টিম কুকের বিদায় ও অ্যাপলের রেকর্ড আয়: জন টার্নাসের সামনে এআই ও চিপ সংকট

রেকর্ড আয়ের আলোয় টিম কুকের বিদায়: জন টার্নাসের সামনে অ্যাপলের ‘১০০ বছরের বন্যা’ ও এআই-যুদ্ধ
মাহবুব আহমেদ।আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি
একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাসে কিছু সন্ধ্যা আসে, যখন হিসাবের খাতায় লেখা সংখ্যাগুলোকে ছাপিয়ে যায় নেতৃত্ব বদলের আবেগ। ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই অ্যাপলের আর্নিংস কলটি ছিল তেমনই এক সন্ধ্যা—একদিকে কোম্পানির ইতিহাসে সর্বোচ্চ জুন-প্রান্তিক রাজস্ব, অন্যদিকে প্রায় ১৫ বছর ধরে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী প্রযুক্তি সাম্রাজ্যগুলোর একটিকে পরিচালনা করা টিম কুকের শেষ আর্থিক প্রতিবেদন।
অ্যাপল জানায়, ২৭ জুন শেষ হওয়া ২০২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিকে কোম্পানিটি ১০৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব অর্জন করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। নিট মুনাফা দাঁড়ায় প্রায় ২৯ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার এবং শেয়ারপ্রতি আয় হয় ২ দশমিক ০২ ডলার—বছরওয়ারি ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি। অ্যাপল একে কোম্পানির ইতিহাসের সর্বোচ্চ জুন-প্রান্তিক ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করেছে। (Apple)
কিন্তু এই উজ্জ্বল সংখ্যার মাঝেই যেন শোনা গেল বিদায়ের ঘণ্টা। আগামী ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে অ্যাপলের প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব নিচ্ছেন দীর্ঘদিনের হার্ডওয়্যার প্রকৌশলপ্রধান জন টার্নাস। টিম কুক সিইও পদ ছেড়ে কোম্পানির এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন। অ্যাপলের পরিচালনা পর্ষদ সর্বসম্মতভাবে এই নেতৃত্ব পরিবর্তন অনুমোদন করেছে বলে প্রতিষ্ঠানটি এপ্রিলেই জানিয়েছিল। (Apple)
সাফল্যের রেকর্ড, তবু কেন আতঙ্কিত ওয়াল স্ট্রিট?
ফলাফল প্রকাশের পর প্রথম প্রতিক্রিয়ায় অ্যাপলের শেয়ার প্রায় ৫ দশমিক ৫ থেকে ৬ শতাংশ কমে যায়। পরদিন নিয়মিত লেনদেনে পতন প্রায় ১০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে, যার ফলে এক পর্যায়ে কোম্পানিটির বাজারমূল্য থেকে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার মুছে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। (Reuters)
এই বিপরীতমুখী দৃশ্য—রেকর্ড আয় অথচ শেয়ারের বড় পতন—শেয়ারবাজারের একটি পুরোনো সত্য মনে করিয়ে দেয়: বাজার অতীতের সাফল্যের মূল্য দেয়, কিন্তু শেয়ারের দাম নির্ধারণ করে ভবিষ্যতের প্রত্যাশা।
অ্যাপল আগামী সেপ্টেম্বর প্রান্তিকে রাজস্ব ৯ থেকে ১১ শতাংশ বাড়বে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে। অথচ ওয়াল স্ট্রিটের গড় প্রত্যাশা ছিল প্রায় ১২ শতাংশ। মাত্র এক বা দুই শতাংশ পয়েন্টের এই ব্যবধানও বিনিয়োগকারীদের কাছে বড় সতর্কসংকেত হয়ে ওঠে, কারণ অ্যাপলের মতো প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সামান্য প্রবৃদ্ধি-ঘাটতিও কয়েক দশক বিলিয়ন ডলারের পার্থক্য তৈরি করতে পারে। (Reuters)
আইফোন ও ম্যাকের অসাধারণ উত্থান
প্রান্তিক ফলাফলে অ্যাপলের সবচেয়ে শক্তিশালী চালিকাশক্তি ছিল আইফোন। আইফোন বিক্রি বছরওয়ারি প্রায় ২১ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ৫৪ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে—জুন প্রান্তিকের জন্য নতুন রেকর্ড। ম্যাক বিক্রি প্রায় ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়ে ১০ বিলিয়ন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছে। (Reuters)
তবে সব বিভাগ সমানভাবে ভালো করেনি। আইপ্যাড বিক্রি প্রায় ৫ দশমিক ৯ শতাংশ কমেছে। সার্ভিসেস বিভাগ থেকে রেকর্ড ৩০ দশমিক ৭৪ বিলিয়ন ডলার এলেও এর ১২ দশমিক ১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা দুর্বল ছিল। অ্যাপ স্টোরের নীতিগত ও আইনি পরিবর্তন, বিশেষ করে বিভিন্ন দেশে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার চাপ, সার্ভিসেস বিভাগের ভবিষ্যৎ মার্জিন নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। (Reuters)
অর্থাৎ অ্যাপল একদিকে আইফোন ও ম্যাকের ওপর ভর করে দ্রুত বাড়ছে, অন্যদিকে তার সবচেয়ে বেশি লাভজনক সার্ভিস ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ধীর হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগের এটি আরেকটি কারণ।
‘১০০ বছরের বন্যা’: মেমোরি চিপের বাজারে কী ঘটছে?
