পারস্য উপসাগরে নজিরবিহীন পারদ: মার্কিন-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলায় বিপন্ন বৈশ্বিক জ্বালানি রুট

পারস্য উপসাগর এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা এক নতুন ও বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে। গত এপ্রিল মাসে (২০২৬) দুই পক্ষের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও, সাম্প্রতিক দিনগুলোতে সমুদ্রসীমায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সেই চুক্তি প্রায় ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। জুনের প্রথম সপ্তাহ জুড়েই উপসাগরীয় অঞ্চলে একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে, যা বিশ্ববাজারে তেলের দাম এক ধাক্কায় ২ শতাংশের বেশি বাড়িয়ে দিয়েছে।
উত্তেজনার সূত্রপাত ঘটে যখন মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) হরমুজ প্রণালীর বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হুমকি স্বরূপ ইরানের ৪টি ‘ওয়ান-ওয়ে’ অ্যাটাক ড্রোন ভূপাতিত করে এবং ইরানের উপকূলীয় রাডার স্টেশনগুলো লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডস (IRGC) কুয়েতে অবস্থিত দুটি মার্কিন বিমান ঘাঁটি এবং বাহরাইনে ইউএস পঞ্চম ফ্লিটের (Fifth Fleet) সদর দফতর লক্ষ্য করে এক ঝাঁক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করে। কুয়েত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইরানি ড্রোন আঘাত হানায় সাময়িকভাবে বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং বাহরাইন সামরিক বাহিনীও একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে।
ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ার (ISW)-এর বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে ইরান মূলত হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি সম্পূর্ণভাবে হঠাতে চাইছে। গত ৮ জুন ওমান উপকূলে ইরানের হামলায় মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি 'এএইচ-৬৪ অ্যাপাচে' হেলিকপ্টার ভূপাতিত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে এর যোগ্য জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিপরীতে ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মহসেন রেজাই স্পষ্ট জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালীতে কোনো ধরনের মার্কিন আধিপত্য বরদাশত করা হবে না এবং যেকোনো আগ্রাসনের জবাব আরও ধ্বংসাত্মক ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে দেওয়া হবে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (LNG) প্রায় এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয় এই হরমুজ প্রণালী দিয়ে, যা গত কয়েক মাসের অচলাবস্থার কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ উপসাগরীয় আরব দেশগুলো ইরানের এই বেপরোয়া আচরণের বিরুদ্ধে যৌথ আঞ্চলিক প্রতিরোধের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যদিকে, ওয়াশিংটন ইরানের বাজেয়াপ্ত তহবিল ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত আরব মিত্রদের পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করছে। এই সংঘাত যদি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে রূপ নেয়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সমগ্র বৈশ্বিক অর্থনীতিকে এক নজিরবিহীন মন্দার দিকে ঠেলে দেবে।




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।