২৭ জুলাই খুলছে গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতু: টোল সমঝোতায় যুক্তরাষ্ট্র–কানাডার নতুন বাণিজ্যদ্বার

টোল-রাজনীতির অবসান, খুলছে মহাদেশের নতুন বাণিজ্যদ্বার: ২৭ জুলাই চালু গর্ডি হাও সেতু
কানাডার অর্থায়নে নির্মিত ৬ লেনের সেতু ঘিরে ট্রাম্পের আপত্তি, রাজস্ব ভাগাভাগি, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিদ্বন্দ্বী সেতুর প্রভাব ও সীমান্তবাণিজ্যের ভবিষ্যৎ
ডেট্রয়েট নদীর দুই তীর বহু দশক ধরে শুধু দুটি শহরকে নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার অর্থনীতিকেও মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে রেখেছে। নদীর এক পাশে মিশিগানের শিল্পনগরী ডেট্রয়েট, অন্য পাশে অন্টারিওর উইন্ডসর। মাঝখানে চলেছে গাড়ি, যন্ত্রাংশ, খাদ্যপণ্য, কৃষিসামগ্রী ও শত শত কোটি ডলারের বাণিজ্য। এবার সেই ঐতিহাসিক করিডরে যুক্ত হচ্ছে নতুন এক স্থাপত্য—গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতু।
কানাডা ও মিশিগান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও টোল-রাজস্ব নিয়ে দীর্ঘ দর-কষাকষির পর সেতুটি ২০২৬ সালের ২৭ জুলাই যানবাহনের জন্য খুলে দেওয়া হবে। কানাডার ফেডারেল সরকারের ভাষায়, এটি শুধু একটি নতুন সীমান্ত পারাপার নয়; উত্তর আমেরিকার সরবরাহব্যবস্থা, উৎপাদনশিল্প এবং আন্তদেশীয় বাণিজ্যের জন্য এটি হবে একটি নতুন অর্থনৈতিক ধমনি।
প্রায় ৬.৪ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার, অর্থাৎ বিনিময় হার অনুযায়ী আনুমানিক ৪.৫ থেকে ৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটি শুরু থেকেই ছিল উচ্চাকাঙ্ক্ষী। কিন্তু উদ্বোধনের প্রাক্কালে এটি পরিণত হয় টোল, মালিকানা, রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অধিকার এবং রাজনৈতিক প্রভাবের এক জটিল পরীক্ষায়।
সেতুটি আসলে কত বড়
গর্ডি হাও সেতুটি ছয় লেনের কেবল-স্টেইড সেতু। এর মূল স্প্যান ৮৫৩ মিটার, যা উত্তর আমেরিকায় এ ধরনের সেতুর দীর্ঘতম মূল স্প্যান। সম্পূর্ণ নদী পারাপারের দৈর্ঘ্য প্রায় ২.৫ কিলোমিটার। দুই প্রান্তে নির্মিত হয়েছে আধুনিক কাস্টমস ও বর্ডার প্রসেসিং সুবিধা; যুক্ত হয়েছে মিশিগানের ইন্টারস্টেট-৭৫ মহাসড়কের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ।
সেতুটিতে পথচারী ও সাইকেল আরোহীদের জন্যও আলাদা দ্বিমুখী মাল্টি-ইউজ পথ রাখা হয়েছে। প্রায় ২.৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ৩.৬ মিটার প্রশস্ত এ পথ সীমান্ত অবকাঠামোকে শুধু ট্রাক ও গাড়ির জন্য নয়, নগর-সংযোগের একটি নতুন প্রতীক হিসেবেও উপস্থাপন করছে।
প্রকল্পের সঙ্গে রয়েছে দুটি বৃহৎ পোর্ট অব এন্ট্রি, অ্যাপ্রোচ ব্রিজ, মহাসড়ক ইন্টারচেঞ্জ এবং সীমান্ত নিরাপত্তার উন্নত প্রযুক্তি। অর্থাৎ এটি কেবল নদীর ওপর ঝুলন্ত একটি সেতু নয়; বরং একটি পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক পরিবহনব্যবস্থা।
কেন এত গুরুত্বপূর্ণ ডেট্রয়েট–উইন্ডসর করিডর
ডেট্রয়েট–উইন্ডসর সীমান্ত উত্তর আমেরিকার ব্যস্ততম স্থলবাণিজ্য করিডরগুলোর একটি। প্রতিদিন শত শত মিলিয়ন ডলারের পণ্য এই অঞ্চল দিয়ে যাতায়াত করে। অটোমোবাইল শিল্পের জন্য এর গুরুত্ব আরও বেশি। একটি গাড়ির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ উৎপাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিকবার যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে।
