ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত: যুদ্ধের দাবার ছকে কারা জিতছে, কারা হারছে?

যুদ্ধের দাবার ছক: ইরান–যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের আড়ালে ক্ষমতার খেলা, তেলের রাজনীতি এবং মানবতার পরাজয়
বিশ্লেষণ করেছেন মাহবুব আহমেদ। কভার স্টোরি । সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি
দূর থেকে দেখলে এটি যেন একটি দাবার খেলা।
একপাশে একটি পরাশক্তি। অন্য পাশে আরেকটি আঞ্চলিক শক্তি। বোর্ডের ওপর সাজানো আছে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন, যুদ্ধবিমান, নিষেধাজ্ঞা, সাইবার হামলা, প্রক্সি মিলিশিয়া এবং কূটনৈতিক চাপ। কিন্তু দাবার এই বোর্ডের নিচে যারা চাপা পড়ে আছে, তারা কোনো গুটি নয়। তারা মানুষ।
তারা বাবা, মা, শিশু, ছাত্র, শ্রমিক, চিকিৎসক, শিক্ষক।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার দীর্ঘ সংঘাতকে অনেকেই সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা হিসেবে দেখেন। কিন্তু বাস্তবে এটি শুধু দুটি রাষ্ট্রের দ্বন্দ্ব নয়। এটি আধুনিক বিশ্বের ক্ষমতার বিন্যাস, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক আধিপত্য, ধর্মীয় রাজনীতি, অস্ত্র ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির এক জটিল কাহিনি।
এই কাহিনির সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো—যারা সিদ্ধান্ত নেয়, তারা সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্রে থাকে না; আর যারা যুদ্ধক্ষেত্রে থাকে, তারা সাধারণত সিদ্ধান্ত নেয় না।
শত্রুতার শিকড় কত গভীরে?
১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবকে অনেকে এই বৈরিতার সূচনা হিসেবে দেখেন। কিন্তু ইতিহাস আরও পুরোনো।
১৯৫৩ সালে ইরানের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করতে পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার ভূমিকার অভিযোগ আজও মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক স্মৃতিতে জীবন্ত।
সেই ঘটনার পর থেকেই ইরানের বহু রাজনৈতিক চিন্তাবিদ যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু একটি দেশ হিসেবে নয়, বরং একটি হস্তক্ষেপকারী শক্তি হিসেবে দেখতে শুরু করেন।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছে ইরান দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি রাষ্ট্র, যা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্বার্থ, ইসরায়েলের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতার জন্য চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।
ফলে দুই দেশের সম্পর্ক কখনোই কেবল কূটনীতির বিষয় ছিল না। এটি ছিল পারস্পরিক অবিশ্বাসের ইতিহাস।
যুদ্ধ কি সত্যিই আদর্শের জন্য?
প্রশ্নটি অস্বস্তিকর।
কারণ ইতিহাস বলে, অধিকাংশ যুদ্ধ আদর্শের ভাষায় শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত তা শক্তি ও স্বার্থের সমীকরণে গিয়ে দাঁড়ায়।
মধ্যপ্রাচ্য পৃথিবীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অঞ্চল।
হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়। এই রুটে অস্থিরতা মানেই বৈশ্বিক বাজারে ধাক্কা।
ফলে ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা শুধু তেহরান ও ওয়াশিংটনের বিষয় নয়; এটি লন্ডন, বেইজিং, মস্কো, রিয়াদ, টোকিও এবং ঢাকা পর্যন্ত প্রভাব ফেলে।
অনেক সমালোচকের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিকে বোঝার জন্য আদর্শের চেয়ে জ্বালানি, বাণিজ্য এবং কৌশলগত অবস্থানকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তবে এই ব্যাখ্যারও সীমাবদ্ধতা আছে।
কারণ ইরানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে বিষয়টি কেবল ভূ-রাজনীতি নয়; এটি বিপ্লবী আদর্শ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং বিদেশি প্রভাবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রশ্নও।
যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি কী?
ওয়াশিংটনের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরে মোটামুটি একই।
তাদের মতে, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রক্সি নেটওয়ার্ক এবং পারমাণবিক কর্মসূচি মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি।
মার্কিন প্রশাসনগুলো যুক্তি দেয়, ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা না গেলে অঞ্চলটি আরও অস্থিতিশীল হবে।
এই অবস্থানকে সমর্থন করেন অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক।
তাদের মতে, কূটনৈতিক চাপ, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং সামরিক প্রতিরোধ ছাড়া ইরানের প্রভাব মোকাবিলা করা কঠিন।
ইরানের পাল্টা বক্তব্য
তেহরানের বক্তব্য ভিন্ন।
তারা বলে, যুক্তরাষ্ট্র বহু দশক ধরে মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখে অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করেছে।
ইরানি নেতারা প্রায়ই প্রশ্ন তোলেন—হাজার হাজার মাইল দূরের একটি দেশ কেন মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা নির্ধারণ করবে?
