‘তেলাপোকা’ থেকে তরুণ বিদ্রোহ: প্রশ্নফাঁসের আগুনে ভারতের সংসদদ্বারে নতুন রাজনৈতিক ভাষা

পরীক্ষা কেলেঙ্কারি, বেকারত্ব, পুলিশের বলপ্রয়োগ এবং রাষ্ট্রের প্রতি দীর্ঘদিনের অনাস্থা—সব মিলিয়ে ভারতের ‘ককরোচ আন্দোলন’ এখন শুধু শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ নয়; এটি হয়ে উঠছে একটি প্রজন্মের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশ
মাহবুব আহমেদ । আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি
ঝিরঝিরে বৃষ্টি, মাথার ওপর ভারতের জাতীয় পতাকা, কারও হাতে সংবিধান, কারও হাতে বি আর আম্বেদকরের প্রতিকৃতি। সামনে ধাতব ব্যারিকেড, দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণ বাহিনী ও প্রায় তিন হাজার নিরাপত্তাকর্মী। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে আশপাশের কয়েকটি মেট্রোস্টেশন; কোথাও কোথাও ইন্টারনেট সংযোগও সীমিত। কিন্তু এত আয়োজনের পরও হাজার হাজার তরুণ যখন দিল্লির যন্তর মন্তর পেরিয়ে সংসদ ভবনের মাত্র কয়েক শ মিটারের মধ্যে পৌঁছে গেলেন, তখন ঘটনাটি আর একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদে সীমাবদ্ধ থাকল না।
২০ জুলাই ২০২৬-এর সেই ‘সংসদ চলো’ অভিযান ভারতের গণতন্ত্রের সামনে কয়েকটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রেখে গেছে: একটি দেশের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাব্যবস্থা যখন বারবার দুর্নীতি ও প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে আক্রান্ত হয়, তখন তরুণেরা রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করবে কেন? শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ব্যারিকেড অতিক্রম করলে রাষ্ট্রের সঙ্গত প্রতিক্রিয়া কী—সংলাপ, না লাঠি ও কাঁদানে গ্যাস? আর ব্যঙ্গ থেকে জন্ম নেওয়া ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ কি ক্ষণস্থায়ী ডিজিটাল উত্তেজনা, নাকি ভারতের প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর বাইরে গড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মের প্রতিবাদী ভাষা?
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০ থেকে ১২ হাজারের মতো শিক্ষার্থী ও তরুণ দিল্লির বিক্ষোভে অংশ নেন। কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টনী অতিক্রম করে তাঁদের একটি অংশ সংসদ ভবনের প্রায় ১০০ মিটারের মধ্যে পৌঁছে যায়। পরে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠি ব্যবহার করে; এতে আন্দোলনকারী ও পুলিশ—উভয় পক্ষের মানুষ আহত হন। (Prothom Alo)
যে ক্ষোভের নাম প্রশ্নফাঁস
আন্দোলনের তাৎক্ষণিক কারণ ছিল NEET-UG ২০২৬–সহ চিকিৎসা ও সরকারি চাকরির কয়েকটি প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, একটি পরীক্ষার ফল কেবল নম্বর নির্ধারণ করে না—এটি পরিবারগুলোর বহু বছরের সঞ্চয়, শিক্ষার্থীর শ্রম এবং ভবিষ্যৎ জীবনের সম্ভাবনা নির্ধারণ করে। ফলে প্রশ্নফাঁস নিছক প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি সুযোগের সমতা এবং রাষ্ট্রীয় ন্যায্যতার ওপর আঘাত।
তাঁদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, পরীক্ষায় অনিয়মের স্বচ্ছ তদন্ত, দায়ীদের দ্রুত বিচার, ক্ষতিগ্রস্ত প্রার্থীদের জন্য প্রতিকার এবং ভবিষ্যতের পরীক্ষাব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার। এপি জানিয়েছে, প্রশ্নফাঁসের পাশাপাশি সরকারি চাকরির সংকট, বেকারত্ব এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক আত্মহত্যার ঘটনাগুলোও আন্দোলনের বিস্তৃত ক্ষোভের অংশ হয়ে উঠেছে। (AP News)
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পরীক্ষাসংক্রান্ত অপরাধের দ্রুত বিচারের জন্য বিশেষ বা দ্রুতগতির আদালতের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বলে ফিন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে। তবে আন্দোলনকারীদের একাংশ বলছে, বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত করার ঘোষণা জরুরি হলেও তা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক দায়বদ্ধতার বিকল্প হতে পারে না। শিক্ষামন্ত্রীকে বহাল রেখে শুধু তদন্ত ও বিচারের আশ্বাস দিলে ব্যবস্থার ওপর হারানো আস্থা ফিরে আসবে কি না—সেই প্রশ্ন রয়ে গেছে। (Financial Times)
কেন নাম ‘ককরোচ’?
