৯/১১-এর ২৫ বছর: অজানা তথ্য, যুদ্ধ ও দীর্ঘ ছায়া

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের চারটি ছিনতাই করা উড়োজাহাজ কয়েক ঘণ্টায় ২,৯৭৭ মানুষের জীবন কেড়ে নিয়েছিল। কিন্তু ঘটনাটির দীর্ঘ ছায়া ছড়িয়েছে অসুস্থ উদ্ধারকর্মী, অবিরাম নজরদারি, মুসলিম ও শিখদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, গুয়ানতানামোর অনিষ্পন্ন বিচার এবং বহু দেশের যুদ্ধক্ষেত্রে। হামলার পঁচিশ বছর পূর্তিতে নথি, গবেষণা ও সরকারি হিসাব ধরে দেখা হলো—আমরা কী জানি, কী ভুল জানি, আর কোন প্রশ্নগুলো এখনো খোলা।
চারটি বিমানের সকাল
নিউইয়র্কে সকাল ৮টা ৪৬ মিনিট। আমেরিকান এয়ারলাইনস ফ্লাইট ১১ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত করে। ১৭ মিনিট পর ইউনাইটেড এয়ারলাইনস ফ্লাইট ১৭৫ ঢুকে যায় দক্ষিণ টাওয়ারে। সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে ফ্লাইট ৭৭ পেন্টাগনে আঘাত করে। যাত্রীদের প্রতিরোধের পর ফ্লাইট ৯৩ সকাল ১০টা ৩ মিনিটে পেনসিলভানিয়ার শ্যাঙ্কসভিলের কাছে বিধ্বস্ত হয়; তদন্তকারীদের ধারণা, এর লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল। সকাল ৯টা ৫৯ মিনিটে দক্ষিণ টাওয়ার এবং ১০টা ২৮ মিনিটে উত্তর টাওয়ার ধসে পড়ে।
চারটি সমন্বিত হামলায় নিহত হন ২,৯৭৭ জন—নিউইয়র্কে ২,৭৫৩, পেন্টাগনে ১৮৪ এবং ফ্লাইট ৯৩-এ ৪০ জন যাত্রী ও ক্রু। তাঁরা ৯০টির বেশি দেশের নাগরিক ছিলেন। এই সংখ্যায় ১৯ ছিনতাইকারী নেই। ন্যাশনাল সেপ্টেম্বর ১১ মেমোরিয়াল অ্যান্ড মিউজিয়াম এ হিসাব সংরক্ষণ করে।
কিন্তু সংখ্যাটি একই সঙ্গে পূর্ণ সত্য এবং অসম্পূর্ণ সত্য। পূর্ণ—কারণ ওই দিন নিহতদের স্বীকৃত সরকারি হিসাব এটি। অসম্পূর্ণ—কারণ বিষাক্ত ধুলা ও ধোঁয়ার সংস্পর্শে পরবর্তী বছরগুলোতে যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের বড় অংশ এই সংখ্যার বাইরে। ৯/১১ তাই কেবল এক দিনের গণহত্যা নয়; এটি দীর্ঘস্থায়ী জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ও।
যে তথ্যগুলো আড়ালে থেকে যায়
সেদিন টুইন টাওয়ার কমপ্লেক্সে আনুমানিক ১৬,৪০০ থেকে ১৮,০০০ মানুষ ছিলেন। ভয়াবহ প্রাণহানি সত্ত্বেও তাঁদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। এটি আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্যোগ-নির্গমনগুলোর একটি—যার কৃতিত্ব অফিসকর্মী, ভবনকর্মী, নিরাপত্তাকর্মী, দমকলকর্মী এবং বহু সাধারণ মানুষের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের।
