কক্সবাজার ইনানীর রিসোর্টে ১০ মৃত্যু: জুনে ঝুঁকির নোটিশ, মেরিন ড্রাইভে ২৫০ স্থাপনার অনুমোদন প্রশ্নে

কক্সবাজারের ইনানীতে টুপটুপ রিসোর্টের আগুনে নিহত ১০ জনের মধ্যে ছয়জন একই পরিবারের। নতুন এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, মেরিন ড্রাইভের প্রায় ২৫০টি স্থাপনার প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিয়ে ঘাটতি রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের ভাষ্য অনুযায়ী, পুড়ে যাওয়া রিসোর্টটিকে জুনে ঝুঁকিপূর্ণ বলে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল—তবু সেটি চালু ছিল।
শনিবার সকালে কক্সবাজারের ইনানীতে একটি কাঠের রিসোর্টে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর ছয় স্বজনকে হারিয়ে বেঁচে ফিরেছেন ঢাকার আশিকুল ইসলাম। তিনি দোতলা থেকে লাফ দিয়ে প্রাণে রক্ষা পান। আগুনে মোট ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু এই শোকাবহ ঘটনার সঙ্গে দ্রুতই সামনে এসেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন: পর্যটন এলাকার আবাসনস্থলে অগ্নিনিরাপত্তা ও অনুমোদনের নিয়ম কাগজে থাকলেও, সেগুলোর বাস্তব প্রয়োগ কতটা হচ্ছে?
দিনের শেষ ভাগে প্রকাশিত দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কক্সবাজার–টেকনাফ মেরিন ড্রাইভের পাশে থাকা প্রায় ২৫০টি স্থাপনার অনুমোদন বা ছাড়পত্র নিয়ে ঘাটতি রয়েছে। প্রতিবেদনে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ফায়ার সার্ভিস ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ভিত্তিতে এই চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এটি প্রাথমিকভাবে জানা এক গুরুত্বপূর্ণ পরিসংখ্যান; তবে স্থাপনাগুলোর পূর্ণ তালিকা, কোনটির কোন অনুমোদন নেই এবং সেগুলোর বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসবের বিস্তারিত তালিকা প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়নি।
জুনে সতর্কবার্তা, তবু চালু ছিল রিসোর্ট
ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে ১৭ অক্টোবর সকালে। ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদের বক্তব্য উদ্ধৃত করে দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, ফায়ার সার্ভিসের এক পরিদর্শক গত জুনে রিসোর্টটি পরিদর্শন করেন এবং ১১ জুন সেটিকে “ঝুঁকিপূর্ণ” বলে নোটিশ দেন। মহাপরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছিল না এবং সতর্কবার্তার পরও সেটি চালু রাখা হয়েছিল।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা আরও বলেছেন, সেখানে অগ্নিনির্বাপক যন্ত্র, অগ্নিসংকেতব্যবস্থা ও অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা ছিল না। সমুদ্রের পাশের বাতাস আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহায়তা করেছে বলে তাঁদের ধারণা। তবে আগুনের সুনির্দিষ্ট উৎস এখনো তদন্তাধীন। জেলা প্রশাসক রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিক ধারণার কথা বলেছেন; এটিকে নিশ্চিত কারণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছিল—এটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। কিন্তু সতর্কবার্তার পর ব্যবসা চালু থাকলে, নোটিশের পরবর্তী ধাপ কী ছিল, কে তার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করেছে এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন না পাওয়া পর্যন্ত কার্যক্রম বন্ধের ক্ষমতা কার ছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। টুপটুপ রিসোর্টের ব্যবস্থাপনার বক্তব্যও পর্যালোচিত প্রতিবেদনগুলোতে পাওয়া যায়নি। পুলিশ ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে বলে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানিয়েছে; আটক হওয়া নিজে কোনো অপরাধ প্রমাণ করে না।
