লিও তলস্তয়: জীবন, সাহিত্য ও অহিংস দর্শনের কথাকার

‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ ও ‘আন্না কারেনিনা’র স্রষ্টা লিও তলস্তয় শুধু বিশ্বসাহিত্যের মহৎ ঔপন্যাসিক নন; যুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী, বিকল্প শিক্ষার পরীক্ষক, ধর্মীয় কর্তৃত্বের সমালোচক এবং গান্ধীকে প্রভাবিত করা অহিংস নৈতিকতার অন্যতম প্রধান আধুনিক চিন্তক। তাঁর ১৯৮তম জন্মবার্ষিকীতে ফিরে দেখা সেই বিস্ময়কর, বিরোধপূর্ণ ও আত্মজিজ্ঞাসাময় জীবন।
মানুষ কীভাবে বাঁচে? সুখ কোথায়? মৃত্যু যখন অনিবার্য, তখন শ্রম, প্রেম, খ্যাতি কিংবা সম্পদের অর্থ কী? আর রাষ্ট্র ও ধর্মের নামে সংঘটিত সহিংসতার সামনে ব্যক্তির নৈতিক দায়িত্বই-বা কোথায়?
লিও তলস্তয়ের সাহিত্যজীবনকে কয়েকটি বিখ্যাত উপন্যাসের ইতিহাস হিসেবে পড়লে তাঁর প্রকৃত ব্যাপ্তি ধরা পড়ে না। প্রায় ছয় দশকের লেখালেখিতে তিনি বারবার ফিরে গেছেন এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর কাছে। কখনো যুদ্ধক্ষেত্রের আতঙ্কে, কখনো অভিজাত পরিবারের খাবার টেবিলে, কখনো মৃত্যুশয্যায় শুয়ে থাকা এক বিচারকের নিঃসঙ্গতায়, আবার কখনো নিজের বিশ্বাস ও জীবনযাপনের অসংগতির সামনে দাঁড়িয়ে।
তাই তলস্তয়কে পড়া শুধু উনিশ শতকের রাশিয়াকে জানা নয়; মানুষ তার আকাঙ্ক্ষা, ভয়, আত্মপ্রবঞ্চনা ও বিবেকের সঙ্গে কীভাবে লড়াই করে—তার এক দীর্ঘ অনুসন্ধানে প্রবেশ করা।
দুটি ক্যালেন্ডারে একটি জন্মদিন
লেভ নিকোলায়েভিচ তলস্তয় জন্মগ্রহণ করেন ১৮২৮ সালের ২৮ আগস্ট, তৎকালীন রুশ সাম্রাজ্যে ব্যবহৃত জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। বর্তমান গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে তারিখটি ৯ সেপ্টেম্বর। তাঁর জন্মস্থান ছিল মস্কোর প্রায় ২০০ কিলোমিটার দক্ষিণে তুলা অঞ্চলের পারিবারিক ভূসম্পত্তি ইয়াসনায়া পলিয়ানা।
অভিজাত পরিবারে জন্মালেও শৈশবেই জীবনের অনিশ্চয়তা তাঁকে স্পর্শ করে। দুই বছর বয়সে মা এবং নয় বছর বয়সে বাবা মারা যান। আত্মীয়দের কাছে বড় হওয়া এই অনাথ বালকের স্মৃতি পরবর্তী সময়ে সরাসরি আত্মজীবনী না হলেও ‘চাইল্ডহুড’, ‘বয়হুড’ ও ‘ইয়ুথ’ রচনার মানসিক উপাদান হয়ে ওঠে।
১৮৪৪ সালে তিনি কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যভাষা এবং পরে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কাঠামো তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। ডিগ্রি ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করে ফিরে যান ইয়াসনায়া পলিয়ানায়। তরুণ বয়সে তিনি যেমন আত্মশৃঙ্খলার কঠোর পরিকল্পনা করতেন, তেমনি জুয়া, ঋণ ও অভিজাত অবসরের জীবনেও জড়িয়ে পড়তেন। তাঁর দিনলিপিতে এই আত্মনিয়ন্ত্রণ ও আত্মবিচ্যুতির দ্বন্দ্ব বারবার ফিরে এসেছে।