তবু উদ্ধারব্যবস্থা ছিল বিভ্রান্তিমুক্ত নয়। উত্তর টাওয়ারে প্রথম বিমান আঘাতের পর দক্ষিণ টাওয়ারের ঘোষণায় ভবনটিকে নিরাপদ বলা হয় এবং অনেককে অফিসে ফিরে যেতে বলা হয়। কেউ নির্দেশ মেনেছিলেন; কেউ মানেননি। কিছু প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব নিরাপত্তা কর্মকর্তারা উল্টো বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। পরে ৯/১১ কমিশনের শুনানিতে এই পরস্পরবিরোধী বার্তাকে প্রাণরক্ষাকারী যোগাযোগব্যবস্থার বড় ব্যর্থতা হিসেবে তুলে ধরা হয়।
আরেকটি প্রায় বিস্মৃত দৃশ্য ঘটেছিল পানিতে। সেতু-টানেল বন্ধ, সাবওয়ে স্থবির—লোয়ার ম্যানহাটান যেন দ্বীপে আটকে পড়েছিল। ফেরি, টাগবোট, কোস্ট গার্ড, ব্যক্তিগত নৌকা ও পর্যটকবাহী জাহাজ এক অনানুষ্ঠানিক বহর গড়ে কয়েক ঘণ্টায় আনুমানিক তিন থেকে পাঁচ লাখ মানুষকে সরিয়ে নেয়। ৯/১১ মেমোরিয়াল মিউজিয়ামের নথি অনুযায়ী, এটি আধুনিক ইতিহাসের বৃহত্তম নৌপথে বেসামরিক সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাগুলোর একটি।
ধ্বংসস্তূপ সরাতে প্রায় নয় মাস লেগেছিল; সরানো হয়েছিল আনুমানিক ১৮ লাখ টন উপাদান। এ কাজই পরে বহু উদ্ধারকর্মী, নির্মাণশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীর অসুস্থতার সঙ্গে যুক্ত হয়।
হামলার দাম পাঁচ লাখ ডলারের কম; প্রতিক্রিয়ার দাম ট্রিলিয়ন
আল-কায়েদার ১৯ সদস্যের দলটি প্রায় দুই বছর ধরে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে। ৯/১১ কমিশনের হিসাবে হামলার মোট ব্যয় ছিল চার থেকে পাঁচ লাখ ডলার। অর্থ এসেছে আল-কায়েদার কাছ থেকে। শেয়ারবাজারে আগাম তথ্য ব্যবহার করে মুনাফার বহুল প্রচারিত অভিযোগের পক্ষে কমিশন ও এফবিআই প্রমাণ পায়নি।
এই ক্ষুদ্র অপারেশনাল ব্যয়ের বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল ঐতিহাসিক মাত্রার। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির Costs of War প্রকল্প ২০২১ সালে হিসাব করেছিল, ৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধগুলোর বাজেটারি ব্যয় ও ২০৫০ সাল পর্যন্ত সাবেক সেনাদের ভবিষ্যৎ সেবা মিলিয়ে দায় প্রায় ৮ ট্রিলিয়ন ডলার।
একই প্রকল্পের ২০২৩ সালের মডেলভিত্তিক গবেষণা বলছে, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেনসহ যুদ্ধক্ষেত্রগুলোতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মৃত্যু ৪.৫ থেকে ৪.৭ মিলিয়ন হতে পারে। এর মধ্যে ৩.৬ থেকে ৩.৮ মিলিয়ন মৃত্যু যুদ্ধজনিত অর্থনৈতিক পতন, ক্ষুধা, রোগ এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থা ধ্বংসের মতো পরোক্ষ কারণে।
গবেষণা প্রকল্পটি নিজেই সতর্ক করে—এটি কোনো এক পক্ষের হাতে সরাসরি নিহত মানুষের তালিকা নয়, বরং বিভিন্ন পক্ষের যুদ্ধ ও তার সামাজিক অভিঘাতের সমন্বিত অনুমান।
