একটি হত্যাকাণ্ড, ১২৯টি তারিখ এবং সত্যের অপেক্ষায় মেঘ

যে অপেক্ষা শুরু হয়েছিল একটি শিশুর শৈশবে, তা পেরিয়েছে ১৪ বছর, চারটি তদন্তব্যবস্থা এবং ১২৯টি সময়সীমা। নতুন সূত্রের দাবি আবার আশা জাগালেও প্রশ্ন রয়ে গেছে—এবার কি প্রমাণ আদালতে পৌঁছাবে, নাকি আরেকটি তারিখ এসে নীরবে চলে যাবে?
মাহবুব আহমেদ। কঠিন এই যুদ্ধ | পর্ব ১ । নিয়মিত কলাম।
আগের একটি লেখায় আমি প্রশ্ন করেছিলাম—সাংবাদিকতা অপরাধ নয়; তবে সত্য বলার অপরাধ কি মৃত্যু?
সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনির কথা ভাবলে আজ মনে হয়, প্রশ্নটি অসম্পূর্ণ ছিল। কারণ একজন সাংবাদিক নিহত হলে শুধু একটি প্রাণ থেমে যায় না। তার সঙ্গে একটি পরিবারের স্বাভাবিক জীবন ভেঙে পড়ে, সহকর্মীদের সাহস সংকুচিত হয়, সংবাদকক্ষে জন্ম নেয় অদৃশ্য সতর্কতা এবং সত্য জানার নাগরিক অধিকার একটু একটু করে দুর্বল হয়ে যায়।
কখনো কখনো মৃত্যুর চেয়েও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে মৃত্যুর কোনো বিশ্বাসযোগ্য উত্তর না পাওয়া।
২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি ঢাকার পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় নিহত হন মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরওয়ার এবং এটিএন বাংলার জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মেহেরুন রুনি। তাঁদের অল্পবয়সী সন্তান মিহির সরওয়ার মেঘ তখন বাসাটিতেই ছিল।
সংবাদে আমরা ঘটনাটিকে লিখি—“সাংবাদিক দম্পতি হত্যা”। শব্দগুলো নির্ভুল, কিন্তু সম্পূর্ণ নয়। তাঁরা দুজন সাংবাদিক ছিলেন; আবার একটি শিশুর বাবা ও মা, দুই পরিবারের সন্তান, কারও ভাইবোন, কারও বন্ধু এবং অসংখ্য সহকর্মীর পরিচিত মুখও ছিলেন।
একটি শিরোনামে মানুষের সব সম্পর্ক ধরা পড়ে না।
সেদিনের পর মেঘের জীবনে সকাল আর কোনো সাধারণ সকাল ছিল কি না, আমরা জানি না। কিন্তু এটুকু জানি—আমাদের ক্যালেন্ডারে ২০১২ পেরিয়ে ২০২৬ এসেছে। সরকার বদলেছে, মন্ত্রী ও পুলিশপ্রধান বদলেছেন, তদন্তকারী কর্মকর্তা বদলেছেন, সংবাদমাধ্যমের প্রযুক্তি পাল্টেছে। ছোট্ট মেঘ বড় হয়েছে। অথচ রাষ্ট্র এখনো তাকে বলতে পারেনি—তার বাবা-মাকে কারা হত্যা করেছিল এবং কেন।
একটি শিশুর শৈশব পেরিয়ে যাওয়ার চেয়েও একটি তদন্ত কি দীর্ঘ হতে পারে?
বাংলাদেশের উত্তর—হ্যাঁ, পারে।
৪৮ ঘণ্টা থেকে ১২৯তম সময়সীমা
হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছিলেন, ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করা হবে। আতঙ্কিত মানুষকে আশ্বস্ত করার জন্য হয়তো কথাটি বলা হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায় থেকে উচ্চারিত প্রতিশ্রুতি বাতাসে হারিয়ে যায় না; সময়ের সঙ্গে তা রাষ্ট্রের নিজের বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
সেই ৪৮ ঘণ্টা ২০১২ সালেই শেষ হয়েছে।
২০২৬ সালের ২৭ আগস্টও পিবিআই তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। ঢাকার আদালত পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেছেন ৩০ সেপ্টেম্বর। বাসস, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন ও দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড—সব কটি সংবাদমাধ্যমের হিসাবে, এ নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদন জমার সময় ১২৯ বার পিছিয়েছে।
১২৯ বার!