শেষ আর্নিংস কলে টিম কুক মেমোরি চিপের মূল্যবৃদ্ধিকে রূপক অর্থে “১০০ বছরের বন্যা” বলে বর্ণনা করেন। তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য কেবল অ্যাপলের জন্য নয়; এটি বর্তমান বৈশ্বিক প্রযুক্তি অর্থনীতির একটি গভীর পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ডেটা সেন্টার নির্মাণে বিপুল পরিমাণ উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেমোরি, স্টোরেজ, উন্নত ওয়েফার ও প্যাকেজিং সক্ষমতা প্রয়োজন হচ্ছে। ফলে স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স, মাইক্রন ও অন্যান্য নির্মাতার উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশ এআই অবকাঠামোর দিকে চলে যাচ্ছে। স্মার্টফোন ও ব্যক্তিগত কম্পিউটার নির্মাতারা তাই একই যন্ত্রাংশের জন্য বেশি দাম দিয়ে প্রতিযোগিতা করছে। Qualcomm-ও জানিয়েছে, মেমোরি, ওয়েফার ও প্যাকেজিং ব্যয় বৃদ্ধির কারণে শিল্পজুড়ে মূল্যচাপ বাড়ছে। (Fortune)
অ্যাপল ইতিমধ্যে ম্যাক ও আইপ্যাডের দাম বাড়িয়েছে। আইফোনের দাম এখনো তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল রাখা হলেও উৎপাদন ব্যয় অব্যাহতভাবে বাড়লে নতুন প্রজন্মের আইফোনেও মূল্যবৃদ্ধির ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। (The Wall Street Journal)
সমস্যা কেবল মেমোরির দাম নয়। অ্যাপল নিজস্ব ডিজাইনের প্রসেসর ব্যবহার করলেও সেগুলো তৈরির জন্য উন্নত সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনক্ষমতার ওপর নির্ভরশীল। টিম কুক জানিয়েছেন, সর্বাধুনিক নোডে তৈরি সিস্টেম-অন-চিপের সরবরাহও গুরুতরভাবে সীমিত। ফলে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত আইফোন, ম্যাক ও আইপ্যাড উৎপাদন করতে না পারলে রাজস্ব প্রবৃদ্ধি আটকে যেতে পারে। (Business Insider)
এখানেই এক অস্বস্তিকর বিদ্রূপ রয়েছে। সরবরাহব্যবস্থাকে নিখুঁত করার দক্ষতার কারণেই টিম কুক বিশ্বখ্যাত হয়েছিলেন। অথচ তাঁর বিদায়ের মুহূর্তে উত্তরসূরির হাতে তিনি এমন একটি অ্যাপল তুলে দিচ্ছেন, যার বড় ঝুঁকিগুলোর একটি আবার সেই সরবরাহব্যবস্থাই।
ট্যারিফ রিফান্ড: ব্যবস্থাপনার সাফল্য, নাকি এককালীন সুবিধা?