এই তুলনা একটি অস্বস্তিকর সত্য দেখায়: সন্ত্রাসীরা আমেরিকাকে যে প্রতিক্রিয়ায় প্ররোচিত করতে চেয়েছিল, তার আর্থিক ও মানবিক পরিধি হামলার নিজস্ব সক্ষমতার বহু গুণ ছাড়িয়ে যায়।
তবে এ থেকে এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না যে নিরাপত্তা প্রতিক্রিয়া অপ্রয়োজনীয় ছিল। আল-কায়েদা আফগানিস্তানে প্রশিক্ষণশিবির চালাত, তালেবান তাদের আশ্রয় দিয়েছিল এবং সংগঠনটি আরও হামলার অভিপ্রায় পোষণ করত। প্রশ্নটি প্রতিক্রিয়া হবে কি না—তা নয়; প্রশ্ন হলো প্রতিক্রিয়ার লক্ষ্য, আইনগত সীমা, স্থায়িত্ব এবং বেসামরিক মূল্য কীভাবে নির্ধারিত হয়েছিল।
সতর্কসংকেত ছিল, কিন্তু তারা একই ছবিতে জোড়া লাগেনি
৯/১১ কমিশনের বহুল উদ্ধৃত রায়—এটি ছিল “কল্পনা, নীতি, সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা।” ২০০১ সালের গ্রীষ্মে গোয়েন্দা ব্যবস্থায় বিপদের সংকেত এত ঘন ছিল যে কমিশন অধ্যায়ের নাম দেয় “The System Was Blinking Red”।
৬ আগস্ট প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে দেওয়া দৈনিক গোয়েন্দা ব্রিফের শিরোনাম ছিল “Bin Ladin Determined to Strike in US”। অথচ সেটি ছিল ওই বছর বিন লাদেন বা আল-কায়েদা বিষয়ে প্রেসিডেন্টকে দেওয়া অন্তত ৩৬তম ব্রিফিং আইটেম—প্রথমটি যা যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরে সম্ভাব্য আক্রমণ নিয়ে নিবেদিত ছিল।
ফিনিক্সে এফবিআইয়ের এক এজেন্ট জুলাইয়ে উগ্রবাদীদের মার্কিন ফ্লাইট স্কুলে প্রশিক্ষণ নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে সতর্ক করেছিলেন। সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপকরা হামলার আগে স্মারকটি দেখেননি; সেটিতে আত্মঘাতী ছিনতাইয়ের নির্দিষ্ট পূর্বাভাসও ছিল না।
সিআইএ জানত খালিদ আল-মিহদারের মার্কিন ভিসা ছিল এবং নাওয়াফ আল-হাজমি যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেছিলেন, কিন্তু তথ্য সময়মতো ওয়াচলিস্ট ও অভ্যন্তরীণ তদন্তে কার্যকরভাবে পৌঁছায়নি।
এখানেই পূর্বাভাস ও জবাবদিহির সূক্ষ্ম পার্থক্য। কোনো নথিই ১১ সেপ্টেম্বরের সুনির্দিষ্ট সময়, চারটি ফ্লাইট ও লক্ষ্য একসঙ্গে বলে দেয়নি। তাই “সরকার সব জানত” দাবি প্রমাণিত নয়। কিন্তু ছড়িয়ে থাকা সূত্রগুলো ভাগাভাগি ও বিশ্লেষণে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা ছিল—এটি ৯/১১ কমিশনের ৫৮৫ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত। কমিশন ২৫ লাখ পৃষ্ঠার নথি পর্যালোচনা এবং ১০ দেশে ১,২০০-এর বেশি সাক্ষাৎকার নিয়েছিল।