সংখ্যাটি লেখা সহজ; এর ভেতরের অপমান বোঝা কঠিন।
১২৯ বার একটি পরিবার হয়তো ভেবেছে—এবার কিছু জানা যাবে।
১২৯ বার সাংবাদিকেরা লিখেছেন—“তদন্ত প্রতিবেদন আবার পেছাল।”
১২৯ বার আদালতের একটি তারিখ এসেছে এবং ফলাফল ছাড়াই চলে গেছে।
১২৯ বার রাষ্ট্র বলেছে—আরও কিছু সময় দরকার।
কিন্তু সময় শুধু তদন্তকারী সংস্থা পায়নি। সময় পেয়েছে সম্ভাব্য অপরাধীও। সাক্ষীর স্মৃতি দুর্বল হয়েছে, কর্মকর্তা বদলেছেন, ডিজিটাল তথ্য অপ্রাপ্য হয়ে থাকতে পারে, আলামতের অবস্থা পরিবর্তিত হয়েছে এবং ঘটনার সমসাময়িক সামাজিক প্রেক্ষাপট দূরে সরে গেছে।
বিলম্ব মানেই অপরাধীকে ইচ্ছাকৃতভাবে রক্ষা করা হয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত প্রমাণ ছাড়া দেওয়া যায় না। কিন্তু দীর্ঘ বিলম্ব যে তদন্তের কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত করে, তা অস্বীকার করারও উপায় নেই।
১২৯তম তারিখ তাই শুধু আদালতের একটি প্রশাসনিক সংখ্যা নয়। এটি প্রতিষ্ঠানগত ব্যর্থতার দীর্ঘ দিনপঞ্জি।
তদন্ত কি ব্যর্থ হয়েছে, নাকি আমরা সত্যিই জানতে চাইনি?
একটি রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি বলা সহজ। আরও কঠিন প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান কি নিজেদের পূর্ণ সামর্থ্য দিয়ে রহস্যটি উদ্ঘাটনের চেষ্টা করেছে?
আমি কোনো ব্যক্তি, রাজনৈতিক দল, নিরাপত্তা সংস্থা বা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বকে আদালতের আগে অপরাধী ঘোষণা করতে চাই না। সেটি সাংবাদিকতা নয়। কিন্তু চারটি তদন্তব্যবস্থা, বহু কর্মকর্তা এবং ১৪ বছরের পরও প্রশ্ন করা সাংবাদিকতারই দায়িত্ব।
কেন হত্যাস্থল দ্রুত ও সম্পূর্ণভাবে সুরক্ষিত করা যায়নি?
কেন এত মানুষ বাসাটিতে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিল?
প্রতিটি আলামতের সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও হস্তান্তরের পূর্ণ ধারাবাহিক নথি কি এখনো অক্ষত আছে?
কেন তদন্ত বারবার কর্মকর্তা ও সংস্থা বদলের ভেতর দিয়ে গেছে?
২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত র্যাবের হাতে থাকা মামলায় কেন পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এল না?
২০২৪ সালে গঠিত উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্সকে ছয় মাসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হলেও সেই সময়সীমা কেন কার্যকর হলো না?
এবং বারবার সময় চাওয়ার পরও কোনো তদন্ত কর্মকর্তার কাজের মূল্যায়ন বা প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি আমরা দেখিনি কেন?
প্রথম আলোর ২০২৫ সালের অনুসন্ধানে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে মামলাটির কার্যত কোনো তদন্ত হয়নি। র্যাবের একজন মুখপাত্র অবশ্য এই মূল্যায়নের বিরোধিতা করে বলেছিলেন, তদন্ত চলমান ছিল।
এই পরস্পরবিরোধী বক্তব্যই দেখায়, তদন্তের একটি স্বাধীন কার্যসম্পাদন-পর্যালোচনা কতটা প্রয়োজন। শুধু “তদন্ত চলছে” বললে আর যথেষ্ট নয়। কী কাজ হয়েছে, কী হয়নি, কেন হয়নি এবং কার দায়—এসবও জানতে হবে।
হত্যাস্থল যখন জনসমাগমে পরিণত হয়
অপরাধ তদন্তের প্রথম পাঠ হলো ঘটনাস্থলের অখণ্ডতা রক্ষা করা। কে প্রবেশ করলেন, কী স্পর্শ করলেন, কোন আলামত কোথা থেকে সংগ্রহ করা হলো এবং কার হেফাজতে গেল—প্রতিটি ধাপ নথিভুক্ত রাখতে হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব জাস্টিস বলছে, ডিএনএ আলামত অত্যন্ত সংবেদনশীল; ঘটনাস্থলে অপ্রয়োজনীয় মানুষের চলাচল সীমিত করা এবং আলামতের ‘চেইন অব কাস্টডি’ সংরক্ষণ করা তার গ্রহণযোগ্যতার জন্য অপরিহার্য।
সাগর–রুনির বাসায় তদন্তকারীরা পৌঁছানোর আগে বা ঘটনাস্থল নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় বহু সাংবাদিক, স্বজন, প্রতিবেশী ও অন্য মানুষ প্রবেশ করেছিলেন—এমন বক্তব্য পরে সরকারি পর্যায় থেকেও দেওয়া হয়। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর সংসদে সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষের প্রবেশে গুরুত্বপূর্ণ আলামত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা বলেছিলেন বলে CPJ নথিভুক্ত করেছে।
সাংবাদিক হিসেবে এখানে আমাদেরও আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
সহকর্মী নিহত হলে মানুষ ছুটে যাবেন—এটি মানবিক। সংবাদকর্মীরা দ্রুত তথ্য জানাতে চাইবেন—এটিও স্বাভাবিক। কিন্তু একটি হত্যাকক্ষ সংবাদ সম্মেলনের স্থান নয়। ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনের ভিড় যদি পদচিহ্ন, স্পর্শচিহ্ন বা জৈব আলামত দূষিত করে, তাহলে অজান্তেই সংবাদমাধ্যমও সত্যের পথ কঠিন করে তুলতে পারে।
