মার্শাল ম্যাকলুহান: যিনি ইন্টারনেটের আগেই দেখে ফেলেছিলেন সামাজিক মাধ্যম, অ্যালগরিদম ও এআই–নিয়ন্ত্রিত বিশ্বের ভবিষ্যৎ

ডিজিটাল সভ্যতার সবচেয়ে ভবিষ্যৎদ্রষ্টা চিন্তাবিদকে নতুন করে পড়ার সময় কি এখনই?
মাহবুব আহমেদ । ফিচার ডেস্ক | সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি
একটি সংবাদ পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছাতে একসময় সপ্তাহ লেগে যেত। পরে তা কমে দাঁড়ায় দিনে, ঘণ্টায়, মিনিটে। আজ সেই একই সংবাদ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এবং স্মার্টফোনের মাধ্যমে কয়েক সেকেন্ডেরও কম সময়ে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—এই পরিবর্তন কি শুধু প্রযুক্তির?
নাকি মানুষের চিন্তা, রাজনীতি, অর্থনীতি, সাংবাদিকতা, সংস্কৃতি এবং সত্য-মিথ্যা বোঝার ক্ষমতাও বদলে গেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে আজও বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগে ফিরে যেতে হয় একজন মানুষের কাছে।
তিনি মার্শাল ম্যাকলুহান (Marshall McLuhan)।
আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল একজন যোগাযোগ তাত্ত্বিককে শ্রদ্ধা জানানো নয়; বরং ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে গভীর সংকটগুলোকে নতুন করে বোঝার চেষ্টা করা।
একজন সাহিত্য সমালোচক কীভাবে হয়ে উঠলেন যোগাযোগ বিপ্লবের স্থপতি
১৯১১ সালের ২১ জুলাই কানাডার আলবার্টার এডমন্টনে জন্ম নেওয়া হার্বার্ট মার্শাল ম্যাকলুহান শুরুতে ছিলেন ইংরেজি সাহিত্য গবেষক।
তিনি কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। পরে কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোতে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন।
অদ্ভুত বিষয় হলো—
তিনি কখনো কম্পিউটার বিজ্ঞানী ছিলেন না।
তিনি ছিলেন না কোনো প্রকৌশলী।
তিনি ছিলেন না টেলিভিশন নির্মাতা।
তবুও ডিজিটাল যুগকে সবচেয়ে গভীরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তিনিই।
কারণ তিনি যন্ত্রকে নয়—
মানুষের আচরণকে পড়তেন।
“The Medium is the Message”—যে বাক্য বদলে দিয়েছে যোগাযোগবিদ্যার ইতিহাস
১৯৬৪ সালে প্রকাশিত তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Understanding Media: The Extensions of Man-এ তিনি লিখেছিলেন—
“The Medium is the Message.”
বিশ্বের সবচেয়ে উদ্ধৃত যোগাযোগ তত্ত্বগুলোর একটি এটি।
প্রথম শুনলে বাক্যটি অনেকের কাছেই অদ্ভুত মনে হয়।
কেননা আমরা সাধারণত ভাবি—
বার্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু ম্যাকলুহান বললেন—
না।
বার্তা বহনকারী মাধ্যমই শেষ পর্যন্ত সমাজকে বদলে দেয়।
একই সংবাদ—চারটি ভিন্ন বাস্তবতা
একই খবর—
সকালে ছাপা সংবাদপত্রে পড়া,
টেলিভিশনে ব্রেকিং নিউজ হিসেবে দেখা,
ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে দেখা,
অথবা TikTok-এর ২৫ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা—
চার ক্ষেত্রেই মানুষের প্রতিক্রিয়া ভিন্ন।
কারণ—
মাধ্যম মানুষের মনোযোগ, ধৈর্য, বিশ্লেষণ ক্ষমতা এবং আবেগকে পুনর্গঠন করে।
আজকের অ্যালগরিদম-নির্ভর নিউজ ফিড এই তত্ত্বের বাস্তব উদাহরণ।
বিশ্বগ্রাম (Global Village): ইন্টারনেটের ৩০ বছর আগেই করা ভবিষ্যদ্বাণী
১৯৬০-এর দশকে ম্যাকলুহান “Global Village” শব্দটি ব্যবহার করেন।
তখন—
Google ছিল না।
Facebook ছিল না।
YouTube ছিল না।
ইন্টারনেটও ছিল না।
কিন্তু তিনি বলেছিলেন—
ইলেকট্রনিক যোগাযোগ পৃথিবীকে এমনভাবে সংযুক্ত করবে যে পুরো মানবসভ্যতা এক গ্রামের মানুষের মতো প্রতিক্রিয়া জানাবে।
আজ—
একটি যুদ্ধ,
একটি নির্বাচন,
একটি ভূমিকম্প,
একটি ভাইরাল ভিডিও,
অথবা একজন অজানা মানুষের বক্তব্য—
মুহূর্তেই বৈশ্বিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
এটাই বিশ্বগ্রাম।
তথ্যের বিস্ফোরণ—এবং তাঁর অবিশ্বাস্য ভবিষ্যদ্বাণী
ম্যাকলুহানের আরেকটি বিখ্যাত বক্তব্য—
“There is absolutely no inevitability as long as there is a willingness to contemplate what is happening.”
