গুগলের ২৮তম জন্মদিন: সার্চ থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

কোনো শহরে নতুন, কোনো শব্দের অর্থ জানতে হবে, কিংবা বহুদিনের অমীমাংসিত একটি প্রশ্ন মনে এসেছে—আমাদের অনেকের হাত চলে যায় একই সাদা পৃষ্ঠায়। একটি বাক্সে কয়েকটি শব্দ লিখলে খুলে যায় ওয়েবপেজ, ছবি, মানচিত্র, ভিডিও, সংবাদ আর বিজ্ঞাপনের স্তর। গুগলের সাফল্য শুধু তথ্য খুঁজে দেওয়ায় নয়; কী আগে দেখা যাবে, কোন সূত্র চোখে পড়বে, আর কোনটি আড়ালে থাকবে—সেই অভিজ্ঞতাটিও এটি গড়ে তুলেছে।
২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ গুগল তার ২৮তম জন্মদিন পালন করছে। তবে কোম্পানিটির প্রতিষ্ঠার তারিখ ও জন্মদিন উদ্যাপনের দিন এক নয়। গুগলের নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, Google Inc. ১৯৯৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নিবন্ধিত হয়েছিল; কিন্তু এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি ২৭ সেপ্টেম্বরকে জন্মদিন হিসেবে পালন করে আসছে। সেই হিসাবে আজকের দিনটি উদ্যাপনের দিন—নিবন্ধনের বার্ষিকী নয়।
লিংক গুনে ওয়েবকে পড়ার চেষ্টা
গুগলের শুরু ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি, স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায়। ল্যারি পেজ ও সের্গেই ব্রিনের প্রকল্পটির নাম ছিল BackRub। তখনকার সার্চ ইঞ্জিনগুলো ওয়েবপেজের ভেতরের শব্দ মিলিয়ে ফল সাজাত। পেজ ও ব্রিন ভাবলেন, একটি পেজের গুরুত্ব বোঝার আরেকটি উপায় হতে পারে—অন্য পেজগুলো সেটিকে কতবার এবং কীভাবে উল্লেখ করছে।
তাদের ১৯৯৮ সালের গবেষণাপত্রে Google-কে এমন একটি সার্চ ইঞ্জিন হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যা ওয়েবের লিংক-সংযোগকে গুরুত্ব দেয়। পরে PageRank নামে পরিচিত এই পদ্ধতিতে একটি পেজের মূল্যায়নে তার দিকে আসা লিংকের সংখ্যা ও উৎসের গুরুত্ব বিবেচিত হতো। এক অর্থে, এটি ছিল ওয়েবের ভেতরকার উদ্ধৃতি-সম্পর্ক পড়ার চেষ্টা। গুগলের বর্তমান নথিও বলছে, PageRank-এর রূপ বদলেছে, কিন্তু এটি এখনো তাদের র্যাঙ্কিং ব্যবস্থার অংশ।
গুগল নামটির সঙ্গে “googol”—এক-এর পরে ১০০টি শূন্য—এর সম্পর্ক প্রতিষ্ঠাতাদের গবেষণাপত্রেই উল্লেখ আছে। ছবিতে প্রচলিত “বানান ভুল থেকে নাম” কাহিনি থাকলেও, প্রতিষ্ঠাতাদের নিজেদের ভাষ্য অনুসারে নামটি বিশাল তথ্যভাণ্ডারের ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিল।
শুরুর আরেকটি বহুল আলোচিত ঘটনা হলো এক লাখ ডলারের চেক। স্ট্যানফোর্ডের একটি স্মৃতিচারণ অনুযায়ী, Sun Microsystems-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা অ্যান্ডি বেকটলশাইম গুগলের প্রতিষ্ঠাতাদের ব্যবসায়িক পরিকল্পনা শুনে নিজের চেক লিখেছিলেন—“Google Inc.”-এর নামে, যদিও তখন কোম্পানিটি আইনগতভাবে নিবন্ধিতই হয়নি। এটি Sun Microsystems-এর কোম্পানি-তহবিল থেকে দেওয়া অনুদান ছিল না; ছিল বেকটলশাইমের বিনিয়োগ।
