জেফ্রি আর্চারের মৃত্যু: শেষ উপন্যাসের আগের দিন বিদায়

বেস্টসেলার লেখক ও সাবেক ব্রিটিশ রাজনীতিকের মৃত্যু হয়েছে ৫ অক্টোবর। তাঁর শেষ উপন্যাস Adam & Eve প্রকাশিত হওয়ার কথা ছিল পরদিন। সাহিত্যিক সাফল্যের পাশাপাশি তাঁর জীবন স্মরণে থাকবে মিথ্যা সাক্ষ্য ও ন্যায়বিচারে বাধা দেওয়ার অপরাধে কারাবাসের জন্যও।
➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖➖
একটি বইয়ের শেষ অধ্যায় লেখকের অনুপস্থিতিতেই পাঠকের হাতে পৌঁছাল। ব্রিটিশ লেখক ও সাবেক রাজনীতিক জেফ্রি আর্চার ৮৬ বছর বয়সে মারা গেছেন ৫ অক্টোবর—তাঁর শেষ উপন্যাস Adam & Eve প্রকাশের ঠিক আগের দিন। প্রকাশক হার্পারকলিন্স জানিয়েছে, তিনি বাড়িতে “হঠাৎ ও শান্তিপূর্ণভাবে” মারা যান; তখন তিনি লেখার কাজের মধ্যবর্তী সময়ে ছিলেন। মৃত্যুর কারণ প্রকাশ করা হয়নি।
মৃত্যুর আগের দিনও আর্চার লন্ডনের লেস্টার স্কয়ার থিয়েটারে পাঠকদের সঙ্গে দেখা করেছেন এবং বইয়ে স্বাক্ষর দিয়েছেন বলে রয়টার্স জানিয়েছে। যে লেখক পাঠককে শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত টেনে নেওয়ার কৌশলে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, তাঁর নিজের জীবনের এই ঘটনাক্রমেও যেন ছিল আকস্মিক এক বাঁক—তবে মৃত্যুর সময় ও বই প্রকাশের সময়ের এই কাকতালকে নাটকীয় করে তোলার চেয়ে তাঁর বহুমাত্রিক জীবনকে সম্পূর্ণভাবে দেখা জরুরি।
ঋণ থেকে বেস্টসেলার
১৯৪০ সালে লন্ডনে জন্ম নেওয়া আর্চার রাজনীতিতে প্রবেশ করেন তরুণ বয়সেই। ১৯৬৯ সালে তিনি কনজারভেটিভ পার্টির প্রার্থী হিসেবে লাউথ আসন থেকে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য নির্বাচিত হন। তবে এক ব্যর্থ বিনিয়োগের পর আর্থিক সংকটে পড়ে ১৯৭৪ সালে তিনি পুনর্নির্বাচনে দাঁড়াননি। পরে সেই সংকটই তাঁকে লেখালেখির দিকে ঠেলে দেয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস Not a Penny More, Not a Penny Less প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ সালে।
১৯৭৯ সালের Kane & Abel তাঁকে আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে পরিচিত করে। দুই ভিন্ন সামাজিক অবস্থানে জন্ম নেওয়া দুই পুরুষের জীবন ও প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে লেখা উপন্যাসটি আর্চারের বহুলপঠিত বইগুলোর একটি হয়ে ওঠে। তাঁর গল্পে দ্রুতগতি, পালাবদল, শ্রেণি ও উচ্চাকাঙ্ক্ষার সংঘাত এবং অধ্যায়ের শেষে নতুন প্রশ্ন রেখে যাওয়ার কৌশল বারবার ফিরে এসেছে। এই নির্মাণশৈলী তাঁকে সাহিত্যসমালোচকদের সর্বসম্মত প্রশংসা এনে না দিলেও বিপুল পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
হার্পারকলিন্সের হিসাবে, আর্চারের বই বিশ্বজুড়ে ৩০ কোটির বেশি কপি বিক্রি হয়েছে। প্রকাশকের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বই ১১৯টি দেশে এবং ৪৯টি ভাষায় প্রকাশিত হয়েছে। এগুলো প্রকাশক-প্রদত্ত বিক্রির হিসাব; স্বতন্ত্রভাবে নিরীক্ষিত বিক্রির সংখ্যা হিসেবে একে দেখা উচিত নয়।
জনজীবনের সাফল্য, আদালতের রায়
আর্চারের রাজনৈতিক জীবনও দীর্ঘ সময় ধরে কনজারভেটিভ পার্টির সঙ্গে যুক্ত ছিল। মার্গারেট থ্যাচারের আমলে তিনি দলের ডেপুটি চেয়ারম্যান হন। ১৯৯২ সালে প্রধানমন্ত্রী জন মেজর তাঁকে হাউস অব লর্ডসে লাইফ পিয়ার হিসেবে মনোনীত করেন। তবে রাজনীতিতে তাঁর প্রত্যাবর্তনের পথ থেমে যায় ১৯৯৯ সালে লন্ডনের মেয়র হওয়ার নির্বাচনী প্রচারের সময় পুরোনো এক মামলার ঘটনা নতুন করে সামনে এলে।
১৯৮৭ সালে Daily Star পত্রিকা আর্চারের বিরুদ্ধে এক যৌনকর্মীকে অর্থ দেওয়ার অভিযোগ প্রকাশ করেছিল। আর্চার পত্রিকাটির বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করে ক্ষতিপূরণ জিতেছিলেন। কিন্তু পরে আদালতে দেওয়া তাঁর সাক্ষ্য ও আলিবাই নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২০০১ সালে জুরিরা তাঁকে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া এবং ন্যায়বিচারে বাধা দেওয়ার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন। তাঁকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়; তিনি দুই বছরের কিছু বেশি সময় কারাভোগের পর ২০০৩ সালে মুক্তি পান। অভিযোগ ও দণ্ডের মধ্যে পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ: তাঁর সাজা হয়েছিল আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য ও বিচারপ্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়ার অপরাধে, মূল পত্রিকাগত অভিযোগের জন্য নয়।