তবে প্রধান দায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। ঘটনাস্থল নিয়ন্ত্রণ, প্রবেশ সীমিত করা এবং আলামত রক্ষা করা শোকাহত স্বজন বা সংবাদকর্মীর দায় নয়।
প্রথম কয়েক ঘণ্টায় হারিয়ে যাওয়া প্রেক্ষাপট পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত পরীক্ষাগারও পুরোপুরি ফিরিয়ে দিতে পারে না।
দুই অজ্ঞাত মানুষের ডিএনএ—আশা, কিন্তু সমাধান নয়
মামলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক আলামতের একটি হলো দুই অজ্ঞাত ব্যক্তির ডিএনএ।
প্রথম আলোর তদন্তভিত্তিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রুনির পোশাকে একজন এবং সাগরকে বাঁধতে ব্যবহৃত ওড়নায় অন্য একজন অজ্ঞাত ব্যক্তির ডিএনএ পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্রের পরীক্ষাগারে এসব নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছিল। পিবিআই পরবর্তী সময়ে সেই দুই প্রোফাইলের সঙ্গে মিল খুঁজতে সম্ভাব্য ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা করেছে।
শুনতে মনে হতে পারে—সত্য তো হাতের কাছেই। ওই দুজনকে খুঁজে পেলেই রহস্য শেষ।
ফরেনসিক বাস্তবতা এত সরল নয়।
কোনো বস্তুতে কারও ডিএনএ পাওয়া মানেই তিনি হত্যাকারী নন। তিনি বৈধ বা নির্দোষ কারণেও বস্তুটি স্পর্শ করে থাকতে পারেন। আবার নমুনা কখন, কীভাবে এবং কার উপস্থিতিতে সংগ্রহ করা হয়েছিল; সেটি একক নাকি মিশ্র প্রোফাইল; ঘটনাস্থলে কতজন প্রবেশ করেছিলেন—এসবের ওপর আলামতের ব্যাখ্যামূল্য নির্ভর করে।
এই কারণেই ডিএনএকে আলাদা করে নয়, সময়রেখা, সাক্ষ্য, ফোন রেকর্ড, অবস্থান, সম্ভাব্য উদ্দেশ্য এবং অন্যান্য আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে হয়।
এখন প্রয়োজন স্বাধীন ফরেনসিক পর্যালোচনা। জানতে হবে—
মূল নমুনা বা ডিএনএ এক্সট্রাক্ট এখনো সংরক্ষিত আছে কি না;
পরীক্ষাগারের পূর্ণ নথি, কাঁচা তথ্য ও মাননিয়ন্ত্রণ রেকর্ড পিবিআইয়ের হাতে আছে কি না;
আধুনিক বিশ্লেষণপদ্ধতিতে পুনঃপরীক্ষার বৈজ্ঞানিক সুযোগ আছে কি না;
নমুনা সংগ্রহ ও হস্তান্তরের পূর্ণ ‘চেইন অব কাস্টডি’ পুনর্গঠন করা সম্ভব কি না;
বৈধভাবে সংগৃহীত নতুন তুলনামূলক নমুনার সঙ্গে পরীক্ষা করা হয়েছে কি না।
এসব প্রশ্নের প্রকাশ্য উত্তর নেই। মামলাটির সবচেয়ে পরিচিত বাক্য তাই এখনো—“আমরা জানি না।”
হারিয়ে যাওয়া ল্যাপটপ ও মোবাইল: চুরি, বিভ্রান্তি নাকি অসমাপ্ত অনুসন্ধান?
সাগরের দুটি ল্যাপটপ ও একটি মোবাইল ফোন হত্যাকাণ্ডের পর বাসায় পাওয়া যায়নি বলে পরিবারের সদস্যরা CPJ-কে জানিয়েছেন। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, অন্য মূল্যবান জিনিস হারায়নি।
এই তথ্যটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন, কিন্তু অতিরঞ্জন ছাড়া।
ডিভাইসগুলো সাধারণ চুরির উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। অপরাধের উদ্দেশ্য অন্যদিকে ঘোরানোর জন্য সরানো হতে পারে। আবার সাংবাদিকতার কোনো অনুসন্ধান বা পেশাগত সূত্র মুছে ফেলার উদ্দেশ্যও থাকতে পারে।
শেষ সম্ভাবনাটি গুরুতর; কিন্তু এখনো প্রমাণিত নয়।
সাগরের সাবেক সহকর্মী আরাফাতুল ইসলাম CPJ-কে বলেছেন, সাগর পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে একটি বইয়ের কাজ করছিলেন এবং সংশ্লিষ্ট উপাদান হারানো ল্যাপটপে ছিল। সাগর ও রুনি দুজনেরই জ্বালানি খাত নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের এক বিবৃতিতে তাঁদের জ্বালানি খাতের দুর্নীতি-সংক্রান্ত অনুসন্ধানের কারণে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল বলে “ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়”—এমন কথা উল্লেখ করা হয়।
কিন্তু “ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়” এবং “তদন্তে প্রমাণিত”—এক কথা নয়।
সাগর–রুনি পেশাগত কাজের কারণে নিহত হয়েছিলেন কি না, রাষ্ট্র এখনো তা প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। তাই সম্ভাবনাকে সত্য বানানো যেমন অনুচিত, তেমনি হারানো ডিভাইসগুলোর পেশাগত গুরুত্ব উপেক্ষা করাও দায়িত্বহীনতা।
একজন সাংবাদিকের ল্যাপটপ শুধু যন্ত্র নয়। সেখানে সূত্র, নোট, অসমাপ্ত প্রতিবেদন, যোগাযোগের ইতিহাস এবং অনুসন্ধানের মানচিত্র থাকতে পারে।
সেই মানচিত্র হারিয়ে যাওয়া কখনো কখনো একটি জীবনের পাশাপাশি একটি অসমাপ্ত সত্যেরও মৃত্যু।
‘সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব’: সূত্র, প্রমাণ নাকি সংবাদসম্মেলনের নতুন রহস্য?
