শেখ হাসিনা, পানি ও বাণিজ্য: নতুন বাস্তবতায় বাংলাদেশ–ভারত কূটনীতি

পারস্পরিক স্বার্থের নতুন পরীক্ষা: শেখ হাসিনা ইস্যুতে আটকে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক
ব্যক্তি নয়, রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক—ঢাকা ও দিল্লির সামনে কঠিন পুনর্গঠন
স্ট্যান্ডফার্স্ট
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক কার্যকর হতে হলে উভয় দেশের স্বার্থ রক্ষা করতে হবে। বক্তব্যটি কূটনৈতিকভাবে ভারসাম্যপূর্ণ শোনালেও এর সময়কাল তাৎপর্যপূর্ণ—শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফর, গঙ্গার পানি চুক্তির আসন্ন মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়া, ভিসা সীমাবদ্ধতা ও বাণিজ্যিক উত্তেজনায় দুই দেশের সম্পর্কে এখন গভীর আস্থার সংকট।
মাহবুব আহমেদ। ভারত বাংলাদেশের সম্পর্ক। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
প্রতিবেদন
ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কের সাম্প্রতিকতম বার্তাটি এসেছে মাত্র দুটি শব্দে—“পারস্পরিক স্বার্থ”।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বলেছেন, যেকোনো সম্পর্ক কার্যকর হতে হলে তাকে পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। প্রতিবেশীদের কাছে শুধু ভারতের স্বার্থ পূরণের প্রত্যাশা তিনি করেন না; ভারত যেমন তাদের স্বার্থ বোঝার ও সম্মান করার চেষ্টা করবে, তেমনি প্রতিবেশীরাও ভারতের উদ্বেগ উপলব্ধি করবে—এমন একটি “যুক্তিযুক্ত ভারসাম্যের” কথাও বলেছেন তিনি।
২২ আগস্ট দিল্লিতে ইকোনমিক টাইমস ওয়ার্ল্ড লিডারস ফোরামে দেওয়া এই বক্তব্য সাধারণ কোনো কূটনৈতিক নীতিকথা নয়। এটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর অনিশ্চিত, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর দাবি অমীমাংসিত এবং দুই দেশের রাজনৈতিক আস্থা গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষার মুখে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে সরাসরি উত্তর দেননি জয়শঙ্কর। পরিবর্তে তিনি বলেন, সম্পর্কটি বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারতের জন্যও কার্যকর ও কল্যাণকর হতে হবে। এই উত্তর প্রত্যর্পণের প্রশ্নের সমাধান দেয়নি; বরং দিল্লি যে বিষয়টিকে বৃহত্তর দ্বিপক্ষীয় দরকষাকষি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে দেখছে, সেই ইঙ্গিতই জোরালো করেছে। প্রথম আলো, India Today
সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে ২৩ থেকে ২৫ আগস্ট তারেক রহমানের সম্ভাব্য দিল্লি সফরের কথা প্রকাশিত হলেও ঢাকা সফরটি নিশ্চিত করেনি। প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব এ এ এম সালেহ বলেছেন, এ বিষয়ে তখনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার পক্ষ থেকে শেখ হাসিনা ও অন্য পলাতক ব্যক্তিদের প্রত্যর্পণের দাবিতে ভারতের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষার কথাও বলা হয়েছে। উভয় দেশ সম্পর্ক মেরামতের উদ্দেশ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালালেও সফরের জন্য “অনুকূল পরিবেশ” তৈরি হয়েছে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। Reuters
একটি উচ্চপর্যায়ের সফর কোনো অমীমাংসিত বিরোধের তাৎক্ষণিক সমাধান করবে না। তবে এটি রাজনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় চালু করা, প্রত্যর্পণ প্রশ্নে আনুষ্ঠানিক অবস্থান জানা এবং পানি, বাণিজ্য, ভিসা ও সীমান্তের মতো বিষয়গুলোকে নতুন কাঠামোয় আলোচনার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অন্যদিকে, প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক সমঝোতা ছাড়া তাড়াহুড়ো করে সফর হলে তা প্রতীকী ছবির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার ঝুঁকি রয়েছে।
সম্পর্কের কেন্দ্রে শেখ হাসিনা