অনুসন্ধানের পাশে বিজ্ঞাপনের ব্যবসা
গুগলের ইতিহাসে অনুসন্ধান ও বিজ্ঞাপন পাশাপাশি এগিয়েছে। ২০০০ সালে চালু হওয়া AdWords বিজ্ঞাপনদাতাদের নির্দিষ্ট শব্দের সঙ্গে যুক্ত টেক্সট বিজ্ঞাপন দেখানোর সুযোগ দেয়। ব্যবহারকারী কিছু খুঁজলে ফলাফলের সঙ্গে বিজ্ঞাপনও দেখতে পান—গুগলের ব্যবসায়িক মডেল এই সংযোগকে বড় পরিসরে নিয়ে যায়। ২০০৪ সালের শেয়ারবাজারে প্রবেশের নথিতেও কোম্পানি প্রতি-ক্লিকে বিজ্ঞাপনের আয়ের কথা ব্যাখ্যা করেছিল।
এরপর গুগল আর শুধু সার্চ কোম্পানি থাকেনি। Gmail ইমেইলকে বড় স্টোরেজ ও সার্চের সঙ্গে যুক্ত করল; Maps ও পরে Android মানুষকে মোবাইলের পর্দায় তথ্য, পথনির্দেশ ও যোগাযোগের সেবা দিল; YouTube ভিডিও দেখার অভ্যাস বদলে দিল; Chrome ওয়েব ব্রাউজিংয়ে গুগলের উপস্থিতি বাড়াল। Android-কে গুগল অধিগ্রহণ করে ২০০৫ সালে; প্রথম Android ফোন বাজারে আসে ২০০৮ সালে। ২০১৫ সালে Google-কে মূল কোম্পানি Alphabet-এর অধীনে পুনর্গঠন করা হয়।
এই বিস্তার ব্যবহারকারীর জন্য বাস্তব সুবিধা তৈরি করেছে। একটি অ্যাকাউন্টে ইমেইল, ছবি, ভিডিও, দিকনির্দেশ ও নথি পাওয়া যায়। বাংলা ভাষাভাষীরাও বানান, উচ্চারণ বা ইংরেজি শব্দ মনে না থাকলেও নানা উপায়ে অনুসন্ধান করতে পারেন; অনুবাদ ও কণ্ঠ-অনুসন্ধান ভাষাগত বাধা কিছুটা কমায়। তবে সুবিধার এই জাল যত বিস্তৃত হয়েছে, একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীলতাও তত বেড়েছে।
ফলাফলের ক্রমও এক ধরনের ক্ষমতা
সার্চ ইঞ্জিন ওয়েবের সবকিছু সমানভাবে সামনে আনে না। কোন ফল আগে থাকবে, কোনটি নিচে নামবে—এ সিদ্ধান্তে র্যাঙ্কিং ব্যবস্থা, ব্যবহারকারীর প্রশ্ন, পৃষ্ঠার বিষয়বস্তু, লিংক এবং আরও নানা সংকেত কাজ করে। গুগল জানায়, তার সিস্টেম শত শত বিলিয়ন ওয়েবপেজ ও অন্যান্য ডিজিটাল কনটেন্ট থেকে ফল বেছে নেয়। এই প্রক্রিয়ায় সার্চ দ্রুত ও ব্যবহারযোগ্য হয়; একই সঙ্গে গুগলের সিদ্ধান্ত সংবাদমাধ্যম, ব্যবসা, লেখক ও ছোট ওয়েবসাইটের পাঠকপ্রাপ্তিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
এই প্রভাবই মার্কিন সরকারের সঙ্গে গুগলের দীর্ঘ অ্যান্টিট্রাস্ট মামলার কেন্দ্রে। ২০২৪ সালের আগস্টে ওয়াশিংটনের ফেডারেল আদালত রায় দেয়, সাধারণ সার্চ ও সার্চ-টেক্সট বিজ্ঞাপনের বাজারে গুগল একচেটিয়া ক্ষমতা বজায় রাখতে আইনবিরোধী আচরণ করেছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে আদালত নির্দিষ্ট একচেটিয়া বিতরণ চুক্তি নিষিদ্ধ করে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্য কিছু সার্চ-ডেটা ও বিজ্ঞাপন-সেবা উন্মুক্ত করার নির্দেশ দেয়। আদালত গুগলকে ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেয়নি। গুগল রায়ের সঙ্গে দ্বিমত জানিয়ে আপিলের কথা বলেছে।
AI উত্তর দিলে ওয়েবসাইটে কে যাবে?
