ক্রিস্টোফার নোলান: ঝড়ের সমুদ্রে ‘দ্য ওডিসি’, স্মার্টফোনবিহীন এক চলচ্চিত্র সম্রাটের প্রত্যাবর্তন

ক্রিস্টোফার নোলান: ঝড়ের সমুদ্রে ‘দ্য ওডিসি’, স্মার্টফোনবিহীন এক চলচ্চিত্র সম্রাটের প্রত্যাবর্তন
মাইন আহমেদ। বিনোদন । ডেস্ক রিপোর্ট
স্কটল্যান্ডের উপকূলে জুলাইয়ের এক বিষণ্ন সকাল। আকাশজুড়ে সিসার মতো ধূসর মেঘ, সমুদ্র উত্তাল, আর বৃষ্টির ফোঁটাগুলো বাতাসের তীব্রতায় প্রায় অনুভূমিক হয়ে ছুটে আসছে। এমন আবহাওয়ায় সাধারণত শুটিং ইউনিট আশ্রয় খোঁজে, ক্যামেরা ঢেকে রাখা হয়, আর পরিচালকরা দিনের কাজ বাতিল করার কথা ভাবেন।
কিন্তু ক্রিস্টোফার নোলান সেই ধরনের পরিচালক নন।
তাঁর নতুন চলচ্চিত্র ‘দ্য ওডিসি’-র শুটিংয়ের প্রথম দিনেই তিনি ঝড়ের মধ্যে জেটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। মনে হচ্ছিল, ছয় মাসব্যাপী বিশাল এই প্রকল্পের সূচনাই হয়তো ব্যর্থ হতে যাচ্ছে। কিন্তু ভাগ্য এবং প্রস্তুতি—দুটিই সেদিন নোলানের পক্ষে ছিল।
শুটিংয়ের জন্য ব্যবহৃত ১১৫ ফুট দীর্ঘ জাহাজটি এমন বৈরী আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছিল। নিরাপত্তা উপদেষ্টারা আশ্বস্ত করলেন, অভিজ্ঞতা যতই ভয়ংকর হোক, কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
অল্প সময়ের মধ্যেই পরিচালক, অভিনেতা ও কলাকুশলীরা উত্তাল ঢেউয়ের বুকে ভেসে পড়েন।
ঢেউয়ের আঘাতে জাহাজ দুলছিল ভয়ঙ্করভাবে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে কয়েকজন অভিনেতা রেলিং আঁকড়ে ধরে বমি করতে শুরু করেন।
সেই মুহূর্তেই নোলানের মাথায় আসে অন্য চিন্তা।
ঝড়ের গর্জনের মধ্যে তিনি তাঁর চিত্রগ্রাহক হোয়াইটে ভ্যান হোয়াইটেমাকে চিৎকার করে বলেন,
“আপত্তি না থাকলে, আমরা কি এই দৃশ্যগুলো ক্যামেরায় ধারণ করতে পারি?”