‘ককরোচ জনতা পার্টি’ বা CJP প্রচলিত অর্থে নিবন্ধিত কোনো পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক দল হিসেবে শুরু হয়নি। এটি জন্ম নেয় অনলাইন ব্যঙ্গ, অপমানের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা এবং তরুণদের বেঁচে থাকার প্রতীকি ভাষা থেকে।
আন্দোলনের ভাষ্য অনুযায়ী, তেলাপোকা বা cockroach এমন এক প্রাণী, যাকে মানুষ ঘৃণা করে, তাড়িয়ে দেয় এবং নির্মূল করতে চায়; কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশেও সে টিকে থাকে। সংগঠনটি এই প্রতীককে ভারতের অবহেলিত তরুণদের সঙ্গে মিলিয়েছে—যাঁদের চাকরি নেই, পরীক্ষায় নিশ্চয়তা নেই, সামাজিক মর্যাদা নেই; তবু তাঁরা আশা ছাড়েননি। তাদের ঘোষিত অগ্রাধিকার শিক্ষা, কর্মসংস্থান, পরিবেশ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা। (Prothom Alo)
এখানেই আন্দোলনটির রাজনৈতিক দক্ষতা। যে শব্দটি দিয়ে কাউকে অবমাননা করা হয়, সেটিকেই তারা পরিচয়ের শক্তিতে পরিণত করেছে। ইতিহাসে এমন উদাহরণ নতুন নয়। সামাজিক আন্দোলন প্রায়ই ক্ষমতার দেওয়া অপমানসূচক ভাষাকে নিজেদের পতাকায় পরিণত করে। একটি শব্দ তখন আর গালি থাকে না; হয়ে ওঠে সংহতির সংকেত।
স্প্যানিশ সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল কাস্তেলস তাঁর নেটওয়ার্কভিত্তিক আন্দোলনবিষয়ক আলোচনায় দেখিয়েছেন, আধুনিক প্রতিবাদের শক্তি সব সময় কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে আসে না; অনেক সময় যোগাযোগের নেটওয়ার্ক, সম্মিলিত ক্ষোভ এবং একটি স্মরণীয় প্রতীকই হাজারো বিচ্ছিন্ন মানুষকে এক কণ্ঠে যুক্ত করে। ককরোচ আন্দোলনেও দৃশ্যত সেই সূত্র কাজ করছে—প্রথমে ব্যঙ্গ, পরে হ্যাশট্যাগ, তারপর অনশন এবং শেষ পর্যন্ত সংসদ অভিমুখে জনস্রোত।
নেতৃত্বহীন, নাকি নতুন ধরনের নেতৃত্ব?