ধস নিয়ে বিজ্ঞান কী বলে—আর কী বলে না
একটি জনপ্রিয় কিন্তু ভুল বাক্য হলো, “জেট ফুয়েল ইস্পাত গলিয়ে দিয়েছিল।” সরকারি তদন্ত এমন দাবি করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেকনোলজির—NIST—তিন বছরের তদন্তে বলা হয়, বিমানের আঘাতে স্তম্ভ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং অগ্নিরোধক আবরণ সরে যায়। বহু তলায় ছড়িয়ে পড়া আগুনে মেঝের কাঠামো ঝুলে পড়ে, বাইরের স্তম্ভ ভেতরের দিকে বাঁকে এবং ধস শুরু হয়। ইস্পাত গলে যাওয়া প্রয়োজন ছিল না—উচ্চ তাপে তার শক্তি ও দৃঢ়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়াই যথেষ্ট।
NIST প্রায় ২০০ বিশেষজ্ঞ, এক হাজার সাক্ষাৎকার, সাত হাজার ভিডিও অংশ, সাত হাজার ছবি এবং ২৩৬টি উদ্ধার করা ইস্পাতের টুকরা ব্যবহার করে। সংস্থাটি বিস্ফোরক বা ক্ষেপণাস্ত্রের সমর্থনে ভিডিও, শ্রাব্য, ভূকম্পন বা কাঠামোগত প্রমাণ পায়নি।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ সীমাও স্বীকার করে: উদ্ধার করা ইস্পাতের ওপর বিস্ফোরক বা থার্মাইটের রাসায়নিক অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা করা হয়নি। ষড়যন্ত্রতত্ত্বে এই বাদ পড়াকে প্রমাণ হিসেবে দেখানো হয়; কিন্তু পরীক্ষা না হওয়া নিজে বিস্ফোরকের উপস্থিতির প্রমাণ নয়। NIST-এর বিস্তারিত প্রশ্নোত্তর অনুযায়ী, উপলভ্য ধসের ক্রম, ভিডিও ও কাঠামোগত বিশ্লেষণ নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের দাবিকে সমর্থন করে না।
এক দিনের মৃত্যুর পর দীর্ঘ স্বাস্থ্য-দুর্যোগ
ধসে কংক্রিট, কাচ, সীসা, অ্যাসবেস্টস, দহনজাত রাসায়নিক এবং অতি সূক্ষ্ম কণার মিশ্রণ বাতাসে ছড়ায়। বিপদের প্রথম দিনগুলোতে রাজনৈতিক আশ্বাস বৈজ্ঞানিক অনিশ্চয়তাকে ঢেকে দিয়েছিল।
২০০৩ সালে পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার মহাপরিদর্শকের দপ্তর জানায়, বাতাস নিরাপদ—তৎকালীন প্রশাসকের এমন আশ্বাস বিদ্যমান উপাত্তে পুরোপুরি সমর্থিত ছিল না; অ্যাসবেস্টসসহ কয়েকটি দূষকের স্বাস্থ্যভিত্তিক মানদণ্ডও অনুপস্থিত ছিল। EPA-র তদারকি প্রতিবেদন ঝুঁকি-যোগাযোগ, ঘরের ভেতরের দূষণ ও পরিষ্কার ব্যবস্থার ঘাটতি চিহ্নিত করে।
পঁচিশ বছর পর সেই ভুলের মূল্য দেখা যায় হাসপাতাল ও ক্ষতিপূরণ নথিতে। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ CDC-র World Trade Center Health Program-এ প্রায় দেড় লাখ সদস্য নথিভুক্ত; আইন অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসা চলবে ২০৯০ সাল পর্যন্ত। ক্যানসার, শ্বাসযন্ত্রের রোগ, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জটিলতা—সবকিছুই কর্মসূচির আওতায়।