২০২৪ সালের আগস্টে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁর উপস্থিতি ধীরে ধীরে একটি মানবিক বা আশ্রয়সংক্রান্ত বিষয়ের সীমা ছাড়িয়ে দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে স্পর্শকাতর রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠেছে।
ঢাকার বর্তমান সরকারের কাছে তাঁকে ফেরত আনার দাবি বিচারিক প্রক্রিয়া, রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈধতার সঙ্গে যুক্ত। ভারতের কাছে বিষয়টি প্রত্যর্পণ চুক্তি, আইনি প্রক্রিয়া, কূটনৈতিক দায় এবং দীর্ঘদিনের এক রাজনৈতিক মিত্রের নিরাপত্তার জটিল সমন্বয়।
২০২৬ সালের আগস্টে দিল্লিতে শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলন এবং বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করে। ঢাকা এর প্রতিবাদ জানিয়ে ঘটনাটিকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অসম্মান হিসেবে বর্ণনা করে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বলেছে, তারা ওই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন বা বক্তব্যকে অনুমোদন করেনি। BBC বাংলা, The Guardian
শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের একটি আদালত তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বিচারকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। অতএব, তাঁর বিরুদ্ধে রায়, প্রত্যর্পণের বৈধতা এবং ভারতে তাঁর অধিকার—তিনটি পৃথক আইনি প্রশ্ন।
প্রত্যর্পণের দাবি করা বাংলাদেশের অধিকার; একইভাবে ভারত তাদের আইন ও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী দাবি পরীক্ষা করবে। কিন্তু কোনো সিদ্ধান্ত না জানিয়ে বিষয়টি অনির্দিষ্টকাল ঝুলিয়ে রাখা দুই দেশের সম্পর্কে অবিশ্বাস আরও বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশের রাজনীতি কি একটি ব্যক্তিকে ঘিরেই দেখা হবে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে দীর্ঘদিনের একটি অভিযোগ হলো—ভারত বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও জনগণের পরিবর্তে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্ককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিয়েছে।
এই ধারণা পুরোপুরি প্রমাণিত কোনো একক সত্য নয়; তবে বাংলাদেশের জনমতের একটি অংশে এটি গভীরভাবে উপস্থিত। নির্বাচন, সীমান্তে প্রাণহানি, তিস্তা, বাণিজ্যিক বাধা এবং ভারতের সরকারি বক্তব্যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির প্রতি সংবেদনশীলতার অভাব—সব মিলিয়ে অভিযোগটি শক্তিশালী হয়েছে।
ভারতের দৃষ্টিকোণ ভিন্ন। শেখ হাসিনার শাসনামলে সীমান্ত নিরাপত্তা, বিচ্ছিন্নতাবাদ দমন, উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ, ট্রানজিট ও বিদ্যুৎ বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা হয়েছিল। ফলে দিল্লির নীতিনির্ধারকদের কাছে সেই সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল পূর্বানুমানযোগ্য এবং কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক।
কিন্তু একটি নির্বাচিত বা ক্ষমতাসীন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা এবং একটি দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের ক্ষমতার পরিবর্তনের পর ভারতকে এখন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বিস্তৃত করতে হবে।
বাংলাদেশেরও মনে রাখা দরকার—কোনো একটি ভারতীয় সরকার বা নীতির বিরোধিতা আর ভারতের রাষ্ট্র ও জনগণের বিরুদ্ধে অবস্থান এক নয়। আবেগনির্ভর ভারতবিরোধিতা বাংলাদেশের পানি, বাণিজ্য বা নিরাপত্তা-স্বার্থ অর্জনের কার্যকর বিকল্প হতে পারে না।
“পারস্পরিক স্বার্থ” বাংলাদেশের জন্য কী
জয়শঙ্করের বক্তব্যের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হবে দিল্লি বাংলাদেশের কোন উদ্বেগগুলোকে বৈধ পারস্পরিক স্বার্থ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, তার ওপর।
