ফারুকী-তিশাকে নিয়ে গুজবের ভিড়ে যে প্রশ্নগুলো জরুরি

পর্দা থেকে ক্ষমতার করিডরে
মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে আমার পরিচয়ের স্মৃতিতে আছে চলচ্চিত্রের শুরুর দিকের এক সময়। তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ব্যাচেলর যখন দর্শকের সামনে আসে, আমাদের প্রতিষ্ঠান Dream Unlimited বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ছবিটির প্রচারে যুক্ত হয়েছিল। চ্যানেল আইতে ছবিটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারের আয়োজনেও আমরা সহযোগিতা করেছিলাম—এটি আমার ব্যক্তিগত স্মৃতি। পরে তাঁর চলচ্চিত্র ও নাটকের যাত্রায়ও আমাদের প্রতিষ্ঠানের কিছু পরোক্ষ ভূমিকা ছিল।
সেই সময় ফারুকীকে চিনতাম একজন নতুন ভাষা খোঁজা নির্মাতা হিসেবে। টেলিভিশনের পরিচিত ছক ভেঙে শহুরে মধ্যবিত্তের অস্বস্তি, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও সামাজিক ভণ্ডামি তাঁর কাজে জায়গা পেয়েছিল। ব্যাচেলর (২০০৪) ছিল তাঁর চলচ্চিত্র নির্মাণে অভিষেক; পরে থার্ড পারসন সিঙ্গুলার নাম্বার, টেলিভিশন, ডুব: নো বেড অব রোজেস এবং শনিবার বিকেল তাঁকে বাংলাদেশের বাইরে পরিচিত করে। তাঁর কর্মজীবন ও চলচ্চিত্রের তালিকা নিয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এবং আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র সংবাদমাধ্যম ভ্যারাইটিও প্রতিবেদন করেছে।
একজন শিল্পীর কাজের পাশে দাঁড়ানো আর তাঁর পরবর্তী প্রতিটি সিদ্ধান্তের সমর্থক হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়। পুরোনো সম্পর্কের কারণে তাঁকে নিয়ে লেখা কঠিন হতে পারে; কিন্তু সেই সম্পর্ক গোপন রেখে লেখা তার চেয়েও অনুচিত। তাই এই কলামের শুরুতেই বলি: ফারুকীর শিল্পীজীবনের এক পর্যায়ে আমাদের প্রতিষ্ঠানের প্রচার-সহযোগিতা ছিল—এটি আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির বিবরণ, কোনো স্বাধীন নিরীক্ষা বা তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পক্ষে সাক্ষ্য নয়।
ফারুকীর জীবনে বড় বাঁক আসে ২০২৪ সালের নভেম্বরে, যখন তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেন। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে দেওয়া তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশের জন্য কাজ করার আকাঙ্ক্ষা এবং মুহাম্মদ ইউনূসের সহকর্মী হওয়ার সুযোগ তাঁকে এই দায়িত্ব নিতে প্রলুব্ধ করেছিল। তাঁর নিয়োগের পরপরই সামাজিক মাধ্যমে সমালোচনা শুরু হয়; ছাত্রদের একটি অংশও নতুন উপদেষ্টা নিয়োগের প্রতিবাদে কর্মসূচি ঘোষণা করেছিল। অর্থাৎ রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তাঁর দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার পর তৈরি হয়নি—শুরু থেকেই ছিল।
শিল্পীর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ঝুঁকি