২৫০ স্থাপনার অনুমোদন-ঘাটতি: স্থানীয় সংকেত, পূর্ণ হিসাব নয়
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রায় ৮০ কিলোমিটার দীর্ঘ মেরিন ড্রাইভের পাশে নানা ধরনের এক হাজারের বেশি স্থাপনা রয়েছে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের ভাষ্য, প্রায় ২৫০টি স্থাপনার কাগজপত্র বা নিয়ম মানার ঘাটতি শনাক্ত করে নোটিশ দেওয়া হয়েছে; পরিদর্শন এখনো চলছে। ফায়ার সার্ভিসের স্থানীয় এক কর্মকর্তার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০টির বেশি স্থাপনাকে ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স না থাকায় সতর্ক করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের কক্সবাজার কার্যালয়ের এক কর্মকর্তাও মেরিন ড্রাইভের প্রায় ২৫০টি স্থাপনার পরিবেশগত ছাড়পত্র না থাকার কথা বলেছেন।
এই সংখ্যাগুলোকে একই অর্থে নেওয়া ঠিক হবে না। প্রতিবেদনে তিনটি দপ্তরের পৃথক অনুমোদন-সংক্রান্ত বক্তব্য এসেছে; কিন্তু ২৫০টি স্থাপনার সবগুলোর ক্ষেত্রেই যে একই তিন ধরনের ছাড়পত্র নেই, তা বলা হয়নি। কতগুলো স্থাপনা একাধিক তালিকায় রয়েছে, কতগুলোকে কেবল নোটিশ দেওয়া হয়েছে, আর কতগুলোর বিরুদ্ধে মামলা বা বন্ধের ব্যবস্থা হয়েছে—সেই বিশদ তথ্যও প্রকাশিত হয়নি।
তারপরও তথ্যটি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, একটি রিসোর্টে প্রাণঘাতী আগুনের পর সমস্যাটি কেবল একটি ভবনের নিরাপত্তায় সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে—নিয়মিত পরিদর্শন, নোটিশের পর ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন দপ্তরের সমন্বয়ও তদন্তের আওতায় আসা দরকার। স্থানীয় নাগরিক আন্দোলনের এক প্রতিনিধিও পর্যটকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জবাবদিহির দাবি জানিয়েছেন।
একটি পরিবারের ছয় মৃত্যু
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও প্রথম আলোর পৃথক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আশিকুল ইসলামের পরিবারের ছয় সদস্য আগুনে মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাঁর স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা এবং স্ত্রীর বোন লায়লা জাহান নাবিলা। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে যাওয়া আশিকুল দোতলা থেকে লাফিয়ে বেঁচে যান। পরিবারটির সেদিন সকালেই ঢাকায় ফেরার কথা ছিল বলে সংবাদমাধ্যমকে জানান তিনি।
প্রথম আলোর প্রতিবেদনে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তার বরাতে ছয়জন নিহতের পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। দিনের পরের এক প্রতিবেদনে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড সাতজনের পরিচয় শনাক্ত হওয়ার কথা জানিয়েছে; বাকি তিনজনের পরিচয় ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করার কথা ছিল। নিহতের সংখ্যা ১০ হলেও পরিচয় শনাক্তের সংখ্যা সময়ের সঙ্গে বদলেছে—তাই পুরোনো ও পরবর্তী প্রতিবেদনের তালিকায় পার্থক্য দেখা যায়।
উদ্ধারকাজের সময় ও আহতের সংখ্যা নিয়ে অমিল
আগুনের খবর কখন পৌঁছায় এবং কখন তা পুরোপুরি নেভে—এ নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে সময়ের পার্থক্য রয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের চট্টগ্রাম বিভাগের উপপরিচালকের বক্তব্য উদ্ধৃত করে প্রথম আলো জানিয়েছে, সকাল ৭টা ২৩ মিনিটে খবর আসে এবং ৮টা ১৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। দ্য ডেইলি স্টার ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের পরবর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুন পুরোপুরি নেভানো হয় সকাল ১১টার দিকে। “নিয়ন্ত্রণে আনা” এবং “পুরোপুরি নেভানো” আলাদা পর্যায় হতে পারে; তবু কর্তৃপক্ষের একটি একীভূত সময়রেখা প্রকাশ করলে বিষয়টি পরিষ্কার হবে।