ইরানের মতে, তাদের প্রতিরক্ষা কর্মসূচি মূলত আত্মরক্ষামূলক।
তাদের যুক্তি হলো, বিদেশি সামরিক ঘাঁটি এবং শত্রুভাবাপন্ন জোট দ্বারা পরিবেষ্টিত অবস্থায় শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়া টিকে থাকা সম্ভব নয়।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় ব্যবসা
বিখ্যাত মার্কিন সেনা কর্মকর্তা ও রাষ্ট্রপতি ডুইট আইজেনহাওয়ার ১৯৬১ সালে তার বিদায়ী ভাষণে একটি শব্দ ব্যবহার করেছিলেন—Military-Industrial Complex।
তিনি সতর্ক করেছিলেন, সামরিক শিল্প ও রাজনৈতিক ক্ষমতার অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
ছয় দশক পরও সেই সতর্কবার্তা প্রাসঙ্গিক।
যুদ্ধ যত বাড়ে, অস্ত্র বিক্রি তত বাড়ে।
মিসাইল, ড্রোন, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, নজরদারি প্রযুক্তি—সবকিছুর বাজার প্রসারিত হয়।
এ কারণে সমালোচকেরা বলেন, যুদ্ধ শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও অংশ।
অবশ্য অস্ত্র শিল্পের সমর্থকেরা পাল্টা যুক্তি দেন—নিরাপত্তা ছাড়া শান্তি সম্ভব নয়।
সাধারণ মানুষের যুদ্ধ
লিও টলস্টয়ের War and Peace উপন্যাসে যুদ্ধকে রাজাদের নয়, মানুষের গল্প হিসেবে দেখানো হয়েছে।
সেটিই আজও সত্য।
কোনো ক্ষেপণাস্ত্র যখন আকাশে উড়ে যায়, তখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম শিরোনাম বানায়।
কিন্তু একটি শিশুর স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়া, একটি পরিবারের ঘর হারানো, একজন চিকিৎসকের হাসপাতাল হারানো—এসব খবর খুব কমই ইতিহাসের বইয়ে জায়গা পায়।
জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বারবার বলা হয়েছে, আধুনিক সংঘাতের সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় বেসামরিক জনগণ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নতুন যুদ্ধক্ষেত্র
আজকের যুদ্ধ শুধু আকাশে নয়, অ্যালগরিদমেও হয়।
একটি ভিডিও, একটি ছবি, একটি হ্যাশট্যাগ—কখনো কখনো একটি ক্ষেপণাস্ত্রের চেয়েও বেশি রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে।
তথ্যযুদ্ধ, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা এবং ডিজিটাল প্রোপাগান্ডা এখন সামরিক কৌশলের অংশ।
ফলে সত্য খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
কে জিতবে?
এই প্রশ্নের উত্তর ইতিহাস বহুবার দিয়েছে।
যুদ্ধে কেউ পুরোপুরি জেতে না।
কেউ ভূখণ্ড পায়, কেউ রাজনৈতিক সুবিধা পায়, কেউ অর্থনৈতিক লাভ পায়।
কিন্তু মানবতা প্রায়ই হারায়।
ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে বিজয়ের পতাকা ওড়ানো সম্ভব, কিন্তু সেখানে শান্তি নির্মাণ করা অনেক কঠিন।
শেষ কথা: দাবার বোর্ডের নিচের মানুষগুলো
আমাদের কভারের ছবিতে দুই শক্তিধর খেলোয়াড় দাবা খেলছে।
তাদের চোখ বোর্ডে।
কিন্তু বোর্ডের নিচে আগুনে পুড়ছে মানুষ।
সম্ভবত এই দৃশ্যটিই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক রূপক।
কারণ ইতিহাসের প্রতিটি বড় সংঘাত শেষ পর্যন্ত একটি প্রশ্ন রেখে যায়—
রাষ্ট্র কি মানুষের জন্য, নাকি মানুষ রাষ্ট্রের খেলায় ব্যবহৃত একেকটি গুটি?
যতদিন এই প্রশ্নের উত্তর স্পষ্ট না হবে, ততদিন পৃথিবীর কোথাও না কোথাও দাবার বোর্ড সাজানো থাকবে, আর তার নিচে কেউ না কেউ আগুনের মধ্যে বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে।
#Iran #USA #IranUSConflict #MiddleEast #Geopolitics #WarAndPeace #GlobalPolitics #Editorial #CoverStory #PoliticalCartoon #InternationalNews #Humanity #WeeklyCalifornierChithi #California #WorldNews #Analysis #FeatureStory #Journalism #BanglaNews #MahbubAhmed




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।