গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর: স্বপ্ন, ক্ষমতা ও রাষ্ট্র সংস্কারের অসমাপ্ত হিসাব

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থান শুধু একটি সরকার পতনের ঘটনা ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের কাঠামো বদলের দাবি। কিন্তু দুই বছর পর প্রশ্ন উঠছে—জনতার আত্মত্যাগ কি কেবল নির্বাচনী পালাবদলে সীমিত হয়ে গেল, নাকি এখনো পরিবর্তনের সম্ভাবনা বেঁচে আছে?
জুলাইয়ের প্রশ্ন: সরকার বদল, নাকি রাষ্ট্র বদল?
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন এক গভীর বাঁকবদলের নাম। শুরুতে সরকারি চাকরির কোটা সংস্কারের দাবিতে ছাত্রদের আন্দোলন হলেও, দমন-পীড়ন, প্রাণহানি ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার অভিযোগের মধ্য দিয়ে এটি দ্রুত বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সরকার আদালতের রায়ের পর কোটা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন মেনে নেয়, কিন্তু তখন আন্দোলনকারীরা শুধু কোটা নয়—কারফিউ প্রত্যাহার, ইন্টারনেট চালু, ক্যাম্পাস খুলে দেওয়া ও আটক ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিও তোলে। (Reuters)
এই জায়গাতেই জুলাই আন্দোলনের রাজনৈতিক অর্থ তৈরি হয়। এটি শুধু চাকরির ন্যায্যতা নয়, রাষ্ট্রের জবাবদিহি, পুলিশি ক্ষমতার সীমা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক সংস্কার ও নাগরিক মর্যাদার প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
ক্ষমতার দরজায় কারা ঢুকল, রাস্তায় কারা রইল?
আলতাফ পারভেজের আলোচিত কলামে মূল প্রশ্নটি তীব্রভাবে এসেছে—গণঅভ্যুত্থানের পর ক্ষমতার কাঠামো বদলাল, নাকি শুধু ক্ষমতার ব্যবহারকারী বদলাল? তাঁর যুক্তি, অভ্যুত্থানের পর সুশীল সমাজের একাংশ, রাজনৈতিক দল, নির্বাচিত প্রতিনিধি ও আমলাতন্ত্র—সবাই নতুন বাস্তবতায় নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে; কিন্তু শহীদ পরিবার, আহত কর্মী, শ্রমজীবী অংশগ্রহণকারী ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। (দৈনিক আগামীর সময়)
এই প্রশ্নকে উপেক্ষা করা যায় না। কারণ গণঅভ্যুত্থানের নৈতিক ভিত্তি আসে রক্ত, ক্ষতি, ভয় অতিক্রম করা সাহস এবং মানুষের সম্মিলিত প্রত্যাশা থেকে। সেই প্রত্যাশা যদি কেবল নির্বাচনে গিয়ে শেষ হয়, তবে ইতিহাস একে অসমাপ্ত বিপ্লব বলেই মনে রাখবে।
মানবাধিকার: পুরনো ছায়া কি নতুন সময়েও রয়ে গেল?
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৫ সালের প্রতিবেদনে বলেছে, জুলাই ২০২৪-এ শান্তিপূর্ণ ছাত্র আন্দোলনের ওপর হামলা ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগ বাংলাদেশে নিরাপত্তা খাত সংস্কারের জরুরি প্রয়োজন দেখিয়েছে। সংস্থাটি পুলিশ, র্যাব ও গোয়েন্দা কাঠামোর জবাবদিহিমূলক পুনর্গঠনের কথা বলেছে। (Human Rights Watch)
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালও বাংলাদেশ নিয়ে তাদের ২০২৫/২৬ প্রতিবেদনে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের ওপর চাপ, এবং পুরনো দমনমূলক আইন ব্যবহারের ধারাবাহিকতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করেছে, জাতিসংঘ মানবাধিকার দপ্তর ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি নিয়ে স্বাধীন অনুসন্ধান করেছে। (Amnesty International)
অর্থাৎ শুধু অতীত সরকারের দায় বিচার করলেই হবে না; নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থাকেও প্রমাণ করতে হবে যে তারা মানবাধিকারকে দলীয় সুবিধার চেয়ে বড় করে দেখে।
সংস্কার কমিশন: কাগজে রাষ্ট্র, বাস্তবে স্থবিরতা
গণঅভ্যুত্থানের পর সংস্কার কমিশন, নতুন সংবিধান ভাবনা, পুলিশ ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, স্থানীয় সরকারের ক্ষমতায়ন—এসব নিয়ে জনপরিসরে বড় প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, এই প্রস্তাবগুলো কি বাস্তব নীতিতে পরিণত হয়েছে?
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন তাঁর Political Order in Changing Societies বইয়ে দেখিয়েছিলেন, রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই স্থিতিশীল হয় যখন প্রতিষ্ঠানগুলো বদলায়। শুধু শাসক বদলালে পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হয় না। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই শিক্ষা প্রযোজ্য: নির্বাচন দরকার, কিন্তু নির্বাচন একা রাষ্ট্র সংস্কারের বিকল্প নয়।
দুই পক্ষের যুক্তি: ব্যর্থতা নাকি সময়ের অপেক্ষা?
