একটি দেশ, অসংখ্য দরজা: প্রবাসে কেন ভাঙে বাংলাদেশি সংগঠন

মাহবুব আহমেদের নিয়মিত কলাম ‘ এক জনমে অনেক জনম ‘ —- আজকের আয়োজন
একটি দেশ, অসংখ্য দরজা
প্রবাসে সংগঠন কেন ভাঙে, স্বদেশের রাজনীতি কীভাবে দূরত্ব পেরিয়ে আসে, আর ঐক্যের নতুন পথ কোথায়
—-——— ———- ———- ————
একটি বিদেশি শহরের গল্প বলি। শহরটির নাম বলব না। নাম বললে কেউ ভাবতে পারেন, গল্পটি শুধু সেই শহরের। অথচ এমন শহর পৃথিবীতে অনেক আছে—নিউইয়র্ক, লন্ডন, টরন্টো, সিডনি, রোম, প্যারিস কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো ব্যস্ত নগর।
রোববারের বিকেল। বাবা ছেলেকে নিয়ে একটি কমিউনিটি অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন। গাড়িতে বসে ছেলে জিজ্ঞেস করল,
—বাবা, আজ আমরা কোন বাংলাদেশের অনুষ্ঠানে যাচ্ছি?
বাবা প্রথমে প্রশ্নটি বুঝতে পারলেন না। বাংলাদেশ তো একটাই। কিন্তু ছেলের মোবাইলে একই দিনের তিনটি আমন্ত্রণপত্র। তিনটিতেই বাংলাদেশের কথা, সংস্কৃতির কথা, ঐক্যের কথা। শুধু স্থান আলাদা, সভাপতি আলাদা, আয়োজক আলাদা। একটির সঙ্গে আরেকটির কথা নেই।
বাবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
—যেটিতে আমাদের পরিচিত মানুষ বেশি, সেটিতে যাব।
ছেলে আর কিছু বলল না। জানালার বাইরে তাকাল। হয়তো সে সেদিন প্রথম বুঝল—মানচিত্রের বাংলাদেশ এক হলেও প্রবাসে তার অনেকগুলো দরজা আছে। এক দরজার মানুষ অন্য দরজায় ঢোকেন না।
দৃশ্যটি কল্পিত। কিন্তু প্রশ্নটি আমাদের সবার।
স্যুটকেসে আমরা শুধু স্মৃতি আনি না
মানুষ যখন দেশ ছাড়ে, সঙ্গে কিছু জামাকাপড়, কাগজপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিস নেয়। দৃশ্যমান স্যুটকেসের বাইরে আরেকটি অদৃশ্য স্যুটকেসও থাকে। সেখানে থাকে মায়ের ভাষা, রান্নাঘরের গন্ধ, নদীর স্মৃতি, ঈদের সকাল, পূজার ঢাক, পহেলা বৈশাখ, রবীন্দ্রসংগীত, লোকগান এবং ফেলে আসা মানুষের মুখ।
দুঃখের বিষয়, সেই অদৃশ্য স্যুটকেসে আমরা কখনো কখনো আরও কিছু নিয়ে আসি—দলাদলি, পদমর্যাদার আকাঙ্ক্ষা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্ব, জেলাভিত্তিক গর্বের বাড়াবাড়ি, ভিন্নমত সহ্য না করার অভ্যাস এবং দেশের রাজনৈতিক শত্রুতার অসমাপ্ত হিসাব।
প্রথমে সংগঠন তৈরি হয় প্রয়োজন থেকে। নতুন আসা একজন মানুষকে বাসা খুঁজে দেওয়া হবে। কেউ অসুস্থ হলে পাশে দাঁড়ানো হবে। কোনো পরিবার বিপদে পড়লে অর্থ সংগ্রহ করা হবে। শিশুরা বাংলা শিখবে। জাতীয় দিবস পালিত হবে। মৃত ব্যক্তির মরদেহ দেশে পাঠাতে সহায়তা করা হবে।
এই কাজগুলো করতে গিয়ে মানুষ একত্র হয়। একটি নাম ঠিক হয়। একটি কমিটি হয়। তারপর কখন যে সেবা থেকে পদ বড় হয়ে যায়, কেউ খেয়াল করে না।
একসময় দেখা যায়, সংগঠনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় আর মানুষের সমস্যা নয়। আলোচনার বিষয়—কে সভাপতি, কে সাধারণ সম্পাদক, ফেসবুক গ্রুপের অ্যাডমিন কে, অনুষ্ঠানের ব্যানারে কার ছবি বড়, মঞ্চে কে আগে বসবেন এবং মাইক্রোফোন কার হাতে কতক্ষণ থাকবে।
সেবা তখন পেছনের সারির একটি ভাঁজ করা চেয়ার। নেতৃত্ব বসে যায় সামনের রাজকীয় আসনে।
বিভাজন কি সব সময় খারাপ?
