নানা পাটেকর: পর্দার তীব্রতা, জীবনের ব্যক্তিগত ক্ষত—৭৫ বছরে বিদায়

মারাঠি মঞ্চ থেকে হিন্দি ও সমান্তরাল ধারার সিনেমা—নানা পাটেকর ছিলেন এমন এক অভিনেতা, যাঁর উপস্থিতি পর্দায় সহজে উপেক্ষা করা যেত না। ৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুর পর আলোচনায় এসেছে তাঁর শিল্পীজীবন, ব্যক্তিগত শোক, বহুদিনের গুঞ্জন এবং #MeToo-র সময় ওঠা অভিযোগও।
পূর্ণ প্রতিবেদন
পর্দায় নানা পাটেকরকে দেখলে তাঁর কণ্ঠ, দৃষ্টি আর সংযত অথচ বিস্ফোরক অভিনয় একসঙ্গে মনে থাকে। বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, গোয়ায় ৭৫ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুতে ভারতীয় সিনেমা হারাল এমন এক অভিনেতাকে, যিনি নায়ক, প্রতিপক্ষ, চরিত্রাভিনেতা—প্রতিটি অবস্থানেই নিজের আলাদা ছাপ রাখতে পেরেছিলেন।
রয়টার্স জানিয়েছে, তাঁকে গোয়ার বাড়িতে অচেতন অবস্থায় পাওয়ার পর হাসপাতালে নেওয়া হয়; চিকিৎসকের বক্তব্য অনুযায়ী, হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। ঠিক কী কারণে এমনটা ঘটেছিল, তা তাৎক্ষণিকভাবে স্পষ্ট ছিল না। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসও তাঁর মৃত্যুর খবর ও বর্ণিত কারণ নিশ্চিত করেছে।
মৃত্যুর খবরের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তাঁর জীবনের নানা অধ্যায়—স্ত্রী নীলকান্তির সঙ্গে আলাদা থাকা, প্রথম সন্তানকে হারানো, এবং অভিনেত্রী মনীষা কৈরালার সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জন। কিন্তু এই কাহিনিগুলোর প্রমাণের মান এক নয়। তাঁর শিল্পীজীবনের স্বীকৃতি সরকারি নথিতে নথিভুক্ত; পারিবারিক অভিজ্ঞতার কিছু অংশ তিনি নিজেই সাক্ষাৎকারে বলেছেন; আর মনীষার সঙ্গে সম্পর্কের রোমান্টিক ব্যাখ্যা বহু বছর ধরে আলোচিত হলেও তা নির্ভরযোগ্যভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য নয়।
মঞ্চ থেকে সিনেমায়
নানা পাটেকরের জন্মনাম বিশ্বনাথ পাটেকর। মহারাষ্ট্রে বেড়ে ওঠা এই অভিনেতার কর্মজীবনের শুরু মারাঠি থিয়েটারে। ১৯৭৮ সালে ‘গমন’ ছবিতে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর তিনি ধীরে ধীরে হিন্দি ও মারাঠি—দুই ভাষার সিনেমাতেই নিজের জায়গা তৈরি করেন। ‘সালাম বম্বে!’, ‘পরিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘অগ্নিসাক্ষী’ ও ‘নটসম্রাট’ তাঁর বহুমাত্রিক অভিনয়জীবনের উল্লেখযোগ্য কাজগুলোর মধ্যে পড়ে। আন্তর্জাতিক পরিচিতি আসে মীরা নায়ারের ‘সালাম বম্বে!’-র মাধ্যমে। রয়টার্স ও এপি তাঁর প্রায় পাঁচ দশকের অভিনয়জীবন এবং সমান্তরাল ও মূলধারার সিনেমায় কাজের কথা তুলে ধরেছে।
তাঁর অভিনয়কে শুধু উচ্চকণ্ঠ বা রাগী চরিত্রের মধ্যে আটকে রাখা যায় না। ‘খামোশি: দ্য মিউজিক্যাল’-এ তিনি ছিলেন এক বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী পিতার ভূমিকায়; ‘নটসম্রাট’-এ মঞ্চের সাবেক সম্রাটের অহং, স্মৃতি ও নিঃসঙ্গতা একসঙ্গে ধারণ করেছিলেন। চরিত্রের ভেতরের দ্বন্দ্বকে শরীরী ভাষা ও কণ্ঠের ওঠানামায় প্রকাশ করার ক্ষমতাই তাঁকে বহু সহকর্মীর থেকে আলাদা করেছিল।
ভারতের সরকারি পদ্ম পুরস্কারের তালিকায় ২০১৩ সালের পদ্মশ্রীপ্রাপকদের মধ্যে তাঁর নাম রয়েছে। এপি জানিয়েছে, তিনি তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারও পেয়েছিলেন।
সন্তানের মৃত্যু: যে শোকের কথা তিনি নিজেই বলেছেন