২০২৪ সালে যোগ্য সদস্যদের ৫৪ শতাংশ ফুসফুসের ক্যানসার স্ক্রিনিং পেয়েছিলেন, যেখানে ২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় বাস্তব হার ছিল ১৮ শতাংশ। CDC-র ২৫তম বার্ষিকীর মূল্যায়ন নিবিড় দীর্ঘমেয়াদি নজরদারির সুফলও দেখায়।
৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত 9/11 Victim Compensation Fund-এ ২,০০,৫৫২টি নিবন্ধন এবং ১,১২,৩০২টি দাবি জমা পড়ে; মোট অনুমোদিত পুরস্কার ১৮.৫৬ বিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে ৬,২৮৭টি ক্ষতিপূরণ-সিদ্ধান্ত মৃত ব্যক্তির পক্ষে।
এই সংখ্যা দিয়ে ৯/১১-সংক্রান্ত মোট রোগমৃত্যু নির্ধারণ করা যায় না—যোগ্যতা, দাবি দাখিল ও আইনি সংজ্ঞা আলাদা—কিন্তু “এক দিনের” ক্ষতি কত দীর্ঘ তা দেখায়। VCF-এর আগস্ট ২০২৬ মাসিক প্রতিবেদন এ হিসাবের উৎস।
২০১৯ সালে কংগ্রেসে ক্ষতিপূরণ তহবিল স্থায়ী করার শুনানিতে কৌতুকাভিনেতা ও অধিকারকর্মী জন স্টুয়ার্ট বলেছিলেন:
“তাঁরা পাঁচ সেকেন্ডে সাড়া দিয়েছিলেন। আঠারো বছর পর, আপনারা আপনাদের কাজ করুন।”
তাঁর সাক্ষ্যের ভিডিও দেখায়, স্মৃতির আনুষ্ঠানিকতা আর রাষ্ট্রের বাস্তব দায় এক জিনিস নয়।
নিরাপত্তার নতুন রাষ্ট্র: সুরক্ষা না স্থায়ী জরুরি অবস্থা?
হামলার সাত দিনের মাথায় কংগ্রেস ২০০১ সালের Authorization for Use of Military Force—AUMF—পাস করে। প্রতিনিধি পরিষদে ভোট ছিল ৪২০–১; সিনেটে ৯৮–০।
একমাত্র বিরোধী ভোট দেওয়া ক্যালিফোর্নিয়ার প্রতিনিধি বারবারা লি সতর্ক করেছিলেন:
“আমরা যখন কাজ করব, তখন যেন আমরা সেই অশুভ শক্তিতে পরিণত না হই, যাকে আমরা ঘৃণা করি।”
তাঁর কংগ্রেশনাল রেকর্ডভুক্ত বক্তব্য তখন একাকী শোনালেও পরে “চিরস্থায়ী যুদ্ধ” বিতর্কের নৈতিক কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
৪৫ দিনের মধ্যে USA PATRIOT Act আইনে পরিণত হয়। এটি তথ্য ভাগাভাগির বাধা কমায় এবং তদন্তকারীদের নজরদারি ক্ষমতা বাড়ায়; নাগরিক অধিকারকর্মীরা গোপন অনুসন্ধান, বিস্তৃত তথ্য সংগ্রহ এবং যথেষ্ট বিচারিক তদারকির অভাব নিয়ে আপত্তি তোলেন।
পরবর্তী বছরগুলোতে কয়েকটি ধারা সংশোধিত বা মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও ৯/১১-পরবর্তী নিরাপত্তা স্থাপত্য রয়ে যায়: ট্রান্সপোর্টেশন সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, ২২টি সংস্থাকে নিয়ে Department of Homeland Security, Director of National Intelligence এবং National Counterterrorism Center। নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নতি বাস্তব; একই সঙ্গে বিমানবন্দর থেকে অনলাইন যোগাযোগ পর্যন্ত দৈনন্দিন জীবনে রাষ্ট্রীয় পর্যবেক্ষণের সীমানা বদলে যায়।