না। সব নতুন সংগঠনকে বিভাজনের ফল বলা অন্যায় হবে। একটি বড় সংগঠন কোনো জনগোষ্ঠী, পেশা, ভাষা, ধর্মীয় পরিচয়, নারী, তরুণ কিংবা নতুন অভিবাসীর প্রয়োজন উপেক্ষা করলে নতুন সংগঠন প্রয়োজন হতে পারে। ছোট সংগঠন কখনো নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি করে, উপেক্ষিত মানুষের কণ্ঠ তুলে ধরে এবং বিশেষ সেবা দেয়। বহুত্ব গণতন্ত্রের শক্তি।
সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন নতুন প্রয়োজনের জন্য নয়—একটি নির্বাচনে হেরে গিয়ে, কাঙ্ক্ষিত পদ না পেয়ে, হিসাব দিতে না চেয়ে কিংবা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে আরেকটি সংগঠন তৈরি করা হয়। একই নামের কাছাকাছি নাম, একই উদ্দেশ্য, একই সদস্য এবং একই উৎসব নিয়ে যখন পাল্টা কমিটি দাঁড়ায়, তখন সেটি বহুত্ব নয়; সেটি প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার নতুন ঠিকানা।
একটি সংগঠন ভাঙলে শুধু একটি কমিটি ভাঙে না। সঙ্গে ভাঙে মানুষের আস্থা, অনুদানের সক্ষমতা, স্বেচ্ছাসেবার উৎসাহ এবং স্থানীয় প্রশাসনের কাছে কমিউনিটির সম্মিলিত কণ্ঠ। একই কাজের জন্য পাঁচটি সংগঠন পাঁচবার হল ভাড়া করে, পাঁচটি ব্যাংক হিসাব চালায়, পাঁচটি তহবিল সংগ্রহ করে এবং পাঁচজন নিজেকে পুরো কমিউনিটির প্রতিনিধি বলেন।
কিন্তু বিপদের দিনে সাহায্য চাইতে গেলে বোঝা যায়—পাঁচটি সাইনবোর্ড সব সময় একটি কার্যকর প্রতিষ্ঠানের সমান নয়।
দূরত্ব পেরিয়ে আসা রাজনীতি
গবেষকেরা বহুদিন ধরে ‘long-distance nationalism’ বা দূরবর্তী জাতীয়তাবাদের কথা বলছেন। মানুষ স্বদেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থাকলেও দেশের রাজনৈতিক পরিচয়, সংঘাত ও আবেগ প্রবাসে নতুনভাবে সংগঠিত হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই দূরত্ব আরও কমিয়েছে। ঢাকার একটি রাজনৈতিক ঘটনা কয়েক মিনিটের মধ্যে লন্ডন, নিউইয়র্ক, টরন্টো কিংবা সিডনির সামাজিক সম্পর্কেও উত্তাপ তৈরি করতে পারে।
রাজনৈতিক মত থাকা অপরাধ নয়। বরং গণতান্ত্রিক সমাজে সচেতন রাজনৈতিক অবস্থান মানুষের অধিকার। সমস্যা রাজনৈতিক মতাদর্শে নয়; সমস্যা শুরু হয় যখন সামাজিক সংগঠনের সদস্যপদ, সাহায্য, সম্মাননা, মঞ্চ বা নেতৃত্ব পাওয়ার অঘোষিত শর্ত হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক আনুগত্য।