গঙ্গার পানি চুক্তি
১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। নতুন চুক্তি বা নবায়ন শুধু প্রবাহের একটি গাণিতিক ভাগ নয়; এর সঙ্গে কৃষি, পানীয় জল, সুন্দরবনের লবণাক্ততা এবং বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পরিবেশগত নিরাপত্তা জড়িত।
জলবায়ু পরিবর্তন ও শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে নতুন চুক্তিতে নির্ভরযোগ্য পরিমাপ, তথ্য বিনিময় এবং জলবায়ু অভিযোজন অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।
তিস্তার অমীমাংসিত প্রশ্ন
তিস্তা চুক্তির আলোচনা বহু বছর ধরে ঝুলে আছে। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের সদিচ্ছা থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে চুক্তি এগোয়নি—দিল্লির প্রচলিত ব্যাখ্যা এটি। কিন্তু বাংলাদেশের দৃষ্টিতে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক জটিলতা দ্বিপক্ষীয় প্রতিশ্রুতি অনির্দিষ্টকাল অপূর্ণ রাখার পর্যাপ্ত কারণ হতে পারে না।
সীমান্তে প্রাণহানি
দুই দেশের সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় চোরাচালান ও সংঘবদ্ধ অপরাধ বাস্তব সমস্যা। কিন্তু নিরস্ত্র মানুষ বা সন্দেহভাজন চোরাকারবারিকে গুলি করে হত্যা কোনো স্বাভাবিক সীমান্তনীতি হতে পারে না। প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের পরিবর্তে গ্রেপ্তার, যৌথ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা আস্থা পুনর্গঠনের মৌলিক শর্ত।
বাণিজ্য ও অশুল্ক বাধা
দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে বাংলাদেশের বড় ঘাটতি রয়েছে। ২০২৪–২৫ অর্থবছরে দুই দেশের মোট বাণিজ্য প্রায় ১১ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার ছিল বলে ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে। বাংলাদেশ ভারত থেকে প্রায় ৯ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করলেও রপ্তানি করেছে প্রায় ১ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। The Economic Times
শুধু ঘাটতি থাকাই অন্যায্যতার প্রমাণ নয়; বাংলাদেশের শিল্পও ভারতীয় তুলা, সুতা, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সীমান্তবন্দর, পণ্যের মান যাচাই, স্থলপথে প্রবেশ ও অশুল্ক বাধায় অসমতা থাকলে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা বাধাগ্রস্ত হয়।
বিশ্বব্যাংকের একটি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দ্বিপক্ষীয় মুক্তবাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের ভারতে রপ্তানি ১৮২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে পারে; পরিবহন ও লেনদেন ব্যয় কমানো গেলে সম্ভাব্য বৃদ্ধি আরও বেশি হতে পারে। World Bank
ভিসা ও মানুষের যোগাযোগ
চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা এবং পারিবারিক প্রয়োজনে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভারতে যাতায়াত করেন। রাজনৈতিক উত্তেজনার পর ভিসাসেবা সীমিত হওয়ায় ভোগান্তি বেড়েছে।
নিরাপত্তা যাচাই ভারতের অধিকার; কিন্তু অনির্দিষ্ট বিলম্ব ও অস্পষ্ট নীতি সাধারণ মানুষকে শাস্তি দেয়। চিকিৎসা, শিক্ষার্থী ও জরুরি পারিবারিক ভিসা স্বাভাবিক করা সম্পর্কের সবচেয়ে দ্রুত দৃশ্যমান আস্থা-নির্মাণমূলক পদক্ষেপ হতে পারে।
ভারতের স্বার্থও বাস্তব
পারস্পরিকতা মানে শুধু ভারতের কাছে বাংলাদেশের দাবি নয়। ভারতেরও কিছু বৈধ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্বার্থ রয়েছে।
বাংলাদেশের ভূখণ্ড যেন ভারতের বিরুদ্ধে সশস্ত্র গোষ্ঠী ব্যবহার করতে না পারে—এটি দিল্লির প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে সড়ক, রেল ও নৌ-যোগাযোগ উত্তর-পূর্ব ভারতের পরিবহন ব্যয় ও সময় কমাতে পারে।
বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা, আন্তদেশীয় অপরাধ, মানব পাচার, মাদক ও চোরাচালান মোকাবিলায়ও বাংলাদেশের সহযোগিতা ভারতের প্রয়োজন।
কানেক্টিভিটি বাংলাদেশের জন্যও লাভজনক হতে পারে—যদি ট্রানজিট ফি, অবকাঠামো বিনিয়োগ, পরিবেশগত ব্যয় এবং বাংলাদেশের নিজস্ব বাণিজ্যিক প্রবেশাধিকার স্বচ্ছভাবে নির্ধারিত হয়। এক পক্ষের কৌশলগত সুবিধাকে “আঞ্চলিক সহযোগিতা” বলে চালিয়ে দিলে প্রকৃত পারস্পরিকতা তৈরি হবে না।
উত্তেজনার মধ্যেও বিদ্যুৎ বাণিজ্য
রাজনৈতিক সম্পর্কের অবনতি সত্ত্বেও ভারত থেকে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানি অব্যাহত রয়েছে। রয়টার্সের হিসাবে, ২০২৫ সালে ভারতের আদানি পাওয়ারের গোড্ডা কেন্দ্র থেকে বাংলাদেশ ৮ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ পেয়েছে, যা বাংলাদেশের মোট সরবরাহের প্রায় ৮ দশমিক ২ শতাংশ।
বাংলাদেশের গ্যাসসংকট ও বিদ্যুতের চাহিদা এই আমদানিকে তাৎক্ষণিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ করেছে। তবে আদানি চুক্তির মূল্য, শর্ত এবং স্বচ্ছতা নিয়ে বাংলাদেশে প্রশ্ন রয়েছে। কাজেই বিদ্যুৎ আমদানি প্রয়োজনীয় হলেও চুক্তির আর্থিক ন্যায্যতা স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করার অধিকার বাংলাদেশের থাকা উচিত। Reuters
এই উদাহরণ দেখায়, রাজনৈতিক শীতলতার মধ্যেও বাস্তব স্বার্থ দুই দেশকে সহযোগিতায় বাধ্য করে। কিন্তু পরস্পরের ওপর নির্ভরতা থাকলেই সম্পর্ক ন্যায্য হয়ে যায় না; চুক্তি ও মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতাও প্রয়োজন।
চীনকে ঘিরে ভারতের উদ্বেগ
বাংলাদেশে চীনের অবকাঠামো বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও বঙ্গোপসাগরীয় উপস্থিতি ভারত গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। দিল্লির আশঙ্কা, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক দুর্বল হলে চীন সেই শূন্যতা পূরণ করবে।
বাংলাদেশের জন্য সঠিক পথ ভারত অথবা চীন—এই দুইয়ের একটিকে বেছে নেওয়া নয়। জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান ও অন্য অংশীদারদের সঙ্গে বহুমাত্রিক সম্পর্ক গড়ে তোলাই বাস্তববাদী কূটনীতি।
বাংলাদেশের চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভারতবিরোধী হিসেবে দেখা যেমন ভুল, তেমনি ভারতের নিরাপত্তা-উদ্বেগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করাও দূরদর্শী হবে না। প্রতিরক্ষা ও বন্দর প্রকল্পে স্বচ্ছতা এই সন্দেহ কমাতে পারে।
ইতিবাচক ইতিহাসও রয়েছে
বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক শুধু অসম্পূর্ণ প্রতিশ্রুতির ইতিহাস নয়। ১৯৭৪ সালের স্থলসীমান্ত চুক্তি ও ২০১১ সালের প্রটোকল বাস্তবায়ন করে ২০১৫ সালে ১৬২টি ছিটমহল বিনিময় দুই দেশের কূটনীতির একটি বিরল সাফল্য।
দশকের পর দশক ধরে আটকে থাকা সমস্যাটি সমাধান করে দুই দেশ প্রমাণ করেছে—রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সংসদীয় অনুমোদন এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকারকে গুরুত্ব দিলে জটিল বিরোধও শান্তিপূর্ণভাবে মেটানো সম্ভব।
এই অভিজ্ঞতা তিস্তা, সীমান্ত হত্যা বা বাণিজ্যিক বিরোধ সমাধানের নিশ্চয়তা দেয় না; তবে একটি কার্যকর পদ্ধতির দৃষ্টান্ত দেয়।
জয়শঙ্করের বক্তব্যের অর্থ কী
জয়শঙ্করের “পারস্পরিক স্বার্থ” মন্তব্যে সহযোগিতার সুযোগ এবং কূটনৈতিক সতর্কতা—দুটিই আছে।
ইতিবাচক পাঠ হলো, ভারত সম্পর্ককে একতরফা প্রত্যাশার ভিত্তিতে চালাতে চায় না এবং বাংলাদেশের স্বার্থকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা বলছে। সতর্কতামূলক পাঠ হলো, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণসহ ঢাকার কোনো একটি দাবিকে দিল্লি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করবে না।