আন্দোলনটিকে অনেক সংবাদমাধ্যম ‘নেতৃত্বহীন’ বললেও বাস্তবে এটি সম্পূর্ণ নেতৃত্বশূন্য নয়। অভিজিৎ দিপক, সৌরভ দাস, আশুতোষ রাংকা প্রমুখ মুখপাত্র ও সংগঠক হিসেবে সামনে এসেছেন। তবে কোনো একক সর্বময় নেতার পরিবর্তে অনলাইন নেটওয়ার্ক, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক এবং বিভিন্ন দাবিতে ক্ষুব্ধ মানুষের অংশগ্রহণ আন্দোলনটিকে বিস্তৃত করেছে।
এ ধরনের কাঠামোর সুবিধা হলো—একজন নেতাকে আটক বা দুর্বল করলেই আন্দোলন শেষ হয় না। অসুবিধা হলো—আলোচনার সময় কে সবার প্রতিনিধিত্ব করবেন, সহিংসতা ঘটলে কার ওপর দায় বর্তাবে এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি কীভাবে নির্ধারিত হবে, তা অস্পষ্ট থাকে।
তুর্কি বংশোদ্ভূত সমাজবিজ্ঞানী জেইনেপ তুফেকচি আধুনিক ডিজিটাল আন্দোলন সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুব দ্রুত বিপুল মানুষকে রাজপথে আনতে পারে, কিন্তু পুরোনো সংগঠনগুলোর মতো দীর্ঘ আলোচনা, নেতৃত্ব তৈরি ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে উঠতে সময় লাগে। ককরোচ আন্দোলনের সামনে এখন ঠিক সেই পরীক্ষা—ভাইরাল প্রতীক থেকে টেকসই সংস্কার আন্দোলনে উত্তরণ।
সোনম ওয়াংচুক: আন্দোলনের নৈতিক মোড়
লাদাখের পরিবেশকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের অনশন আন্দোলনটিকে নতুন নৈতিক শক্তি দেয়। তিনি প্রায় ২০ দিন অনশন চালানোর পর ১৮ জুলাই ভোরে পুলিশ তাঁকে যন্তর মন্তর থেকে সরিয়ে হাসপাতালে নেয় বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর পর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আরও মানুষ আন্দোলনে যোগ দেন। (Prothom Alo)
ওয়াংচুক মূলত পরিবেশ, লাদাখের সাংবিধানিক সুরক্ষা এবং স্থানীয় জনগণের অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয়। তাঁর মতো পরিচিত নাগরিককর্মীর উপস্থিতি প্রশ্নফাঁসের ইস্যুকে বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় জবাবদিহির আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করে। শিক্ষার্থীদের কাছে তাঁর অনশন হয়তো এই বার্তাই দিয়েছে—তাদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা বলে যেটি দেখানো হচ্ছে, সেটির পেছনে আসলে নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাও রয়েছে।
তবে সমালোচকেরা বলতে পারেন, বিভিন্ন ইস্যু এক আন্দোলনে যুক্ত হলে মূল দাবি ঝাপসা হয়ে যায়। প্রশ্নফাঁস, লাদাখের পরিবেশ, বেকারত্ব, নাগরিক অধিকার এবং বিরোধী রাজনীতি—সব একসঙ্গে এলে সরকারের পক্ষে আন্দোলনটিকে ‘রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত’ বলে চিত্রিত করা সহজ হয়।
পুলিশের ভাষ্য বনাম আন্দোলনকারীদের অভিযোগ
দিল্লি পুলিশের দাবি, বিক্ষোভকারীদের একাংশ নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ব্যারিকেড ভাঙেন, পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ করেন এবং জনসম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেন। এ অভিযোগে অন্তত ৭০ জনকে আটক করার খবর প্রকাশিত হয়েছে। (The Economic Times)
অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা বলছেন, তাঁরা শান্তিপূর্ণভাবে সংসদের দিকে যেতে চেয়েছিলেন এবং পুলিশ অপ্রয়োজনীয় শক্তি প্রয়োগ করেছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে দেখা যায়, আন্দোলনের নেতারা অংশগ্রহণকারীদের বারবার সহিংসতা এড়িয়ে চলতে বলেছেন; তাঁদের যুক্তি ছিল, কোনো সংঘর্ষ আন্দোলনের নৈতিক অবস্থান দুর্বল করে সরকারের সুবিধা করে দেবে। (Prothom Alo)
এক নারী বিক্ষোভকারীকে একজন জ্যেষ্ঠ পুলিশ কর্মকর্তা চড় মারছেন এবং চুল ধরে টানছেন—এমন অভিযোগসংবলিত একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছে CJP। ভিডিওটির পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তের ফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগটিকে স্বাধীনভাবে নিষ্পত্তি হওয়া সত্য বলা যায় না; তবে দৃশ্যটি পুলিশি জবাবদিহি নিয়ে জনক্ষোভ বাড়িয়েছে। (The Times of India)
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশকে একই সঙ্গে দুটি দায়িত্ব পালন করতে হয়—নিরাপত্তা রক্ষা এবং নাগরিকের প্রতিবাদের অধিকার নিশ্চিত করা। সংসদ ভবনের নিরাপত্তা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। ব্যারিকেড ভাঙা বা পুলিশের ওপর আক্রমণ আইনসঙ্গত প্রতিবাদের অংশ হতে পারে না। কিন্তু একইভাবে নির্বিচার লাঠিপেটা, অপ্রয়োজনীয় আটক বা নারী বিক্ষোভকারীর প্রতি অপমানজনক আচরণও আইনের শাসনের পরিচয় নয়।
রাষ্ট্রের শক্তি সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় তখন নয়, যখন সে লাঠি চালায়; বরং তখন, যখন কঠিন ও অস্বস্তিকর প্রতিবাদকেও সংবিধানের সীমার মধ্যে নিরাপদ রাখে।
সরকারের দেরিতে সংলাপ
প্রথম দিকে আন্দোলনকে গুরুত্ব না দিলেও সংসদ অভিমুখী পদযাত্রায় বিপুল লোকসমাগমের পর সরকার আলোচনায় আসে। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী জে পি নাড্ডা আন্দোলনকারীদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন। আন্দোলনকারীরা লিখিত দাবি জমা দেন, আর নাড্ডা তাঁদের অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার ও পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সহায়তার অনুরোধ জানান। একই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ও শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান দীর্ঘ বৈঠক করেছেন বলে সংবাদমাধ্যমে খবর আসে। (Prothom Alo)
এখানে সরকারের জন্য একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন রয়েছে: যে আলোচনা হাজারো মানুষ ব্যারিকেড ভাঙার পর সম্ভব হলো, সেটি কয়েক সপ্তাহ আগে কেন সম্ভব হয়নি?