অ্যাপলের প্রান্তিক মুনাফায় প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের ট্যারিফ রিফান্ড গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে এই অর্থ গ্রস মার্জিন প্রায় দুই শতাংশ পয়েন্ট এবং শেয়ারপ্রতি আয় ১১ সেন্ট বাড়িয়েছে। রিফান্ডসহ গ্রস মার্জিন ছিল ৫০ দশমিক ১ শতাংশ; এই সুবিধা বাদ দিলে তা প্রায় ৪৮ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসে। (Apple)
কুকের সমর্থকেরা বলবেন, জটিল বাণিজ্যনীতি, শুল্ক ও সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক সামলে এত বড় অর্থ ফেরত পাওয়া তাঁর প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক দক্ষতার প্রমাণ। এই যুক্তি একেবারে অমূলক নয়।
তবে সমালোচকদের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। ট্যারিফ রিফান্ড কোনো স্থায়ী ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি নয়; এটি এককালীন আর্থিক সুবিধা। ওই অর্থ বাদ দিলে অ্যাপলের প্রকৃত পরিচালন মার্জিনে মেমোরি ও উৎপাদন ব্যয়ের চাপ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কাজেই ৫০ দশমিক ১ শতাংশ মার্জিনকে ভবিষ্যৎ প্রান্তিকগুলোর স্বাভাবিক মান ধরে নেওয়া বিভ্রান্তিকর হবে।
টিম কুক: উদ্ভাবক কম, সাম্রাজ্য নির্মাতা বেশি?
২০১১ সালে স্টিভ জবসের কাছ থেকে দায়িত্ব নেওয়ার সময় টিম কুকের সামনে প্রায় অসম্ভব একটি প্রশ্ন ছিল—স্টিভ জবস-পরবর্তী অ্যাপল কি আদৌ টিকে থাকবে?
১৫ বছর পর উত্তরটি পরিষ্কার। কুক দায়িত্ব নেওয়ার সময় অ্যাপলের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৩৫০ বিলিয়ন ডলার। তাঁর বিদায়ের বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রথমবার পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের বাজারমূল্য ছুঁয়েছে। বার্ষিক রাজস্ব প্রায় চার গুণ বেড়ে ৪১৬ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে এবং সক্রিয় অ্যাপল ডিভাইসের সংখ্যা আড়াই বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। (Reuters)
কুকের নেতৃত্বে অ্যাপল কেবল আইফোন বিক্রেতা থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছে হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার, পেমেন্ট, স্বাস্থ্য, বিনোদন, ক্লাউড ও সাবস্ক্রিপশনের একটি বিশাল বন্ধ ইকোসিস্টেম।
অ্যাপল ওয়াচ পরিধানযোগ্য স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিকে মূলধারায় নিয়ে এসেছে। এয়ারপডস তারবিহীন হেডফোন বাজারকে পুনর্গঠন করেছে। অ্যাপল মিউজিক, আইক্লাউড, অ্যাপল টিভি, ফিটনেস, পেমেন্ট ও অ্যাপ স্টোরের মতো পরিষেবা কোম্পানিকে ধারাবাহিক আয় দিয়েছে। একসময় আইফোনের ওপর অতিনির্ভরতা নিয়ে যে ভয় ছিল, সার্ভিসেস ব্যবসার সম্প্রসারণ তা অনেকটাই কমিয়েছে। (Reuters)
কুকের অ্যাপল ছিল পণ্যের বিস্ফোরক নাটকীয়তার চেয়ে শৃঙ্খলিত পুনরাবৃত্তি, উৎপাদন দক্ষতা, মার্জিন, ব্র্যান্ড আনুগত্য ও পরিষেবা-নির্ভর আয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
এই কারণেই তাঁকে স্টিভ জবসের অনুকরণ হিসেবে বিচার করা ভুল। জবস ছিলেন কল্পনার স্থপতি; কুক ছিলেন সেই কল্পনার বিশ্বব্যাপী অবকাঠামো নির্মাতা।
সমালোচনার জায়গা: অ্যাপল কি তার আত্মা হারিয়েছে?