সমালোচকদের বক্তব্য, জুলাইয়ের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল বৈষম্যহীন, জবাবদিহিমূলক, নাগরিকবান্ধব রাষ্ট্র। কিন্তু দুই বছর পরও পুলিশি সংস্কার, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা, আমলাতন্ত্রের জবাবদিহি, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও রাজনৈতিক সহিংসতা প্রশ্নে বড় অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়।
অন্যদিকে সমর্থকদের যুক্তি, এত গভীর সংকটের রাষ্ট্র এক-দুই বছরে বদলে ফেলা বাস্তবসম্মত নয়। একটি দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের পর প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, রাজনৈতিক দল ও নাগরিক সমাজ—সবকিছু পুনর্গঠনে সময় লাগে। তাদের মতে, অন্তত ভয়ভীতি ভেঙে মানুষ কথা বলছে, নতুন দল ও নতুন রাজনৈতিক ভাষা তৈরি হচ্ছে, এবং জুলাইয়ের স্মৃতি এখনো রাষ্ট্রকে চাপে রাখছে।
দুই যুক্তির মাঝখানে সত্যটি সম্ভবত এটাই: পরিবর্তনের পথ খোলা হয়েছে, কিন্তু সেই পথে হাঁটার মতো পরিণত, ঐক্যবদ্ধ, নৈতিক রাজনৈতিক শক্তি এখনো দুর্বল।
কালচারাল ওয়ার: আসল প্রশ্ন থেকে দৃষ্টি সরানোর কৌশল?
গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে সংস্কার বনাম প্রতিশোধ, মুক্তিযুদ্ধ বনাম জুলাই, ধর্মীয় পরিচয় বনাম নাগরিক পরিচয়—এসব দ্বন্দ্ব ক্রমে তীব্র হয়েছে। এতে রাষ্ট্র সংস্কারের আসল প্রশ্ন অনেক সময় পেছনে চলে যায়। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের জায়গায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ভিত্তিক যুদ্ধ বড় হয়ে ওঠে।
এটি শুধু বাংলাদেশের সমস্যা নয়। বহু দেশে গণআন্দোলনের পর পুরনো ক্ষমতাকাঠামো টিকে থাকে নাগরিক সমাজকে বিভক্ত রেখে। ইতিহাসে ১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহের পর ব্রিটিশ শাসকের ‘divide and rule’ নীতি এর ক্লাসিক উদাহরণ। বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায়ও প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি রাষ্ট্র বদলের বদলে পরস্পরকে হারানোর রাজনীতিতে আটকে যাচ্ছি?
জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় শিক্ষা
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছে, জনগণ ভয় অতিক্রম করলে সবচেয়ে শক্তিশালী শাসনও টেকে না। কিন্তু একই সঙ্গে এটি আরেকটি কঠিন শিক্ষা দিয়েছে—রাস্তায় বিজয় অর্জন করা যত কঠিন, রাষ্ট্র পুনর্গঠন তার চেয়েও কঠিন।
গণঅভ্যুত্থান সফল হতে হলে প্রয়োজন তিনটি বিষয়:
প্রথমত, নৈতিক নেতৃত্ব;
দ্বিতীয়ত, প্রতিষ্ঠানভিত্তিক সংস্কারের স্পষ্ট রূপরেখা;
তৃতীয়ত, ক্ষমতার বাইরে থেকেও জনচাপ ধরে রাখার সংগঠিত শক্তি।
এই তিনটির ঘাটতি থাকলে অভ্যুত্থান ইতিহাসে আবেগ হয়ে থাকে, রাষ্ট্রে রূপান্তর ঘটায় না।
শেষ কথা: জুলাই এখনো শেষ হয়নি
জুলাইয়ের ব্যর্থতা নিয়ে কথা বলা মানে জুলাইকে অস্বীকার করা নয়। বরং ব্যর্থতার হিসাব নেওয়াই শহীদ, আহত ও অংশগ্রহণকারী মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। গণঅভ্যুত্থান যদি কেবল সরকার পরিবর্তনের স্মৃতিসৌধ হয়ে থাকে, তবে সেটি অসম্পূর্ণ। কিন্তু যদি জুলাই রাষ্ট্র সংস্কারের দীর্ঘ সংগ্রামের নৈতিক সূচনা হয়, তবে এর ইতিহাস এখনো লেখা শেষ হয়নি।
বাংলাদেশের সামনে তাই প্রশ্ন একটাই: আমরা কি পুরনো রাষ্ট্রে নতুন মুখ বসাব, নাকি সত্যিই নতুন সামাজিক চুক্তির পথে হাঁটব?
#JulyUprising #BangladeshPolitics #StateReform #HumanRights #Democracy #জুলাইআন্দোলন #গণঅভ্যুত্থান #বাংলাদেশরাজনীতি



এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।