তখন একই দেশের মানুষ পরস্পরকে আর প্রতিবেশী হিসেবে দেখেন না। দেখেন দলের লোক, বিপক্ষের লোক কিংবা সন্দেহজনক লোক হিসেবে। দেশের রাজনীতির যে বিভাজন থেকে দূরে এসে মানুষ একটি নিরাপদ সামাজিক পরিসর তৈরি করতে চেয়েছিল, সেই বিভাজনই ধীরে ধীরে প্রবাসী সংগঠনের বৈঠকখানায় স্থায়ী আসন পেয়ে যায়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। একটি প্রবাসী সামাজিক প্রতিষ্ঠানকে দলনিরপেক্ষ হতে হবে; কিন্তু অন্যায়, বৈষম্য, বর্ণবাদ, অভিবাসীর অধিকার কিংবা বাংলাদেশের মানুষের দুর্দশার প্রশ্নে নির্বাক হতে হবে না। অরাজনৈতিকতার নামে নীরবতা কোনো নৈতিক আদর্শ নয়। প্রতিষ্ঠান নাগরিক বিষয়ে সক্রিয় থাকবে, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক দলের বিদেশি শাখা বা নির্বাচনী ঘাঁটিতে পরিণত হবে না।
রাজনীতি যার যার; প্রতিষ্ঠান সবার।
পৃথিবীর বহু শহরে একই গল্প কেন
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বিশ্বে আন্তর্জাতিক অভিবাসীর সংখ্যা প্রায় ২৮১ মিলিয়ন বলে উল্লেখ করা হয়েছে—বিশ্ব জনসংখ্যার প্রায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই বিপুল মানুষের সঙ্গে ভাষা, স্মৃতি, ধর্ম, রাজনীতি এবং স্বদেশের সামাজিক কাঠামোও সীমান্ত অতিক্রম করে। বাংলাদেশিরা এই বৃহত্তর বৈশ্বিক অভিজ্ঞতারই অংশ।
প্রবাসী সংগঠনগুলো তাই অপ্রয়োজনীয় নয়। OECD-এর গবেষণায় দেখা যায়, স্বেচ্ছাসেবামূলক অংশগ্রহণ অভিবাসীদের স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি, ভাষাগত দক্ষতা এবং পেশাগত সক্ষমতা বাড়াতে পারে। অভিবাসী ও ডায়াসপোরা সংগঠন নতুন মানুষকে তথ্য, সেবা এবং অন্তর্ভুক্তির পথও দেখাতে পারে।
কিন্তু একটি প্রতিষ্ঠান যখন সেবার বদলে পরিচয়-রাজনীতির দুর্গ হয়ে ওঠে, তখন সে মানুষকে সমাজের সঙ্গে যুক্ত করার পরিবর্তে নিজের ছোট বলয়ের মধ্যে আটকে ফেলে। একই গ্রামের মানুষ এক দলে, একই জেলার মানুষ আরেক দলে, একই রাজনৈতিক বিশ্বাসের মানুষ তৃতীয় দলে—শেষ পর্যন্ত প্রত্যেকে পরিচিত মানুষের মাঝেই নিরাপদ থাকেন। নতুন সম্পর্ক তৈরি হয় না; পুরোনো দূরত্ব আরও প্রাতিষ্ঠানিক হয়।
এখানেই প্রবাসী জীবনের বড় বৈপরীত্য। আমরা বহুসাংস্কৃতিক দেশে বাস করি, কিন্তু কখনো কখনো আমাদের সংগঠনকে এত ছোট পরিচয়ের বাক্সে বন্দী করি যে সেখানে পুরো বাংলাদেশও জায়গা পায় না।
নতুন প্রজন্ম দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে
প্রথম প্রজন্মের কাছে জেলা বা গ্রামের পরিচয় আবেগের। দ্বিতীয় প্রজন্মের কাছে সেটি প্রধানত বাবা-মায়ের গল্প। তারা বাংলাদেশকে ভালোবাসতে পারে, বাংলা গান শুনতে পারে, খাবার ও উৎসবে আনন্দ পেতে পারে; কিন্তু তারা এমন সাংগঠনিক ভাষা বোঝে না যেখানে নিয়মের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বড়, ভোটার তালিকার চেয়ে পরিচিতির তালিকা কার্যকর এবং সমালোচনাকে অসম্মান মনে করা হয়।