১৪ বছরের নীরবতার মধ্যে ২০২৬ সালের আগস্টে নতুন একটি দাবি সামনে আসে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, তাঁদের তদন্ত সংস্থা সাগর–রুনি মামলা তদন্ত করছে না; মামলাটি পিবিআইয়ের অধীনে। তবে অন্য একটি মামলার কল ডিটেইল রেকর্ড বা সিডিআর পর্যালোচনার সময় একজন “সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের” সম্ভাব্য সংযোগের সূত্র পাওয়া গেছে। সেটি যাচাই চলছে এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া গেলে পিবিআইকে দেওয়া হবে বলে তিনি জানান।
এখানে দুটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, এটি এখনো একটি প্রাথমিক সূত্র; আদালতে পরীক্ষিত প্রমাণ নয়।
দ্বিতীয়ত, দ্য ডেইলি স্টারের ৩০ আগস্টের প্রতিবেদনে পিবিআই-সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেছেন, তাঁদের তদন্ত দল তখনো এমন কোনো তথ্য পায়নি। তদন্ত কর্মকর্তা চলমান তদন্তের কথা বলে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।
অর্থাৎ, নতুন দাবিটির আনুষ্ঠানিক প্রাতিষ্ঠানিক হস্তান্তর ও যাচাই তখনো অসম্পূর্ণ ছিল।
এ অবস্থায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিল্পী, অভিনেতা বা অন্য পরিচিত ব্যক্তির নাম অনুমান করে ছড়ানো বিপজ্জনক। নাম প্রকাশ না করার অর্থ সংবাদমাধ্যম ও নাগরিকেরা অনুমান করে শূন্যস্থান পূরণ করবেন—এমন অনুমতি নয়।
একটি অপ্রমাণিত পোস্ট কয়েক ঘণ্টায় একজন নির্দোষ মানুষের সম্মান ধ্বংস করতে পারে। সত্যের দাবিতে দাঁড়াতে গিয়ে আমরা যেন আরেকটি অন্যায় সৃষ্টি না করি।
নতুন সূত্রের মূল্য সংবাদ সম্মেলনের আলোয় নয়, প্রমাণের পরীক্ষায় নির্ধারিত হবে। সিডিআরের মূল নথি, নম্বরের মালিকানা, সময়, অবস্থান, যোগাযোগের উদ্দেশ্য এবং অন্য স্বাধীন আলামতের সঙ্গে সম্পর্ক যাচাই করতে হবে। তারপর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
ক্লু থেকে প্রমাণের পথ দীর্ঘ। কিন্তু সেই পথ না পেরিয়ে কোনো নাম উচ্চারণ করা বিচার নয়—জনতার আদালত।
‘রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হত্যা’—একটি দাবির অসহনীয় ওজন
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ও বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা গণমাধ্যমে সাগর–রুনি হত্যাকে “স্টেট স্পন্সরড মার্ডার” বলে বর্ণনা করেছেন এবং দাবি করেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ আগে থেকে ঘটনার আভাস জানত। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও নিউ এজ তাঁর বক্তব্য প্রকাশ করেছে।
এটি অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ।
কিন্তু এ দাবির সমর্থনে কোনো পূর্ণাঙ্গ সাক্ষ্য, দাপ্তরিক নথি, ফোন রেকর্ড বা আদালতে গ্রহণযোগ্য আলামত প্রকাশ করা হয়নি। পিবিআইও এখনো এমন কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেনি। ফলে একে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে লেখা যাবে না।
কোনো হত্যাকে রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট বলা মানে শুধু একজন সরকারি কর্মকর্তার সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নয়। এর অর্থ হতে পারে রাষ্ট্রের তথ্য, ক্ষমতা, সম্পদ বা সুরক্ষা অপরাধের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন কিংবা আড়াল করতে ব্যবহৃত হয়েছে।
প্রমাণিত হলে এটি হবে রাষ্ট্রের নিজের নাগরিকের জীবনের অধিকারের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধ। আবার প্রমাণ ছাড়া অভিযোগটি ব্যবহার করা হলে তদন্ত রাজনৈতিক প্রতিশোধ ও চরিত্রহননের অস্ত্র হয়ে উঠতে পারে।
এই দুই বিপদের মাঝখানে একমাত্র নিরাপদ পথ—স্বাধীন, প্রমাণনির্ভর ও আদালতের নজরদারিতে পরিচালিত তদন্ত।
রাষ্ট্রকে নিজের ছায়ার ভেতরেও অনুসন্ধান করতে প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ রাষ্ট্রের মর্যাদা কখনো ভুল অস্বীকার করার মধ্যে নয়; নিজের প্রতিষ্ঠানের সম্ভাব্য অপরাধও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে পারার মধ্যে।
একটি অমীমাংসিত হত্যা যেভাবে সংবাদকক্ষে প্রবেশ করে
সাগর–রুনি হত্যার প্রভাব মামলা নম্বরের মধ্যে আটকে নেই। এর অদৃশ্য ছায়া বাংলাদেশের সংবাদকক্ষগুলোতে ছড়িয়ে আছে।
সাংবাদিকেরা সাধারণত একটি প্রতিবেদনের আগে ঝুঁকির তালিকা লিখে বসেন না। কিন্তু অভিজ্ঞতার সঙ্গে মনের ভেতর এক ধরনের নীরব হিসাব তৈরি হয়—
এই প্রতিবেদন করলে কারা অসন্তুষ্ট হবে?
