দেশে ফিরলেই শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার: মৃত্যুদণ্ড, প্রত্যর্পণ ও বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থার কঠিন পরীক্ষা

দেশে ফিরলেই শেখ হাসিনা গ্রেপ্তার: ন্যায়বিচারের পরীক্ষা, নাকি বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিশোধের নতুন অধ্যায়?
ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণের ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সরকারের আইনমন্ত্রী বলছেন, দেশে পা রাখার পর আত্মসমর্পণের সুযোগ পাওয়ার আগেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে। মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড, ভারতের কাছে প্রত্যর্পণের আবেদন, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা—সব মিলিয়ে তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন এখন আর একজন নেতার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র, রাজনীতি ও আইনের শাসনের জন্য এক ঐতিহাসিক পরীক্ষা।
মাহবুব আহমেদ। রাজনৈতিক প্রতিবেদন।আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি
দেশের মাটিতে পা রাখার মুহূর্তেই গ্রেপ্তার—বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ঘিরে সরকারের বার্তা এখন স্পষ্ট এবং কঠোর।
বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেছেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে দেশে ফিরতে পারেন। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের রায় ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কার্যকর থাকায় দেশে ফেরার পর আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। এমনকি তিনি আদালতে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করার আগেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাঁকে গ্রেপ্তার করতে পারে।
আইনমন্ত্রীর ভাষায়, কোনো ব্যক্তিই আইনের ঊর্ধ্বে নন এবং সরকার আইনবহির্ভূত কোনো পদক্ষেপ নেবে না। তাঁর বক্তব্যের পর শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন নিয়ে এত দিনের রাজনৈতিক জল্পনা একটি বাস্তব আইনগত ও নিরাপত্তাজনিত প্রশ্নে রূপ নিয়েছে। (Anandabazar)
শেখ হাসিনা সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক দীর্ঘ টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তিনি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরতে চান। তাঁর সঙ্গে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদেরও দেশে ফিরে আদালতের সামনে উপস্থিত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
তাঁর ভাষ্যে, দেশে ফিরে তাঁকে গ্রেপ্তার, কারাবন্দী কিংবা হত্যা করা হতে পারে—তবুও তিনি ফিরবেন। এই ঘোষণা একদিকে রাজনৈতিক দৃঢ়তার প্রকাশ; অন্যদিকে এটি এমন এক সংঘাতের পূর্বাভাস, যেখানে আদালত, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, জনমত এবং আঞ্চলিক কূটনীতি একই সঙ্গে পরীক্ষিত হবে। (reuters.com)
মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে ফেরার ঘোষণা
২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের গণ-আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেয়। সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও একই মামলায় দণ্ডিত হন।
বিচারটি হয় তাঁদের অনুপস্থিতিতে। শেখ হাসিনা অভিযোগ অস্বীকার করে রায়কে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তাঁর দলকে বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে নির্মূল করার প্রচেষ্টা বলে দাবি করেছেন। আওয়ামী লীগও ট্রাইব্যুনালকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে চিত্রিত করেছে। (Human Rights Watch)
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত, আহত এবং নির্যাতিতদের পরিবার বলছে, দীর্ঘদিন রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার আড়ালে থাকা ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা ছাড়া বাংলাদেশে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
এই দুই অবস্থানের মাঝখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি দাঁড়িয়ে আছে: গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার অবশ্যই হতে হবে, কিন্তু সেই বিচার কীভাবে এমনভাবে পরিচালিত হবে, যাতে তা প্রতিশোধ নয়—ন্যায়বিচার হিসেবে ইতিহাসে স্বীকৃত হয়?