এই দ্বৈততা এড়িয়ে গেলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ হয়। তথ্য বিনিময়ের উন্নতি আরেকটি ৯/১১-ধরনের সমন্বিত হামলা ঠেকাতে সহায়ক হয়েছে—এমন যুক্তি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের। সমালোচকেরা বলেন, ব্যতিক্রমী জরুরি ক্ষমতা একবার প্রতিষ্ঠিত হলে তা লক্ষ্য বদলে অভিবাসন, প্রতিবাদ ও সাধারণ অপরাধ দমনে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
অর্থাৎ উত্তরাধিকার শুধু “আরেকটি হামলা হয়নি” নয়; কী মূল্যে নিরাপত্তা অর্জিত হয়েছে, সেটিও।
আফগানিস্তান ছিল আল-কায়েদার ঘাঁটি; ইরাক ছিল ভিন্ন সিদ্ধান্ত
৯/১১ ও ইরাক যুদ্ধকে এক সূত্রে দেখার প্রবণতা এখনো আছে। কমিশন বলেছে, আল-কায়েদা ও ইরাকি কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগের নজির থাকলেও সহযোগিতামূলক কার্যকর সম্পর্ক বা ৯/১১ হামলায় ইরাকের সহায়তার প্রমাণ মেলেনি।
হামলার পর প্রশাসনের ভেতরে ইরাকে আঘাতের আলোচনা হয়েছিল; শেষ পর্যন্ত ২০০৩ সালের আক্রমণ ছিল পৃথক রাজনৈতিক ও গোয়েন্দা যুক্তির ওপর দাঁড়ানো সিদ্ধান্ত।
বারাক ওবামা ২০০৯ সালের কায়রো ভাষণে আফগানিস্তানকে প্রয়োজনীয়তার যুদ্ধ এবং ইরাককে “war of choice” বলে পার্থক্য করেছিলেন। একই বক্তৃতায় তাঁর ঘোষণা ছিল:
“আমেরিকা ইসলামের সঙ্গে যুদ্ধে নেই—এবং কখনো থাকবে না।”
হোয়াইট হাউসের সংরক্ষিত ভাষণ ছিল এমন এক সময়ে সম্পর্ক মেরামতের প্রয়াস, যখন “সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” বহু মুসলিমের কাছে রাষ্ট্র, ধর্ম ও সহিংসতাকে বিপজ্জনকভাবে একাকার করে ফেলেছিল।
ঘরের ভেতরের আরেক যুদ্ধ: মুসলিম ও শিখদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ
২০০১ সালে এফবিআই ৪৮১টি মুসলিমবিরোধী বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনা নথিভুক্ত করে; এসব ঘটনায় ৫৫৪ জন ভুক্তভোগী ছিলেন। সরকারি সংখ্যা কেবল রিপোর্ট হওয়া ও আইনগতভাবে শ্রেণিবদ্ধ ঘটনাই ধরে, তাই বাস্তব অভিজ্ঞতা আরও বিস্তৃত হতে পারে। এফবিআইয়ের ২০০১ সালের Hate Crime Statistics দেখায় কী দ্রুত জাতীয় শোক পরিচয়ভিত্তিক প্রতিহিংসায় রূপ নিয়েছিল।
হামলার চার দিন পর, ১৫ সেপ্টেম্বর অ্যারিজোনার মেসায় নিজের গ্যাস স্টেশনের বাইরে ফুল লাগানোর সময় শিখ অভিবাসী বলবীর সিং সোধিকে গুলি করে হত্যা করা হয়। হত্যাকারী তাঁকে মুসলিম ভেবেছিল।
