ফোবানা সম্মেলন শেষ, কিন্তু ঐক্য কোথায়?

সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি | সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ
সম্পাদকীয় বিশ্লেষণ
ফোবানা সম্মেলন শেষ, কিন্তু ঐক্য কোথায়?
লস অ্যাঞ্জেলেসের আড়ম্বরপূর্ণ আয়োজনের ভেতর সমন্বয়হীনতার সুর—এখন দরকার আরও শক্তিশালী, স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ
মাহবুব আহমেদ • ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মূল বক্তব্য উৎসব ও অংশগ্রহণ ছিল—কিন্তু একই সপ্তাহান্তে চার শহরে চারটি “৪০তম ফোবানা” প্রমাণ করে, প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্য এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি। লস অ্যাঞ্জেলেসের আয়োজনকে ব্যর্থ বলা ন্যায্য নয়; তবে এর ব্যাপ্তির তুলনায় সমন্বয়, সময়শৃঙ্খলা, তথ্যপ্রবাহ ও অংশীজনের সংযোগ আরও পরিণত হওয়া দরকার।
তিন দিনের আলো, গান, আড্ডা ও আবেগের পর লস অ্যাঞ্জেলেসে ৪০তম ফোবানা সম্মেলনের পর্দা নেমেছে। ইউনিভার্সাল সিটির হিলটনে ছড়িয়ে ছিল বাংলাদেশের রং, প্রবাসজীবনের স্মৃতি এবং নতুন প্রজন্মকে শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা। দূরদূরান্ত থেকে আসা শিল্পী, সংগঠক ও অতিথিদের উপস্থিতি নিঃসন্দেহে এই আয়োজনকে প্রাণ দিয়েছে।
তবু অনুষ্ঠান শেষে একটি প্রশ্ন আরও জোরে ফিরে আসে—ঐক্য কোথায়?
এ প্রশ্ন কোনো একক ব্যক্তি বা একটি আয়োজক কমিটিকে ছোট করার জন্য নয়। বরং চার দশকের একটি প্রবাসী প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ নিয়ে জরুরি আত্মসমালোচনা। কারণ মঞ্চে “ঐক্য” উচ্চারিত হলেও একই লেবার ডে সপ্তাহান্তে নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, অরল্যান্ডো ও কানাডার টরন্টোতে চারটি পৃথক আয়োজন নিজেদের ৪০তম ফোবানা হিসেবে প্রচার করেছে। লস অ্যাঞ্জেলেস সম্মেলনের আগের একটি আয়োজকঘনিষ্ঠ প্রতিবেদনেও একই সময়ে চারটি বাংলাদেশি সম্মেলন হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ সংকটটি কেবল বাইরের সমালোচনা নয়; বিভক্তির বাস্তবতা সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর কাছেও অস্বীকারযোগ্য নয়।
অংশগ্রহণ ছিল—কিন্তু অংশগ্রহণই ঐক্য নয়
লস অ্যাঞ্জেলেস আয়োজনের শক্তি ছিল স্পষ্ট। ফোবানার সরকারি ওয়েবসাইটে ২০২৬ সালের সদস্যপদ নিবন্ধন, নির্বাহী কমিটি এবং হিলটন লস অ্যাঞ্জেলেসে সম্মেলনের তথ্য প্রকাশিত ছিল। আয়োজকপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, ৭০টির বেশি সংগঠন নিবন্ধন করেছিল, ২৩টির বেশি অঙ্গরাজ্য থেকে শত শত শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীর আসার কথা ছিল এবং শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক প্রস্তুতিতে যুক্ত ছিলেন। সেমিনার, সাহিত্য, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্য, ব্যবসা, তরুণদের কার্যক্রম ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা—কর্মসূচির পরিসরও ছিল বিস্তৃত।