জুলাই–আগস্টে কী ঘটেছিল
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের স্বাধীন তথ্যানুসন্ধান প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্টে সরকারবিরোধী আন্দোলন দমনের সময় নিরাপত্তা বাহিনী ও আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার গুলিবর্ষণ, গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং অন্যান্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি পাওয়া গেছে।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ওই সহিংসতায় সর্বোচ্চ প্রায় ১,৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন। নিহতদের মধ্যে শিশু ও কিশোরও ছিল। আহত হন হাজার হাজার মানুষ। তদন্তকারীরা মনে করেন, আন্দোলন দমনে সংঘটিত কিছু কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়তে পারে। (OHCHR)
এই ভয়াবহতার বিচার চাওয়া কোনো রাজনৈতিক বিলাসিতা নয়; এটি নিহতদের পরিবার, আহত বিক্ষোভকারী এবং রাষ্ট্রীয় সহিংসতার শিকার মানুষের মৌলিক অধিকার।
শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, বিরোধী দল দমন, গণমাধ্যমের ওপর চাপ এবং নির্বাচনী ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও দীর্ঘদিন অভিযোগ ছিল। হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ বিভিন্ন সংস্থা বলেছে, তাঁর সরকারের অধীনে আইন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে ব্যবহার করা হয়েছিল। (Human Rights Watch)
এই বাস্তবতা এড়িয়ে শেখ হাসিনার বিচার নিয়ে আলোচনা করলে নিহত ও নিপীড়িত মানুষের প্রতি অবিচার করা হবে।
তবে একইভাবে, অতীতের অন্যায়ের প্রতিকার করতে গিয়ে নতুন সরকার যদি একই ধরনের নির্বিচার গ্রেপ্তার, রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, ভয়ভীতি কিংবা দুর্বল বিচারপ্রক্রিয়ার আশ্রয় নেয়, তাহলে সেটিও ন্যায়বিচার নয়। শুধু ক্ষমতার হাত বদল হবে; রাষ্ট্রের চরিত্র বদলাবে না।
বিচার নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ কেন
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জবাবদিহির প্রয়োজন স্বীকার করলেও তাঁর অনুপস্থিতিতে বিচার, নিজের পছন্দের আইনজীবীর মাধ্যমে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না পাওয়া এবং মৃত্যুদণ্ড দেওয়ায় গুরুতর উদ্বেগ জানিয়েছে।
সংস্থাটির মতে, মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কিন্তু বিচার যদি আন্তর্জাতিক মানের না হয়, তবে তা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার দেওয়ার পরিবর্তে রায়ের বৈধতাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। (Human Rights Watch)
এখানেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা আইনগতভাবে স্বাভাবিক হতে পারে, কারণ তাঁর বিরুদ্ধে আদালতের রায় ও পরোয়ানা রয়েছে। কিন্তু গ্রেপ্তারের পর তাঁকে নিরাপত্তা, আইনজীবী নিয়োগ, আদালতে বক্তব্য দেওয়া, প্রমাণ চ্যালেঞ্জ করা এবং উচ্চতর আদালতে আপিলের কার্যকর সুযোগ দিতে হবে।
আত্মসমর্পণের আগেই গ্রেপ্তারের প্রশ্নটি তাই মূল সমস্যা নয়। আসল প্রশ্ন হলো—গ্রেপ্তারের পর রাষ্ট্র তাঁর সঙ্গে কী আচরণ করবে এবং আদালত কতটা স্বাধীনভাবে বিচার করবে।
কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর দায়মুক্তির কারণ হতে পারে না। আবার তাঁর অজনপ্রিয়তা বা ক্ষমতাচ্যুত অবস্থাও ন্যায়বিচারের অধিকার কেড়ে নেওয়ার বৈধতা দেয় না।
মৃত্যুদণ্ড কি ন্যায়বিচারকে শক্তিশালী করে?
শেখ হাসিনার মামলার অন্যতম বিতর্কিত দিক মৃত্যুদণ্ড।
বাংলাদেশের আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো ধারাবাহিকভাবে এর বিরোধিতা করে আসছে। তাদের যুক্তি—মৃত্যুদণ্ড অপরিবর্তনীয়; বিচারপ্রক্রিয়ায় ভুল, রাজনৈতিক প্রভাব কিংবা অসম্পূর্ণ আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ থাকলে সেই ভুল সংশোধনের আর কোনো পথ থাকে না।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ যত গুরুতরই হোক, মৃত্যুদণ্ডের বদলে একটি পূর্ণাঙ্গ, প্রকাশ্য এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন বিচার বাংলাদেশের পক্ষে অধিক শক্তিশালী নৈতিক অবস্থান তৈরি করতে পারে।
রাষ্ট্রের লক্ষ্য যদি সত্য উদ্ঘাটন, ভুক্তভোগীদের মর্যাদা এবং ভবিষ্যতে একই অপরাধ প্রতিরোধ করা হয়, তবে শুধু কঠোরতম শাস্তি নয়—বিশ্বাসযোগ্যতম বিচারই তার প্রধান অস্ত্র হওয়া উচিত।
আইনদার্শনিক লন এল. ফুলার তাঁর The Morality of Law গ্রন্থে দেখিয়েছেন, আইন কেবল আদেশ বা শাস্তির সমষ্টি নয়; আইনের নৈতিক কর্তৃত্ব নির্ভর করে তার ধারাবাহিকতা, স্বচ্ছতা এবং ন্যায্য প্রয়োগের ওপর।
অর্থাৎ, যে বিচারকে জনগণ আগে থেকেই রাজনৈতিক ফলাফল হিসেবে ধরে নেয়, সে বিচার আইনগতভাবে বৈধ হলেও নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা হারাতে পারে।
পাসপোর্ট বাতিল, তবুও কি দেশে ফেরা সম্ভব?