পরে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে নোলান বলেন, অভিনেতারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে সম্মতি দিয়েছিলেন।
“দিনটি যেমন ছিল ভীষণ কষ্টকর, তেমনি অবিশ্বাস্যরকম ফলপ্রসূ। সেই মুহূর্তগুলোর কিছু দৃশ্য শেষ পর্যন্ত সিনেমার আমার সবচেয়ে প্রিয় অংশগুলোর একটি হয়ে উঠেছে।”
মহাকাব্য থেকে মহাসিনেমা
প্রাচীন গ্রিক কবি হোমারের অমর মহাকাব্য ‘দ্য ওডিসি’ অবলম্বনে নির্মিত এই চলচ্চিত্র ইতোমধ্যে ২০২৬ সালের সবচেয়ে আলোচিত সিনেমাগুলোর একটি।
প্রিমিয়ারের আগের রাতে ফুটবল ম্যাচ দেখতে গিয়ে ভোর চারটা পর্যন্ত জেগে থাকা নোলান লন্ডনের করিন্থিয়া হোটেলে বসে তাঁর নতুন চলচ্চিত্র ও দীর্ঘ ক্যারিয়ারের নানা অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
১৯৭০ সালে লন্ডনে জন্ম নেওয়া নোলান বড় হয়েছেন যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে। শৈশব থেকেই চলচ্চিত্র ছিল তাঁর স্বপ্নের জগৎ।
১৯৯৮ সালে মাত্র কয়েক হাজার ডলারের বাজেটে নির্মিত ‘Following’ দিয়ে তিনি নজর কাড়েন। এরপর আসে ‘Memento’, যা চলচ্চিত্র ইতিহাসের অন্যতম মৌলিক মনস্তাত্ত্বিক থ্রিলার হিসেবে বিবেচিত হয়।
সেখান থেকে তাঁর উত্থান আর থামেনি।
Insomnia, Batman Trilogy, Inception, Interstellar, Dunkirk, Tenet এবং সর্বশেষ ‘Oppenheimer’—যে চলচ্চিত্র প্রায় এক বিলিয়ন ডলার আয় করে এবং সাতটি অস্কার জয় করে—সব মিলিয়ে নোলান নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন সমকালীন চলচ্চিত্রের সবচেয়ে প্রভাবশালী নির্মাতাদের একজন হিসেবে।
কেন স্টুডিওগুলো নোলানের ওপর চোখ বন্ধ করে বাজি ধরে?
হলিউডে এমন নির্মাতা খুব কম আছেন যাঁদের হাতে শত শত মিলিয়ন ডলার তুলে দিতে বিনিয়োগকারীরা দ্বিধা করেন না।
নোলানের বিশেষত্ব হলো—তিনি জটিল দর্শন, সময়ের ভিন্ন মাত্রা, মানবচেতনার গভীর মনস্তত্ত্ব কিংবা পারমাণবিক রাজনীতির মতো কঠিন বিষয়কে জনপ্রিয় বিনোদনে রূপ দিতে পারেন।
তাঁর চলচ্চিত্র একই সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক এবং বাণিজ্যিক।
অনেকের ধারণা, ‘দ্য ওডিসি’ তাঁর সবচেয়ে ব্যয়বহুল চলচ্চিত্র।
কিন্তু নোলান নিজেই জানান, সেই রেকর্ড এখনো ‘The Dark Knight Rises’-এর দখলে।
মুক্তির আগেই সংস্কৃতি যুদ্ধ
তবে ‘দ্য ওডিসি’ শুধুমাত্র সিনেমা হিসেবেই আলোচনায় আসেনি।
মুক্তির আগেই এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথাকথিত “কালচার ওয়ার”-এর কেন্দ্রে পরিণত হয়।
জিউসের পৌরাণিক কন্যা হেলেন অব ট্রয় চরিত্রে কেনিয়ান-মেক্সিকান অস্কারজয়ী অভিনেত্রী লুপিটা নিয়ঙ্গ’ও-র কাস্টিং নিয়ে শুরু হয় বিতর্ক।
সমালোচকদের একাংশ দাবি করেন, এটি হলিউডের “ওক” রাজনীতির প্রতিফলন।
ইলন মাস্কসহ কয়েকজন জনপ্রিয় ইউটিউব ব্যক্তিত্বও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে ট্রান্সজেন্ডার অভিনেতা এলিয়ট পেজ-এর অংশগ্রহণ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
ফলে সিনেমার ট্রেইলার ইউটিউবে বিপুলসংখ্যক ডিসলাইক পায়।
কিন্তু এসব সমালোচনায় নোলান বিচলিত নন।
তাঁর ভাষায়,