সীমান্তে কয়েক ঘণ্টার বিলম্বও তখন শুধু একটি ট্রাকের সময় নষ্ট করে না; তা কারখানার উৎপাদনলাইন থামিয়ে দিতে পারে, শ্রমঘণ্টা নষ্ট করতে পারে এবং শেষ পর্যন্ত পণ্যের মূল্য বাড়াতে পারে।
কানাডা সরকার বলছে, নতুন সেতুটি উত্তর আমেরিকার সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়াবে, অপরিহার্য পণ্যের চলাচল সহজ করবে এবং উৎপাদনশিল্পকে সহায়তা করবে। মিশিগানের গভর্নর গ্রেচেন হুইটমারও বলেছেন, এটি গাড়ি উৎপাদনের গতি বাড়াবে, পরিবহন ব্যয় কমাবে, যানজট হ্রাস করবে এবং কৃষি ও কর্মসংস্থানে সহায়তা করবে।
তবে সেতু চালু হলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে—এমন সরল আশাবাদও বাস্তবসম্মত নয়। সীমান্ত পারাপারের সময় নির্ভর করে শুধু সেতুর লেনের ওপর নয়; কাস্টমস জনবল, নিরাপত্তা পরীক্ষা, ডিজিটাল নথিপত্র, ট্রাকের প্রবাহ এবং উভয় দেশের বাণিজ্যনীতির ওপরও। নতুন অবকাঠামো সক্ষমতা বাড়ায়, কিন্তু দক্ষ প্রশাসন ছাড়া সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগে না।
কানাডা অর্থ দিল, যুক্তরাষ্ট্র কেন ভাগ চাইল
প্রকল্পটির আর্থিক কাঠামো ছিল অস্বাভাবিক হলেও স্পষ্ট। ২০১২ সালের কানাডা–মিশিগান ক্রসিং এগ্রিমেন্ট অনুযায়ী, কানাডা সেতু, পোর্ট অব এন্ট্রি এবং মিশিগানের মহাসড়ক সংযোগের মূল অর্থায়নের দায় নেয়। ভবিষ্যৎ টোল আয় থেকে কানাডার বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের পরিকল্পনা করা হয়।
কিন্তু ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশ্ন তোলেন—যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ও বাজার ব্যবহার করে নির্মিত একটি সেতুর আয় থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি কী পাবে। তিনি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রকে “সম্পূর্ণ ক্ষতিপূরণ” দিতে হবে এবং সম্ভাব্যভাবে সম্পদের অর্ধেক মালিকানা দেওয়া উচিত। একই সঙ্গে তিনি সেতু উদ্বোধন আটকে দেওয়ার হুমকি দেন। কী আইনি ক্ষমতায় তিনি এমনটি করতে পারতেন, তা তখন পরিষ্কার ছিল না।
সমর্থকদের মতে, ট্রাম্পের হস্তক্ষেপ একটি অবহেলিত অসাম্য সামনে এনেছে। সেতুর এক প্রান্ত, নিরাপত্তা অবকাঠামো ও ট্রাফিকের বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে হলেও নির্মাণব্যয় ও ভবিষ্যৎ আয়ের কাঠামোতে কানাডার প্রাধান্য ছিল। তাদের যুক্তি—দ্বিপক্ষীয় সম্পদ হলে লাভও দৃশ্যমানভাবে দ্বিপক্ষীয় হওয়া উচিত।
সমালোচকদের মতে, এই যুক্তি ২০১২ সালের স্বাক্ষরিত চুক্তি ও কানাডার বহন করা আর্থিক ঝুঁকিকে উপেক্ষা করে। যে দেশ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, ঋণ ও ব্যয়ভার নিয়েছে এবং বহু বছরের নির্মাণঝুঁকি বহন করেছে, তার বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের অধিকার স্বাভাবিক। প্রকল্প প্রায় সম্পূর্ণ হওয়ার পর নতুন শর্ত চাপানো রাষ্ট্রের চুক্তিনিষ্ঠা ও বিনিয়োগযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
শেষ পর্যন্ত কী সমঝোতা হলো
সরকারি ঘোষণায় বলা হয়েছে, দুই পক্ষ টোল ব্যবস্থাপনা, স্বচ্ছতা এবং আঞ্চলিক বিনিয়োগ নিয়ে সমন্বিত ব্যবস্থায় সম্মত হয়েছে। সেতুর পরিচালন মুনাফার একটি অংশ থেকে ১৫ বছরের অর্থনৈতিক উন্নয়ন তহবিল গঠন করা হবে। নির্দিষ্ট কিছু অ-বাজারভিত্তিক টোল পরিবর্তনের ক্ষেত্রে উইন্ডসর–ডেট্রয়েট ব্রিজ অথরিটি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সম্মতি চাইবে।
