্পদের একটি ক্ষুদ্র অংশ জনস্বাস্থ্য রক্ষায় ব্যয় করা হলে লাখো মানুষের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এজন্য তারা ১৫ লাখেরও বেশি স্বাক্ষর সংগ্রহ করে প্রস্তাবটি ব্যালটে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই বিভক্তি
বিষয়টি শুধু রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে নয়, ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরেও বড় ধরনের বিভাজন তৈরি করেছে। ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম প্রকাশ্যেই এই করের বিরোধিতা করেছেন। তার যুক্তি, এটি রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। বরং অতি-ধনীরা ক্যালিফোর্নিয়া ছেড়ে টেক্সাস, ফ্লোরিডা কিংবা নেভাডার মতো কম করের রাজ্যে চলে গেলে রাজ্যের আয়করের সবচেয়ে বড় উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নিউজমের সঙ্গে একমত ক্যালিফোর্নিয়ার চিকিৎসা, শিক্ষা, আবাসন ও ব্যবসায়িক সংগঠনগুলোর বড় অংশও। তাদের মতে, ক্যালিফোর্নিয়ার মোট ব্যক্তিগত আয়করের প্রায় অর্ধেকই আসে সর্বোচ্চ আয়কারী ১ শতাংশ করদাতার কাছ থেকে। ফলে কয়েক ডজন বিলিয়নিয়ার রাজ্য ছেড়ে গেলেও রাজস্বে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।
সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ
ব্যালটে যাওয়ার আগে বিরোধ কমাতে শ্রমিক ইউনিয়ন এক পর্যায়ে ৫ শতাংশের পরিবর্তে ২ শতাংশ কর আরোপের প্রস্তাব দিয়েছিল। তবে গভর্নর নিউজম সেই সমঝোতা গ্রহণ করেননি। শেষ পর্যন্ত সময়সীমা শেষ হওয়ায় প্রস্তাবটি সরাসরি নভেম্বরের ব্যালটে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
সিলিকন ভ্যালির পাল্টা লড়াই
এই উদ্যোগ ঠেকাতে প্রযুক্তি খাতের ধনকুবেররাও নজিরবিহীন অর্থ ব্যয় শুরু করেছেন। গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন একাই ৮২ মিলিয়ন ডলার অনুদান দিয়েছেন ‘Building a Better California’ নামে বিরোধী প্রচারণা তহবিলে। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক গোষ্ঠী মিলিয়ে ইতোমধ্যে ১১৮ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে বলে প্রচার-অর্থায়নের নথিতে দেখা গেছে।
বিরোধীদের দাবি, এই কর ক্যালিফোর্নিয়ার বিনিয়োগ পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, উদ্যোক্তাদের অন্য রাজ্যে যেতে উৎসাহিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষা, জননিরাপত্তা ও অবকাঠামো খাতে রাজস্ব সংকট আরও বাড়াবে।
আইনি লড়াইয়ের আশঙ্কা
অর্থনীতিবিদ ও সাংবিধানিক আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, ভোটে পাস হলেও এই সম্পদকর আদালতে দীর্ঘ আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে সম্পদের ওপর রাজ্য পর্যায়ে এককালীন কর এবং অতীত তারিখ থেকে (retroactive) কার্যকর করার বৈধতা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন উঠতে পারে।
এদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার অদলীয় আইনসভা বিশ্লেষক দপ্তর (Legislative Analyst’s Office) সতর্ক করে বলেছে, প্রথম দিকে বড় অঙ্কের রাজস্ব এলেও পরবর্তী সময়ে উচ্চ আয়ের করদাতারা রাজ্য ত্যাগ করলে নিয়মিত আয়কর আদায় কমে যেতে পারে। ফলে দীর্ঘমেয়াদে রাজ্যের আর্থিক স্থিতিশীলতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ভোটারদের সামনে বড় প্রশ্ন
সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, ধনীদের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপের ধারণাটি অনেক ভোটারের কাছে জনপ্রিয়। তবে অতীতে ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন করসংক্রান্ত গণভোটে দেখা গেছে, নির্বাচন ঘনিয়ে এলে বিরোধী প্রচারণা ও আইনি বিতর্কের কারণে জনসমর্থন কমে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, এবারের প্রচারণাও যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ব্যালট ক্যাম্পেইনগুলোর একটি হতে পারে।
ফলে নভেম্বরের ভোট শুধু ক্যালিফোর্নিয়ার স্বাস্থ্যখাতের অর্থায়ন নয়, যুক্তরাষ্ট্রে সম্পদ বৈষম্য, ধনীদের ওপর করনীতি এবং ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক দর্শনের দিকনির্দেশনাও নির্ধারণ করতে পারে।
তথ্যসূত্র (রেফারেন্স):
Associated Press (AP)
CBS News
Los Angeles Times
San Francisco Chronicle
CalMatters
The Guardian
The Wall Street Journal
Sacramento Bee
#California #BillionaireTax #WealthTax #CaliforniaElection #GavinNewsom #MediCal #Healthcare #SiliconValley #SergeyBrin #USPolitics #TaxReform #EconomicPolicy #BreakingNews #USA #CaliforniaNews




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।