যুদ্ধ তাঁকে বীরত্বের আড়ালের সত্য দেখিয়েছিল
১৮৫১ সালে বড় ভাই নিকোলাইয়ের সঙ্গে ককেশাসে গিয়ে সামরিক জীবনে প্রবেশ করেন তলস্তয়। পরে ক্রিমিয়ার যুদ্ধে রুশ সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কর্মকর্তা হিসেবে সেভাস্তোপোল অবরোধ প্রত্যক্ষ করেন।
যুদ্ধ তাঁকে প্রচলিত অর্থে বীরত্বের রোমাঞ্চ শেখায়নি; বরং দেখিয়েছিল ভয়, বিশৃঙ্খলা, দৈব ঘটনা এবং মানুষের অসহায়তা। এই অভিজ্ঞতা থেকে রচিত ‘সেভাস্তোপোল স্কেচেস’ বা ‘সেভাস্তোপোলের গল্পগুলো’ ১৮৫৫ সালে প্রকাশিত হয়। সেখানে যুদ্ধ কোনো শৌর্যবীর্যের সাজানো মঞ্চ নয়—আহত সৈনিক, হাসপাতালের দুর্গন্ধ, মৃত্যুভীতি এবং আত্মপ্রবঞ্চনার এক বাস্তব জগৎ।
এই সামরিক অভিজ্ঞতাই পরে ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এ যুদ্ধের মহিমান্বিত বর্ণনাকে ভেঙে দেয়। সম্রাট কিংবা সেনাপতির ঘোষিত পরিকল্পনার চেয়ে অসংখ্য সাধারণ মানুষের সিদ্ধান্ত, ভুল, আতঙ্ক ও দৈনন্দিন কাজ ইতিহাসকে অধিক গভীরভাবে নির্মাণ করে—তলস্তয়ের ইতিহাসদর্শনের কেন্দ্রে ছিল এই ধারণা।
বাস্তবতার নয়, জীবন্ত মানুষের শিল্পী
তলস্তয়কে সাধারণত বাস্তববাদী লেখক বলা হয়। কিন্তু তাঁর বাস্তবতা নিছক বাহ্যিক বর্ণনার নিখুঁততা নয়। তিনি চরিত্রের মনের ভেতরে ক্ষুদ্রতম পরিবর্তন—একটি দৃষ্টি, বিরতি, অস্বস্তি, আত্মপক্ষসমর্থন কিংবা হঠাৎ উপলব্ধিকে—গল্পের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় রূপ দিতে পারতেন।
তাঁর চরিত্রেরা স্থির কোনো নৈতিক প্রতীক নয়। তারা একই সঙ্গে উদার ও স্বার্থপর, সত্যবাদী ও আত্মপ্রবঞ্চক, প্রেমময় ও নিষ্ঠুর হতে পারে। বাস্তব মানুষ যেমন নিজের উদ্দেশ্য সব সময় নিজেও বোঝে না, তলস্তয়ের চরিত্রেরাও তেমনই নিজেদের কাছে আংশিকভাবে অজানা।
এই মনস্তাত্ত্বিক সূক্ষ্মতার কারণেই তাঁর রচনা নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিসর অতিক্রম করেছে। রুশ অভিজাত সমাজের আচার, উনিশ শতকের বিবাহপ্রথা কিংবা নেপোলিয়নিক যুদ্ধ অপরিচিত হলেও পাঠক পিয়েরের বিভ্রান্তি, আন্দ্রেইয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, নাতাশার আবেগ, আন্নার নিঃসঙ্গতা কিংবা ইভান ইলিচের মৃত্যুভয় চিনতে পারেন।
‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’: ইতিহাসের পাদদেশে মানুষের মুখ
‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’-এর প্রাথমিক অংশ ১৮৬৫ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়; ব্যাপক পুনর্লিখনের পর পূর্ণাঙ্গ রূপটি ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত হয়। ১৮০৫ থেকে ১৮১২ সালের নেপোলিয়নিক যুদ্ধ এবং ফরাসি বাহিনীর রাশিয়া আক্রমণ এর ঐতিহাসিক পটভূমি।