শেখ হাসিনার বাংলাদেশি পাসপোর্ট বাতিল করা হয়েছে বলে সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, বৈধ পাসপোর্ট ছাড়া তিনি কীভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে ফিরবেন।
আইনমন্ত্রী বলেছেন, তাঁর ফেরার পথ বা ভ্রমণ নথির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেখবে। একজন নাগরিকের দেশে প্রবেশের অধিকার, বিশেষ ভ্রমণ অনুমতি এবং ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা—সব মিলিয়ে এ বিষয়ে পৃথক প্রশাসনিক ব্যবস্থা প্রয়োজন হতে পারে। (Anandabazar)
তবে পাসপোর্টের সমস্যার চেয়ে বড় বাধা ভারতের অবস্থান।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের জন্য ভারতের কাছে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। ২০২৬ সালের ৩১ জুলাই ভারতের সরকার একটি সংসদীয় কমিটিকে জানিয়েছে, অনুরোধটি দেশটির উপযুক্ত কর্তৃপক্ষ বিদ্যমান আইন ও প্রক্রিয়ার আলোকে পরীক্ষা করছে। এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। (The Times of India)
প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও সিদ্ধান্ত এত কঠিন কেন
ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রত্যর্পণ চুক্তি রয়েছে। ২০১৬ সালে চুক্তির কিছু বিধান সংশোধন করে অপরাধী প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছিল।
তবে চুক্তিতে এমন সুরক্ষাও রয়েছে, যার ভিত্তিতে ভারত দেখতে পারে অভিযোগটি ন্যায়বিচারের স্বার্থে সদ্ভাবে আনা হয়েছে কি না, এর মধ্যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না এবং প্রত্যর্পিত ব্যক্তি ন্যায়সংগত বিচার পাবেন কি না। (ISAS)
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে ভারতের সিদ্ধান্ত তাই নিছক আইনি নয়।
তিনি দীর্ঘদিন ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিলেন। তাঁর সরকারের সময় নিরাপত্তা সহযোগিতা, উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ, সংযোগ প্রকল্প এবং বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার হয়েছিল। তাঁকে প্রত্যর্পণ করলে ভারত নতুন ঢাকার সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করতে পারে, কিন্তু পুরোনো মিত্রকে ত্যাগ করার বার্তাও যাবে।
আবার প্রত্যর্পণ না করলে বাংলাদেশের একটি বড় অংশের কাছে ভারতকে বিচার এড়িয়ে যাওয়ার আশ্রয়দাতা হিসেবে দেখা হতে পারে।
বিশেষত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ভারতের সিদ্ধান্তকে আরও জটিল করতে পারে। আন্তর্জাতিক প্রত্যর্পণ ব্যবস্থায় অনেক দেশ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না করার নিশ্চয়তা চায়। যদিও ভারত নিজেও মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে, তবু রাজনৈতিকভাবে আলোচিত এবং অনুপস্থিতিতে পরিচালিত একটি মামলায় প্রত্যর্পণ কূটনৈতিক ও বিচারিক পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে।
স্বেচ্ছায় ফেরা: সাহস, কৌশল নাকি রাজনৈতিক পুনরুত্থানের চেষ্টা?