রয়টার্স ও দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ব্যবস্থায় যুক্তরাষ্ট্র টোল পরিচালন মুনাফার ৫০ শতাংশ পাওয়ার সুযোগ পাবে এবং নির্দিষ্ট সীমার বেশি টোল বৃদ্ধিতে প্রভাব রাখবে। তবে সরকারি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে ৫০–৫০ ভাগের পূর্ণ আর্থিক সূত্র বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। ফলে চুক্তির প্রকৃত অর্থ বোঝার জন্য “রাজস্ব”, “নিট মুনাফা”, নির্মাণব্যয় পুনরুদ্ধার এবং পরিচালন ব্যয়ের সংজ্ঞা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
এখানেই জনস্বার্থের প্রশ্নটি বড় হয়ে ওঠে। একটি সেতুর আয়ের অঙ্ক জানালেই যথেষ্ট নয়। জানতে হবে—
কোন খরচ বাদ দিয়ে মুনাফা হিসাব হবে, কানাডার নির্মাণব্যয় কত বছরে ফেরত আসবে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন তহবিল কোন এলাকায় ব্যয় হবে এবং টোল নীতিতে জনগণের কতটা নজরদারি থাকবে।
সাধারণ যাত্রী ও ট্রাকের টোল
প্রাথমিক ঘোষিত হার অনুযায়ী, সাধারণ যাত্রীবাহী গাড়ির একবার পারাপারের টোল হবে ৮ কানাডীয় ডলার বা ৫.৭৫ মার্কিন ডলার। “ব্রেকঅ্যাওয়ে” নিবন্ধিত ব্যবহারকারীরা ২৫ শতাংশ ছাড়ে ৬ কানাডীয় ডলার বা ৪.৩৫ মার্কিন ডলার দেবেন।
বাণিজ্যিক ট্রাক ও বড় যানবাহনের টোল নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি অ্যাক্সেলে ১২ কানাডীয় ডলার বা ৮.৭৫ মার্কিন ডলার; নিবন্ধিত ছাড়ের হার হবে প্রতি অ্যাক্সেলে ৯.৬০ কানাডীয় ডলার বা ৬.৯০ মার্কিন ডলার।
নতুন সেতুর সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে এই টোল হার প্রতিদ্বন্দ্বী পথগুলোর তুলনায় কতটা আকর্ষণীয় থাকে। ট্রাক কোম্পানিগুলো আবেগ দিয়ে রুট বেছে নেয় না; তারা সময়, জ্বালানি, টোল, নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা হিসাব করে। অতিরিক্ত টোল হলে সেতুর সক্ষমতা অব্যবহৃত থাকতে পারে। আবার খুব কম টোল হলে রক্ষণাবেক্ষণ ও ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়তে পারে।
অ্যাম্বাসাডর ব্রিজ: প্রতিযোগিতা নাকি প্রভাবের রাজনীতি
গর্ডি হাও সেতুর গল্পে নিকটবর্তী ব্যক্তিমালিকানাধীন অ্যাম্বাসাডর ব্রিজকে বাদ দেওয়া যায় না। বহু বছর ধরে ডেট্রয়েট–উইন্ডসর বাণিজ্যের বড় অংশ এই সেতু দিয়ে চলেছে। এর মালিক মরুন পরিবার নতুন সরকারি সেতুর বিরোধিতা করেছে এবং আইনি ও রাজনৈতিক লবিং চালিয়েছে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, মরুন পরিবারের একজন সদস্য ট্রাম্পপন্থী সুপার প্যাকে ১০ লাখ ডলার অনুদান দেওয়ার কয়েক সপ্তাহ পর ট্রাম্প প্রতিদ্বন্দ্বী গর্ডি হাও সেতুর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন। হোয়াইট হাউস ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক সংগঠন অনুদান ও নীতিগত অবস্থানের মধ্যে কোনো সম্পর্কের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এখানে সতর্ক সাংবাদিকতার প্রয়োজন। রাজনৈতিক অনুদান ও পরবর্তী সরকারি সিদ্ধান্তের সময়গত নৈকট্য সন্দেহ তৈরি করতে পারে, কিন্তু তা একাই সরাসরি প্রভাবের প্রমাণ নয়। একই সঙ্গে, এমন পরিস্থিতিতে পূর্ণ স্বচ্ছতা না থাকলে জনবিশ্বাস ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আরও বড় প্রশ্ন