তরুণেরা সাধারণত প্রশ্ন করে—গঠনতন্ত্র কোথায়? অর্থের হিসাব কি দেখা যাবে? নেতৃত্ব বদলায় কীভাবে? আমি নতুন হলে কথা বলার সুযোগ পাব কি? আমার দক্ষতা কি কাজে লাগবে, নাকি শুধু অনুষ্ঠানের দিনে চেয়ার সাজাতে হবে?
উত্তর না পেলে তারা তর্ক করে না। তারা চলে যায়।
তারপর প্রথম প্রজন্ম আক্ষেপ করে—নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশ নিয়ে ভাবে না। সত্যটি কখনো উল্টোও হতে পারে: নতুন প্রজন্ম বাংলাদেশকে প্রত্যাখ্যান করেনি; তারা হয়তো আমাদের তৈরি অস্বচ্ছ ও সংঘাতপূর্ণ দরজাগুলো প্রত্যাখ্যান করেছে।
তারা উত্তরাধিকার হিসেবে কেবল বাংলা গান, খাবার ও উৎসব পাবে না। আমরা সতর্ক না হলে তারা পাবে পাল্টা কমিটি, ব্লক করা ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, অমীমাংসিত হিসাব এবং বহু বছর ধরে চলা ব্যক্তিগত বিরোধের তালিকা।
এটি কোনো গর্বের উত্তরাধিকার নয়।
সমাধান: একটি ছাতা, বহু সাংস্কৃতিক জানালা
সব সংগঠন বন্ধ করে একটি বিশ্বব্যাপী মহাসংগঠন বানানো বাস্তবসম্মত নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের আইন, প্রয়োজন ও সামাজিক বাস্তবতা আলাদা। কিন্তু প্রতিটি বড় শহর বা অঞ্চলে একটি দলনিরপেক্ষ বাংলাদেশি কমিউনিটি কাউন্সিল গঠন করা সম্ভব। জাতীয় পর্যায়ে এসব কাউন্সিল একটি ফেডারেশনের মাধ্যমে যুক্ত হতে পারে।
জেলা, বিভাগ, পেশা, ধর্মীয় বা সাংস্কৃতিক সংগঠন বিলুপ্ত করার প্রয়োজন নেই। তারা ‘সাংস্কৃতিক অধ্যায়’ বা সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিজেদের ইতিহাস, খাবার, সাহিত্য ও উৎসব তুলে ধরবে। কিন্তু পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির নাগরিক প্রতিনিধিত্ব, জরুরি সহায়তা, সরকারি সংস্থার সঙ্গে যোগাযোগ এবং যৌথ তহবিল পরিচালনা করবে একটি স্বচ্ছ ছাতা প্রতিষ্ঠান।
এই প্রতিষ্ঠানের ভিত্তি হতে পারে দশটি নীতিতে:
এক. প্রকাশ্য গঠনতন্ত্র ও সদস্যতালিকা। কে সদস্য, কে ভোটার, কে প্রার্থী হতে পারবেন—সব নিয়ম নির্বাচনের আগে প্রকাশ করতে হবে।
দুই. মেয়াদসীমা। নেতৃত্ব সেবা, স্থায়ী মালিকানা নয়। দুই বছরের মেয়াদ এবং একই পদে সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ রাখা যেতে পারে।
তিন. স্বাধীন নির্বাচন। পদপ্রার্থী নন এবং কোনো প্রচারশিবিরে যুক্ত নন—এমন ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করতে হবে। ভোটার তালিকা ও ফলাফল যাচাইয়ের সুযোগ থাকতে হবে।