শেখ হাসিনার ঘোষণাকে তাঁর সমর্থকেরা সাহসী প্রত্যাবর্তনের প্রতিশ্রুতি হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, তিনি পালিয়ে থাকতে চান না; আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে অভিযোগ মোকাবিলা করতে চান।
সরকারের পক্ষ অবশ্য এই ঘোষণাকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান সরকারের কর্মকর্তারা মনে করেন, দেশে ফেরার বক্তব্যের মাধ্যমে শেখ হাসিনা নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করতে এবং নিষিদ্ধ দলটির রাজনৈতিক ভিত্তি পুনরুজ্জীবিত করতে চাইছেন। (reuters.com)
দুই ব্যাখ্যাই আংশিক সত্য হতে পারে।
দেশে ফিরে আদালতে দাঁড়ানো একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর জন্য রাজনৈতিক সাহসের পরিচয় হতে পারে। একই সঙ্গে বিচারকে রাজনৈতিক মঞ্চে রূপান্তর করে নিজেকে নির্যাতিত নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার কৌশলও হতে পারে।
শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা তাই আইনের পাশাপাশি প্রতীকের রাজনীতি।
তাঁর সমর্থকদের কাছে এটি নির্বাসন ভেঙে ফিরে আসার কাহিনি। বিরোধীদের কাছে এটি দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসনের দায় এড়াতে নতুন রাজনৈতিক নাটক। আর নিহতদের পরিবারের কাছে প্রশ্নটি আরও সরল—কে নির্দেশ দিয়েছিল, কে দায়ী এবং তাঁরা কবে পূর্ণ সত্য জানতে পারবেন?
আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকলে বিচার কতটা রাজনৈতিক থাকবে
শেখ হাসিনার বিচারের বিশ্বাসযোগ্যতার সঙ্গে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থার প্রশ্ন ওতপ্রোতভাবে যুক্ত।
ক্ষমতাচ্যুতির পর দলটির কার্যক্রম ও নির্বাচনী অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সরকারের যুক্তি, দলটির নেতৃত্ব এবং সংগঠনের একটি অংশ ২০২৪ সালের সহিংস দমন-পীড়নের সঙ্গে জড়িত ছিল।
কিন্তু সমালোচকদের প্রশ্ন—একটি দলের অভিযুক্ত নেতাদের বিচার এবং পুরো দলকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া কি একই বিষয়?
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সতর্ক করেছে, শেখ হাসিনার সরকার যেভাবে আইনকে বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করেছিল, নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা যদি আওয়ামী লীগ-সমর্থকদের বিরুদ্ধে একই পদ্ধতি অনুসরণ করে, তবে সেটিও মৌলিক স্বাধীনতার লঙ্ঘন হবে। (Human Rights Watch)
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো দল অপরাধের ঢাল হতে পারে না। কিন্তু অপরাধের দায়ও ব্যক্তিনির্ভর প্রমাণ ছাড়া লক্ষ-কোটি সমর্থকের ওপর আরোপ করা যায় না।
আওয়ামী লীগের শাসনামলের গুরুতর অপরাধের বিচার প্রয়োজন। একই সঙ্গে দলটির সাধারণ সমর্থক, ভিন্নমতাবলম্বী সদস্য এবং সহিংসতায় সম্পৃক্ত নন—এমন নাগরিকদের রাজনৈতিক অধিকারও রক্ষা করতে হবে।
ন্যায়বিচার আর সমষ্টিগত প্রতিশোধের সীমারেখাটি এখানেই।
শেখ হাসিনার আমলের উন্নয়ন কি অভিযোগ মুছে দিতে পারে?