এই অর্জন স্বীকার করেই বলতে হয়: বড় ভেন্যু, বহু অতিথি বা দীর্ঘ শিল্পী তালিকা প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্যের সমার্থক নয়। ঐক্যের প্রকৃত মাপকাঠি হলো—একটি স্বীকৃত সাংবিধানিক কাঠামো, প্রতিনিধিত্বশীল নেতৃত্ব, বিরোধ নিষ্পত্তির গ্রহণযোগ্য ব্যবস্থা, স্বচ্ছ অর্থব্যবস্থা এবং একই নামের অধীনে প্রতিযোগী সম্মেলন বন্ধ করার সক্ষমতা। সেই পরীক্ষায় ফোবানা এখনো উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
লস অ্যাঞ্জেলেসে সমন্বয়হীনতার যে অনুভূতি
একজন অংশগ্রহণকারী হিসেবে আমার অনুভূতি—আয়োজনে আন্তরিকতা ও শ্রম ছিল, কিন্তু কোথাও কোথাও সমন্বয়ের অভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। একটি বহুমাত্রিক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মূল মঞ্চ, সেমিনার, অতিথি ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রবাহ, সময়সূচি ও স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে রিয়েল-টাইম সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই সংযোগ দুর্বল হলে ভালো কর্মসূচিও প্রত্যাশিত প্রভাব হারায়; দর্শক জানেন না কোথায় কখন কী হচ্ছে, অংশগ্রহণকারীর অভিজ্ঞতা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং আয়োজকদের বিপুল শ্রম পুরোপুরি দৃশ্যমান হয় না।
এটি ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ—কোনো স্বাধীন অনুষ্ঠান-পরবর্তী নিরীক্ষার ফল নয়। তাই নির্দিষ্ট ব্যর্থতার চূড়ান্ত রায় না দিয়ে বরং একটি প্রকাশ্য মূল্যায়নের দাবি তোলা বেশি দায়িত্বশীল। আয়োজকেরা উপস্থিতির যাচাইকৃত সংখ্যা, আয়-ব্যয়ের সারসংক্ষেপ, কর্মসূচির বাস্তবায়ন, অংশগ্রহণকারীদের মতামত এবং কী কী প্রত্যাশামতো হয়নি—এসব প্রকাশ করলে সমালোচনা অভিযোগে আটকে থাকবে না; পরবর্তী আয়োজনের শিক্ষায় পরিণত হবে।
বিভক্তির ইতিহাস নতুন নয়
বর্তমান সংকট হঠাৎ তৈরি হয়নি। ২০১৯ সালে নিউইয়র্কেই একই সময়ে দুই পক্ষ আলাদা ভেন্যুতে ফোবানা সম্মেলন আয়োজন করেছিল। সে সময় প্রথম আলোর প্রতিবেদনে নেতৃত্বের অনৈক্য, ব্যক্তিগত রেষারেষি, রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং “ফোবানা” নামের ব্যবহার নিয়ে আইনি বিরোধের কথাও উঠে আসে। ২০২৪ সালের সম্মেলন-পরবর্তী সংবাদেও ঐক্যের আহ্বান সত্ত্বেও বিভক্তি থেকে যাওয়ার কথা লেখা হয়েছিল।
দুই বছর পর ২০২৬ সালে একই নাম ও একই বর্ষপূর্তি দাবি করে চার শহরে চার আয়োজন হওয়া দেখায় যে বিরোধটি আর সাময়িক মনোমালিন্য নয়; এটি একটি গভীর শাসনসংকট। সংগঠন যদি নিজেই নির্ধারণ করতে না পারে কারা বৈধ প্রতিনিধি, কোন সম্মেলন ধারাবাহিকতার অংশ এবং বিরোধ কীভাবে মীমাংসা হবে, তাহলে সাধারণ প্রবাসী, স্পন্সর, শিল্পী ও নতুন প্রজন্মের কাছে ব্র্যান্ডটির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয়ে যায়।
ক্ষতিটা কার?
বিভক্তির মূল্য কেবল নেতারা দেন না। একই সপ্তাহান্তে চারটি আয়োজন হলে দর্শক, শিল্পী, স্পন্সর এবং সংবাদমাধ্যম ভাগ হয়ে যায়। অর্থ ও স্বেচ্ছাশ্রমের পুনরাবৃত্তি ঘটে। একসঙ্গে ব্যবহার করা গেলে যে সম্পদ দিয়ে আরও শক্তিশালী যুব সম্মেলন, বৃত্তি, গবেষণা, প্রবাসী অধিকার নেটওয়ার্ক কিংবা দুর্যোগ সহায়তা তহবিল গড়া যেত, তার বড় অংশ প্রতিযোগী মঞ্চ নির্মাণে ব্যয় হয়।
সবচেয়ে বড় ক্ষতি নতুন প্রজন্মের। তারা দেখে, যে প্রতিষ্ঠান তাদের বাংলাদেশি পরিচয় ও সংস্কৃতির উত্তরাধিকার দেওয়ার কথা বলে, সেই প্রতিষ্ঠানই নেতৃত্ব ও নামের দ্বন্দ্বে বিভক্ত। সংস্কৃতি শেখানোর আগে সংগঠনকে সহযোগিতা, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক আচরণের উদাহরণ দেখাতে হয়।