চার. অর্থের খোলা হিসাব। প্রতিষ্ঠানের নামে ব্যাংক হিসাব, বড় ব্যয়ে দুই ব্যক্তির অনুমোদন, ত্রৈমাসিক আয়-ব্যয় প্রকাশ এবং বছরে অন্তত একবার স্বাধীন আর্থিক পর্যালোচনা জরুরি।
পাঁচ. স্বার্থের সংঘাত নীতি। কোনো সিদ্ধান্তে নেতার ব্যক্তিগত, পারিবারিক, ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থ থাকলে তা প্রকাশ করতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সেই আলোচনা ও ভোট থেকে সরে দাঁড়াতে হবে।
ছয়. প্রতিষ্ঠানের সম্পদ প্রতিষ্ঠানেরই। ওয়েবসাইট, ডোমেইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সদস্যদের তথ্য, ই-মেইল ও লোগো কোনো সভাপতি বা অ্যাডমিনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি হতে পারবে না। দায়িত্ব বদলালে নিয়ন্ত্রণ আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর হবে।
সাত. দলনিরপেক্ষতার লিখিত সীমানা। ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকবে; কিন্তু সংগঠনের অর্থ, মঞ্চ, লোগো, সদস্যতালিকা বা অনুষ্ঠান কোনো দলের প্রচারে ব্যবহার করা যাবে না। রাজনৈতিক দলের সক্রিয় পদধারী একই সময়ে শীর্ষ নির্বাহী পদে থাকতে পারবেন কি না, সে বিষয়ে সবার জন্য সমান ও আগেই ঘোষিত নীতি থাকতে হবে।
আট. নতুন প্রজন্মের ক্ষমতা। পরিচালনা পর্ষদের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ তরুণ ও দ্বিতীয় প্রজন্মের সদস্যদের জন্য রাখা যেতে পারে। তাদের শুধু সাংস্কৃতিক পরিবেশক নয়—বাজেট, প্রযুক্তি, নীতি ও সিদ্ধান্তের অংশীদার করতে হবে।
নয়. নিরপেক্ষ বিরোধ নিষ্পত্তি। নির্বাচন বা নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধ হলে সঙ্গে সঙ্গে পাল্টা সংগঠন নয়; প্রথমে লিখিত অভিযোগ, মধ্যস্থতা এবং স্বাধীন আপিল প্যানেলের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
দশ. সাফল্যের নতুন মাপকাঠি। কতজন সভাপতি হলেন নয়—কতজন নতুন অভিবাসী সহায়তা পেলেন, কতজন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেলেন, কতজন প্রবীণ সেবা পেলেন, কতজন তরুণ নেতৃত্বে এলেন এবং স্থানীয় নীতিনির্ধারণে কমিউনিটির কণ্ঠ কতটা শক্তিশালী হলো—এসব দিয়ে প্রতিষ্ঠানের সাফল্য মাপতে হবে।
শুরু হবে কোথা থেকে
বড় পরিবর্তনের জন্য প্রথমেই বড় ভবন দরকার নেই। প্রয়োজন একটি ছোট নিরপেক্ষ উদ্যোগ। বিভিন্ন সংগঠনের বাইরে থাকা পাঁচ থেকে সাতজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তি, নারী, তরুণ ও পেশাজীবীকে নিয়ে একটি প্রস্তুতি পরিষদ গঠন করা যেতে পারে। তারা ছয় মাসের মধ্যে কমিউনিটির প্রয়োজন নিয়ে উন্মুক্ত জরিপ করবে, বিদ্যমান সংগঠনগুলোর সম্পদ ও কাজের মানচিত্র তৈরি করবে এবং একটি খসড়া সনদ প্রকাশ করবে।