টিম কুকের সাফল্যের গল্প যত বড়, সমালোচনার তালিকাও তত ছোট নয়।
ট্রিপ মিকলের আলোচিত বই After Steve: How Apple Became a Trillion-Dollar Company and Lost Its Soul–এ কুক-যুগের অ্যাপলকে এমন এক প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে, যা আর্থিকভাবে অভাবনীয় সাফল্য পেলেও স্টিভ জবসের সময়কার ঝুঁকি নেওয়া ও নতুন পণ্যশ্রেণি তৈরির সংস্কৃতি ধীরে ধীরে হারিয়েছে। বইটির মূল দ্বন্দ্ব হলো—একটি প্রতিষ্ঠান কি একই সঙ্গে নিখুঁত ব্যবসা এবং বিপ্লবী সৃজনশীল শক্তি হতে পারে? (Goodreads)
সমালোচকেরা বলেন, অ্যাপল ওয়াচ ও এয়ারপডস সফল হলেও আইফোনের মতো নতুন কোনো গণপ্রযুক্তি শ্রেণি কুক সৃষ্টি করতে পারেননি। ভিশন প্রো প্রযুক্তিগতভাবে উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও এর দাম, ব্যবহারিক সীমাবদ্ধতা ও বাজারের ক্ষুদ্রতা এটিকে এখনো মূলধারার পণ্য হতে দেয়নি।
আরও গুরুতর সমালোচনা এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে। প্রতিদ্বন্দ্বীরা যখন জেনারেটিভ এআই, চ্যাটবট ও ক্লাউড অবকাঠামোয় শত শত বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, অ্যাপল তখন তুলনামূলক ধীরগতিতে এগিয়েছে। সিরির আধুনিকীকরণে বিলম্ব এবং বাইরের অংশীদারের প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা প্রশ্ন তুলেছে—অ্যাপল কি পরবর্তী কম্পিউটিং বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে, নাকি কেবল অন্যদের এআইকে সুন্দর হার্ডওয়্যারের ভেতরে পরিবেশন করবে? (AP News)
তবে এর বিপরীত যুক্তিও আছে। এআই খাতে প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে অ্যাপল তুলনামূলক কম মূলধন ব্যয় করে শক্তিশালী নগদপ্রবাহ ধরে রেখেছে। এআই মডেলের প্রতিটি স্তর নিজে বানানোর বদলে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অংশীদারত্ব করা দীর্ঘমেয়াদে আরও সাশ্রয়ী ও বাস্তববাদী কৌশল হতে পারে। জুলাইয়ে অ্যাপলের পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার বাজারমূল্য ছোঁয়ার পেছনে এই কম-ব্যয়ী অবস্থানও বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। (Reuters)
জন টার্নাস কে, এবং কেন তাঁকেই বেছে নেওয়া হলো?
জন টার্নাস অ্যাপলে যোগ দেন ২০০১ সালে। তিনি ম্যাক, আইপ্যাড, আইফোন এবং অ্যাপলের নিজস্ব সিলিকনভিত্তিক হার্ডওয়্যার প্রকৌশলের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে শিক্ষিত টার্নাস দীর্ঘদিন ধরে অ্যাপলের পণ্য উন্নয়ন ও উৎপাদন বাস্তবায়নের মধ্যবর্তী সেতু হিসেবে কাজ করেছেন। (Reuters)
তাঁকে বেছে নেওয়ার অর্থ অ্যাপল বাইরের কোনো মিডিয়া-খ্যাত এআই নির্বাহী নয়, বরং নিজের ভেতরের পণ্য-সংস্কৃতিকে নেতৃত্বের কেন্দ্রে রাখছে।
এ সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি হলো ধারাবাহিকতা। টার্নাস অ্যাপলের ডিজাইন ভাষা, গোপনীয় সংস্কৃতি, প্রকৌশল পদ্ধতি ও সরবরাহব্যবস্থা গভীরভাবে জানেন। নেতৃত্ব পরিবর্তনে বড় সাংগঠনিক ধাক্কার ঝুঁকি তাই কম।
কিন্তু এখানেই উদ্বেগের জায়গাও রয়েছে। অ্যাপলের বর্তমান দুর্বলতা যদি হয় এআই সফটওয়্যার, ক্লাউড সক্ষমতা ও নতুন ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতায় পিছিয়ে থাকা, তাহলে আরেকজন হার্ডওয়্যারকেন্দ্রিক নির্বাহী কি সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারবেন?
টার্নাসের সামনে প্রশ্ন তাই কেবল—পরবর্তী আইফোন কত পাতলা হবে—এটি নয়। বড় প্রশ্ন হলো: এমন এক যুগে, যখন প্রযুক্তির মূল্য দ্রুত হার্ডওয়্যার থেকে বুদ্ধিমান সফটওয়্যার ও ব্যক্তিগত এজেন্টের দিকে যাচ্ছে, অ্যাপল তার দুই দশকের ইকোসিস্টেমকে কীভাবে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করবে?
উত্তরাধিকার না ছায়া?