আহতের সংখ্যাতেও অমিল আছে। প্রথম আলো ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদনে ছয়জনের হাসপাতালে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে; অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে চারজন আহতের কথা এসেছে। পরে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, আহত ছয়জনের মধ্যে পাঁচজনের শরীরে প্রায় পাঁচ শতাংশ দগ্ধ হওয়ার চিহ্ন ছিল এবং একজন পড়ে গিয়ে আহত হয়েছিলেন; তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেওয়া হয়। বিভিন্ন প্রতিবেদনের সময় ও তথ্যসূত্রের পার্থক্য এ অমিলের কারণ হতে পারে, তবে এই মুহূর্তে একটিমাত্র চূড়ান্ত সংখ্যা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
তদন্তে শুধু আগুনের উৎস নয়, তদারকিও জরুরি
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছেন। আগুনের কারণ নির্ধারণের পাশাপাশি তদন্তে কয়েকটি প্রশ্নের জবাব জরুরি: জুনের ১১ তারিখে দেওয়া নোটিশের কপি ও শর্ত কী ছিল; রিসোর্ট চালু রাখার অনুমতি বা অন্য কোনো লাইসেন্স ছিল কি না; বের হওয়ার নিরাপদ পথ ও অগ্নিনিরাপত্তা সরঞ্জাম কেন ছিল না; এবং সতর্কবার্তার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো কী পদক্ষেপ নিয়েছিল?
কক্সবাজারের মতো পর্যটন এলাকায় ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও দর্শনার্থীর নিরাপত্তা একই বাস্তবতার অংশ। কিন্তু পর্যটন বাড়ানোর দায় নিরাপত্তার ন্যূনতম শর্ত শিথিল করার অনুমতি দেয় না। মেরিন ড্রাইভের ২৫০ স্থাপনার তথ্য যদি সঠিক ও তুলনাযোগ্য হয়, তবে তা কেবল নোটিশ জারির বিষয় নয়—কোন কর্তৃপক্ষ কী সময়সীমায় কী ব্যবস্থা নিয়েছে, তার নথিভিত্তিক জবাবদিহির বিষয়ও।
যা জানা, যা এখনো অস্পষ্ট
যা জানা গেছে
১৭ অক্টোবর সকালে ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে আগুন লাগে; ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিসের তথ্য সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
আশিকুল ইসলামের পরিবারের ছয়জন নিহত হন; আশিকুল লাফ দিয়ে বেঁচে যান।
ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের ভাষ্য অনুযায়ী, রিসোর্টটির ফায়ার সেফটি লাইসেন্স ছিল না; জুনে ঝুঁকির নোটিশ দেওয়া হয়েছিল।
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের পরবর্তী প্রতিবেদনে মেরিন ড্রাইভের প্রায় ২৫০টি স্থাপনার অনুমোদন-ঘাটতির কথা এসেছে।
জেলা প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি করেছে।
যা এখনো স্পষ্ট নয়
আগুনের নিশ্চিত উৎস ও সুনির্দিষ্ট কারণ।
জুনের নোটিশের পর রিসোর্টের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
মেরিন ড্রাইভের ২৫০ স্থাপনার তালিকা, প্রতিটি ক্ষেত্রে কোন অনুমোদন অনুপস্থিত এবং কতগুলো স্থাপনা একাধিক দপ্তরের তালিকায় আছে।
উদ্ধারকাজে আহতের চূড়ান্ত সংখ্যা এবং সময়ের ভিন্নতার ব্যাখ্যা।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রকাশের সময়সীমা এবং রিসোর্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য।
#কক্সবাজার #ইনানী #রিসোর্টে_আগুন #অগ্নিনিরাপত্তা #মেরিনড্রাইভ #জবাবদিহি #বাংলাদেশ #TourismSafety




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।