পাটেকরের ব্যক্তিজীবনের সবচেয়ে গভীর ক্ষত ছিল তাঁর বড় ছেলে দুর্বাসার মৃত্যু। ‘দ্য লাল্লানটপ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ছেলেটি জন্মগত শারীরিক সমস্যায় ভুগছিল এবং আড়াই বছর বয়সে মারা যায়। পরে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত সাক্ষাৎকারের প্রতিবেদনে তাঁর সেই অভিজ্ঞতার কথা এসেছে—সন্তানের অসুস্থতার সময় নিজের উদ্বেগের কেন্দ্রে ছেলের কষ্টের বদলে লোকজন কী ভাববে, সেই চিন্তা চলে এসেছিল বলে তিনি অনুশোচনা করেছিলেন। তিনি আরও বলেছিলেন, সন্তানের মৃত্যুর পর অতিরিক্ত ধূমপানে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন।
এই স্মৃতিকে গসিপের উপাদান বানালে তার মানবিক অর্থ হারিয়ে যায়। তাঁর নিজের বক্তব্যে এখানে আছে শোক, অপরাধবোধ এবং পরবর্তী আত্মসমালোচনা—একজন জনপ্রিয় অভিনেতার ব্যক্তিগত জীবনের এমন অংশ, যা পর্দার চরিত্রের চেয়ে অনেক বেশি নীরব ও জটিল।
নীলকান্তির সঙ্গে সম্পর্ক: আলাদা থাকা, কিন্তু আইনি বিচ্ছেদ নয়
পাটেকর ও নীলকান্তির পরিচয় হয়েছিল থিয়েটারের সূত্রে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ সময় তাঁরা আলাদা থাকলেও তাঁদের বিবাহবিচ্ছেদ হয়নি। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ প্রকাশিত তাঁর পুরোনো সাক্ষাৎকারের বিবরণে পাটেকর তাঁদের সম্পর্কের সুখের সময়ের কথাও স্মরণ করেছিলেন। তবে তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের সব সিদ্ধান্ত বা দূরত্বের কারণ জনসমক্ষে সম্পূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি। তাই তাঁদের দাম্পত্যকে একটি সরল “বিচ্ছেদের গল্প” হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
মনীষা কৈরালাকে ঘিরে গুঞ্জন: যা জানা, আর যা জানা নয়
মনীষা কৈরালা ও নানা পাটেকর ‘অগ্নিসাক্ষী’সহ কয়েকটি ছবিতে একসঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে বহু বছর ধরে সংবাদমাধ্যমে গুঞ্জন প্রকাশিত হয়েছে। তবে গুঞ্জনকে নিশ্চিত প্রেমের সম্পর্ক হিসেবে দেখানোর মতো নির্ভরযোগ্য, প্রত্যক্ষ প্রমাণ সামনে নেই।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ‘অগ্নিসাক্ষী’র চিত্রনাট্যকার রণবীর পুষ্প এ নিয়ে কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের সংবাদ-প্রতিবেদনগুলোতে তিনি দুই অভিনেতার মধ্যে ঘনিষ্ঠতা ও বোঝাপড়ার কথা বলেছেন, তবে তাঁদের সম্পর্কের প্রকৃতি প্রেম ছিল কি না, তা তিনি নিশ্চিত করেননি। ফলে ছবির প্রচারে ব্যবহৃত “প্রেমের গুঞ্জন” কথাটিকে প্রতিষ্ঠিত জীবনীমূলক তথ্যের বদলে গুঞ্জন হিসেবেই দেখা উচিত।
#MeToo-র সময় ওঠা অভিযোগও উত্তরাধিকারের অংশ
২০১৮ সালে অভিনেত্রী তনুশ্রী দত্ত ২০০৮ সালের ‘হর্ন ওকে প্লিজ’ ছবির একটি গানের শুটিংয়ের সময় নানা পাটেকরের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ আনেন। পাটেকর অভিযোগ অস্বীকার করেন। ২০১৯ সালে মুম্বাই পুলিশ তদন্তের পর আদালতে ‘বি-সামারি’ প্রতিবেদন জমা দেয়—অর্থাৎ পুলিশের বক্তব্য ছিল অভিযোগের সমর্থনে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সে সময় দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছিল, প্রতিবেদনটি গ্রহণ করা হবে কি না, তা আদালতের বিবেচনাধীন ছিল। দত্ত পুলিশের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে নতুন তদন্তও চেয়েছিলেন।