কিন্তু এটি শুধু যুদ্ধের উপন্যাস নয়। রোস্তভ, বলকনস্কি ও বেজুখভ পরিবারকে কেন্দ্র করে এতে প্রেম, বিবাহ, উত্তরাধিকার, মাতৃত্ব, মৃত্যু, বিশ্বাস এবং আত্মপরিচয়ের অসংখ্য কাহিনি পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।
তলস্তয় ইতিহাসের তথাকথিত ‘মহামানব তত্ত্বের’ বিরোধিতা করেন। তাঁর নেপোলিয়ন নিজের নিয়ন্ত্রণক্ষমতা সম্পর্কে মোহগ্রস্ত; বিপরীতে সেনাপতি কুতুজভ বুঝতে পারেন, যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে সমস্ত ঘটনা পরিচালনা করা সম্ভব নয়। ইতিহাস এখানে ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া কোনো পরিকল্পনা নয়—অগণিত মানুষের ইচ্ছা ও পরিস্থিতির সম্মিলিত, প্রায়শই অননুমেয় ফল।
এই দৃষ্টিভঙ্গি আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ আধুনিক রাজনীতিও প্রায়ই যুদ্ধ, বিপ্লব কিংবা জাতীয় বিপর্যয়কে কয়েকজন নেতার ব্যক্তিগত কাহিনিতে সীমিত করে। তলস্তয় স্মরণ করিয়ে দেন, ইতিহাসের মূল্য শুধু মানচিত্রের পরিবর্তনে নয়; সাধারণ মানুষের ঘর, সম্পর্ক ও স্মৃতিতে তার কী পরিণতি হলো—সেখানেও মাপতে হয়।
‘আন্না কারেনিনা’: প্রেমের বিচার নয়, সমাজের ব্যবচ্ছেদ
১৮৭৫ থেকে ১৮৭৭ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত এবং ১৮৭৮ সালে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘আন্না কারেনিনা’ শুরু হয় বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম পরিচিত বাক্যে—সব সুখী পরিবারের সাদৃশ্য আছে; প্রতিটি অসুখী পরিবার অসুখী হয় নিজের স্বতন্ত্র পথে।
বাক্যটি যেন উপন্যাসটির নৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক মানচিত্র। আন্নার বিবাহবহির্ভূত প্রেমকে কেন্দ্র করে কাহিনি এগোলেও তলস্তয় কেবল একজন নারীর ‘পতনের’ গল্প বলেননি। তিনি দেখিয়েছেন এমন এক সমাজকে, যেখানে পুরুষের যৌন বিচ্যুতি প্রায়ই ক্ষমাযোগ্য, কিন্তু নারীর ক্ষেত্রে একই ঘটনা সামাজিক মৃত্যুদণ্ডে পরিণত হয়।
আন্না ভালোবাসা, মাতৃত্ব, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা এবং স্বাধীনতার মধ্যে ক্রমে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। তাঁর ট্র্যাজেডিকে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত দিয়ে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যায় না; সামাজিক দ্বিচারিতা, মানসিক নিঃসঙ্গতা এবং অধিকারহীনতার কাঠামোও সমানভাবে দায়ী।
সমান্তরালে লেভিন চরিত্র কৃষিশ্রম, পরিবার, বিশ্বাস ও জীবনের অর্থ নিয়ে লড়াই করে। লেভিনের অনেক প্রশ্নে তলস্তয়ের আত্মজীবনীমূলক ছায়া রয়েছে। আন্নার ধ্বংস ও লেভিনের নৈতিক অনুসন্ধান পাশাপাশি রেখে উপন্যাসটি সহজ কোনো নীতিবাক্যে পৌঁছায় না; বরং প্রশ্ন তোলে—সামাজিক অনুমোদন কি নৈতিক সত্যের সমার্থক?