শেখ হাসিনার সমর্থকেরা প্রায়ই তাঁর শাসনামলের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অবকাঠামো উন্নয়ন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং ভারতের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন।
পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, বিদ্যুৎ সংযোগের বিস্তার এবং মাথাপিছু আয় বৃদ্ধির মতো অর্জন বাংলাদেশের আধুনিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো অস্বীকার করা ইতিহাসকে রাজনৈতিকভাবে সংকুচিত করা হবে।
তবে উন্নয়ন কোনো সরকারকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় থেকে অব্যাহতি দেয় না।
সেতু নির্মাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কিংবা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি রাষ্ট্রীয় হত্যাকাণ্ড, গুম, নির্যাতন বা ভোটাধিকার হরণের অভিযোগের বিকল্প উত্তর নয়। একইভাবে, মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ প্রমাণের আগেই তাঁর শাসনামলের সব অর্জন অস্বীকার করাও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চা নয়।
একজন শাসকের উত্তরাধিকার প্রায়ই একই সঙ্গে নির্মাণ এবং ক্ষতের ইতিহাস বহন করে।
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ ইতিহাসবিদদের সামনে এই দ্বৈততা থাকবে—তিনি কি অর্থনৈতিক রূপান্তরের স্থপতি, নাকি কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার নির্মাতা? সম্ভবত উত্তরটি একটির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
বর্তমান সরকারেরও জবাবদিহি প্রয়োজন
শেখ হাসিনা সরকারের অপরাধের বিচার চাওয়া বর্তমান সরকারকে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে তোলে না।
পরবর্তী সময়ে হাজার হাজার রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তার, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, দলটির সমর্থক হিসেবে বিবেচিত সাংবাদিক ও আইনজীবীদের ওপর চাপ এবং হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহল। (SpComm Reports)
অতীতের দমননীতি নিন্দা করে বর্তমানের দমননীতিকে বৈধতা দেওয়া যায় না।
একটি সরকার তখনই নৈতিক উচ্চতা অর্জন করে, যখন সে তার সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও সেই অধিকার দেয়, যা পূর্ববর্তী সরকার অন্যদের দেয়নি।
শেখ হাসিনার জন্য ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করা তাঁর প্রতি রাজনৈতিক সহানুভূতি নয়; বরং ২০২৪ সালের নিহতদের বিচারকে আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য করার পূর্বশর্ত।
গ্রেপ্তারের মুহূর্তে সরকারের সামনে পাঁচ পরীক্ষা
শেখ হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরলে সরকারের প্রথম দায়িত্ব হবে তাঁর জীবন ও শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কোনো জনরোষ, রাজনৈতিক প্রতিশোধ বা হেফাজতে নির্যাতনের সুযোগ রাখা যাবে না।
দ্বিতীয়ত, তাঁকে অবিলম্বে স্বাধীন আইনজীবীর সহায়তা নিতে দিতে হবে।
তৃতীয়ত, বিচার ও আপিলের কার্যক্রম যতটা সম্ভব প্রকাশ্য ও পর্যবেক্ষণযোগ্য করতে হবে। দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক, গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতি বিচারকে শক্তিশালী করতে পারে।
চতুর্থত, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত রেখে একটি পূর্ণাঙ্গ আপিল ও পুনর্বিচারের সুযোগ বিবেচনা করা উচিত।
পঞ্চমত, তাঁর বিচারকে ব্যবহার করে নির্বিচারে দলীয় কর্মী বা সমর্থকদের দমন করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
এর একটিতেও ব্যর্থ হলে বিচার রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগ থেকে মুক্ত হতে পারবে না।
ইতিহাসের শিক্ষা: বিজয়ীর বিচার যথেষ্ট নয়
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ন্যুরেমবার্গ বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধের বিচারপ্রক্রিয়ায় নতুন দিগন্ত খুলেছিল। কিন্তু সেখানেও “বিজয়ীর বিচার” নিয়ে সমালোচনা উঠেছিল—কারণ বিচারকারীরা নিজেরা বিজয়ী শক্তি ছিলেন।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ঐতিহাসিক সতর্কতা প্রযোজ্য।
ক্ষমতাচ্যুত শাসকের অপরাধের বিচার করা সহজতর হয়, কারণ তিনি আর রাষ্ট্রযন্ত্র নিয়ন্ত্রণ করেন না। কঠিন কাজ হলো—বিচারকে এমন নিরপেক্ষতা দেওয়া, যাতে ভবিষ্যতে বর্তমান শাসকের বিরুদ্ধেও একই আইন একইভাবে প্রয়োগ করা যায়।