হলো—আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এত গুরুত্বপূর্ণ একটি করিডর কি দীর্ঘদিন একটি বেসরকারি অপারেটরের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল ছিল? গর্ডি হাও সেতু সেই নির্ভরতা কমিয়ে প্রতিযোগিতা ও বিকল্প সৃষ্টি করবে। তবে সরকারি সেতু বলে তার জবাবদিহি স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিশ্চিত হয় না; স্বচ্ছ টোলনীতি, নিরীক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ লাগবে।
খরচ ও সময় বৃদ্ধি: মেগাপ্রকল্পের পুরোনো রোগ
গর্ডি হাও সেতুর নির্মাণ ২০১৮ সালে শুরু হয়। প্রথমে প্রকল্প চুক্তির মূল্য ছিল প্রায় ৫.৭ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার। পরবর্তী সংশোধনে ব্যয় বেড়ে ৬.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে এবং সমাপ্তির সময়সীমাও পিছিয়ে যায়।
অবকাঠামো গবেষক বেন্ট ফ্লাইভবিয়ার্গ বহু বছর ধরে দেখিয়েছেন, বৃহৎ পরিবহন প্রকল্পে দীর্ঘ বাস্তবায়নকাল ও দুর্বল জবাবদিহি ব্যয় বৃদ্ধির বড় কারণ। তাঁর গবেষণায় সরকারি বনাম বেসরকারি মালিকানার সরল তুলনার চেয়ে জবাবদিহির মানকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে।
গর্ডি হাও প্রকল্পের ক্ষেত্রেও মহামারি, সরবরাহব্যবস্থার সংকট, শ্রমবাজার, প্রকৌশলগত জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক সমন্বয় ব্যয় ও সময়ে প্রভাব ফেলেছে। কিন্তু “মেগাপ্রকল্পে এমন হয়” বলে সব বৃদ্ধি মেনে নেওয়া উচিত নয়। প্রাথমিক হিসাব কতটা বাস্তবসম্মত ছিল, ঝুঁকির মূল্যায়ন যথাযথ ছিল কি না এবং সংশোধিত ব্যয়ের সুফল কে পাবে—এসব প্রশ্নের উত্তর প্রকাশ্য থাকা জরুরি।
স্থানীয় জনগণের জন্য সেতুটি কী আনবে
বড় অবকাঠামো প্রায়ই জাতীয় সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে উপস্থাপিত হয়, কিন্তু নির্মাণস্থলের পাশে থাকা মানুষ দূষণ, ট্রাক চলাচল, শব্দ, জমি অধিগ্রহণ ও স্বাস্থ্যঝুঁকির বোঝা বহন করেন।
ডেট্রয়েটের ডেলরে এবং উইন্ডসরের স্যান্ডউইচ এলাকার জন্য প্রকল্পে একটি কমিউনিটি বেনিফিটস প্ল্যান রাখা হয়েছে। এতে কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি, পাড়ার অবকাঠামো, খাদ্যনিরাপত্তা, সড়কনিরাপত্তা ও পরিবেশগত উন্নয়নের উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত।
তবু পরিকল্পনা ও বাস্তব সুফলের মধ্যে ব্যবধান থাকতে পারে। অর্থনৈতিক উন্নয়ন তহবিলের অর্থ যদি স্থানীয় স্বাস্থ্য, বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ, সবুজ বেষ্টনী, নিরাপদ সড়ক এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায় না পৌঁছায়, তাহলে সেতুর জাতীয় সাফল্য স্থানীয় মানুষের কাছে অসম উন্নয়নের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
গর্ডি হাও নামটি কেন তাৎপর্যপূর্ণ
সেতুটির নাম রাখা হয়েছে কানাডীয় আইস হকির কিংবদন্তি গর্ডি হাও-এর নামে। “মিস্টার হকি” নামে পরিচিত হাও জীবনের বড় অংশ ডেট্রয়েট রেড উইংসের হয়ে খেলেছেন। তাঁর পরিচয় একই সঙ্গে কানাডীয় জন্মভূমি ও ডেট্রয়েটের ক্রীড়া সংস্কৃতিকে যুক্ত করে।
এই নামকরণ তাই কেবল একজন ক্রীড়াবিদকে সম্মান জানানো নয়; এটি দুই দেশের ভাগ করা সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও প্রতীক। রাজনৈতিক বিরোধ যখন সীমান্তকে বিভাজনের ভাষায় ব্যাখ্যা করে, গর্ডি হাওয়ের নাম তখন স্মরণ করিয়ে দেয়—দুই তীরের সম্পর্ক শুধু শুল্ক ও টোলের নয়, মানুষেরও।