একজন চলচ্চিত্রকারের রাজনীতিতে প্রবেশ নিজে থেকেই অপরাধ বা অনৈতিকতা নয়। শিল্পীরা রাষ্ট্রের নীতি, সংস্কৃতি ও জনজীবন নিয়ে কথা বলবেন—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষমতার ভেতরে গেলে তাঁদের কথার সঙ্গে যুক্ত হয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সরকারি অর্থ, নিয়োগ এবং জবাবদিহির প্রশ্ন। তখন দর্শক আর কেবল শিল্পীকে বিচার করেন না; বিচার করেন দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকেও।
এখানেই ফারুকীর জন্য ঝুঁকিটি দ্বিমুখী। রাজনৈতিক ক্ষমতা শিল্পীর বক্তব্যকে আরও বিস্তৃত শ্রোতার কাছে নিতে পারে, আবার তাঁর কাজকে দলীয় অবস্থানের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে পারে। আর কোনো প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে “আমি শিল্পী” পরিচয় প্রশাসনিক জবাবদিহির বিকল্প হতে পারে না। একইভাবে, সামাজিক মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষোভ থাকলেই অভিযোগ সত্য হয়ে যায় না।
ফারুকীর উপদেষ্টা হওয়ার সময়কার সমালোচনার একটি অংশ ছিল তাঁর আগের রাজনৈতিক অবস্থান ও অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে। দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছিল, নতুন ভূমিকায় তাঁকে পূর্ববর্তী শাসকগোষ্ঠীর সহযোগী বলে আখ্যা দেওয়া হচ্ছিল; ফারুকী তখন বলেছিলেন, তাঁকে রাজনৈতিক পরিচয়ের বদলে কাজ দিয়ে বিচার করা হোক।
এ ধরনের অভিযোগের উত্তর রাজনৈতিক স্লোগানে নয়, তথ্য ও কাজের বিবরণে দিতে হয়। আবার “কাজ দিয়ে বিচার করুন”—এই আহ্বানের অর্থও হলো, কাজের হিসাব জনসমক্ষে পরীক্ষা করার অধিকার মানুষের আছে।
গণভবন প্রকল্প: অভিযোগের পরিসর আর প্রমাণের সীমা
গণভবনকে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের প্রকল্পটি ফারুকীকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর জনস্বার্থের প্রশ্নগুলোর একটি। এখানে দুটি আলাদা বিষয় গুলিয়ে ফেলা চলবে না: একদিকে প্রকল্পের অর্থব্যয় ও ক্রয়পদ্ধতি নিয়ে স্বচ্ছতার প্রশ্ন; অন্যদিকে ফারুকীর ব্যক্তিগতভাবে শত শত কোটি টাকা আত্মসাতের দাবি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) গণভবন জাদুঘরের নির্মাণ ও সংস্কারে প্রায় ১১১ কোটি টাকা সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছিলেন, জরুরি বা বিশেষ পরিস্থিতি ছাড়া প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র এড়িয়ে সরাসরি ক্রয় সাধারণত গ্রহণযোগ্য নয়; কেন এই পদ্ধতি নেওয়া হলো, তার নিরপেক্ষ তদন্ত ও স্পষ্ট ব্যাখ্যা দরকার। এই উদ্বেগটি প্রকল্পের ক্রয়পদ্ধতি নিয়ে—এটি নিজে থেকে ব্যক্তিগত আত্মসাতের প্রমাণ নয়।
২০২৬ সালের আগস্টে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, জাদুঘর প্রকল্পে নির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করা হবে এবং প্রমাণ মিললে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে পাঠানো হতে পারে। তিনি একই সঙ্গে বলেন, অভিযোগে কার বিরুদ্ধে, কী ধরনের অনিয়ম এবং কীভাবে তা ঘটেছে—এসব নির্দিষ্ট করে জানাতে হবে। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর প্রতিবেদন অনুসারে, জাদুঘর উদ্বোধনের পর অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠনের কথাও তিনি জানান।