মালিক কি পাশে থাকবেন?
মামলা হলে আইনজীবী কে দেবেন?
বাড়ি ফেরার সময় কেউ অনুসরণ করবে কি?
আমার সন্তানের স্কুলের ঠিকানা নিরাপদ তো?
বিপদে পড়লে সহকর্মীরা কত দিন আমার কথা মনে রাখবেন?
এসব কোনো সাংবাদিকতা বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে নেই। কিন্তু বহু বাংলাদেশি সাংবাদিকের বাস্তব শিক্ষার অংশ।
২০২০ সালে Media and Communication সাময়িকীতে প্রকাশিত মফিজুর রহমান ও মুশফিক ওয়াদুদের গবেষণায় বাংলাদেশের ২৩ জন বর্তমান ও সাবেক সাংবাদিকের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা দেখেন, সাংবাদিকের নিরাপত্তা শুধু শারীরিক হামলা থেকে বেঁচে থাকা নয়; এর সঙ্গে পেশাগত স্বাধীনতা, আর্থিক নিরাপত্তা, মানসিক চাপ এবং ক্ষমতাসীন কাঠামোর সঙ্গে আপসের প্রশ্নও জড়িত। অংশগ্রহণকারী সাত সাবেক সাংবাদিকের মধ্যে চারজন নিরাপত্তাহীনতার কারণে পেশা ছাড়ার কথা জানান।
গবেষণাটির নমুনা ছোট; তাই পুরো দেশের জন্য পরিসংখ্যানগত সাধারণীকরণ করা উচিত নয়। কিন্তু এর অন্তর্দৃষ্টি গভীর: নিরাপত্তাহীন সাংবাদিক কেবল আহত হন না—তিনি কখনো কখনো বেঁচে থাকার জন্য নিজের বস্তুনিষ্ঠতাও সংকুচিত করেন।
সেন্সরশিপ সব সময় কোনো কর্মকর্তা এসে কলম থামিয়ে দেয় না। কখনো সাংবাদিক নিজেই একটি বাক্য নরম করেন, একটি নাম বাদ দেন, একটি অনুসন্ধান মাঝপথে বন্ধ করেন। সম্পাদক জানেন খবরটি সত্য, তবু বলেন—“এখন সময় ভালো নয়।”
কোনো পুলিশ রিপোর্টে এই নীরবতার হিসাব থাকে না। কিন্তু সংবাদপত্রের প্রতিটি বাদ পড়া বাক্যে সমাজ একটু একটু করে অন্ধ হয়ে যায়।
ঢাকার বাইরে ভয় আরও ব্যক্তিগত
জাতীয়ভাবে পরিচিত কোনো সাংবাদিক আক্রান্ত হলে সংবাদমাধ্যম, আইনজীবী ও নাগরিক সমাজ অন্তত কিছুদিন পাশে দাঁড়ায়। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকের জীবন আরও নিঃসঙ্গ।
স্থানীয় দুর্নীতি, জমি দখল, বালু উত্তোলন, মাদক, বন উজাড় বা সরকারি প্রকল্পের অনিয়ম নিয়ে যিনি লেখেন, পরদিন তাঁকে একই বাজারে অভিযুক্ত ব্যক্তির মুখোমুখি হতে হয়। অভিযোগ করতে হয় সেই থানায়, যেখানে প্রভাবশালী ব্যক্তিটির যোগাযোগ থাকতে পারে। তাঁর প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী আইন বিভাগ নেই; অনেক ক্ষেত্রে নিয়মিত বেতনও নেই।
২০২৩ সালে জামালপুরের সাংবাদিক গোলাম রব্বানী নাদিম বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হন এবং পরে মারা যান। CPJ-এর নথি অনুযায়ী, তাঁর পরিবার মনে করে স্থানীয় এক রাজনৈতিক ব্যক্তিকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের প্রতিশোধ হিসেবে তাঁকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল। অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রথমে সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর বা অন্য কারও চূড়ান্ত দায় আদালতকেই নির্ধারণ করতে হবে।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের অস্থিরতার সময় সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে হাসান মেহেদি ও আবু তাহের মোহাম্মদ তুরাব নিহত হন বলে CPJ নথিভুক্ত করেছে। আরও সাংবাদিক আহত হন।
একজন সাংবাদিক যখন সংঘর্ষের মধ্যে দাঁড়ান, তাঁর হাতে অস্ত্র থাকে না—থাকে ক্যামেরা, কলম বা ফোন। কিন্তু “PRESS” লেখা পোশাক সব সময় সুরক্ষা দেয় না।
ক্ষমতাসীন ব্যক্তি ভাবেন, ক্যামেরা তাঁর অনিয়ম ধরে রাখবে। বিক্ষুব্ধ জনতা ভাবে, সাংবাদিক বিপরীত পক্ষের। পুলিশ মনে করে, তিনি অভিযানের পথে বাধা। রাজনৈতিক কর্মী আশা করে, তিনি তাদের পছন্দের ভাষায় সংবাদ লিখবেন।
সবার কাছে সাংবাদিক ব্যবহারযোগ্য; কারও কাছে নিরাপদ নন।
সাংবাদিকের প্রতিষ্ঠান কি সত্যিই তাঁর আশ্রয়?