মৃত্যুর সামনে খুলে যায় জীবনের মিথ্যা
‘দ্য ডেথ অব ইভান ইলিচ’ তলস্তয়ের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর রচনাগুলোর একটি। ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত নভেলাটিতে একজন সফল বিচারক অসুস্থ হয়ে বুঝতে পারেন—সমাজ যাকে যথার্থ ও সম্মানজনক জীবন বলেছে, তার বড় অংশই ছিল অভিনয়।
ইভান ইলিচের মৃত্যু শারীরিক ঘটনার চেয়ে বেশি কিছু। এটি আত্মপ্রবঞ্চনার বিরুদ্ধে এক নির্মম জিজ্ঞাসাবাদ। পদমর্যাদা, সামাজিক সৌজন্য এবং পেশাগত সাফল্যের নিচে যদি সত্যিকারের সম্পর্ক ও সহমর্মিতা না থাকে, তবে তথাকথিত সফলতা মানুষকে মৃত্যুভয়ের মুখে কোনো আশ্রয় দিতে পারে না।
‘দ্য ক্রয়ৎসার সোনাটা’য় যৌনতা, ঈর্ষা ও বিবাহের দমনমূলক রূপ; ‘রেজারেকশন’-এ বিচারব্যবস্থা, কারাগার, জমির মালিকানা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের ভণ্ডামি; আর মরণোত্তর প্রকাশিত ‘হাজি মুরাদ’-এ সাম্রাজ্যবাদী সহিংসতার দুই পক্ষে আটকে পড়া এক মানুষের নিয়তি—তলস্তয়ের সাহিত্য ক্রমশ সামাজিক ক্ষমতা ও ব্যক্তিগত নৈতিকতার সংঘাতের দিকে অগ্রসর হয়।
খ্যাতির শিখরে দাঁড়িয়ে অর্থহীনতার সংকট
‘আন্না কারেনিনা’ শেষ করার সময় তলস্তয়ের সামনে এমন এক সংকট আসে, যা সাহিত্যিক ব্যর্থতার কারণে নয়—সাফল্যের মধ্যেই জন্ম নিয়েছিল। খ্যাতি, পরিবার, সম্পদ এবং সৃজনশীল প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও তিনি জীবনের অর্থ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। মৃত্যু সবকিছু মুছে দিলে অর্জনের মূল্য কোথায়—এই প্রশ্ন তাঁকে গভীর বিষণ্নতা ও আত্মহননের চিন্তার কাছাকাছি নিয়ে যায়।
১৮৭৯–৮০ সালে লেখা ‘আ কনফেশন’-এ তিনি এই সংকট অকপটে বর্ণনা করেন। উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মতত্ত্ব কিংবা অভিজাত বুদ্ধিজীবী সমাজের চেয়ে সাধারণ কৃষকের শ্রম, বিশ্বাস ও পারস্পরিক নির্ভরতার মধ্যে তিনি জীবনের এক ধরনের নৈতিক ভিত্তি দেখতে পান।
তাঁর পরবর্তী ধর্মদর্শনের কেন্দ্র ছিল যিশুর ‘সারমন অন দ্য মাউন্ট’-এর আক্ষরিক নৈতিক পাঠ—শত্রুকে ভালোবাসা, প্রতিশোধ প্রত্যাখ্যান এবং সহিংসতার মাধ্যমে অশুভকে প্রতিহত না করা। এখান থেকে তিনি রাষ্ট্রীয় যুদ্ধ, মৃত্যুদণ্ড, বাধ্যতামূলক সামরিক সেবা, ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠিত গির্জার ক্ষমতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
তাঁর এই দর্শনকে অনেক গবেষক ‘খ্রিষ্টীয় নৈরাজ্যবাদ’ বলেন, যদিও তলস্তয় নিজে কোনো রাজনৈতিক সংগঠন বা মতবাদের আনুষ্ঠানিক সদস্য হতে চাননি।
ধর্মকে প্রত্যাখ্যান নয়, ধর্মীয় ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ
তলস্তয় নাস্তিক হয়ে গিয়েছিলেন—এমন সরল ব্যাখ্যা যথার্থ নয়। তিনি যিশুর নৈতিক শিক্ষাকে গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু ত্রিত্ববাদ, অলৌকিক পুনরুত্থান, ধর্মীয় আচার ও গির্জার ধর্মতাত্ত্বিক কর্তৃত্ব প্রত্যাখ্যান করেন।
১৯০১ সালে রুশ অর্থোডক্স চার্চের সর্বোচ্চ ধর্মীয় প্রশাসন হলি সিনড একটি পরিপত্রে জানায়, তলস্তয়ের বিশ্বাস চার্চের শিক্ষার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অনুতাপ না করা পর্যন্ত চার্চ তাঁকে সদস্য হিসেবে গণ্য করতে পারে না। ঘটনাটি সাধারণভাবে তাঁর ‘এক্সকমিউনিকেশন’ বা বহিষ্কার নামে পরিচিত। তবে কেমব্রিজের সাম্প্রতিক গবেষণা দেখিয়েছে, দলিলটি একই সঙ্গে তাঁকে বিচ্ছিন্ন ঘোষণা এবং ফিরে আসার আহ্বান জানাতে চেয়েছিল; ফলে এটি প্রচলিত আনুষ্ঠানিক বহিষ্কারের তুলনায় কিছুটা জটিল দলিল।
তলস্তয় জবাবে নিজের অবস্থান প্রত্যাহার করেননি। তাঁর বিরোধ ছিল ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে নয়; ধর্ম যখন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, সেনাবাহিনী ও বৈষম্যকে পবিত্রতা দেয়—তখন সেই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে।
কৃষকের সন্তানদের জন্য স্বাধীন বিদ্যালয়
তলস্তয়ের একটি তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত পরিচয় হলো শিক্ষা-পরীক্ষক। ইয়াসনায়া পলিয়ানায় তিনি কৃষক পরিবারের শিশুদের জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। সেখানে শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, প্রশ্ন ও শেখার পদ্ধতির ওপর কঠোর বলপ্রয়োগের বিরোধিতা করা হতো।
ইয়াসনায়া পলিয়ানা জাদুঘরের নথি অনুযায়ী, বিদ্যালয়টির মূলনীতি ছিল শিক্ষার্থীর স্বাধীনতা এবং জবরদস্তির অনুপস্থিতি। অক্সফোর্ড ও কেমব্রিজে প্রকাশিত সাম্প্রতিক গবেষণা তলস্তয়ের পদ্ধতিকে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক ও সংলাপনির্ভর শিক্ষার প্রাথমিক পরীক্ষাগুলোর একটি হিসেবে মূল্যায়ন করেছে।
তবে তাঁর প্রগতিশীলতা সর্বক্ষেত্রে সমান ছিল না। শিক্ষা-গবেষক ড্যানিয়েল মুলাঁ-স্তোজেক দেখিয়েছেন, জ্ঞান ও শিক্ষার স্বাধীনতা নিয়ে সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকলেও নারীর সামাজিক মুক্তি সম্পর্কে তলস্তয়ের কিছু মত ছিল পশ্চাৎমুখী। এই বৈপরীত্য তাঁকে পূজার বেদিতে না বসিয়ে ঐতিহাসিক মানুষ হিসেবে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
তলস্তয় ও গান্ধী: প্রভাব ছিল গভীর, কিন্তু একমুখী নয়
তলস্তয়ের অহিংস চিন্তার সবচেয়ে ঐতিহাসিক প্রভাব পড়েছিল মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর ওপর। ১৯০৮ সালে বাঙালি বিপ্লবী ও পণ্ডিত তারকনাথ দাশকে লেখা ‘আ লেটার টু আ হিন্দু’তে তলস্তয় যুক্তি দেন, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে মুক্তির ভিত্তি হওয়া উচিত ভালোবাসা, সহযোগিতা প্রত্যাহার এবং সহিংসতায় অংশ না নেওয়া।