গুগলের সামনে এখন আরেকটি পরিবর্তন: সার্চ ফলের তালিকার পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি সংক্ষিপ্ত উত্তর। Gemini মডেল ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে পরিচয় করিয়ে দেয় গুগল। এরপর AI Overviews-এর মতো সুবিধা সার্চের ভেতরেই প্রশ্নের সারাংশ দিতে শুরু করে। ব্যবহারকারী দ্রুত উত্তর পেতে পারেন; কিন্তু উত্তরের পেছনে থাকা সংবাদমাধ্যম বা ওয়েবসাইটে ক্লিক করার প্রয়োজন কমে যেতে পারে।
এই প্রভাবের মাপ নিয়ে এখনো মতভেদ আছে। Reuters Institute-এর ২০২৬ সালের প্রতিবেদনে Chartbeat-এর ২,৫০০টির বেশি সাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের নভেম্বরের মধ্যে গুগল সার্চ থেকে আসা অর্গানিক ট্রাফিক বিশ্বজুড়ে ৩৩ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রে ৩৮ শতাংশ কমেছে। প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে বলেছে, এই পতনের কতটা AI Overviews-এর কারণে—তা নিশ্চিত নয়। অন্যদিকে গুগলের সার্চ বিভাগের প্রধান ২০২৫ সালের আগস্টে বলেন, তাদের হিসাব অনুযায়ী সার্চ থেকে ওয়েবসাইটে মোট অর্গানিক ক্লিক বছরওয়ারি মোটামুটি স্থিতিশীল ছিল। এই দুই হিসাবের সময়সীমা ও পদ্ধতি এক নয়; তাই একটিকে অন্যটির সরাসরি খণ্ডন হিসেবে পড়া ঠিক হবে না।
এখানে গুগলের জন্মদিনের প্রশ্নটি আর শুধু প্রযুক্তির স্মৃতিচারণে আটকে থাকে না। যে প্রতিষ্ঠান মানুষকে ওয়েবের দরজা পর্যন্ত নিয়ে এসেছিল, সে-ই এখন দরজার ভেতরে দাঁড়িয়ে উত্তরও দিতে চাইছে। উত্তরটি যদি যথেষ্ট মনে হয়, মূল প্রতিবেদন, স্থানীয় সংবাদ বা বিশেষজ্ঞের লেখা হয়তো আর পড়া হবে না। আবার ভালো উত্তর পাঠককে আরও নির্ভরযোগ্য উৎসের দিকে নিয়ে যেতে পারে—গুগল এই যুক্তিই দেয়। কোনটি ঘটছে, তা খাতভেদে ও সাইটভেদে আলাদা হতে পারে।
গুগলের ২৮ বছরে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হয়তো সার্চের গতি নয়; মানুষের তথ্য পাওয়ার অভ্যাস এবং সেই অভ্যাসের ওপর গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা। এখন চ্যালেঞ্জ হলো, মেশিন যখন শুধু খুঁজে দেয় না, সারাংশও বানায়—তখন তথ্যের উৎস, লেখকের শ্রম ও পাঠকের আস্থা কীভাবে দৃশ্যমান থাকবে। গুগলের জন্মদিনে সেই প্রশ্নটিও উদ্যাপনের অংশ হওয়া উচিত।
কী নিশ্চিত, কী এখনো প্রশ্ন
যা নিশ্চিত: Google Inc. ১৯৯৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর নিবন্ধিত হয়েছিল; গুগল ২৭ সেপ্টেম্বরকে জন্মদিন হিসেবে পালন করে। PageRank গুগলের শুরুর র্যাঙ্কিং ধারণাগুলোর একটি এবং এখনও র্যাঙ্কিং ব্যবস্থার অংশ। ২০২৪ সালে মার্কিন আদালত সার্চ বাজারে গুগলের একচেটিয়া আচরণ নিয়ে রায় দেয়; ২০২৫ সালে প্রতিকারমূলক আদেশ আসে।
যা এখনো স্পষ্ট নয়: প্রকাশকদের সার্চ-ট্রাফিক কমার কতটা AI Overviews-এর কারণে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত একক পরিমাপ নেই। Reuters Institute/Chartbeat-এর একাধিক সাইটের সমষ্টিগত তথ্য এবং গুগলের নিজস্ব মোট ক্লিকের হিসাব আলাদা পদ্ধতি ব্যবহার করে।
সূত্র ও যাচাই নোট
প্রতিষ্ঠার তারিখ ও জন্মদিনের পার্থক্য গুগলের নিজস্ব ইতিহাস এবং ২০২৫ সালের জন্মদিনের Doodle-এ মিলিয়ে দেখা হয়েছে। BackRub ও PageRank-এর প্রাথমিক ধারণা প্রতিষ্ঠাতাদের গবেষণাপত্র এবং গুগলের সার্চ-র্যাঙ্কিং নথির সঙ্গে মিলিয়ে লেখা হয়েছে। এক লাখ ডলারের চেকের তথ্য স্ট্যানফোর্ডের প্রতিবেদন থেকে নেওয়া। অ্যান্টিট্রাস্ট অংশে মার্কিন বিচার বিভাগের মামলা-সংক্রান্ত নথি এবং গুগলের নিজস্ব প্রতিক্রিয়া দেখা হয়েছে। প্রকাশক-ট্রাফিকের অংশে Reuters Institute/Chartbeat-এর সমষ্টিগত তথ্যের সীমাবদ্ধতা এবং গুগলের নিজস্ব পাল্টা হিসাব—দুটিই রাখা হয়েছে। সময়-সংবেদনশীল তথ্য ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত যাচাই করা হয়েছে।
সরাসরি সূত্র
Stanford paper: The Anatomy of a Large-Scale Hypertextual Web Search Engine
Stanford Engineering: Andy Bechtolsheim and Google’s early investment
Google Search Central: A guide to Google Search ranking systems
Google: Our remedies proposal in DOJ’s search distribution case
Reuters Institute: Journalism, media, and technology trends and predictions 2026
Google: AI in Search is driving more queries and higher quality clicks
#Google #GoogleBirthday #GoogleHistory #SearchEngine #GeminiAI #DigitalJournalism #ArtificialIntelligence
মাহবুব আহমেদ | বাংলাদেশি-আমেরিকান উদ্যোক্তা, কলাম লেখক,লেখক, সম্পাদক ও নাগরিক অধিকারকর্মী।




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।