সাংবাদিকদের অসহায়ত্ব নিয়ে লিখতে গেলে শুধু সরকার ও রাজনৈতিক দলকে দোষ দিয়ে দায় শেষ করা যায় না। সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও প্রশ্ন করতে হবে।
কতজন সাংবাদিক নিয়োগপত্র ছাড়া কাজ করেন?
কতজন সময়মতো বেতন পান?
হামলা বা মামলার শিকার হলে কতটি প্রতিষ্ঠান আইনজীবী দেয়?
ঝুঁকিপূর্ণ অনুসন্ধানের আগে কত সংবাদকক্ষে নিরাপত্তা পরিকল্পনা হয়?
স্থানীয় প্রতিনিধি আক্রান্ত হলে কেন্দ্রীয় কার্যালয় কত দিন তাঁর পাশে থাকে?
কত মালিক সম্পাদকীয় স্বাধীনতার চেয়ে ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক সম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেন?
একজন প্রতিবেদককে ঝুঁকিপূর্ণ অনুসন্ধানে পাঠিয়ে বিপদের সময় বলা হলো—“এটি তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়।” এর চেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসঘাতকতা আর কী হতে পারে?
গণমাধ্যমের স্বাধীনতা শুধু সরকারের সেন্সরশিপ না থাকার নাম নয়। সম্পাদককে মালিকের চাপ থেকে স্বাধীন থাকতে হবে, প্রতিবেদককে প্রতিষ্ঠানের আইনি ও নিরাপত্তা সহায়তা দিতে হবে এবং বিজ্ঞাপনদাতা যেন সংবাদ নির্ধারণ করতে না পারে, সেই কাঠামো তৈরি করতে হবে।
নিজের চাকরি, বেতন ও পরিবারের চিকিৎসা নিয়ে অনিশ্চিত একজন মানুষের কাছে অসীম সাহস দাবি করা সহজ; সেই সাহসকে রক্ষা করা কঠিন।
দায়মুক্তি অপরাধীর সবচেয়ে বড় সাহস
UNESCO-এর সর্বশেষ বৈশ্বিক হিসাবে, সাংবাদিক হত্যার প্রায় ৮৫ শতাংশ বিচারিকভাবে অমীমাংসিত। ২০১২ সালে হারটি ছিল প্রায় ৯৫ শতাংশ; কিছু উন্নতি হলেও বিশ্বের অধিকাংশ হত্যার বিচার এখনো হয় না।
এই পরিসংখ্যান শুধু হতাশার নয়; এটি নতুন অপরাধের আমন্ত্রণ।
সম্ভাব্য হামলাকারী যখন দেখে আগের হত্যার বিচার হয়নি, তার ভয় কমে। সে বুঝতে শেখে—তদন্ত দীর্ঘ করা যায়, সাক্ষীকে চুপ করানো যায়, আলামতের শক্তি ক্ষয় হতে দেওয়া যায় এবং মানুষের স্মৃতি বদলানোর অপেক্ষা করা যায়।
দায়মুক্তি কোনো অপরাধের সমাপ্তি নয়; এটি পরবর্তী অপরাধের প্রস্তুতি।
CPJ ২০২৪ সালে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে পাঠানো চিঠিতে বলেছে, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সময়ে অন্তত ১৪ জন সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী তাঁদের কাজের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত হামলায় নিহত হয়েছেন; আরও অন্তত আটজনের মৃত্যুর উদ্দেশ্য নিশ্চিত করা যায়নি।
প্রতিটি সংখ্যা একজন মানুষ, একটি পরিবার এবং অসমাপ্ত কিছু সংবাদের প্রতিনিধিত্ব করে।
কেন সাগর–রুনি মামলা সবার মামলা
কেউ প্রশ্ন করতে পারেন—দেশে এত হত্যা, এত অমীমাংসিত মামলা; একটিকে এত গুরুত্ব দেওয়া হবে কেন?
কারণ সাগর–রুনি মামলায় রাষ্ট্রের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ তদন্ত ও বিচারিক প্রতিষ্ঠান কোনো না কোনো সময় যুক্ত হয়েছে। থানা-পুলিশ, ডিবি, র্যাব, হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত টাস্কফোর্স এবং পিবিআই—সবাই এসেছে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব দ্রুত বিচারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। সাংবাদিক সমাজ বছরের পর বছর আন্দোলন করেছে।
তারপরও তদন্ত শেষ হয়নি।
এত প্রতিষ্ঠান, সময়, কর্মকর্তা ও জনদাবির পরও যদি একটি বহুল আলোচিত হত্যার তদন্ত শেষ না হয়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের অচেনা একজন সাংবাদিক নিজের জন্য কী আশা করবেন?