তারপর একটি উন্মুক্ত নাগরিক সম্মেলন হবে—যেখানে বক্তৃতার চেয়ে শোনা হবে বেশি। সেখানে প্রশ্ন হবে: আমাদের প্রবীণদের কী প্রয়োজন? নতুন অভিবাসীরা কোথায় আটকে যাচ্ছেন? তরুণেরা কেন আসছেন না? জরুরি তহবিল কীভাবে চলবে? স্থানীয় সরকার ও মূলধারার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কে কথা বলবে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর থেকে প্রতিষ্ঠান তৈরি হবে। কোনো ব্যক্তির নাম থেকে নয়।
পুরোনো সংগঠনগুলোকে শত্রু ভাবলে এই উদ্যোগ ব্যর্থ হবে। বরং তাদের অভিজ্ঞতা, স্বেচ্ছাসেবক ও সাংস্কৃতিক শক্তিকে নতুন কাঠামোর অংশ করতে হবে। লক্ষ্য কাউকে মুছে ফেলা নয়; লক্ষ্য হলো একই কাজের অকারণ পুনরাবৃত্তি কমানো এবং মানুষের সেবাকে নেতৃত্বের প্রতিযোগিতার ওপরে রাখা।
আবার সেই শিশুটির কাছে
গল্পের শিশুটি এখনো গাড়ির জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে। তার মোবাইলে তিনটি আমন্ত্রণপত্র। বাবা কোনটিতে যাবেন, ঠিক করতে পারছেন না।
হয়তো একদিন পরিস্থিতি বদলাবে। একই শহরে বহু সাংস্কৃতিক আয়োজন থাকবে, কিন্তু তারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী বাংলাদেশ হবে না। একটি যৌথ ক্যালেন্ডার থাকবে, একটি জরুরি সহায়তা ব্যবস্থা থাকবে, একটি বিশ্বাসযোগ্য নাগরিক কণ্ঠ থাকবে। মানুষ নিজের জেলা, ভাষা, ধর্ম ও রাজনৈতিক মত নিয়ে গর্ব করবেন; কিন্তু সেই পরিচয় অন্য বাংলাদেশিকে দরজার বাইরে রাখবে না।
সেদিন ছেলে আবার জিজ্ঞেস করবে,
—বাবা, আজ আমরা কোন বাংলাদেশের অনুষ্ঠানে যাচ্ছি?
বাবা হয়তো হাসবেন। বলবেন,
—বাংলাদেশ তো একটাই। আজ আমরা মানুষের অনুষ্ঠানে যাচ্ছি।
প্রবাসে আমাদের সবচেয়ে বড় সংগঠন সেই দিনই তৈরি হবে—যেদিন কোনো সভাপতির নামের আগে নয়, মানুষের প্রয়োজনের পাশে আমরা নিজেদের নাম লিখতে শিখব।
দেশ থেকে দূরে এসে আমরা যেন দেশের মানচিত্র বড় করি—ছোট ছোট ক্ষমতার ঘরে তাকে আর ভাগ না করি।
দেশ থেকে দূরে এসে আমরা যেন দেশের মানচিত্র বড় করি—ছোট ছোট ক্ষমতার ঘরে তাকে আর ভাগ না করি।
—-——
মাহবুব আহমেদ
বাংলাদেশি-আমেরিকান উদ্যোক্তা,লেখক, সম্পাদক ও নাগরিক অধিকারকর্মী।
#প্রবাসীবাংলাদেশি #বাংলাদেশিডায়াসপোরা #প্রবাসীসংগঠন #কমিউনিটিঐক্য #প্রবাসেরাজনীতি #দলনিরপেক্ষতা #নতুনপ্রজন্ম #BangladeshiDiaspora #CommunityUnity #DiasporaLeadership #WeeklyCalifornierChithi




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।