স্মিথসোনিয়ানের ইতিহাস মনে করিয়ে দেয়, বিদ্বেষ প্রায়ই যাকে লক্ষ্য করে তার পরিচয়ও জানে না। শিখ, মুসলিম, আরব, দক্ষিণ এশীয় এবং যাঁদের “অন্য” মনে হয়েছে—তাঁদের জন্য ৯/১১-পরবর্তী নিরাপত্তাহীনতা ছিল দ্বিমুখী: সন্ত্রাসের ভয় এবং প্রতিবেশীর সন্দেহ।
ন্যায়বিচার এখনো সমাপ্ত নয়
এফবিআইয়ের PENTTBOM তদন্ত ছিল সংস্থাটির ইতিহাসে সবচেয়ে বড়: পাঁচ লাখের বেশি সূত্র, ১,৬৭,০০০ সাক্ষাৎকার এবং দেড় লাখ আলামত। প্রথম ৩০ দিনেই ৩৫ টেরাবাইট তথ্য জমা হয়েছিল। এফবিআই বলছে, মামলাটি এখনো খোলা।
কমিশন খালিদ শেখ মোহাম্মদকে হামলার “প্রধান স্থপতি” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তিনি ২০০৩ সালে পাকিস্তানে আটক এবং ২০০৬ সাল থেকে গুয়ানতানামো বেতে বন্দী। কিন্তু বিচার বারবার পিছিয়েছে। গোপন আটককেন্দ্রে নির্যাতন, প্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা, গোপন তথ্য প্রকাশ এবং সামরিক কমিশনের বৈধতা—সবকিছু প্রক্রিয়াকে জটিল করেছে।
২০২৬ সালের ২৫তম বার্ষিকীতেও চূড়ান্ত রায় নেই। অভিযোগ গুরুতর ও প্রমাণের ভাণ্ডার বিস্তৃত হলেও আদালতের রায় না হওয়া পর্যন্ত আইনি ভাষায় তাঁকে অভিযুক্ত হিসেবেই উল্লেখ করা উচিত।
সৌদি আরবের প্রশ্নও দ্বিস্তর। কমিশন “সৌদি সরকার প্রতিষ্ঠান হিসেবে” বা জ্যেষ্ঠ সৌদি কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে আল-কায়েদাকে অর্থ দিয়েছেন—এমন প্রমাণ পায়নি; একই সঙ্গে সৌদি পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত কিছু দাতব্য প্রতিষ্ঠানের অর্থ অন্য খাতে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা নাকচ করেনি।
যুক্তরাষ্ট্রে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দেওয়ানি মামলা এগিয়েছে; সৌদি সরকার সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে। মামলা চলার অনুমতি প্রমাণিত দায় নয়—এটি শুধু অভিযোগ পরীক্ষার আইনি পথ খোলা থাকা।
স্মৃতি, প্রতিশোধ ও আত্মসমালোচনা
হামলার তিন দিন পর গ্রাউন্ড জিরোর ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছিলেন:
“আমি আপনাদের শুনতে পাচ্ছি। বাকি পৃথিবী আপনাদের শুনছে। আর যারা এই ভবনগুলো ভেঙে দিয়েছে, তারাও খুব শিগগির আমাদের সবার কথা শুনবে।”
হোয়াইট হাউস আর্কাইভে থাকা এই বাক্য জাতীয় ঐক্য, শোক এবং প্রতিশোধের সংকল্প—তিনটিকেই ধারণ করেছিল।
পঁচিশ বছর পর সেই বাক্যের প্রথমাংশ—“আমি আপনাদের শুনতে পাচ্ছি”—হয়তো আরও বড় নৈতিক পরীক্ষা। আমরা কি শুধু হামলায় নিহতদের শুনি, নাকি বিষাক্ত ধুলায় অসুস্থ পরিচ্ছন্নতাকর্মীকেও? শুধু নিউইয়র্কের শোক, নাকি কাবুল ও বাগদাদের বেসামরিক মানুষের ক্ষতিও? শুধু নিরাপত্তার সাফল্য, নাকি অযাচিত নজরদারি ও বিদ্বেষের মূল্যও?