১৯০৯ সালের ১ অক্টোবর গান্ধী তলস্তয়কে প্রথম চিঠি লেখেন এবং জানান, তাঁর রচনা গান্ধীর মনে গভীর প্রভাব ফেলেছে। পরে গান্ধী চিঠিটি দক্ষিণ আফ্রিকার ‘ইন্ডিয়ান ওপিনিয়ন’-এ প্রকাশের অনুমতি চান। ১৯০৯–১০ সালে তাঁদের মধ্যে সংক্ষিপ্ত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ পত্রবিনিময় হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় সত্যাগ্রহীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত বসতির নামও রাখা হয় ‘টলস্টয় ফার্ম’।
তবে গান্ধীর সত্যাগ্রহকে তলস্তয়ের দর্শনের অনুলিপি বলা ঠিক হবে না। গান্ধীর চিন্তায় জৈন ও হিন্দু নৈতিকতা, ভগবদ্গীতা, যিশুর শিক্ষা, জন রাসকিন, হেনরি ডেভিড থোরো এবং দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী বাস্তবতারও গভীর ভূমিকা ছিল। তলস্তয়ের ‘non-resistance’ অনেক ক্ষেত্রে সহিংস ব্যবস্থায় অংশ না নেওয়ার নৈতিক অবস্থান; গান্ধীর সত্যাগ্রহ আরও সংগঠিত, জনসম্পৃক্ত এবং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় প্রতিরোধে পরিণত হয়েছিল।
নিজের জীবনেই দর্শনের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা
তলস্তয়ের জীবনের বড় ট্র্যাজেডি হলো—তিনি যে নৈতিক সামঞ্জস্যের দাবি অন্যদের সামনে রেখেছিলেন, নিজের জীবনেও তা পুরোপুরি অর্জন করতে পারেননি।
১৮৬২ সালে ৩৪ বছর বয়সী তলস্তয় ১৮ বছর বয়সী সোফিয়া আন্দ্রেয়েভনা বেরসকে বিয়ে করেন। তাঁদের ৪৮ বছরের দাম্পত্যে ১৩ সন্তানের জন্ম হয়। সোফিয়া শুধু স্ত্রী বা সন্তানের মা ছিলেন না; তিনি তলস্তয়ের পাণ্ডুলিপি নকল, সম্পাদনা, প্রকাশনা ও পারিবারিক অর্থব্যবস্থাপনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। পরবর্তী সময়ে ইয়াসনায়া পলিয়ানা সংরক্ষণেও তিনি ছিলেন প্রধান ব্যক্তিদের একজন।
কিন্তু তলস্তয়ের সম্পত্তিবিরোধী আদর্শ, রচনার স্বত্ব ত্যাগের পরিকল্পনা, যৌনসংযমের শিক্ষা এবং অনুসারী ভ্লাদিমির চের্তকভের প্রভাব নিয়ে পরিবারে তীব্র বিরোধ তৈরি হয়। একদিকে তিনি সম্পদের নৈতিক বিপদ নিয়ে লিখেছেন, অন্যদিকে দীর্ঘকাল অভিজাত ভূসম্পত্তির নিরাপত্তার মধ্যেই বাস করেছেন। তিনি সর্বজনীন ভালোবাসার কথা বলেছেন, অথচ তাঁর নিকটতম সম্পর্কগুলো কখনো গভীর কষ্ট ও অবিশ্বাসে আক্রান্ত হয়েছে।
এই অসংগতি তাঁর নৈতিক প্রশ্নগুলোকে বাতিল করে না; বরং আরও অস্বস্তিকর করে তোলে। তলস্তয়ের জীবন দেখায়, সত্যকে শনাক্ত করা এবং সেই সত্য অনুযায়ী প্রতিদিন বেঁচে থাকা একই কাজ নয়।
নোবেল না পাওয়ার বহুল প্রচারিত ইতিহাসে সংশোধন
তলস্তয় নোবেল পুরস্কার পাননি—এটি সত্য। কিন্তু তাঁর মনোনয়ন নিয়ে প্রায়ই ভুল বছর ও বিভাগ প্রচারিত হয়।