আরেকটি বহুল উদ্ধৃত পর্যবেক্ষণ—
“Information is pouring upon us… pattern recognition is our only way of knowing.”
বাংলায় যার সারমর্ম—
তথ্য এত বেশি হয়ে যাবে যে মানুষকে কেবল তথ্য নয়, তথ্যের ভেতরের প্যাটার্ন চিনতে শিখতে হবে।
আজকের AI ঠিক সেটাই করছে।
Machine Learning
Large Language Models
Recommendation Systems
সবই মূলত Pattern Recognition।
AI যুগে ম্যাকলুহান আরও কেন প্রাসঙ্গিক
OpenAI, Google, Anthropic কিংবা Meta—
সবাই এখন তথ্য তৈরি করছে।
কিন্তু ম্যাকলুহান হলে হয়তো প্রশ্ন করতেন—
AI কী লিখছে?
এটি বড় প্রশ্ন নয়।
বড় প্রশ্ন হলো—
AI নামের মাধ্যমটি মানুষের চিন্তার কাঠামো কীভাবে বদলে দিচ্ছে?
এই প্রশ্নই আজ বিশ্বের বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর AI Ethics গবেষণার কেন্দ্রে।
তিনি প্রযুক্তিকে ভয় পাননি—কিন্তু অন্ধ উচ্ছ্বাসকেও সমর্থন করেননি
ম্যাকলুহান কখনো প্রযুক্তিবিরোধী ছিলেন না।
আবার প্রযুক্তিপূজারিও ছিলেন না।
তিনি বলেছিলেন—
প্রত্যেক প্রযুক্তি মানুষের কোনো না কোনো ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয়।
কিন্তু একই সঙ্গে অন্য কোনো ক্ষমতাকে দুর্বলও করে।
আজ স্মার্টফোন—
আমাদের স্মৃতি কমিয়ে দিয়েছে।
GPS বাড়িয়েছে।
কিন্তু দিকনির্ণয়ের স্বাভাবিক ক্ষমতা কমিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যোগাযোগ বাড়িয়েছে।
কিন্তু মনোযোগের স্থায়িত্ব কমিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম কি শুধু সংবাদ দেয়, নাকি সমাজও তৈরি করে?
এই প্রশ্নে ম্যাকলুহানের প্রভাব সবচেয়ে বেশি।
তিনি মনে করতেন—
মিডিয়া কেবল তথ্য পরিবহন করে না।
মিডিয়া মানুষের বাস্তবতার ধারণাও তৈরি করে।
আজকের “Filter Bubble”
“Echo Chamber”
Algorithmic Bias
সবই তাঁর ধারণার আধুনিক রূপ।
সমর্থনের যুক্তি: কেন তাঁকে এখনও ‘মিডিয়ার আইনস্টাইন’ বলা হয়
বিশ্বের বহু গবেষক মনে করেন—
ম্যাকলুহান ইন্টারনেট যুগকে সবচেয়ে আগে বুঝেছিলেন।
The New York Times, BBC, The Economist, Wired, The Guardian-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মাধ্যম সময়ে সময়ে তাঁর চিন্তাকে ডিজিটাল যুগ ব্যাখ্যার অন্যতম ভিত্তি হিসেবে আলোচনা করেছে। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যম, তথ্যের অতিবিস্তার এবং প্রযুক্তির সাংস্কৃতিক প্রভাব নিয়ে সমসাময়িক বিশ্লেষণে তাঁর ধারণা নিয়মিত ফিরে আসে।
হার্ভার্ড, এমআইটি, অক্সফোর্ড, টরন্টো, স্ট্যানফোর্ডসহ বিশ্বের বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে মিডিয়া ও কমিউনিকেশন পাঠ্যক্রমে তাঁর কাজ এখনও গুরুত্বপূর্ণ রেফারেন্স।
সমালোচনাও কম নয়
তবে ম্যাকলুহানকে ঘিরে বিতর্কও রয়েছে।
অনেক সমাজবিজ্ঞানী মনে করেন—
তিনি প্রযুক্তির প্রভাবকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছেন।
সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, শ্রেণিবৈষম্য এবং ক্ষমতার সম্পর্ককে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়েছেন।
সমালোচকদের মতে—
মানুষ প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে।
প্রযুক্তি মানুষকে নয়।