এখন দরকার আনুষ্ঠানিক ঐক্য-প্রক্রিয়া
শুধু মঞ্চ থেকে “এক হয়ে যাই” বললে হবে না। ঐক্যকে একটি সময়বদ্ধ, লিখিত ও যাচাইযোগ্য প্রক্রিয়ায় নিতে হবে।
1. স্বাধীন ঐক্য কমিশন: প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো পক্ষের বর্তমান পদধারী নন—এমন সম্মানিত প্রবাসী, আইনজ্ঞ, সাবেক সংগঠক, নারী ও তরুণ প্রতিনিধিদের নিয়ে ছোট মধ্যস্থতা কমিশন গঠন করতে হবে।
2. সকল পক্ষের নথি প্রকাশ: সংবিধান, নিবন্ধন, ট্রেডমার্ক বা নাম ব্যবহারের অধিকার, সদস্যসংগঠনের তালিকা, নির্বাচনী বিধি এবং আর্থিক কাঠামো কমিশনের সামনে উন্মুক্ত করতে হবে।
3. এক নাম, এক বর্ষপঞ্জি: নির্দিষ্ট সাল থেকে একই সপ্তাহান্তে একাধিক “ফোবানা” না করার লিখিত অঙ্গীকার দরকার। আঞ্চলিক অনুষ্ঠান হতে পারে, কিন্তু কেন্দ্রীয় সম্মেলনের পরিচয় একটিই হওয়া উচিত।
4. স্বচ্ছ নেতৃত্ব নির্বাচন: যাচাইকৃত সদস্যসংগঠনের ভোটার তালিকা, স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, মেয়াদের সীমা এবং স্বার্থের সংঘাতবিষয়ক নীতি প্রকাশ করতে হবে।
5. হিসাব ও ফলাফল প্রকাশ: সম্মেলনের ৯০ দিনের মধ্যে আয়-ব্যয়ের সারসংক্ষেপ, উপস্থিতির যাচাইকৃত তথ্য, বৃত্তি বা জনকল্যাণমূলক ব্যয়ের হিসাব এবং অংশগ্রহণকারী জরিপ প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা যায়।
6. পেশাদার সম্মেলন ব্যবস্থাপনা: মূল নীতি ও সাংস্কৃতিক দিক কমিউনিটির হাতে রেখে সময়সূচি, অতিথি-প্রবাহ, প্রযুক্তি, নিরাপত্তা ও স্বেচ্ছাসেবক সমন্বয়ের জন্য অভিজ্ঞ ইভেন্ট অপারেশন দল যুক্ত করা উচিত।
7. তরুণদের সিদ্ধান্তক্ষমতা: তরুণদের শুধু নাচ-গান বা স্বেচ্ছাসেবায় নয়, পরিচালনা পর্ষদ, বাজেট এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় ভোটসহ অর্থপূর্ণ আসন দিতে হবে।
অনুষ্ঠান নয়, প্রতিষ্ঠান হওয়ার পরীক্ষা
ফোবানার সরকারি পরিচিতিতেই লেখা—“FOBANA is an institution.” প্রতিষ্ঠান হওয়া মানে শুধু বছরে তিন দিনের জমকালো সম্মেলন নয়; সারা বছর কার্যকর থাকা, নিয়ম মানা, মতভেদ সামলানো, হিসাব দেওয়া এবং ব্যক্তির চেয়ে প্রতিষ্ঠানকে বড় রাখা।
লস অ্যাঞ্জেলেসের সম্মেলন অনেক মানুষকে আনন্দ দিয়েছে, পরিচিত করেছে, স্মৃতি তৈরি করেছে—এটি তার সাফল্য। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আমাদের সামনে একটি আয়নাও ধরেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে সম্ভাবনা বিপুল, শ্রমও বিপুল; ঘাটতি হলো আস্থা, সমন্বয় ও একক প্রাতিষ্ঠানিক দিকনির্দেশনায়।
সম্মেলন শেষ হয়েছে। এখন আলো নিভে যাওয়ার পরের কাজ শুরু হওয়া উচিত—ছবির অ্যালবাম নয়, ঐক্যের রোডম্যাপ; অভিনন্দনের বিবৃতি নয়, প্রকাশ্য আত্মমূল্যায়ন; আরেকটি পাল্টা সম্মেলনের ঘোষণা নয়, একটি গ্রহণযোগ্য ফোবানা গড়ার আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ।
ঐক্য কোনো স্লোগান নয়। ঐক্য হলো এমন একটি কাঠামো, যেখানে মতভেদ থাকবে—কিন্তু চারটি আলাদা মঞ্চ লাগবে না।
#FOBANA2026 #FOBANA #LosAngeles #BangladeshiDiaspora #CommunityUnity #প্রবাসীবাংলাদেশি #ফোবানা #ঐক্য




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।