রঙ, রেখা আর স্বপ্নের জাদুকর মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই: বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির এক যুগের অবসান

একুশে পদকপ্রাপ্ত চিত্রশিল্পী, পাপেট আন্দোলনের পথিকৃৎ, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ও সাংস্কৃতিক সংগঠক মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে শোকাহত দেশ। তাঁর প্রস্থান শুধু একজন শিল্পীর বিদায় নয়, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়ের সমাপ্তি।
প্রতিবেদনটি লিখেছেন মাহবুব আহমেদ—
বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির আকাশ থেকে আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র ঝরে গেল। একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য চিত্রশিল্পী, পাপেট শিল্পের অগ্রদূত, টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব এবং সাংস্কৃতিক সংগঠক মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। নিউমোনিয়াজনিত জটিলতায় দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর সোমবার সকালে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। তিনি স্ত্রী, এক পুত্র, এক কন্যা, অসংখ্য ছাত্র, সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী এবং কোটি শিল্পপ্রেমীকে শোকসাগরে ভাসিয়ে রেখে গেছেন।
মৃত্যুর কয়েকদিন আগেও দেশজুড়ে মানুষ তাঁর সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করছিলেন। গত ১৪ জুন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয় এবং একাধিকবার ভেন্টিলেটর সাপোর্ট দিতে হয়। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালালেও শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনের এই কিংবদন্তিকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
মুস্তাফা মনোয়ার ছিলেন এমন একজন শিল্পী, যিনি কেবল ক্যানভাসে ছবি আঁকেননি; তিনি একটি জাতির সাংস্কৃতিক কল্পনাশক্তিকে রঙে, রেখায়, গল্পে এবং স্বপ্নে রূপ দিয়েছিলেন। কবি পূর্ণেন্দু পাত্রীর সেই বিখ্যাত উক্তি—“একটা দেশের জন্য একজন মুস্তাফা মনোয়ারই যথেষ্ট”—আজ তাঁর প্রস্থানের দিনে আরও বেশি সত্য বলে মনে হচ্ছে।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর মাগুরার শ্রীপুর উপজেলার নাকোল গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর পৈতৃক নিবাস ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার মনোহরপুর গ্রামে। তিনি ছিলেন বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত কবি গোলাম মোস্তফার সন্তান। শৈশবেই মাকে হারান। মাতৃহীন সেই শিশুর আশ্রয় হয় শিল্পে। খুব অল্প বয়স থেকেই প্রকৃতি, মানুষ এবং কার্টুনচিত্র আঁকার মধ্য দিয়ে তাঁর শিল্পীসত্তার বিকাশ ঘটে।
শিক্ষাজীবনের শুরু কলকাতায়। পরে নারায়ণগঞ্জ গভর্নমেন্ট স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাস করেন। বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হলেও তাঁর মন টানত রঙ-তুলির জগতে। অবশেষে কলকাতার গভর্নমেন্ট কলেজ অব আর্ট অ্যান্ড ক্রাফটে ভর্তি হয়ে ১৯৫৯ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রাবস্থায় দার্জিলিংয়ের প্রাকৃতিক দৃশ্য নিয়ে আঁকা জলরঙের ছবিগুলো তাঁকে প্রথম শিল্পী হিসেবে পরিচিতি এনে দেয়।
ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি ছিলেন কিশোর ছাত্র। পাকিস্তানি শাসকদের বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থানের প্রতিবাদে পোস্টার ও চিত্রকর্ম এঁকে জনমত গঠনে ভূমিকা রাখেন। এর জন্য তাঁকে জেলও খাটতে হয়েছিল। পরবর্তীকালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে অবস্থান করে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সাংস্কৃতিক দলের নেতৃত্ব দেন। শিল্প ও সংস্কৃতিকে তিনি স্বাধীনতার সংগ্রামের শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন।
বাংলাদেশে পাপেট শিল্পকে জনপ্রিয় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান অনন্য। তাঁকে অনেকেই ‘বাংলাদেশের পাপেট ম্যান’ নামে অভিহিত করেন। তাঁর নির্মিত পাপেট নাটক ও শিশুতোষ অনুষ্ঠান প্রজন্মের পর প্রজন্মের শৈশবকে আলোকিত করেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনে প্রচারিত ‘মনের কথা’সহ বিভিন্ন অনুষ্ঠান আজও দর্শকের স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে।
টেলিভিশন নাটক, শিশুতোষ অনুষ্ঠান, পাপেট, চারুকলা, সাংস্কৃতিক প্রশাসন—প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি রেখে গেছেন অসামান্য অবদান। তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন।
ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যের প্রতীকী স্থাপনা, দ্বিতীয় সাফ গেমসের মিশুক নির্মাণ, শিশুদের জন্য সৃজনশীল অনুষ্ঠান নির্মাণ এবং সাংস্কৃতিক পরিকল্পনার বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর মেধা ও উদ্ভাবন বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিসরকে সমৃদ্ধ করেছে।
তাঁর শিল্পকর্ম আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছে। ১৯৫৭ সালে কলকাতার অল ইন্ডিয়া ফাইন আর্টস প্রদর্শনীতে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। ১৯৫৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা প্রদর্শনীতে তেলচিত্র ও জলরঙ বিভাগে দুটি স্বর্ণপদক লাভ করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে অসংখ্য দেশি-বিদেশি সম্মাননা অর্জনের পাশাপাশি ২০০৪ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একুশে পদকে ভূষিত করে। (Wikipedia)
ব্যক্তিজীবনে ১৯৬৫ সালে তিনি মেরী মনোয়ারকে বিয়ে করেন। তাঁদের এক পুত্র ও এক কন্যা সন্তান রয়েছে। তাঁর পুত্র সাহদত মনোয়ার একজন পাইলট এবং কন্যা নন্দিনী মনোয়ার উন্নয়ন খাতে কর্মরত। বিশ্বখ্যাত বাংলাদেশি অস্কারজয়ী অ্যানিমেটর নাফিস বিন জাফর তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র।
বাংলাদেশের শিল্পাঙ্গনে আজ শোকের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিল্পী, লেখক, শিক্ষক, সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাধারণ মানুষ একযোগে স্মরণ করছেন সেই মানুষটিকে, যিনি শিল্পকে কেবল পেশা হিসেবে নয়, জাতি গঠনের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছিলেন।
মুস্তাফা মনোয়ার চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর আঁকা রঙ, তাঁর নির্মিত পাপেট, তাঁর সৃষ্ট চরিত্র, তাঁর শিক্ষা এবং তাঁর সাংস্কৃতিক স্বপ্ন বাংলাদেশের শিল্প-সংস্কৃতির ভুবনে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
#MustafaMonowar #BangladeshArt #EkusheyPadak #BangladeshCulture #PuppetMan #LegendLivesOn #BangladeshiArtist #ArtAndCulture #Tribute #WeeklyCalifornierChithi




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।