দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে উদ্বিগ্ন তরুণ বাংলাদেশে: ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কি আশীর্বাদ, নাকি আসন্ন সংকটের সতর্কবার্তা?

ডেস্ক রিপোর্ট | সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি
বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস (World Youth Skills Day) উপলক্ষে প্রকাশিত জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের (UNFPA) নতুন জরিপ বাংলাদেশের জন্য একদিকে যেমন উদ্বেগজনক বাস্তবতা তুলে ধরেছে, অন্যদিকে তেমনি নীতিনির্ধারকদের জন্য জোরালো সতর্কবার্তাও দিয়েছে।
জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬৭.২ শতাংশ তরুণ-তরুণী অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত, বৈষম্য এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগে ভুগছেন। এই হার দক্ষিণ এশিয়ার অন্য সব দেশের চেয়ে বেশি। শুধু তাই নয়, ৭৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বৈশ্বিকভাবে দশম স্থানে রয়েছে সবচেয়ে উদ্বিগ্ন তরুণ জনগোষ্ঠীর তালিকায়।
UNFPA-এর “Lives, Choices and Futures” শীর্ষক জরিপে ৭৩টি দেশের ১ লাখ ৮ হাজারেরও বেশি তরুণ-তরুণীর মতামত নেওয়া হয়েছে। গবেষণাটি দেখায়, বিশ্বজুড়েই তরুণদের বড় উদ্বেগ অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, চাকরি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সামাজিক বৈষম্য।
দক্ষিণ এশিয়ায় কেন বাংলাদেশের অবস্থান সবচেয়ে উপরে?
জরিপে দেখা যায়:
বাংলাদেশ: ৬৭.২%
ভুটান: ৬৬.৩%
আফগানিস্তান: ৫৪.৭%
পাকিস্তান: ৫৩.২%
ভারত: ৪৭.৪%
শ্রীলঙ্কা: ৪৫.০%
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে চাকরির বাজার, দক্ষতার ঘাটতি, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক বৈষম্য, প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে আস্থার সংকট।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে কর্মক্ষম যুব জনগোষ্ঠী দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ হওয়ার কথা। কিন্তু পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ না থাকলে এই “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড” উল্টো বোঝায় পরিণত হতে পারে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন।
উদ্বেগের মধ্যেও আশার আলো
চিত্রটি পুরোপুরি হতাশার নয়।
UNFPA-এর বাংলাদেশভিত্তিক তথ্য বলছে, উদ্বেগের মাত্রা বেশি হলেও প্রায় ৬৬ শতাংশ তরুণ এখনও নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী। একই সঙ্গে অধিকাংশ তরুণ পরিবার গঠন, সম্পর্ক এবং সন্তান নেওয়ার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন।
অর্থাৎ বাংলাদেশের তরুণরা স্বপ্ন হারিয়ে ফেলেননি; বরং তারা এমন একটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিবেশ খুঁজছেন যেখানে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ থাকবে।
বিশ্বজুড়ে একই সংকেত
UNFPA-এর বৈশ্বিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, তরুণদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলছে:
চাকরির অনিশ্চয়তা
উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়
আয়ের বৈষম্য
আবাসন সংকট
সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা
সংস্থাটি বলছে, তরুণরা সন্তান বা পরিবার গঠনের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করছেন মূলত অর্থনৈতিক বাস্তবতার কারণে, ব্যক্তিগত পছন্দের কারণে নয়।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবসের মূল বার্তা হলো—দক্ষতা উন্নয়ন ছাড়া ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে টিকে থাকা কঠিন।
বাংলাদেশে প্রতিবছর লাখ লাখ শিক্ষিত তরুণ চাকরির বাজারে প্রবেশ করছেন। কিন্তু শিল্পখাত, প্রযুক্তি খাত এবং আধুনিক অর্থনীতির চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এআই, অটোমেশন এবং ডিজিটাল অর্থনীতির যুগে দক্ষতার ঘাটতি আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই যদি—
কর্মমুখী শিক্ষা,
কারিগরি প্রশিক্ষণ,
প্রযুক্তিগত দক্ষতা,
উদ্যোক্তা উন্নয়ন,
এবং উচ্চমূল্যের কর্মসংস্থান
সৃষ্টি করা না যায়, তবে আগামী এক দশকে বাংলাদেশের যুবসমাজের হতাশা আরও গভীর হতে পারে।
বিশ্লেষণ: সংখ্যার আড়ালের বার্তা
বাংলাদেশের ৬৭.২ শতাংশ তরুণ উদ্বিগ্ন—এই সংখ্যাটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়।
এটি একটি প্রজন্মের মনস্তত্ত্বের প্রতিফলন।
যে প্রজন্ম ডিজিটাল যুগে বড় হয়েছে, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা দেখেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করেছে এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের চাপ ও সামাজিক অস্থিরতার অভিজ্ঞতাও অর্জন করেছে।
তারা হতাশ নয়, কিন্তু তারা অপেক্ষায় আছে।
প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং অর্থনীতি কি তাদের সেই অপেক্ষার যথাযথ উত্তর দিতে পারবে?
#Bangladesh #Youth #UNFPA #Economy #Jobs #SouthAsia #WorldYouthSkillsDay #CaliforniaLetter



এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।