অন্যদিকে তাঁর সমর্থকদের যুক্তি—
আজকের অ্যালগরিদম-চালিত সামাজিক মাধ্যম দেখিয়ে দিয়েছে, প্রযুক্তি শুধু মানুষের ব্যবহারের বস্তু নয়; বরং প্রযুক্তিও মানুষের আচরণ, রাজনৈতিক মতামত, সংবাদ গ্রহণ এবং সামাজিক সম্পর্ককে সক্রিয়ভাবে প্রভাবিত করে।
দুই পক্ষের এই বিতর্কই যোগাযোগবিদ্যার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
বই থেকে শিক্ষা: ‘Understanding Media’ ও ‘The Gutenberg Galaxy’
ম্যাকলুহানের দুটি বই আজও ক্লাসিক—
Understanding Media: The Extensions of Man (1964)
এখানে তিনি যুক্তি দেন, প্রতিটি প্রযুক্তি মানুষের শরীর ও মনের একটি “Extension” বা সম্প্রসারণ। যেমন চাকা মানুষের পায়ের, টেলিফোন কণ্ঠের, আর ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের চিন্তা ও যোগাযোগের সম্প্রসারণ।
The Gutenberg Galaxy (1962)
এই বইয়ে তিনি দেখান, মুদ্রণযন্ত্র কেবল বই ছাপেনি; এটি মানুষের চিন্তার ধরন, শিক্ষাব্যবস্থা, জাতিরাষ্ট্র এবং আধুনিক সমাজ গঠনের পথও বদলে দিয়েছে। একই যুক্তিতে, ডিজিটাল প্রযুক্তিও নতুন এক সামাজিক বাস্তবতা নির্মাণ করছে।
আজকের সাংবাদিকতার জন্য তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা
ডিজিটাল যুগে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তথ্যের অভাব নয়।
বরং—
বিশ্বাসযোগ্যতার অভাব।
AI কয়েক সেকেন্ডে হাজারো লেখা তৈরি করতে পারে।
কিন্তু—
সত্য যাচাই,
প্রেক্ষাপট,
নৈতিকতা,
মানবিকতা,
এবং সম্পাদকীয় বিচারবোধ—
এখনও মানুষের কাজ।
ম্যাকলুহানের দর্শন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—মাধ্যম যত শক্তিশালী হবে, তার ব্যবহার নিয়ে দায়িত্বও তত বাড়বে।
উপসংহার: আজকের পৃথিবী কি তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীকেও ছাড়িয়ে গেছে?
আজ আমরা এমন এক যুগে দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে মানুষ একই সঙ্গে তথ্যের সবচেয়ে সমৃদ্ধ এবং সবচেয়ে বিভ্রান্তিকর পরিবেশে বাস করছে। সামাজিক মাধ্যম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অ্যালগরিদমিক সুপারিশ এবং তাৎক্ষণিক যোগাযোগ পৃথিবীকে সত্যিই একটি “বিশ্বগ্রাম”-এ পরিণত করেছে। কিন্তু এই বিশ্বগ্রামে প্রতিবেশী হওয়া যেমন সহজ হয়েছে, তেমনি ভুল তথ্য, বিভাজন এবং মনোযোগের প্রতিযোগিতাও বেড়েছে।
সম্ভবত এ কারণেই মার্শাল ম্যাকলুহানকে পড়া আজ শুধু একাডেমিক প্রয়োজন নয়; গণতন্ত্র, সাংবাদিকতা এবং ডিজিটাল নাগরিকত্ব বোঝার জন্যও অপরিহার্য।
তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো একটাই—প্রযুক্তিকে বোঝার আগে, প্রযুক্তি আমাদের কীভাবে বদলে দিচ্ছে, সেই প্রশ্নটি করতে হবে।
#MarshallMcLuhan #GlobalVillage #TheMediumIsTheMessage #MediaTheory #DigitalAge #ArtificialIntelligence #AI #Communication #Journalism #MediaStudies #DigitalJournalism #FutureOfMedia #Technology #GlobalCommunication #ThoughtLeadership
#WeeklyCalifornierChithi #CalifornianChithi #BanglaJournalism #IndependentJournalism #TruthCourageConnection




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।