কারাগারের অভিজ্ঞতা তিনি তিন খণ্ডের A Prison Diary সিরিজে লিখে প্রকাশ করেন। মুক্তির পর তিনি আবার হাউস অব লর্ডসে বসেন; ২০২৪ সালে অবসর নেওয়া পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নথিতে তাঁর লর্ডস-সদস্যপদের সময়সীমা ১৯৯২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত দেখানো হয়েছে।
এই প্রত্যাবর্তন তাঁর কাহিনিকে সহজ “পতন ও পুনরুত্থান”-এর ছকে আটকে রাখে না। তাঁর বইয়ের বিপুল পাঠকপ্রিয়তা যেমন বাস্তব, তেমনি আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়াও তাঁর জনজীবনের স্থায়ী অংশ। সাহিত্যিক সাফল্য অপরাধের দায় মুছে দেয় না; আবার অপরাধের রায়ও তাঁর বইয়ের পাঠক-অভিজ্ঞতা বা সাংস্কৃতিক প্রভাবকে অস্বীকার করে না। আর্চারের উত্তরাধিকার তাই একই সঙ্গে জনপ্রিয় লেখকের এবং গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত রাজনীতিকের।
শেষ উপন্যাসের কাহিনি ও প্রকাশ
Adam & Eve ৬ অক্টোবর প্রকাশের জন্য নির্ধারিত ছিল। আর্চারের নিজস্ব ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপন্যাসের দুই প্রধান চরিত্রের জন্ম ১১ নভেম্বর ১৯১৮—প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যুদ্ধবিরতির দিনে। একজন অভিজাত পরিবারের মেয়ে, অন্যজন একই এস্টেটে কাজ করা রাখালের ছেলে। কাহিনির পরের অংশে ১৯৪০ সালের ব্রিটেনের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট এবং হিটলারের সিদ্ধান্ত নিয়ে একটি কাল্পনিক সম্ভাবনা যুক্ত হয়েছে। ঐতিহাসিক সময় ও যুদ্ধ বাস্তব; চরিত্র ও বিকল্প ঘটনাপ্রবাহ উপন্যাসের কল্পনা।
প্রকাশের আগে আর্চার জানিয়েছিলেন, পাঁচ দশকের লেখালেখির পর এটিই তাঁর শেষ পূর্ণদৈর্ঘ্য উপন্যাস হবে। তাঁর ওয়েবসাইটে অবশ্য বলা হয়েছে, ছোটগল্প, চিত্রনাট্য বা অন্য ধরনের লেখালেখি চালিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তিনি খোলা রেখেছিলেন। তাই Adam & Eve ছিল তাঁর ঘোষিত শেষ উপন্যাস—সব ধরনের লেখার অবসান নয়।
বইটি প্রকাশিত হলো লেখকের মৃত্যুর পর। পাঠকের কাছে সেটি এখন একই সঙ্গে একটি নতুন উপন্যাস এবং দীর্ঘ বেস্টসেলার-জীবনের সমাপ্তি। কিন্তু আর্চারকে স্মরণ করতে গেলে শেষ বইয়ের প্রকাশ-তারিখের কাকতালই যথেষ্ট নয়: তাঁর গল্পের বিপুল জনপ্রিয়তা, রাজনীতিতে উত্থান, আদালতে দণ্ড এবং জনজীবনে ফিরে আসার ইতিহাস—সব মিলিয়েই তৈরি হয় তাঁর প্রকৃত, অসমাপ্ত-রকমের উত্তরাধিকার।
যা জানা গেছে / যা এখনো স্পষ্ট নয়
যা জানা গেছে
প্রকাশক হার্পারকলিন্সের বিবৃতি অনুযায়ী, আর্চার ৫ অক্টোবর ২০২৬-এ ৮৬ বছর বয়সে মারা যান।
Adam & Eve প্রকাশের নির্ধারিত তারিখ ছিল ৬ অক্টোবর।
২০০১ সালে তিনি মিথ্যা সাক্ষ্য ও ন্যায়বিচারে বাধা দেওয়ার অপরাধে চার বছরের কারাদণ্ড পান; দুই বছরের কিছু বেশি সময় কারাভোগের পর ২০০৩ সালে মুক্তি পান।
যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নথিতে তাঁর হাউস অব লর্ডস-সদস্যপদ ১৯৯২–২০২৪ পর্যন্ত দেখানো হয়েছে।
যা এখনো স্পষ্ট নয়
প্রকাশকের বিবৃতিতে মৃত্যুর কারণ জানানো হয়নি।
৩০ কোটির বেশি বই বিক্রির হিসাবটি প্রকাশক-প্রদত্ত; স্বাধীন নিরীক্ষার তথ্য হিসেবে তা উপস্থাপন করা যায় না।
সূত্র ও যাচাই নোট
মৃত্যু, প্রকাশের তারিখ ও জীবনের প্রধান ঘটনাগুলো রয়টার্স, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, দ্য গার্ডিয়ান, হার্পারকলিন্স এবং যুক্তরাজ্যের পার্লামেন্টের নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। উপন্যাসের কাহিনি ও লেখকের “শেষ উপন্যাস” ঘোষণার তথ্য তাঁর সরকারি ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া। সংযুক্ত Instagram ছবিটি সংবাদটির সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রকাশকের বিবৃতির বাইরে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
#JeffreyArcher #AdamAndEve #KaneAndAbel #BookNews #BritishLiterature #জেফ্রিআর্চার #বই
সূত্র




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।