সমালোচনার কেন্দ্রে ট্রাম্পের ভূমিকা
ট্রাম্পের সমর্থকেরা বলবেন, তাঁর চাপ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র নতুন আর্থিক সুবিধা পেত না। আলোচনার মাধ্যমে তিনি টোল শাসনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব, আয়ের অংশ এবং আঞ্চলিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করেছেন—এটি তাঁর “আমেরিকা ফার্স্ট” দর-কষাকষির সফল উদাহরণ।
বিরোধীরা বলবেন, একটি পূর্বস্বাক্ষরিত আন্তর্জাতিক চুক্তির প্রকল্প উদ্বোধনের মুখে আটকে দেওয়ার হুমকি অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে ভাবমূর্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। তাদের মতে, দাবি যৌক্তিক হলেও তা প্রতিষ্ঠিত চুক্তি, আইনি প্রক্রিয়া ও কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে তোলা উচিত ছিল; প্রকাশ্য হুমকির মাধ্যমে নয়।
দুই পক্ষের যুক্তির মধ্যে একটি মৌলিক পার্থক্য আছে। এক পক্ষ ফলাফলকে প্রধান বলে মনে করে; অন্য পক্ষ প্রক্রিয়া ও চুক্তির স্থায়িত্বকে সমান গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উভয়টিই জরুরি। ভালো ফল যদি ভবিষ্যৎ চুক্তির বিশ্বাসযোগ্যতা দুর্বল করে, তার দীর্ঘমেয়াদি মূল্য অনেক বেশি হতে পারে।
শেষ বিচারে: সেতু কি সম্পর্কও জোড়া লাগাতে পারবে
গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতু ইস্পাত, কংক্রিট ও তারের বিস্ময় হলেও তার গভীর তাৎপর্য রাজনৈতিক। এটি এমন এক সময়ে খুলছে, যখন যুক্তরাষ্ট্র–কানাডা সম্পর্ক শুল্ক, উৎপাদন, কৃষি, চীননীতি ও অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ নিয়ে চাপের মধ্যে রয়েছে।
সেতুটি প্রমাণ করে, প্রতিবেশী দেশ দুটি পরস্পরের বিকল্প নয়। তাদের কারখানা, কৃষিপণ্য, শ্রমবাজার, পরিবহন ও ভোক্তা অর্থনীতি এত গভীরভাবে যুক্ত যে সীমান্তে বাধা সৃষ্টি করলে ক্ষতি দুই দিকেই ছড়ায়।
কিন্তু ২৭ জুলাই সেতু খুললেই গল্প শেষ হবে না। তখন শুরু হবে প্রকৃত পরীক্ষা—
ট্রাকের অপেক্ষার সময় সত্যিই কমে কি না, টোল স্থিতিশীল থাকে কি না, লাভের হিসাব স্বচ্ছ হয় কি না, স্থানীয় জনগণ বাস্তব সুবিধা পায় কি না এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও দ্বিপক্ষীয় চুক্তি টিকে থাকে কি না।
সেতুর প্রকৌশল ইতিমধ্যে দুই তীরকে যুক্ত করেছে। এখন দেখার বিষয়, দুই দেশের রাজনীতি সেই সংযোগকে কতটা সম্মান করতে পারে।
সংক্ষিপ্ত তথ্যবাক্স
নাম: গর্ডি হাও আন্তর্জাতিক সেতু
সংযোগ: ডেট্রয়েট, মিশিগান–উইন্ডসর, অন্টারিও
উদ্বোধন: ২৭ জুলাই ২০২৬
ব্যয়: ৬.৪ বিলিয়ন কানাডীয় ডলার; আনুমানিক ৪.৫–৪.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার
লেন: ৬টি
মূল স্প্যান: ৮৫৩ মিটার
মোট পারাপার: প্রায় ২.৫ কিলোমিটার
সাধারণ গাড়ির টোল: ৮ কানাডীয় ডলার/৫.৭৫ মার্কিন ডলার
নিবন্ধিত ছাড়ের টোল: ৬ কানাডীয় ডলার/৪.৩৫ মার্কিন ডলার
বিশেষত্ব: পৃথক পথচারী ও সাইকেল পথ, আধুনিক পোর্ট অব এন্ট্রি, সরাসরি I-75 সংযোগ
#GordieHoweBridge #USCanada #DetroitWindsor #InternationalTrade #BorderTrade #SupplyChain #DonaldTrump #CanadaNews #MichiganNews #বিশ্বসংবাদ #যুক্তরাষ্ট্র #কানাডা #আন্তর্জাতিকবাণিজ্য #গর্ডিহাওসেতু




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।