“মানুষ সিনেমা না দেখেই যে বিতর্ক করে, তার বেশিরভাগই অর্থহীন। তারা জানেই না আসলে কী দেখতে যাচ্ছে। ব্যাটম্যান নির্মাণের সময় আমি এক দশক ধরে এই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখেছি। হিথ লেজারকে জোকার হিসেবে নেওয়ার সময়ও মানুষ একইভাবে সমালোচনা করেছিল।”
তিনি যোগ করেন,
“আমার দায়িত্ব হলো মূল গল্পের প্রতি সৎ থাকা এবং সর্বোচ্চ মানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করা।”
এআই নয়, বাস্তবতার প্রতি আস্থা
যখন হলিউড ক্রমশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ডিজিটাল ডাবল ও জেনারেটিভ ভিজ্যুয়াল প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে, তখন নোলান এখনো বাস্তব সেট, প্র্যাক্টিক্যাল ইফেক্টস এবং অ্যানিমেট্রনিক্সের ওপর ভরসা রাখেন।
তাঁর মতে, দর্শক—বিশেষ করে নতুন প্রজন্ম—অস্বাভাবিক দ্রুত বুঝে ফেলে কোন দৃশ্য বাস্তব আর কোনটি কৃত্রিমভাবে তৈরি।
“তরুণ দর্শকরা কৃত্রিমতাকে সহজেই চিনে ফেলে। তারা বাস্তবতা খোঁজে। সিনেমা এখন আবার সেই বাস্তব, স্পর্শযোগ্য গল্প বলার দিকে ফিরে যাচ্ছে।”
স্মার্টফোনবিহীন এক আধুনিক কিংবদন্তি
প্রযুক্তিনির্ভর এই যুগে নোলানের আরেকটি পরিচয় তাঁকে প্রায় কিংবদন্তির পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
তিনি আজও স্মার্টফোন ব্যবহার করেন না।
হাসতে হাসতে তিনি বলেন,
“আপনারা সবাই ফোনের দাস হয়ে গেছেন। আমি যদি স্মার্টফোন ব্যবহার শুরু করি, তাহলে ভয়ংকরভাবে আসক্ত হয়ে পড়ব।”
তাঁর বিশ্বাস, মানুষের সৃজনশীলতার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো অবিরাম ডিজিটাল বিভ্রান্তি।
যখন অন্যরা ট্রেনে বসে ফোন স্ক্রল করে, বিমানবন্দরে অপেক্ষা করতে করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডুবে থাকে, তখন তিনি নিজের পরবর্তী চলচ্চিত্রের ধারণা নিয়ে ভাবেন।
“আমার নতুন আইডিয়াগুলো আসে সেই ফাঁকা মুহূর্তগুলোতে—যে সময় মানুষ সাধারণত ফোন বের করে।”
শেষ চলচ্চিত্রের মতো করে প্রতিটি চলচ্চিত্র
অনেক নির্মাতার মতো নির্দিষ্ট সংখ্যক সিনেমা বানিয়ে অবসরে যাওয়ার পরিকল্পনা তাঁর নেই।
কোয়েন্টিন ট্যারান্টিনোর ‘দশটি সিনেমা’ তত্ত্বে তিনি বিশ্বাস করেন না।
বরং নোলানের দর্শন আরও কঠিন।
তিনি মনে করেন, প্রতিটি চলচ্চিত্র এমনভাবে নির্মাণ করা উচিত যেন সেটিই তাঁর জীবনের শেষ কাজ।
সম্ভবত এই কারণেই তাঁর প্রতিটি সিনেমা কেবল একটি বিনোদনমূলক পণ্য নয়, বরং সময়, স্মৃতি, ইতিহাস, বিজ্ঞান ও মানব অস্তিত্ব নিয়ে নির্মিত একেকটি মহাকাব্যিক অনুসন্ধান।
আগামী ১৭ জুলাই বিশ্বব্যাপী মুক্তি পেতে যাচ্ছে ‘দ্য ওডিসি’।
আর যদি নোলানের কথা সত্যি হয়, তবে দর্শকরা শুধু একটি সিনেমা নয়, বরং আধুনিক চলচ্চিত্র ইতিহাসের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায়ের সাক্ষী হতে চলেছেন।
চাইলে আমি এটির জন্য SEO হেডলাইন, SEO স্লাগ, মেটা ডেসক্রিপশন, ফেসবুক ক্যাপশন এবং 1200×630 তৈলচিত্র কভার-ইমেজের জন্য বিস্তারিত আর্ট ডিরেকশনও তৈরি করে দিতে পারি।
#ChristopherNolan #TheOdyssey #Hollywood #Cinema #MovieNews #Oppenheimer #FilmMaking #EntertainmentNews




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।