কুড়িগ্রামে সারসংকট: গুদাম ভাঙলেন কৃষকেরা

কাগজে পর্যাপ্ত, মাঠে অধরা: সার না পেয়ে কুড়িগ্রামে গুদাম ভাঙলেন কৃষকেরা
বরাদ্দের বড় ঘাটতি থেকে গুদাম ভাঙা: কুড়িগ্রামের সারসংকটের ভেতরের চিত্র
সার নিয়ে সরকারি হিসাব ও কৃষকের অভিজ্ঞতায় এত ব্যবধান কেন
ভূরুঙ্গামারীতে ১৯৭ বস্তা সার নিয়ে গেলেন কৃষকেরা, তদন্তে প্রশাসন
স্ট্যান্ডফার্স্ট
কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীতে বারবার ফিরে যাওয়া কৃষকেরা ডিলারের গুদাম ভেঙে ১৯৭ বস্তা সার নিয়ে গেছেন। পুলিশের হিসাবে স্থানীয় চাহিদা প্রায় চার হাজার বস্তা হলেও বরাদ্দ ছিল মাত্র ১ হাজার ৩২০ বস্তা। সরকার জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুতের দাবি করলেও বিভিন্ন জেলায় বেশি দাম ও সময়মতো সার না পাওয়ার অভিযোগ মাঠপর্যায়ের সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা প্রকাশ করছে।
বাংলাদেশ প্রতিনিধি। আন্তর্জাতিক ডেস্ক প্রতিবেদন
পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন
আমন মৌসুমে জমিতে সার দেওয়ার সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল। কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের কৃষকদের অনেকে কয়েক দফা ডিলারের কাছে গিয়েও প্রয়োজনীয় সার পাননি বলে অভিযোগ করেন। শেষ পর্যন্ত তাঁদের একটি দল শাহ আমানত ট্রেডার্সের গুদামের দরজা ভেঙে ১৯৭ বস্তা সার নিয়ে যায়।
ঘটনাটি আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার স্পষ্ট উদাহরণ। কিন্তু শুধু ‘লুট’ বলে ঘটনাটি শেষ করলে এর পেছনের সরবরাহঘাটতি, বেশি দাম এবং প্রশাসনিক ব্যর্থতার অভিযোগ আড়ালে থেকে যায়।
ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আজিম উদ্দিনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, উপজেলায় সারের চাহিদা ছিল প্রায় চার হাজার বস্তা; বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ১ হাজার ৩২০ বস্তা। অর্থাৎ ঘোষিত চাহিদার মাত্র এক-তৃতীয়াংশের কাছাকাছি বরাদ্দ ছিল।
কী ঘটেছিল শিলখুড়িতে
স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের তথ্যমতে, ডিলারের নামে ৩৪০ বস্তা সার উত্তোলন করা হয়েছিল। কৃষকেরা গুদাম থেকে প্রায় ১৯৭ থেকে ২০২ বস্তা নিয়ে যান—সংবাদমাধ্যমভেদে সংখ্যায় সামান্য পার্থক্য রয়েছে।
পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। প্রথম পর্যায়ে ৩৩ জন কৃষক ৩৩ বস্তা সার ফেরত দেন। পরে প্রশাসন আরও বস্তা উদ্ধারের কথা জানিয়েছে এবং পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
ডিলার তাইফুর রহমানের বক্তব্য প্রথম দিকের সংবাদ প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে ডিলার কেন প্রত্যাশিত পরিমাণে সার বিতরণ করতে পারেননি বা গুদাম বন্ধ ছিল কি না—তার পূর্ণ ব্যাখ্যা অনুপস্থিত।
সরকারের হিসাবে মজুত সন্তোষজনক
কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯ আগস্ট পর্যন্ত প্রধান চার ধরনের সারের জাতীয় মজুতকে সন্তোষজনক বলা হয়েছে। প্রতিবেদিত পরিমাণ ছিল:
ইউরিয়া: ৬ লাখ ১৪ হাজার টন
টিএসপি: ৪ লাখ ৯ হাজার টন
ডিএপি: ৪ লাখ ৫৮ হাজার টন
এমওপি: ২ লাখ ৮৪ হাজার টন