নোবেল পুরস্কারের সরকারি আর্কাইভ অনুযায়ী, তলস্তয়ের নামে মোট ১৯টি পৃথক মনোনয়ন নথিভুক্ত রয়েছে। এর মধ্যে ১৬টি সাহিত্যে, ১৯০২ থেকে ১৯০৬ সালের বিভিন্ন বছরে; এবং তিনটি শান্তিতে, যথাক্রমে ১৯০১, ১৯০২ ও ১৯০৯ সালে। এখানে ১৯টি বলতে ১৯ বছর নয়—একই বছরে একাধিক যোগ্য মনোনয়নকারীর পৃথক প্রস্তাবও গণনায় অন্তর্ভুক্ত।
অতএব, ১৯১০ সালে শান্তিতে তাঁর মনোনয়নের বহুল প্রচারিত দাবিটি সরকারি আর্কাইভের সঙ্গে মেলে না। সঠিক বছর ১৯০৯। একইভাবে ১৯০১ সালে তিনি সাহিত্যে মনোনীত হননি; সে বছর তাঁর মনোনয়ন ছিল শান্তি পুরস্কারের জন্য।
পুরস্কার না পাওয়া তলস্তয়ের সাহিত্যিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করেনি। বরং তাঁর ঘটনা মনে করিয়ে দেয়—প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কার ঐতিহাসিক প্রভাবের একটি সূচক হতে পারে, চূড়ান্ত বিচার নয়।
শেষ যাত্রা: সম্পত্তি থেকে নয়, দ্বন্দ্ব থেকে প্রস্থান
১৯১০ সালের অক্টোবরে, ৮২ বছর বয়সে তলস্তয় রাতে গোপনে ইয়াসনায়া পলিয়ানা ত্যাগ করেন। সঙ্গে ছিলেন তাঁর চিকিৎসক দুশান মাকোভিৎসকি। তাঁর উদ্দেশ্য নিয়ে বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে—সরল ও নির্জন জীবন খোঁজা, পারিবারিক বিরোধ থেকে বেরিয়ে আসা কিংবা নিজের আদর্শের সঙ্গে শেষবারের মতো সামঞ্জস্য স্থাপনের চেষ্টা।
পথে অসুস্থ হয়ে তিনি আস্তাপভো নামের ছোট একটি রেলস্টেশনে নামতে বাধ্য হন। স্টেশনমাস্টারের বাসভবনে নিউমোনিয়ায় তাঁর মৃত্যু হয় ১৯১০ সালের ৭ নভেম্বর, পুরোনো রুশ ক্যালেন্ডারে; বর্তমান গ্রেগরিয়ান হিসাবে ২০ নভেম্বর।
একজন মানুষ, যিনি সারাজীবন ঘর, সম্পত্তি, বিশ্বাস ও জীবনের অর্থ নিয়ে লিখেছেন, তাঁর শেষ অধ্যায়টি ঘটেছিল একটি রেলস্টেশনে—নিজের বাড়ি ও কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যের মাঝামাঝি এক অনির্ধারিত স্থানে। দৃশ্যটি প্রায় তলস্তয়ের নিজের লেখা কোনো রূপকের মতো।
কেন তলস্তয় এখনও আমাদের সমকালীন
তলস্তয়ের সব বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁর কিছু সামাজিক ধারণা ছিল রক্ষণশীল; তাঁর নৈতিক কঠোরতা কখনো মানুষের বাস্তব জটিলতাকে ছোট করে দেখেছে। বার্ট্রান্ড রাসেল ও জন ডিউইয়ের মতো চিন্তকেরা তাঁর দর্শনে অতিসরলীকরণ ও অসংগতি দেখেছিলেন। আধুনিক পাঠক তাঁর নারী, বিবাহ ও যৌনতা সম্পর্কিত কিছু মতের কঠোর সমালোচনা করতেই পারেন।
তারপরও তলস্তয় অপরিহার্য। কারণ তিনি এমন প্রশ্ন তুলেছিলেন, যেগুলো আধুনিক সভ্যতা এখনও মীমাংসা করতে পারেনি: রাষ্ট্র কি নৈতিকতার ঊর্ধ্বে? দেশপ্রেম কি যুদ্ধকে ন্যায়সংগত করতে পারে? বিপুল সম্পদের পাশে দারিদ্র্য থাকলে ব্যক্তিগত সদাচরণ কি যথেষ্ট? শিক্ষা কি শিশুকে মুক্ত করে, না অনুগত করে? আর সামাজিক সাফল্যের জীবন যদি মৃত্যুর সামনে অর্থহীন মনে হয়, তবে সত্যিকারের জীবন কোনটি?