অভিযোগের জবাবে ফারুকী দ্য ডিসেন্ট-এ লিখিত বক্তব্য দেন। তাঁর দাবি, সংবাদে প্রকল্পব্যয়ের অঙ্ক বাড়িয়ে বলা হয়েছে; নির্মাণকাজের বড় অংশ গণপূর্ত অধিদপ্তর করেছে; আর চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ পেয়েছেন দেশের তরুণ নির্মাতারা। তিনি সরাসরি ক্রয়পদ্ধতির পক্ষে সময়স্বল্পতার যুক্তিও দিয়েছেন। এটি তাঁর নিজের বক্তব্য—তদন্তের ফল নয়। দ্য ডিসেন্ট তখন জানিয়েছিল, টেলিভিশন প্রতিবেদনের অভিযোগগুলো যাচাই করে তারা আলাদা ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করবে।
এখানে পাঠকের কাছে জরুরি প্রশ্নটি হলো: সরকারি নথি, প্রকল্পের বরাদ্দ, চুক্তিপত্র, কাজের মান, অর্থপ্রদানের তালিকা এবং নিরীক্ষার ফল কী বলছে? কোনো সংবাদ-অনুসন্ধান অভিযোগ উত্থাপন করতে পারে; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জবাবও প্রকাশ করতে পারে। কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ভিত্তি হওয়া উচিত নথি, স্বাধীন তদন্ত এবং আইনসম্মত প্রক্রিয়া। আমার যাচাইয়ে এখন পর্যন্ত এমন কোনো নির্ভরযোগ্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাইনি যা প্রমাণ করে ফারুকী ব্যক্তিগতভাবে “কয়েকশো কোটি টাকা” আত্মসাৎ করেছেন।
সম্পদের হিসাব কী বলে—আর কী বলে না
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রকাশিত সম্পদ বিবরণী নিয়ে যুগান্তর, প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার প্রতিবেদন করেছে। ওই হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩০ জুন ফারুকীর ঘোষিত সম্পদ ছিল ২ কোটি ২৬ লাখ ৯২ হাজার ২৬ টাকা; ২০২৫ সালের ৩০ জুন তা কমে ২ কোটি ১৫ লাখ ১৮ হাজার ২৬ টাকায় দাঁড়ায়। একই সময়ে নুসরাত ইমরোজ তিশার ঘোষিত সম্পদ বেড়ে প্রায় ২ কোটি ৯৯ লাখ ৯০ হাজার টাকায় পৌঁছায়; প্রতিবেদনে তাঁর এক কোটি টাকার দায়ের কথাও উল্লেখ আছে.
সম্পদ বিবরণী কোনো স্বাধীন ফরেনসিক নিরীক্ষার বিকল্প নয়। এতে ঘোষিত সম্পদ ও নির্দিষ্ট সময়সীমার হিসাব থাকে; সম্পদের উৎস বা প্রতিটি লেনদেনের পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ নয়। তবু প্রকাশিত সরকারি হিসাবের সঙ্গে “কয়েকশো কোটি টাকার ব্যক্তিগত সম্পদ” দাবির ব্যবধান লক্ষণীয়। এমন দাবির পক্ষে শক্ত নথি—যেমন সম্পত্তির দলিল, ব্যাংক লেনদেন, অনুসন্ধানী নিরীক্ষা বা তদন্তের ফল—দেখানো না গেলে সেটিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে লেখা যায় না।
একই সতর্কতা কানাডায় বাড়ি কেনার দাবির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমি নির্ভরযোগ্য, প্রামাণ্য নথি বা স্বাধীন প্রতিবেদনে ফারুকী-তিশার কানাডায় বাড়ি কেনার বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারিনি। সাম্প্রতিক অনলাইন প্রচারণায় বরং অস্ট্রেলিয়ার বাড়ি বিক্রি নিয়ে তাঁদের বিচ্ছেদের গল্প ছড়িয়েছে। রিউমর স্ক্যানার ৮ অক্টোবর ২০২৬-এ জানায়, বিচ্ছেদের দাবিতে পুরোনো সাক্ষাৎকারের অংশ কাটছাঁট করে প্রচার করা হয়েছে; তাদের অনুসন্ধানে দাবিটি মিথ্যা। দ্য ডিসেন্ট-ও একই দিনে পুরোনো ক্লিপ ও মনগড়া তথ্য ব্যবহার করে দম্পতিকে লক্ষ্য করে চালানো প্রচারণার কথা লিখেছে।