সেপ্টেম্বরের জন্য ইউরিয়াসহ প্রায় ৪ লাখ ৪৩ হাজার টন সার বরাদ্দের কথাও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদের দাবি, জাতীয় পর্যায়ে সারের ঘাটতি নেই; ডিলারদের একটি অংশ নতুন নীতিমালায় ব্যবসায়িক সুবিধা হারানোর আশঙ্কা থেকে কৃত্রিম সংকট ও অস্থিরতা তৈরি করছে।
এটি সরকারের অভিযোগ—স্বাধীন তদন্তে সব এলাকায় একই কারণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
জাতীয় মজুত থাকলেও স্থানীয় ঘাটতি সম্ভব
জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত এবং মাঠে কৃষকের সার না পাওয়া—দুটি তথ্য পরস্পরবিরোধী মনে হলেও বাস্তবে একই সঙ্গে সত্য হতে পারে।
সার বন্দরে, কেন্দ্রীয় গুদামে বা জেলা গুদামে থাকলেই তা নির্দিষ্ট সময়ে ইউনিয়নের কৃষকের হাতে পৌঁছায় না। সরবরাহের প্রতিটি ধাপে প্রয়োজন:
সঠিক চাহিদা নির্ধারণ
সময়মতো বরাদ্দ
পরিবহন
ডিলারের উত্তোলন
নির্ধারিত দামে বিক্রি
কৃষকের পরিচয় ও জমির চাহিদা যাচাই
বিক্রির স্বচ্ছ হিসাব
এই শৃঙ্খলের কোনো একটি ধাপে ব্যর্থতা ঘটলে জাতীয় মজুত কৃষকের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে।
বিভিন্ন জেলায় বেশি দামের অভিযোগ
জয়পুরহাট, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও শেরপুরের কৃষকেরা ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি কিনতে সরকার-নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কেজিতে ৪ থেকে ১০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন।
৫০ কেজির বস্তায় এই অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। একটি মৌসুমে বহু বস্তা সার ব্যবহার করা কৃষকের জন্য এই ব্যয় উল্লেখযোগ্য। বেশি দামে সার কেনার অর্থ শেষ পর্যন্ত ধান বা অন্য ফসলের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি।
বিভিন্ন জেলায় বেশি দামের অভিযোগ
জয়পুরহাট, নওগাঁ, কুড়িগ্রাম, দিনাজপুর ও শেরপুরের কৃষকেরা ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি কিনতে সরকার-নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কেজিতে ৪ থেকে ১০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন।
৫০ কেজির বস্তায় এই অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়ায় ২০০ থেকে ৫০০ টাকা। একটি মৌসুমে বহু বস্তা সার ব্যবহার করা কৃষকের জন্য এই ব্যয় উল্লেখযোগ্য। বেশি দামে সার কেনার অর্থ শেষ পর্যন্ত ধান বা অন্য ফসলের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে সরকার-নির্ধারিত প্রতি কেজি খুচরা মূল্য ছিল:
যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি দপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ের বিশ্লেষণেও বলা হয়েছে, অনুমোদিত ডিলারের পর সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতার দীর্ঘ সরবরাহশৃঙ্খল তৈরি হওয়ায় কৃষককে প্রায়ই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দিতে হয়।
নতুন ডিলার নীতিমালার প্রভাব
‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার ডিলার সংরক্ষণসংক্রান্ত নীতিমালা–২০২৫ (সংশোধিত)’ অনুসারে বিসিআইসি ও বিএডিসির ডিলারদের সমন্বিত ব্যবস্থায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের দাবি, পুরোনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগী ও অনিয়মে যুক্ত কিছু ডিলার নতুন নীতিমালার বিরোধিতা করছেন। ডিলারদের বক্তব্য, নীতিমালা নিয়ে বিরোধ থাকলেও মাঠের মূল সমস্যা হলো চাহিদার তুলনায় কম বরাদ্দ এবং দেরিতে সরবরাহ।