সাগর–রুনি মামলা তাই শুধু দুজন মানুষের হত্যার মামলা নয়। এটি রাষ্ট্রের তদন্তসক্ষমতার পরীক্ষা, রাজনৈতিক সদিচ্ছার পরীক্ষা, পুলিশের পেশাদারত্বের পরীক্ষা, আদালতের নজরদারির পরীক্ষা এবং সাংবাদিক সমাজের স্মৃতি ও সংহতির পরীক্ষা।
আমরা সেই পরীক্ষায় এখনো উত্তীর্ণ হতে পারিনি।
মেঘের কাছে রাষ্ট্রের উত্তর কী?
একটি সন্তানকে আমরা কী বলব?
বলব, মামলাটি প্রথমে থানা-পুলিশ, পরে ডিবি, এরপর র্যাব এবং শেষে পিবিআই তদন্ত করেছে?
বলব, আলামত বিদেশে পাঠানো হয়েছিল এবং বহু মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে?
বলব, দুই অজ্ঞাত ডিএনএ প্রোফাইল পাওয়া গেছে, কিন্তু তাদের পরিচয় জানা যায়নি?
বলব, নতুন একটি সিডিআর সূত্র পাওয়ার দাবি উঠেছে, কিন্তু সেটি এখনো আনুষ্ঠানিক প্রমাণ হয়নি?
বলব, ১২৯ বার সময় নেওয়া হয়েছে?
এসব তথ্য সত্য হতে পারে। কিন্তু এগুলোর কোনোটিই সেই উত্তর নয়, যা একটি সন্তান পাওয়ার অধিকার রাখে।
রাষ্ট্রের নথিতে সাগর ও রুনি একটি মামলা নম্বর। সংবাদপত্রের আর্কাইভে তাঁরা পুরোনো শিরোনাম। কিন্তু মেঘের জীবনে তাঁরা অনুপস্থিত বাবা ও মা।
রাষ্ট্রীয় ভাষা যতই নির্লিপ্ত হোক, এই মানবিক সত্য এড়ানোর উপায় নেই।
আরেকটি কমিটি নয়—প্রমাণে পৌঁছানোর পথ দরকার
এখন অন্তত আটটি কাজ জরুরি।
১. ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কথিত সিডিআর সূত্র অবিলম্বে লিখিতভাবে পিবিআই ও আদালতে দিতে হবে।
২. সূত্রটি কোন মামলার তদন্তে, কোন নথি থেকে এবং কী পদ্ধতিতে পাওয়া গেছে—তার সংরক্ষিত অডিট ট্রেইল রাখতে হবে।
৩. কথিত সাক্ষী বা তথ্যদাতার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং তাঁর বক্তব্য স্বাধীন আলামত দিয়ে যাচাই করতে হবে।
৪. দুই অজ্ঞাত ডিএনএ প্রোফাইল ও অবশিষ্ট নমুনা স্বাধীন ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে।
৫. হারানো ল্যাপটপ ও ফোনের সম্ভাব্য ব্যাকআপ, ই-মেইল হিসাব, সংবাদকক্ষের সার্ভার, পুরোনো যোগাযোগ নথি এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আইনসম্মতভাবে পুনরায় পরীক্ষা করতে হবে।
৬. প্রতিটি তদন্তকারী সংস্থার কাজের আলাদা পর্যালোচনা করতে হবে—কী আলামত পেয়েছিল, কী হস্তান্তর করেছে এবং কোথায় ব্যর্থ হয়েছে।
৭. আদালতে পরবর্তী সময় চাওয়ার আবেদনে শুধু “তদন্ত চলছে” বললে চলবে না। সম্পন্ন কাজ, অসমাপ্ত কাজ এবং বাধাগুলো শপথপূর্বক জানাতে হবে।
৮. পরিবারকে নিয়মিত ও আনুষ্ঠানিকভাবে অগ্রগতি জানাতে হবে। নিজেদের মামলার খবর তাঁদের সংবাদমাধ্যম থেকে জানতে হওয়া উচিত নয়।
মূল হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এবং পূর্ববর্তী তদন্তব্যর্থতার অনুসন্ধান—দুটি সমান্তরালে চলতে পারে।
এই লেখা কোনো রায় নয়
এই কলাম লিখে আমি কোনো মামলার রায় দিচ্ছি না। আমি জানি না সাগর ও রুনিকে কারা হত্যা করেছে। প্রকাশ্য প্রমাণের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী বলার অধিকারও আমার নেই।
তবে এটুকু বলা যায়—একটি রাষ্ট্র ১৪ বছরেও বহুল আলোচিত জোড়া হত্যার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত শেষ করতে না পারলে সেই ব্যর্থতাকে স্বাভাবিক বলা যায় না।
আগের লেখায় প্রশ্ন করেছিলাম—সত্য বলার অপরাধ কি মৃত্যু?
আজ আরও কয়েকটি প্রশ্ন যোগ করতে চাই।
সত্য অনুসন্ধানের মূল্য কি একজন সাংবাদিকের জীবন?
তার মৃত্যুর মূল্য কি ১২৯টি নতুন তারিখ?