টিম কুক নির্বাহী চেয়ারম্যান হিসেবে থেকে যাওয়ায় জন টার্নাস তাৎক্ষণিকভাবে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা পাবেন কি না, সেটিও আলোচনার বিষয়। একদিকে কুকের উপস্থিতি সরকার, বিনিয়োগকারী, সরবরাহকারী ও পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখতে সাহায্য করবে। অন্যদিকে অতিশক্তিশালী পূর্বসূরির উপস্থিতি নতুন সিইওর সিদ্ধান্ত গ্রহণকে ছায়াচ্ছন্ন করতে পারে।
স্টিভ জবস থেকে কুকের নেতৃত্ব পরিবর্তন ছিল প্রতিষ্ঠাতার কাছ থেকে পেশাদার ব্যবস্থাপকের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর। কুক থেকে টার্নাসের পরিবর্তন আরও সূক্ষ্ম—এটি এক সফল ব্যবস্থাপকের কাছ থেকে পণ্য প্রকৌশলীর হাতে সাম্রাজ্য তুলে দেওয়া।
টার্নাসকে একই সঙ্গে তিনটি যুদ্ধ করতে হবে:
প্রথমত, উন্নত প্রসেসর ও মেমোরি সংকট সামলে পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয়ত, মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক চাপের মধ্যে অ্যাপলের প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডকে সাধারণ গ্রাহকের নাগালের বাইরে চলে যাওয়া থেকে রক্ষা করা।
তৃতীয়ত, এআই-যুগে প্রমাণ করা যে অ্যাপল শুধু অতীতের সেরা প্রযুক্তিকে পরিশীলিত করতে পারে না, ভবিষ্যতের নতুন প্রযুক্তি-অভিজ্ঞতাও সৃষ্টি করতে পারে।
শেষ আর্নিংস কলের দ্বৈত বার্তা
টিম কুকের শেষ আর্থিক প্রতিবেদন আসলে দুই বিপরীত সত্যের দলিল।
প্রথম সত্য: তাঁর হাতে অ্যাপল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে সফল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। রেকর্ড রাজস্ব, প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের মূল্যায়ন, আড়াই বিলিয়নের বেশি সক্রিয় ডিভাইস এবং বিশ্বের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ভোক্তা ইকোসিস্টেম—এসব তাঁর পরিচালন দক্ষতার অস্বীকার্য প্রমাণ।
দ্বিতীয় সত্য: অতীতের আর্থিক সাফল্য ভবিষ্যতের প্রযুক্তিগত নেতৃত্ব নিশ্চিত করে না। মেমোরি সংকট, উন্নত চিপের সীমাবদ্ধতা, সার্ভিসেস প্রবৃদ্ধির ধীরগতি, পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং এআই প্রতিযোগিতায় অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে জন টার্নাস এমন একটি অ্যাপলের দায়িত্ব নিচ্ছেন, যা একই সঙ্গে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে শক্তিশালী এবং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি পরীক্ষার মুখে।
টিম কুক অ্যাপলকে পতনের হাত থেকে বাঁচাননি—কারণ তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের সময়ও প্রতিষ্ঠানটি সফল ছিল। তাঁর বড় কৃতিত্ব আরও কঠিন: তিনি একটি সফল প্রতিষ্ঠানকে বহু গুণ বড় করেছেন, তার পরিচয় বদলেছেন এবং তাকে প্রযুক্তি থেকে দৈনন্দিন জীবনের অবকাঠামোয় রূপান্তর করেছেন।
এখন ইতিহাসের প্রশ্ন জন টার্নাসকে ঘিরে: তিনি কি কুকের তৈরি সাম্রাজ্য দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করবেন, নাকি অ্যাপলকে আবার এমন কিছু কল্পনা করতে শেখাবেন, যা পৃথিবী এখনো নিজের প্রয়োজন বলে জানে না?
তথ্যসংক্ষেপ
প্রান্তিক: অ্যাপলের ২০২৬ অর্থবছরের তৃতীয় প্রান্তিক
সমাপ্তি: ২৭ জুন ২০২৬
রাজস্ব: ১০৯.৪ বিলিয়ন ডলার
বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি: ১৬ শতাংশ
নিট মুনাফা: প্রায় ২৯.৮ বিলিয়ন ডলার
শেয়ারপ্রতি আয়: ২.০২ ডলার
আইফোন রাজস্ব: ৫৪.২৫ বিলিয়ন ডলার
সার্ভিসেস রাজস্ব: ৩০.৭৪ বিলিয়ন ডলার
পরবর্তী প্রান্তিকের পূর্বাভাস: ৯–১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি
নতুন সিইও: জন টার্নাস
দায়িত্ব গ্রহণ: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
টিম কুকের নতুন পদ: এক্সিকিউটিভ চেয়ারম্যান
#Apple #TimCook #JohnTernus #AppleEarnings #AppleCEO #TechnologyNews #ArtificialIntelligence #ChipCrisis #TechBusiness #ক্যালিফোর্নিয়ারচিঠি
শিরোনামটিকে আরও আক্রমণাত্মক, সাহিত্যধর্মী অথবা Google Discover-কেন্দ্রিক রূপেও সাজানো যেতে পারে।




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।