শিলখুড়ির হিসাবে স্থানীয় চাহিদা ও বরাদ্দের বড় ব্যবধান ডিলারদের বক্তব্যের একটি বাস্তব ভিত্তি দেখায়। তবে ডিলাররা পাওয়া সার ঠিকমতো বিতরণ করেছেন কি না, সেটিও তদন্ত করা প্রয়োজন।
‘লুট’ শব্দের সীমাবদ্ধতা
অনুমতি ছাড়া গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়া আইনত গ্রহণযোগ্য নয়। সংবাদভাষায় একে লুট বলা হলেও ঘটনাটির প্রকৃতি সাধারণ সংঘবদ্ধ ডাকাতির সঙ্গে পুরোপুরি এক নয়। কৃষকেরা প্রকাশ্যে নিজেদের চাষের প্রয়োজনের কথা বলে সার নিয়েছেন এবং তাঁদের কেউ কেউ পরে তা ফেরতও দিয়েছেন।
সঠিক বর্ণনা হতে পারে: “সার না পেয়ে কৃষকদের গুদাম ভেঙে বস্তা নিয়ে যাওয়ার ঘটনা।” এতে কাজটির বেআইনি চরিত্র আড়াল হয় না; একই সঙ্গে ঘটনাটিকে অপ্রাসঙ্গিক অপরাধের ভাষায় অতিসরলও করা হয় না।
জবাবদিহি কোথায় প্রয়োজন
তদন্তে শুধু কোন কৃষক কত বস্তা নিয়ে গেছেন—তা নয়, আরও কয়েকটি বিষয় পরীক্ষা করা প্রয়োজন:
ইউনিয়নভিত্তিক চাহিদা কীভাবে নির্ধারণ করা হয়েছিল
চার হাজার বস্তার চাহিদার বিপরীতে ১ হাজার ৩২০ বস্তা কেন বরাদ্দ হলো
ডিলার বরাদ্দের পুরো সার উত্তোলন করেছিলেন কি না
বিক্রয় রেজিস্টার ও গুদামের মজুত মিলছে কি না
নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি হয়েছিল কি না
অন্য বাজারে বা মধ্যস্বত্বভোগীর কাছে সার সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল কি না
প্রশাসন সংকটের আগাম তথ্য পেয়েও ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছিল কি না
কৃষকের আইনভঙ্গের তদন্ত হবে, কিন্তু সরবরাহব্যবস্থার সম্ভাব্য অনিয়ম বাদ দিয়ে শুধু কৃষকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সংকটের মূল কারণ অমীমাংসিত থাকবে।
যা জানা গেছে
কৃষকেরা ডিলারের গুদাম ভেঙে প্রায় ১৯৭ বস্তা সার নিয়ে যান।
স্থানীয় চাহিদা প্রায় চার হাজার বস্তা হলেও বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৩২০ বস্তা।
কিছু সার ফেরত ও উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
বিভিন্ন জেলায় সরকার-নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
সরকার জাতীয় পর্যায়ে পর্যাপ্ত মজুত থাকার দাবি করেছে।
যা এখনো অস্পষ্ট
ডিলার বরাদ্দের সম্পূর্ণ সার সময়মতো উত্তোলন ও বিতরণ করেছিলেন কি না।
ঠিক কত বস্তা নেওয়া হয়েছিল—বিভিন্ন সূত্রে ১৯৭ ও ২০২ বস্তার উল্লেখ রয়েছে।
কত বস্তা শেষ পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে।
স্থানীয় ঘাটতির পেছনে কম বরাদ্দ, মজুতদারি, পরিবহন বিলম্ব নাকি একাধিক কারণ কাজ করেছে।
বেশি দামে বিক্রির অভিযোগের সঙ্গে কোন কোন ডিলার জড়িত।
সূত্র ও যাচাই নোট
জাতীয় মজুতের পরিসংখ্যান কৃষি মন্ত্রণালয়ের দাবি; মাঠপর্যায়ের প্রাপ্যতা কৃষক ও স্থানীয় কর্মকর্তাদের বক্তব্য থেকে যাচাই করা হয়েছে। ‘ষড়যন্ত্র’ ও ‘কৃত্রিম সংকট’ সরকারের অভিযোগ—স্বাধীনভাবে সর্বত্র প্রমাণিত তথ্য নয়।
প্রধান সূত্র: প্রথম আলো, জাগো নিউজ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, USDA Fertilizer Situation in Bangladesh
#FertilizerCrisis #BangladeshAgriculture #Farmers #Kurigram #FoodSecurity #সারসংকট #কৃষক #ভূরুঙ্গামারী




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।