সরকারের সমর্থকেরা বলতে পারেন, প্রশাসন ইতিমধ্যে তদন্ত, গ্রেপ্তার, পুনঃপরীক্ষা এবং দ্রুত বিচারের উদ্যোগ নিয়েছে; একটি মন্ত্রীর তাৎক্ষণিক পদত্যাগ তদন্তকে প্রভাবিত করতে পারে এবং বিরোধীরা শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ব্যবহার করছে। সরকারি সূত্রও দাবি করেছে, আম আদমি পার্টি, সমাজবাদী পার্টি ও আজাদ সমাজ পার্টিসহ কয়েকটি বিরোধী শক্তির সমর্থনে ভিড় বেড়েছে। (Prothom Alo)
কিন্তু বিরোধী দল কোনো আন্দোলনকে সমর্থন করলেই তার মূল অভিযোগ মিথ্যা হয়ে যায় না। আবার রাজনৈতিক সমর্থন পাওয়া মানেই আন্দোলন সম্পূর্ণ নির্দলীয়—এ দাবিও সরলীকরণ। সত্য সম্ভবত মাঝখানে: শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ বাস্তব, আর সেই ক্ষোভকে রাজনৈতিক শক্তিগুলো নিজেদের সুবিধায় ব্যবহার করার চেষ্টা করাও রাজনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতা।
সংসদের ভেতরে ও বাইরে সংঘর্ষ
২২ জুলাই বিরোধী দলগুলো পুলিশি বলপ্রয়োগ এবং পরীক্ষা কেলেঙ্কারির প্রতিবাদে সংসদের কার্যক্রম অচল করে দেয়। কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ও সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদবসহ বিরোধী নেতাদের আন্দোলনের সময় আটক করার খবরও আসে। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, দিল্লির বাইরেও মুম্বাই ও বেঙ্গালুরুর মতো শহরে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে। (The Guardian)
২৩ জুলাই সংসদ প্রাঙ্গণে শাসক এনডিএ ও বিরোধী INDIA জোটের সংসদ সদস্যরা পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় শিল্প নিরাপত্তা বাহিনীকে দুই পক্ষের মাঝখানে মানবপ্রাচীর তৈরি করতে হয়। (The Economic Times)
এই দৃশ্য ভারতের রাজনৈতিক বিভাজনের প্রতীকও বটে। শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হওয়া প্রশ্ন শেষ পর্যন্ত সংসদের দুই রাজনৈতিক শিবিরের শক্তি প্রদর্শনে রূপ নিচ্ছে। এতে একদিকে ইস্যুটি জাতীয় আলোচনায় এসেছে; অন্যদিকে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে—শিক্ষার্থীদের দাবি কি আবারও দলীয় স্লোগানের নিচে চাপা পড়বে?