অন্য দেশের মৃত্যু স্বীকার করা ৯/১১-এর ভুক্তভোগীদের স্মৃতি খাটো করে না; বরং সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে লড়াইকে সেই মানবিক নীতির কাছে দায়বদ্ধ করে, যার ওপর গণতন্ত্র নিজের নৈতিক বৈধতা দাবি করে।
৯/১১ সম্পর্কে সবচেয়ে কম জানা সত্য হয়তো কোনো গোপন নথি নয়। সত্যটি হলো, একটি সকাল ইতিহাস বদলায়নি একা; সেই সকালের পর রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিকেরা যে সিদ্ধান্তগুলো নিয়েছিল—সেগুলোই আজকের পৃথিবী নির্মাণ করেছে।
স্মরণের কাজ তাই শুধু নাম পাঠ করা নয়। প্রমাণ যাচাই, ভুল স্বীকার, অসুস্থদের যত্ন, আইনের সীমা পুনর্বিবেচনা এবং প্রতিশোধের ভাষার ভেতর মানবিকতার স্থান রক্ষা করাও স্মরণ।
আমরা যা জানি / যা এখনো অস্পষ্ট
আমরা যা জানি
১৯ আল-কায়েদা সদস্য চারটি উড়োজাহাজ ছিনতাই করে হামলা চালায়; ওসামা বিন লাদেনের সংগঠন পরিকল্পনা ও অর্থায়ন করে।
হামলায় ২,৯৭৭ ভুক্তভোগী নিহত হন; ছিনতাইকারীদের এই হিসাবে ধরা হয় না।
হামলার আনুমানিক ব্যয় ছিল চার থেকে পাঁচ লাখ ডলার। আগাম জেনে শেয়ার লেনদেন করে মুনাফার প্রমাণ তদন্তে মেলেনি।
গোয়েন্দা সতর্কতা ছিল, কিন্তু সুনির্দিষ্ট হামলার পূর্ণ নকশা ছিল না; তথ্য ভাগাভাগি ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে গুরুতর ব্যর্থতা ছিল।
NIST-এর সংগৃহীত প্রমাণ টাওয়ার দুটির নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ তত্ত্ব সমর্থন করে না।
ইরাক ৯/১১ হামলায় সহায়তা করেছিল—এমন প্রমাণ কমিশন পায়নি।
৯/১১-সম্পর্কিত রোগের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের প্রয়োজন পঁচিশ বছর পরও বাড়ছে।
যা এখনো অস্পষ্ট বা অসমাপ্ত
ফ্লাইট ৯৩-এর লক্ষ্য ক্যাপিটল ছিল বলে শক্তিশালী ধারণা আছে; লক্ষ্য নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
প্রত্যেক অসুস্থতা বা মৃত্যুর সঙ্গে WTC বিষাক্ত পদার্থের কারণগত সম্পর্ক ব্যক্তিগতভাবে নির্ধারণ জটিল।
খালিদ শেখ মোহাম্মদ ও অন্য অভিযুক্তদের বিচার শেষ হয়নি; নির্যাতনের কারণে প্রমাণ ও প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বিরোধ আছে।
সৌদি কর্মকর্তাদের সম্ভাব্য সহায়তা নিয়ে দেওয়ানি অভিযোগ বিচারাধীন। মামলা এগোনোকে প্রমাণিত দায় হিসেবে দেখা যাবে না।
৯/১১-পরবর্তী যুদ্ধের পরোক্ষ মৃত্যুর পরিমাণ মডেল ও “যুদ্ধজনিত” কারণের সংজ্ঞার ওপর নির্ভরশীল। তাই ৪.৫–৪.৭ মিলিয়ন একটি গবেষণাভিত্তিক পরিসর, প্রত্যক্ষ গণনা নয়।
সূত্র ও যাচাই-নোট
প্রতিবেদনটি ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত হালনাগাদ। ৯/১১ কমিশন, FBI, NIST, CDC, EPA Inspector General, Victim Compensation Fund, Congressional Record এবং National 9/11 Memorial-এর প্রাথমিক নথিকে ভিত্তি ধরা হয়েছে। যুদ্ধের ব্যয় ও পরোক্ষ মৃত্যুর ক্ষেত্রে Brown University-এর গবেষণার পদ্ধতিগত সীমা উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্ধৃতিগুলো সরকারি প্রতিলিপি বা ভিডিওর সঙ্গে মিলিয়ে সংক্ষিপ্তভাবে বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে।
প্রধান সূত্র
#September11 #NineEleven #৯১১ #WarOnTerror #WorldTradeCenter #HumanRights #Journalism #History




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।