বাংলাদেশেরও একই নীতি প্রয়োগ করা দরকার। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও রাজনৈতিক বিষয়; কিন্তু সেই একটি প্রশ্নের কারণে গঙ্গার পানি, তিস্তা, সীমান্ত নিরাপত্তা, ভিসা, বাণিজ্য এবং জ্বালানি আলোচনা বন্ধ করে দেওয়া শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশেরই ক্ষতি করতে পারে।
আলোচনা চালানো মানে প্রত্যর্পণের দাবি থেকে সরে আসা নয়। বরং প্রতিটি বিরোধকে নিজস্ব আইনি ও কূটনৈতিক পথে এগিয়ে নেওয়াই পরিণত রাষ্ট্রনীতির পরিচয়।
ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্রের সম্পর্কে উত্তরণ
বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের পরবর্তী অধ্যায় সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে সম্পর্কটি কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের গণ্ডি থেকে বের হতে পারে কি না।
দিল্লিকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বহুত্ব, জনমতের ক্ষোভ এবং সার্বভৌম সমতার দাবিকে স্বীকার করতে হবে। ঢাকাকে ভারতের নিরাপত্তা ও সংযোগস্বার্থ বুঝতে হবে, তবে বিনিময়ে পরিমাপযোগ্য সুবিধা ও সম্মান নিশ্চিত করতে হবে।
প্রয়োজন:
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ আবেদনের আনুষ্ঠানিক ও আইনি উত্তর
গঙ্গার পানি চুক্তি নবায়নে সময়সীমাবদ্ধ আলোচনা
তিস্তা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগ
সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি কমানোর যাচাইযোগ্য ব্যবস্থা
জরুরি ও চিকিৎসা ভিসা দ্রুত স্বাভাবিক করা
বাণিজ্যে অশুল্ক বাধা পর্যালোচনার যৌথ ব্যবস্থা
বিদ্যুৎ ও কানেক্টিভিটি চুক্তি প্রকাশ ও স্বাধীন পর্যালোচনা
রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি জনগণ, বিশ্ববিদ্যালয় ও নাগরিক সমাজের যোগাযোগ বৃদ্ধি
পারস্পরিক স্বার্থ একটি সুন্দর কূটনৈতিক বাক্য। কিন্তু এর বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হবে তখনই, যখন দুই দেশের সাধারণ মানুষ এর বাস্তব সুফল দেখতে পাবেন।
যা জানা গেছে
এস জয়শঙ্কর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ককে “পারস্পরিক স্বার্থের পরীক্ষায়” উত্তীর্ণ হওয়ার কথা বলেছেন।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে করা প্রশ্নের সরাসরি উত্তর তিনি দেননি।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে আলোচনা হলেও সফর নিশ্চিত হয়নি।
শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য দুই দেশের সম্পর্কে বড় বিরোধ তৈরি করেছে।
১৯৯৬ সালের গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির ৩০ বছরের মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা।
রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেও বাণিজ্য, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগে পারস্পরিক নির্ভরতা অব্যাহত রয়েছে।
যা এখনো অস্পষ্ট
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ আবেদনে ভারত চূড়ান্তভাবে কী সিদ্ধান্ত নেবে।
তারেক রহমানের দিল্লি সফর কবে হবে এবং তার পূর্বশর্ত কী।
গঙ্গার পানি চুক্তি সময়মতো নবায়ন হবে কি না।
ভারতীয় ভিসাসেবা কবে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হবে।
“পারস্পরিক স্বার্থ” বাস্তবায়নে দিল্লি ও ঢাকা কোন নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেবে।
শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ভারত কোনো নীতি গ্রহণ করবে কি না।
প্রধান সূত্র
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর: বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক কি শেখ হাসিনাতেই আটকে থাকবে
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ঘোষিত কাঠামো
#BangladeshIndia #DhakaDelhi #Jaishankar #Diplomacy #SheikhHasina #GangesTreaty #Teesta #বাংলাদেশভারতসম্পর্ক




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।