ভোটে এগিয়ে মুহিত মাহমুদ, মেয়রপদ নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্তে

২০২৫ সালের নির্বাচনের পর বাদ পড়া ৩৭টি অনুপস্থিত ব্যালট গণনায় মুহিত মাহমুদ পেয়েছেন ২,০৮৯ ভোট; বর্তমান মেয়র আদম আলহারবি পেয়েছেন ২,০৭৭। তবে নতুন ফল এখনও অনানুষ্ঠানিক। মাহমুদের হ্যামট্রামিকের বাসিন্দা হিসেবে যোগ্যতা নিয়ে মামলা চলায় তাঁর মেয়র হওয়া নিশ্চিত নয়।
হ্যামট্রামিক, মিশিগান— নির্বাচনের প্রায় এক বছর পর গণনা হওয়া ৩৭টি ব্যালট বদলে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের হ্যামট্রামিক মেয়র নির্বাচনের হিসাব। ১৬ অক্টোবর ওয়েইন কাউন্টি বোর্ড অব ক্যানভাসার্সের প্রকাশিত নতুন, অনানুষ্ঠানিক ফল অনুযায়ী, বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সাবেক সিটি কাউন্সিল সদস্য মুহিত মাহমুদ ২,০৮৯ ভোট পেয়ে বর্তমান মেয়র আদম আলহারবিকে ১২ ভোটে পেছনে ফেলেছেন। তবে এই ব্যবধান তাঁকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে মেয়র করেনি: ফল প্রত্যয়ন আটকে আছে মাহমুদের আবাসিক যোগ্যতা নিয়ে চলমান মামলার কারণে।
যে ৩৭টি ব্যালটে বদলে গেল ফল
ব্যালটগুলোর গল্প শুরু ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বরের স্থানীয় নির্বাচনের পরদিন। হ্যামট্রামিক সিটি ক্লার্কের দপ্তরে ৩৭টি অনুপস্থিত ভোটের ব্যালট পাওয়া যায়, যেগুলো মূল গণনায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। ব্যালটগুলো কীভাবে সংরক্ষিত ছিল এবং সেগুলোর হেফাজতের ধারাবাহিকতা—যাকে নির্বাচনী প্রশাসনে চেইন অব কাস্টডি বলা হয়—নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। নির্বাচনী কর্মকর্তারা জানান, দপ্তরে অননুমোদিত ব্যক্তিদের যাতায়াত থাকায় ব্যালটগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়নি; সেই উদ্বেগেই সেগুলো বাদ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
নির্বাচনের রাতের প্রাথমিক হিসাবে আলহারবি ১১ ভোটে এগিয়ে ছিলেন। পরে কাউন্টি কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়িত ফলে তাঁর ব্যবধান দাঁড়ায় ছয় ভোট। বিতর্কিত ৩৭টি ব্যালট গণনার দাবিতে মাহমুদ আদালতে যান। মার্চে মিশিগান কোর্ট অব আপিল আগের রায় উল্টে ব্যালটগুলো যাচাই করে গণনার পথ খুলে দেয়। এরপর ১৬ অক্টোবর কাউন্টি বোর্ডের পর্যালোচনায় মাহমুদ পান ২৯টি ভোট, আলহারবি ছয়টি; বাকি দুটি ভোট অন্য প্রার্থী বা অন্যভাবে হিসাবে ধরা হয়।
ভোট গণনা বনাম ব্যালটের নিরাপত্তা
এই বিরোধের কেন্দ্রে দুটি গণতান্ত্রিক স্বার্থ মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে, বৈধভাবে দেওয়া ভোট যেন প্রশাসনিক ভুলের কারণে হারিয়ে না যায়। অন্যদিকে, ভোটের নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে যুক্তিসংগত সন্দেহ থাকলে সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
মিশিগান কোর্ট অব আপিলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মত ৩৭টি ব্যালট গণনার নির্দেশ দেয়। কিন্তু একই মামলায় এক বিচারপতি ভিন্নমত পোষণ করেন। তাঁর মতে, ব্যালটগুলো শুধু অনিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছিল তা-ই নয়—অননুমোদিত ব্যক্তিরাও সেগুলোর নাগাল পেয়েছিলেন বলে ক্লার্ক জানিয়েছেন; ফলে ব্যালটের অখণ্ডতা নিশ্চিত করা কঠিন। এই আপত্তি সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত বদলায়নি, তবে কেন বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে তা বোঝায়।