এই আইনি অবস্থানকে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া কিংবা অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হওয়া—কোনোটির সঙ্গেই গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। পুলিশের তদন্তে প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানানো হয়েছিল; একই সঙ্গে অভিযোগকারী সেই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। একজন শিল্পীর মূল্যায়নে তাঁর কাজের পাশাপাশি এই অভিযোগ ও তার পরবর্তী প্রক্রিয়ার কথাও যথাযথভাবে উল্লেখ করা দরকার—তবে যাচাইযোগ্য অবস্থান স্পষ্ট রেখে, অনুমান বা রায় না জুড়ে।
পর্দার বাইরে তাঁর উত্তরাধিকার
পাটেকরের মৃত্যুর পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর অভিনয়ের স্বাতন্ত্র্য ও পর্দায় উপস্থিতির প্রশংসা করে শোকবার্তা দিয়েছেন। এই ধরনের শ্রদ্ধার পাশাপাশি তাঁর কাজ নিয়ে আরও স্থায়ী প্রশ্নও থাকবে: ভারতীয় সিনেমা কি তাঁর মতো তীব্র চরিত্রাভিনেতাদের জন্য যথেষ্ট বৈচিত্র্যময় ভূমিকা তৈরি করতে পেরেছিল? দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এ অভিনেতা ইরফান খানের স্ত্রী সুতাপা সিকদারও মন্তব্য করেছেন, ভারতীয় সিনেমা নানা পাটেকর ও ইরফান খানের প্রতিভাকে আরও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারত।
নানা পাটেকরের জীবনকে এক বাক্যে বাঁধা কঠিন। তাঁর শিল্পীজীবনে ছিল মঞ্চের শৃঙ্খলা, সমান্তরাল সিনেমার বাস্তবতা, মূলধারার জনপ্রিয়তা এবং বহু স্মরণীয় চরিত্র। ব্যক্তিজীবনে ছিল গভীর শোক, সম্পর্কের জটিলতা এবং এমন অভিযোগ, যার আইনি পরিণতি নিয়ে সতর্ক ভাষা জরুরি। তাঁর মৃত্যুর পর তাঁকে স্মরণ করার সবচেয়ে সৎ উপায়—অভিনয়ের শক্তিকে স্বীকার করা, আর জীবনের বিতর্কিত অধ্যায়গুলোকে প্রমাণের সীমার মধ্যে রেখে বলা।
কী জানা, কী এখনো অস্পষ্ট
যা জানা
নানা পাটেকর ৮ অক্টোবর ২০২৬, ৭৫ বছর বয়সে গোয়ায় মারা যান; সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তিনি মারাঠি ও হিন্দি সিনেমায় প্রায় পাঁচ দশক কাজ করেছেন; পদ্মশ্রী ও তিনটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছিলেন।
তাঁর বড় ছেলে দুর্বাসা আড়াই বছর বয়সে মারা যায়—এ বিষয়ে পাটেকর নিজেই সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন।
তনুশ্রী দত্তের অভিযোগের তদন্তে পুলিশ ২০১৯ সালে আদালতে ‘বি-সামারি’ প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল; দত্ত সেই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিলেন।
যা এখনো অস্পষ্ট
হৃদ্যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হওয়ার নির্দিষ্ট কারণ।
নীলকান্তির সঙ্গে তাঁদের দীর্ঘদিন আলাদা থাকার সব ব্যক্তিগত কারণ।
মনীষা কৈরালার সঙ্গে তাঁদের সম্পর্কের প্রকৃতি—এ বিষয়ে প্রকাশিত খবরের বাইরে নিশ্চিত প্রমাণ নেই।
২০১৯ সালের পুলিশি প্রতিবেদনের পর মামলার সর্বশেষ বিচারিক অবস্থান; এই লেখার জন্য পাওয়া উৎসে তা নিশ্চিত করা যায়নি।
উৎস ও যাচাই নোট
মৃত্যু ও কর্মজীবনের তথ্য রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। পদ্মশ্রীর তথ্য ভারতের সরকারি পুরস্কার তালিকা থেকে নেওয়া। পারিবারিক স্মৃতি ও অভিযোগ-সংক্রান্ত অংশে পাটেকরের সাক্ষাৎকার এবং দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এনডিটিভিসহ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ব্যবহার করা হয়েছে। মনীষা কৈরালার সঙ্গে সম্পর্কের গুঞ্জনকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
#নানাপাটেকর #ভারতীয়সিনেমা #বলিউড #মারাঠিসিনেমা #মনীষাকৈরালা #তনুশ্রীদত্ত #চলচ্চিত্র
প্রধান উৎস




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।