তিশার ব্যক্তিগত জীবন জনতার সম্পত্তি নয়
ফারুকী ও তিশার বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ে ছড়ানো গুজবকে সংবাদ হিসেবে পুনরাবৃত্তি করার আগে এর উৎস, প্রমাণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি। রিউমর স্ক্যানার বলছে, ভাইরাল দাবিটি পুরোনো সাক্ষাৎকারের খণ্ডিত অংশ ব্যবহার করে তৈরি। তাই এ মুহূর্তে বিচ্ছেদের গুজবকে সত্য বলে প্রচার করার ভিত্তি নেই। অন্যদিকে, তাঁদের ব্যক্তিগত জীবনের প্রতিটি খুঁটিনাটি জনসমক্ষে ব্যাখ্যা করার বাধ্যবাধকতাও তাঁদের নেই।
এই সীমারেখা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনপরিচিত মানুষকে ঘিরে ভুয়া সম্পর্কের খবর শুধু তাঁদের বিব্রত করে না; পরিবারের সদস্যদেরও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিশা বলেছিলেন, উপদেষ্টা হওয়ার পর ঘরে ফারুকীর আচরণে তিনি পরিবর্তন দেখেননি এবং তাঁকে দেশের জন্য ভালো কিছু করার চেষ্টা করতে দেখেছেন। সেটি তখনকার সাক্ষাৎকার—বর্তমান সম্পর্কের অবস্থা সম্পর্কে নতুন ঘোষণা নয়।
সময়ের আলো ২০২০ সালে তাঁদের দশম বিবাহবার্ষিকী নিয়ে প্রতিবেদন করেছিল। কিন্তু পুরোনো বিবাহবার্ষিকীর খবর বা অতীতের একটি সাক্ষাৎকার আজকের সম্পর্কের অবস্থা প্রমাণ করতে পারে না—যেমন সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত একটি সম্পাদিত ভিডিওও বিচ্ছেদের প্রমাণ নয়।
জনপ্রিয়তা কমেছে—কীভাবে বলা যায়?
ফারুকীর উপদেষ্টা হওয়ার পর সামাজিক মাধ্যমে তাঁর সমালোচনা বেড়েছে—এ কথা সংবাদ প্রতিবেদন ও প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়। কিন্তু “জনপ্রিয়তা কমে গেছে” বলার জন্য নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ, দর্শক-সমীক্ষা বা ধারাবাহিক মাপজোখ দরকার। সামাজিক মাধ্যমের উচ্চকণ্ঠ প্রতিক্রিয়া জনমতের পূর্ণ প্রতিচ্ছবি নয়।
সমালোচনার পেছনে বাস্তব রাজনৈতিক কারণ থাকতে পারে: কেউ তাঁর নিয়োগের বিরোধিতা করেছেন, কেউ অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কেউ প্রকল্পের অর্থব্যয় ও পদ্ধতি নিয়ে জবাব চেয়েছেন। আবার তাঁর সমর্থকদের কাছে তিনি এমন একজন নির্মাতা, যিনি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে ভাবার সুযোগ পেয়েছিলেন। কিন্তু এই দুই অবস্থানের কোনোটিই তথ্য যাচাইয়ের বিকল্প হতে পারে না।
সামনে তাঁর পরীক্ষা
ফারুকী এখন সাবেক উপদেষ্টা; তাঁর সরকারি দায়িত্ব শেষ হয়েছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে। সামনে তাঁর জন্য বড় পরীক্ষা দুটি। প্রথমত, জাদুঘর প্রকল্প নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার জবাব নথিভিত্তিক ও স্বচ্ছভাবে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, নিজের শিল্পীসত্তাকে দলীয় মেরুকরণের বাইরে আবার এমন কাজে ফিরিয়ে নেওয়া, যা দর্শককে ভাবায়—এবং যাকে তাঁর সরকারি পদমর্যাদার কারণে নয়, শিল্পমূল্যের কারণে বিচার করা যায়।