বলিউড, নাগরিক সমাজ ও প্রতিবাদের সাংস্কৃতিক শক্তি
শাবানা আজমি, প্রকাশ রাজ, টুইঙ্কল খান্না, কারিনা কাপুর খান, বরুণ ধাওয়ান ও সারা আলী খানের মতো চলচ্চিত্রজগতের পরিচিত ব্যক্তিরা প্রতিবাদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। (Prothom Alo)
তারকাদের সমর্থন আন্দোলনের বার্তা দ্রুত ছড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু তারকা-সমর্থনেরও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। একটি ইনস্টাগ্রাম পোস্ট মানুষের মনোযোগ টানতে পারে, কিন্তু পরীক্ষার নিরাপত্তা, নিয়োগ কমিশনের সংস্কার কিংবা দুর্নীতির বিচার নিশ্চিত করতে পারে না। আন্দোলনের সাফল্য নির্ভর করবে সামাজিক আবেগকে বাস্তব নীতিগত দাবিতে রূপান্তর এবং সেই দাবিগুলোর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের ওপর।
ভারতের প্রতিবাদের দীর্ঘ ইতিহাসে নতুন অধ্যায়
ভারতে বড় সামাজিক আন্দোলনের ইতিহাস দীর্ঘ। ২০১১ সালে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন লোকপাল আইন এবং আম আদমি পার্টির উত্থানের পরিবেশ তৈরি করেছিল। ২০১২ সালের দিল্লি গণধর্ষণবিরোধী আন্দোলন যৌন সহিংসতাবিষয়ক আইনে পরিবর্তন আনে। নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী বিক্ষোভ, কৃষি আইনবিরোধী দীর্ঘ আন্দোলন, অগ্নিপথ নিয়োগব্যবস্থার বিরুদ্ধে তরুণদের ক্ষোভ এবং নারী চিকিৎসক হত্যার প্রতিবাদ—প্রতিটি আন্দোলন রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের সম্পর্ককে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। রয়টার্সের মূল্যায়নে, বর্তমান ককরোচ আন্দোলনও মোদির তৃতীয় মেয়াদের জন্য বড় ধরনের যুবসমাজভিত্তিক রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। (Reuters)
তবে ইতিহাস এটিও বলে, বিপুল জনসমাবেশ মানেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন নয়। আন্দোলন সফল হতে হলে দাবিগুলোকে সুনির্দিষ্ট করতে হয়, আলোচনার প্রতিনিধি নির্ধারণ করতে হয়, সহিংসতা থেকে দূরে থাকতে হয় এবং অর্জিত প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন দীর্ঘদিন ধরে পর্যবেক্ষণ করতে হয়।
মোদি সরকারের রাজনৈতিক ঝুঁকি
ভারত বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল বড় অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে। মহাকাশ অভিযান, ডিজিটাল পেমেন্ট, প্রযুক্তি ও অবকাঠামোয় দেশটির অগ্রগতি দৃশ্যমান। কিন্তু উন্নয়নের এই জাতীয় বয়ানের পাশে যদি তরুণেরা প্রশ্নফাঁস, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার অসীম চক্রে নিজেদের বন্দী মনে করেন, তবে অর্থনৈতিক সাফল্যের পরিসংখ্যান রাজনৈতিক হতাশা দূর করতে পারবে না।
একটি দেশের ভবিষ্যৎ কেবল তার মোট দেশজ উৎপাদনে নয়; তার তরুণেরা নিয়মকে কতটা বিশ্বাস করে, সেটিতেও নির্ধারিত হয়।
পরীক্ষায় মেধার চেয়ে অর্থ, পরিচয় বা প্রশ্নফাঁসের নেটওয়ার্ক বেশি কার্যকর—এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের নৈতিক চুক্তি ভেঙে যায়। তখন একটি চাকরি না পাওয়ার ক্ষোভ ক্রমে পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগে পরিণত হয়।
মোদি সরকারের সামনে তাই শুধু আন্দোলন থামানোর চ্যালেঞ্জ নেই। বড় চ্যালেঞ্জ হলো—রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ করা।
আন্দোলনকারীদেরও জবাবদিহি প্রয়োজন
রাষ্ট্রের সমালোচনা যতটা প্রয়োজন, আন্দোলনের পদ্ধতির সমালোচনাও ততটাই জরুরি। সংসদের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভাঙার চেষ্টা, পুলিশের দিকে বস্তু বা কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়ে দেওয়া কিংবা জনসম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়ে থাকলে তা গ্রহণযোগ্য নয়। গণতান্ত্রিক অধিকারের সঙ্গে আইনি দায়িত্বও যুক্ত।
একটি আন্দোলনকে সরকার দমন করতে চাইলে সহিংসতার একটি দৃশ্যই তার সবচেয়ে কার্যকর অজুহাত হয়ে ওঠে। তাই ককরোচ আন্দোলনের নেতৃত্বকে স্পষ্ট আচরণবিধি, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং উসকানিদাতা শনাক্ত করার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
একই সঙ্গে ‘শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ’—এই দৃশ্যমান দাবির বাইরে পরীক্ষাব্যবস্থার সংস্কার কীভাবে হবে, তারও বিস্তারিত নীতিপত্র প্রয়োজন। প্রশ্নপত্র তৈরির ডিজিটাল নিরাপত্তা, পরীক্ষাকেন্দ্র তদারক, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, হুইসেলব্লোয়ার সুরক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি—এসব ছাড়া একজন মন্ত্রীর পদত্যাগ প্রতীকী জয় হলেও কাঠামোগত পরিবর্তন নিশ্চিত করবে না।
‘তেলাপোকা’ কি রাজনৈতিক বিকল্প হবে?