তলস্তয় এসব প্রশ্নের নির্ভুল উত্তর রেখে যাননি। তাঁর বড় কৃতিত্ব অন্যত্র—তিনি মানুষের আত্মপ্রবঞ্চনার আরাম ভেঙে প্রশ্নগুলোকে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন করে তুলেছেন।
তাঁর জন্মদিনে শ্রদ্ধা তাই শুধু একজন মহৎ লেখকের প্রতি আনুষ্ঠানিক সম্মান নয়। এটি আমাদের নিজেদের জীবনকেও প্রশ্ন করার উপলক্ষ: আমরা যে জীবনকে সফল বলছি, সেটি কি সত্যিই আমাদের বিবেকের কাছে সত্য?
যা নিশ্চিত, যা সংশোধনযোগ্য
যা নথিতে নিশ্চিত
জন্ম: ৯ সেপ্টেম্বর ১৮২৮—গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার; পুরোনো রুশ ক্যালেন্ডারে ২৮ আগস্ট।
মৃত্যু: ২০ নভেম্বর ১৯১০—গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার; পুরোনো রুশ ক্যালেন্ডারে ৭ নভেম্বর।
সাহিত্যে নোবেল মনোনয়ন: ১৯০২–১৯০৬ সালের মধ্যে মোট ১৬টি পৃথক মনোনয়ন।
শান্তিতে নোবেল মনোনয়ন: ১৯০১, ১৯০২ ও ১৯০৯ সালে তিনটি।
গান্ধীর প্রথম চিঠি: ১ অক্টোবর ১৯০৯।
১৯০১ সালের হলি সিনডের ঘোষণাটি সাধারণভাবে ‘বহিষ্কার’ নামে পরিচিত হলেও এর আনুষ্ঠানিক ধর্মীয় চরিত্র নিয়ে গবেষকদের ব্যাখ্যায় সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
যা সংশোধন প্রয়োজন
মূল লেখায় শান্তিতে নোবেল মনোনয়নের বছর হিসেবে ১৯১০ উল্লেখ করা হয়েছে; সরকারি নোবেল আর্কাইভ অনুযায়ী সঠিক বছর ১৯০৯।
‘১৯টি মনোনয়ন’ মানে ১৯ বছর নয়; একই বছরে একাধিক ব্যক্তির করা পৃথক মনোনয়নসহ মোট নথিভুক্ত প্রস্তাব।
উৎস ও যাচাই নোট
জীবন ও পারিবারিক ঘটনাবলি ইয়াসনায়া পলিয়ানা জাদুঘরের সময়রেখার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। নোবেল-সংক্রান্ত সংখ্যা ও বছর সরকারি নোবেল মনোনয়ন আর্কাইভ থেকে যাচাই করা। গান্ধী–তলস্তয় যোগাযোগে গান্ধীর মূল চিঠি, গান্ধী-সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং ইউনেসকোর নথি ব্যবহার করা হয়েছে। সাহিত্য ও দর্শনের মূল্যায়নে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস এবং স্ট্যানফোর্ড এনসাইক্লোপিডিয়া অব ফিলোসফির গবেষণা পর্যালোচনা করা হয়েছে।
প্রধান সূত্র
Daniel Moulin-Stożek, “Tolstoy on the Injustice of the Philosophy of Education,” Oxford University Press
Daniel Moulin-Stożek, “Peasant Schools and Education,” Tolstoy in Context, Cambridge University Press
“The ‘Excommunication’ and Its Aftermath,” Cambridge University Press
M. K. Gandhi, Letter to Leo Tolstoy, 1 October 1909
Leo Tolstoy, A Letter to a Hindu, Project Gutenberg
UNESCO: The “Lost Letter” of Mahatma Gandhi and the Tolstoy correspondence
Andrew Fiala, “Pacifism,” Stanford Encyclopedia of Philosophy
#LeoTolstoy #লিওতলস্তয় #WarAndPeace #AnnaKarenina #RussianLiterature #WorldLiterature #LiteraryHistory #Nonviolence




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।