একটি শিশুকালে শুরু হওয়া অপেক্ষার কি কোনো শেষ নেই?
আমরা কি পরবর্তী হত্যার পর আবার মানববন্ধন করার জন্য অপেক্ষা করব?
নাকি এমন একটি ব্যবস্থা দাবি করব, যেখানে সাংবাদিকের নিরাপত্তা কোনো সরকার, মালিক বা রাজনৈতিক দলের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে না?
সাগর–রুনির বিচার শুধু অতীতের একটি হত্যার বিচার নয়। এটি নির্ধারণ করবে ভবিষ্যতে একজন তরুণ প্রতিবেদক সাহস করে প্রশ্ন করতে পারবেন কি না।
এটি নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের সংবাদপত্রে সত্য পুরো বাক্যে লেখা হবে, নাকি প্রতিটি বাক্যের কিছু অংশ ভয়ে মুছে ফেলতে হবে।
ক্ষমতা ভুলে যেতে চায়। পরিবার পারে না। ইতিহাসও শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন করে।
সাগর ও রুনি আর ফিরে আসবেন না। কিন্তু তাঁদের হত্যার সত্য ফিরে আসতে পারে—যদি রাষ্ট্র সত্যিই তা খুঁজতে চায়, সাংবাদিক সমাজ স্মৃতি হারিয়ে না ফেলে এবং নাগরিকেরা একসঙ্গে বলেন:
আর কোনো অনির্দিষ্ট অপেক্ষা নয়—এবার বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত, যাচাইযোগ্য প্রমাণ এবং ন্যায়বিচার চাই।
আমরা যা জানি
সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় নিহত হন।
তাঁদের অল্পবয়সী সন্তান মেঘ বাসায় ছিল।
তদন্ত থানা-পুলিশ, ডিবি ও র্যাব পেরিয়ে বর্তমানে পিবিআইয়ের নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার অধীনে।
আদালত ২০২৬ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন জমার নতুন তারিখ দিয়েছেন।
এটি তদন্ত প্রতিবেদন জমার সময়সীমার ১২৯তম পরিবর্তন।
দুটি অজ্ঞাত ডিএনএ প্রোফাইলের কথা তদন্তভিত্তিক প্রতিবেদনে এসেছে।
সাগরের দুটি ল্যাপটপ ও একটি ফোন নিখোঁজ ছিল বলে পরিবার CPJ-কে জানিয়েছে।
ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর একটি সিডিআর সূত্রে “সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের” সম্ভাব্য সংযোগের দাবি করেছেন।
যা এখনো অস্পষ্ট
হত্যাকারী কারা এবং উদ্দেশ্য কী ছিল।
হত্যার সঙ্গে তাঁদের সাংবাদিকতার সম্পর্ক ছিল কি না।
অজ্ঞাত ডিএনএ প্রোফাইল দুটি কার।
হারানো ডিভাইসগুলো কেন নেওয়া হয়েছিল এবং কোথায় আছে।
নতুন সিডিআর সূত্র পিবিআইকে আনুষ্ঠানিকভাবে দেওয়া হয়েছে কি না।
“রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হত্যা” দাবির সমর্থনে আদালতগ্রাহ্য আলামত আছে কি না।
১৪ বছরের তদন্তব্যর্থতার জন্য কোন কর্মকর্তা বা প্রতিষ্ঠান কতটা দায়ী।
লেখকের পরিচিতি
মাহবুব আহমেদ
বাংলাদেশি-আমেরিকান উদ্যোক্তা, কলাম লেখক, লেখক, সম্পাদক এবং পরিবেশ ও মানবাধিকারের পক্ষে সক্রিয় কণ্ঠ।
সূত্র ও যাচাই নোট
এই কলামের মতামত ও বিশ্লেষণ লেখকের। মামলা-সংক্রান্ত তথ্য ৩১ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রকাশ্য আদালত প্রতিবেদন, তদন্তসংশ্লিষ্ট সংবাদ, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম অধিকার সংস্থা, সরকারি ও গবেষণা সূত্রের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়েছে। “সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সংযোগ” ও “রাষ্ট্রীয় মদদপুষ্ট হত্যা”—উভয়ই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি; কোনো আদালতে প্রমাণিত সিদ্ধান্ত নয়। পিবিআই ৩০ আগস্ট পর্যন্ত নতুন সূত্রটি পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেনি।
প্রধান সূত্র
দ্য ডেইলি স্টার: সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের দাবি ও পিবিআইয়ের ভিন্ন অবস্থান
প্রথম আলো: ছয় বছরের কার্যকর তদন্তহীনতা ও দুই ডিএনএ প্রোফাইল
CPJ: মেহেরুন রুনি—হারানো ডিভাইস, পেশাগত সূত্র ও তদন্তের ইতিহাস
গবেষণা: Re-Conceptualizing Safety of Journalists in Bangladesh
#সাগররুনি #কঠিনএইযুদ্ধ #সাংবাদিকনিরাপত্তা #বিচারহীনতা #PressFreedom #JusticeForSagarRuni #JournalistSafety #Bangladesh#foryou #foryoupage #fyp #viral # #viralreels #trending #trendingreels #reelsviral #explorepage #instareels #facebookreels #shortvideo #mustwatch #বাংলা #ট্রেন্ডিং




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।