আলহারবি নতুন ফল মেনে নেননি। তিনি ব্যালটগুলো খোলা অবস্থায় পাওয়ার কথা তুলে ধরে সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন এবং ফল চ্যালেঞ্জ করার কথা বলেছেন। তবে অভিযোগ আর প্রমাণ এক জিনিস নয়: ভোট কারচুপি বা অনিয়ম সম্পর্কে তাঁর বক্তব্যকে আদালত বা তদন্তকারীদের প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করার ভিত্তি নেই। স্থানীয় পত্রিকা দ্য হ্যামট্রামিক রিভিউ জানিয়েছে, আগের কিছু অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
বাসিন্দা হিসেবে যোগ্যতা নিয়ে আলাদা মামলা
ভোটে এগিয়ে যাওয়ার পরও মাহমুদের সামনে রয়েছে আলাদা আইনি বাধা। আলহারবির পক্ষের অভিযোগ, মাহমুদ শহরের বাইরে ট্রয়-এ থাকেন; মেয়র হওয়ার জন্য হ্যামট্রামিকের বাসিন্দা হওয়া প্রয়োজন। মাহমুদ অভিযোগটি অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি হ্যামট্রামিকেই থাকেন। ১৬ অক্টোবরের প্রতিবেদনে ওয়েইন কাউন্টি সার্কিট কোর্টে এ বিষয়ে ২২ অক্টোবর শুনানির কথা বলা হয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত নতুন ফল প্রত্যয়ন করা যাচ্ছে না।
তাই “১২ ভোটে এগিয়ে” কথাটি এখন পর্যন্ত সঠিক হলেও “মেয়র নির্বাচিত” বলা আগেভাগে হবে। ভোটগণনার ফল, ফলের আনুষ্ঠানিক প্রত্যয়ন এবং পদে বসার যোগ্যতা—এগুলো এই মুহূর্তে তিনটি আলাদা প্রশ্ন। ভোটগণনায় মাহমুদ এগিয়ে; বাকি দুটির নিষ্পত্তি হয়নি।
প্রতিনিধিত্বের তাৎপর্য, শহরের স্বার্থও
প্রায় ২৮ হাজার মানুষের ডেট্রয়েট-সংলগ্ন শহর হ্যামট্রামিকে বাংলাদেশি ও ইয়েমেনি—দুই বড় অভিবাসী জনগোষ্ঠীর বসতি রয়েছে। মাহমুদ মেয়র হলে তিনি হবেন শহরটির প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মেয়র বলে স্থানীয় নির্বাচনবিষয়ক সংবাদমাধ্যম Votebeat জানিয়েছে। এটি বাংলাদেশি-আমেরিকানদের স্থানীয় রাজনীতিতে প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারে।
তবে পরিচয়ের ঐতিহাসিক গুরুত্ব যেন শহরের প্রশাসনিক জবাবদিহি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রশ্নগুলোকে আড়াল না করে। ৩৭টি ভোট বাদ পড়া, পরে সেগুলো গণনা, ব্যালটের নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধ, এবং প্রার্থীর আবাসিক যোগ্যতা নিয়ে মামলা—প্রতিটি ধাপই স্থানীয় নির্বাচনের প্রতি মানুষের আস্থা কতটা দৃঢ়, তার পরীক্ষা।
মাহমুদের পক্ষে ভোট পুনর্গণনার লড়াই ছিল ভোটারদের ভোট গণনায় অন্তর্ভুক্ত করার দাবি। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী বলছেন, ব্যালটের হেফাজত নিয়ে প্রশ্নের সমাধান জরুরি। চূড়ান্ত রায় যাই হোক, এ ঘটনায় একটিই শিক্ষা স্পষ্ট: নির্বাচনের ফল শুধু ভোটের ব্যবধানে নির্ধারিত হয় না; ব্যালটের নিরাপদ হেফাজত, স্বচ্ছ গণনা এবং দ্রুত ও বিশ্বাসযোগ্য নিষ্পত্তিও গণতান্ত্রিক আস্থার অংশ।
#মুহিতমাহমুদ #হ্যামট্রামিক #মিশিগান #বাংলাদেশি_আমেরিকান #যুক্তরাষ্ট্রেরনির্বাচন #ভোটাধিকার #স্থানীয়রাজনীতি #Hamtramck




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।