CJP নির্বাচনী রাজনৈতিক দলে পরিণত হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। আন্না হাজারের আন্দোলন থেকে আম আদমি পার্টির জন্ম হয়েছিল; কিন্তু প্রতিটি সামাজিক আন্দোলনের লক্ষ্য ক্ষমতায় যাওয়া নয়। কখনো আন্দোলন রাজনৈতিক দল হয়, কখনো চাপ সৃষ্টিকারী নাগরিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে থাকে, আবার কখনো অভ্যন্তরীণ বিভাজনে হারিয়ে যায়।
রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হলে CJP-কে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের বাইরে অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, ধর্মীয় সম্প্রীতি, কৃষি, স্বাস্থ্য এবং কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক নিয়ে সুসংহত অবস্থান নিতে হবে। তখন ব্যঙ্গাত্মক নামের জনপ্রিয়তা যথেষ্ট হবে না; প্রয়োজন হবে নীতি, সংগঠন, অর্থায়নের স্বচ্ছতা এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র।
অন্যদিকে সামাজিক আন্দোলন হিসেবেই থাকলে তাদের স্বাধীনতা বেশি থাকবে, কিন্তু সরকারি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
শেষ কথা: যে প্রজন্মকে অবজ্ঞা করা যায় না
ককরোচ জনতা পার্টির নাম শুনে প্রথমে হাসি আসতে পারে। কিন্তু রাজনীতির ইতিহাসে হাস্যরস কখনো কখনো গভীর ক্ষতের ভাষা। ক্ষমতার বিরুদ্ধে ব্যঙ্গ দুর্বল মানুষের অস্ত্র—কারণ যে মানুষ ভয়কে নিয়ে হাসতে শিখেছে, তাকে শুধু ভয় দেখিয়ে ঘরে ফেরানো কঠিন।
এই আন্দোলন সফল হবে কি না, ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ করবেন কি না, কিংবা CJP ভবিষ্যতে রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠবে কি না—এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট: ভারতের তরুণদের একটি অংশ আর শুধু পরীক্ষার্থী হিসেবে দেখা দিতে রাজি নয়। তারা নিজেদের নাগরিক, ভোটার এবং রাষ্ট্রের অংশীদার হিসেবে স্বীকৃতি চাইছে।
ব্যারিকেড হয়তো রাস্তা থামাতে পারে; কিন্তু প্রশ্ন থামাতে পারে না।
দিল্লির সংসদদ্বারে দাঁড়িয়ে তরুণেরা যে প্রশ্ন তুলেছে, তার উত্তর শুধু একটি তদন্ত কমিটি বা একটি মন্ত্রীর পদত্যাগে শেষ হবে না। উত্তর দিতে হবে পুরো ব্যবস্থাকে—কেন একটি প্রজন্ম মনে করছে, তাদের শ্রম, মেধা ও ভবিষ্যৎ এমন একটি খেলায় বন্দী, যেখানে নিয়ম আছে, কিন্তু ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা নেই?
ভারতের গণতন্ত্রের শক্তি এখন পরীক্ষা হবে এই জায়গায়: রাষ্ট্র কি ‘তেলাপোকা’ বলে উপেক্ষিত তরুণদের কণ্ঠ শুনবে, নাকি তাদের টিকে থাকার ক্ষমতাকেই নিজের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত করবে?
#India #StudentProtest #CockroachJantaParty




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।