রাজনীতিতে অংশ নেওয়া শিল্পীর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে, কারণ ক্ষমতার সঙ্গে সঙ্গে আসে জবাবদিহি এবং সন্দেহের ভার। কিন্তু সেই ঝুঁকি মানেই শিল্পীকে চুপ থাকতে হবে—এমন নয়। বরং যে শিল্পী জনজীবনে ভূমিকা নেন, তাঁর কাছ থেকে আরও স্বচ্ছতা, আরও সংযম এবং অভিযোগের জবাবে আরও বেশি প্রমাণ প্রত্যাশিত।
ফারুকীর শিল্পযাত্রার একটি অংশ আমি কাছ থেকে দেখেছি। সেই স্মৃতি আমাকে তাঁর প্রতি অন্ধ সমর্থনে বাধ্য করে না; বরং তাঁর কাজ ও সিদ্ধান্তকে আলাদা করে দেখতে শেখায়। ব্যাচেলর-এর নির্মাতাকে যেমন তাঁর চলচ্চিত্রের জন্য মূল্যায়ন করা উচিত, তেমনি সাবেক উপদেষ্টাকে সরকারি প্রকল্পের প্রশ্নে নথি ও তদন্তের ভিত্তিতে বিচার করতে হবে। আর তিশাকে নিয়ে গুজবের ক্ষেত্রে—প্রমাণ ছাড়া ব্যক্তিগত জীবনকে জনতার বিচারসভায় তুলে দেওয়া উচিত নয়। তবে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার ভূমিকা কতটা প্রাসঙ্গিক তা ইতিহাস মূল্যায়ন করবে। ইতিহাস কোনো ভুল ধ্বংস যজ্ঞের পক্ষে কখনো অবস্থান নিতে দেখিনি। ফারুকীর কি নির্মান করেছেন রাজনীতিতে এসে তা পরিচিত মানুষ হিসেবে আমারও দেখার খুব ইচ্ছে।তবে তার পাকিস্তান তথা স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে বিতর্কিত বিভিন্ন মন্তব্য এবং সাংবাদিকদের প্রতি কঠোর নির্মমতা এক অন্য ফারুকীকে চোখের সামনে টেনে এনেছে।
যা জানা / যা এখনো স্পষ্ট নয়
যা জানা:
ফারুকী ২০২৪ সালের নভেম্বরে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা হন; তাঁর নিয়োগের সময় থেকেই সমালোচনা ছিল।
গণভবন জাদুঘর প্রকল্পের সরাসরি ক্রয়পদ্ধতি নিয়ে টিআইবি প্রশ্ন তুলেছিল; ২০২৬ সালের আগস্টে সংস্কৃতিমন্ত্রী নির্দিষ্ট অভিযোগ তদন্তের কথা জানান।
ফারুকী অভিযোগের জবাব দিয়েছেন; তাঁর বক্তব্যকে তদন্তের চূড়ান্ত ফল হিসেবে দেখা যাবে না।
রিউমর স্ক্যানার ফারুকী-তিশার বিচ্ছেদের সাম্প্রতিক দাবিকে মিথ্যা বলেছে।
যা এখনো স্পষ্ট নয়:
জাদুঘর প্রকল্পের সব অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত তদন্ত বা আদালতের সিদ্ধান্ত কী।
কানাডায় বাড়ি কেনার দাবির পক্ষে কোনো প্রামাণ্য নথি আছে কি না; নির্ভরযোগ্য প্রকাশ্য সূত্রে তা নিশ্চিত করা যায়নি।
“জনপ্রিয়তা কমেছে” দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য জনমত জরিপ আছে কি না; আমি এমন জরিপ পাইনি।
সূত্র ও যাচাই-নোট
এই কলামে পাঠকের দেওয়া যুগান্তর, সময়ের আলো ও প্রথম আলোর প্রতিবেদন, পাশাপাশি দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ডেইলি স্টার, টিআইবি, দ্য ডিসেন্ট ও রিউমর স্ক্যানারের প্রতিবেদন মিলিয়ে দেখা হয়েছে। প্রকল্প নিয়ে প্রকাশিত অভিযোগকে অভিযোগ হিসেবেই উপস্থাপন করা হয়েছে; তদন্ত বা আদালতের সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়। লেখকের Dream Unlimited-সংক্রান্ত স্মৃতি ব্যক্তিগত বর্ণনা।
#মোস্তফা_সরয়ার_ফারুকী #নুসরাত_ইমরোজ_তিশা #বাংলাদেশি_সিনেমা #গণভবন #জুলাই_স্মৃতি_জাদুঘর #তথ্যযাচাই #সবিনয়_নিবেদন
সরাসরি সূত্র
সবিনয় নিবেদন
➖➖➖➖➖➖
মাহবুব আহমেদ | সম্পাদক, সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।