আইনের শাসন মানে শুধু ক্ষমতাচ্যুত ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়া নয়। আইনের শাসন মানে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিকেও আইন দিয়ে সীমাবদ্ধ রাখা।
জন লকের রাজনৈতিক দর্শনের মূল কথাগুলোর একটি ছিল—আইনের উদ্দেশ্য স্বাধীনতা ধ্বংস করা নয়, বরং স্বাধীনতাকে রক্ষা ও বিস্তৃত করা। রাষ্ট্র যখন আইনকে প্রতিশোধের অস্ত্রে পরিণত করে, তখন বিচার আর স্বাধীনতার রক্ষাকবচ থাকে না; তা ক্ষমতার ভাষায় পরিণত হয়।
দেশে ফেরা বাংলাদেশের রাজনীতিকে কীভাবে বদলাতে পারে
শেখ হাসিনা দেশে ফিরলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কয়েকটি বড় পরিবর্তন ঘটতে পারে।
প্রথমত, আওয়ামী লীগের ছড়িয়ে থাকা নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হতে পারে। তাঁর বিচারকে কেন্দ্র করে দলটি সাংগঠনিকভাবে পুনরায় সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আন্দোলনে নিহতদের পরিবার এবং আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক শক্তি দ্রুত রায় কার্যকর করার দাবি তুলতে পারে।
তৃতীয়ত, নিরাপত্তা পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হতে পারে। আদালত, বিমানবন্দর এবং কারাগার ঘিরে বিক্ষোভ ও পাল্টা বিক্ষোভের ঝুঁকি থাকবে।
চতুর্থত, ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুন মোড় নিতে পারে। তিনি স্বেচ্ছায় ফিরলে ভারত প্রত্যর্পণের কঠিন সিদ্ধান্ত থেকে সাময়িকভাবে মুক্ত হতে পারে। তবে তাঁর ফেরার ব্যবস্থাপনায় ভারতের ভূমিকা নিয়েও রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তৈরি হবে।
পঞ্চমত, বিচারপ্রক্রিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের কেন্দ্রে থাকবে। কোনো অনিয়ম বাংলাদেশের নতুন সরকারের গণতান্ত্রিক বৈধতা এবং বৈদেশিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
সংবাদপত্রের অবস্থান: দায়মুক্তিও নয়, প্রতিশোধও নয়
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ গুরুতর। ২০২৪ সালের হত্যাকাণ্ড, আহতদের দুর্দশা, গুমের শিকার পরিবার এবং দমন-পীড়নের ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক সুবিধাবাদের আড়ালে চাপা দেওয়া যাবে না।
একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হওয়া তাঁকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না।
কিন্তু একইভাবে, ক্ষমতাচ্যুত হওয়া তাঁর ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার বাতিল করে না।
তাঁর বিচার হতে হবে—কিন্তু বিচারটি এমন হতে হবে, যাতে অভিযুক্তের রাজনৈতিক পরিচয় নয়, প্রমাণ কথা বলে; প্রতিশোধ নয়, সত্য প্রতিষ্ঠিত হয়; মৃত্যুদণ্ডের তাড়না নয়, আইনের নৈতিক শক্তি দৃশ্যমান হয়।
বাংলাদেশের রাজনীতি বহুবার দেখেছে—আজকের অভিযুক্ত আগামী দিনের শাসক, আর আজকের বিচারক রাজনৈতিক শক্তি আগামী দিনের আসামি হয়ে উঠতে পারে। এই চক্র ভাঙার একমাত্র পথ হলো এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে আইন ব্যক্তি, দল ও সরকারের পরিচয় দেখে বদলে যায় না।
শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন কি না, শেষ পর্যন্ত সেটি তাঁর এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলোর সিদ্ধান্ত। কিন্তু তিনি ফিরলে বাংলাদেশ কী করবে—সেই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় চরিত্র নির্ধারণ করবে।
তাঁকে গ্রেপ্তার করা সহজ।
তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ করা তুলনামূলক কঠিন।
আর প্রতিহিংসা থেকে মুক্ত, আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন, ইতিহাসের সামনে টিকে থাকবে—এমন বিচার নিশ্চিত করা সবচেয়ে কঠিন।
বাংলাদেশের সামনে এখন সেই কঠিন কাজটিই।
( প্রতিবেদনটিতে ৩০–৩১ জুলাই ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আদালতের রায় ও অভিযোগগুলো প্রতিবেদনে আইনগত সত্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে; তবে তাঁর অস্বীকার, আওয়ামী লীগের বক্তব্য এবং বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগও সমান গুরুত্বে রাখা হয়েছে।)
#SheikhHasina #BangladeshPolitics #Bangladesh #AwamiLeague #JulyUprising #HumanRights #RuleOfLaw #IndiaBangladesh #শেখহাসিনা #বাংলাদেশ




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।