পদত্যাগের পর বিচারের মুখে রাষ্ট্রপতি? সাহাবুদ্দিনকে ঘিরে দায়মুক্তি, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রতিশোধের সাংবিধানিক লড়াই

রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর মো. সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার ও বিচারের দাবি উঠেছে রাজপথ ও রাজনীতিতে। কিন্তু সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ কি তাঁকে সব অভিযোগ থেকে রক্ষা করে, নাকি দাপ্তরিক ক্ষমতার বাইরে সংঘটিত অপরাধের জন্য সাবেক রাষ্ট্রপতিকেও আদালতের মুখোমুখি করা যায়? বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে এই প্রশ্ন এখন ব্যক্তির চেয়েও বড়।
মাহবুব আহমেদের বিশেষ প্রতিবেদন। ডেস্ক রিপোর্ট | প্রসঙ্গ বাংলাদেশ রাজনীতি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা হারানোর মুহূর্তটি প্রায়ই বিচার, প্রতিশোধ, জনরোষ ও ইতিহাস পুনর্লিখনের মুহূর্তে পরিণত হয়। রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের পরও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। বঙ্গভবন ছাড়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই জাতীয় নাগরিক পার্টি—এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, ইনকিলাব মঞ্চসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন তাঁর গ্রেপ্তার, তদন্ত ও বিচারের দাবি তুলেছে।
অন্যদিকে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি সব দাবি উড়িয়ে দিয়ে সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরে তাঁর পাল্টা বক্তব্য ছিল—তাঁর বিচার কীসের ভিত্তিতে হবে, সমালোচকদের আগে সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদ পড়ে দেখা উচিত।
এই মন্তব্যে অহংকার আছে কি না, রাজনৈতিক অসংবেদনশীলতা আছে কি না—তা নিয়ে বিতর্ক চলতে পারে। কিন্তু তাঁর উত্থাপিত সাংবিধানিক প্রশ্নটি বাস্তব এবং গুরুতর। কারণ আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি আছে; তবে সেই দায়মুক্তি সর্বগ্রাসী নয়। রাষ্ট্রপতির পদ ছেড়ে দিলেই সব সুরক্ষা শেষ হয়ে যায় না, আবার রাষ্ট্রপতি ছিলেন বলেই জীবনের সব কাজ বিচারের বাইরে চলে যায় না।
সুতরাং কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি হলো—সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তার করা উচিত কি না নয়; তাঁকে গ্রেপ্তার করার মতো সুনির্দিষ্ট, আমলযোগ্য অপরাধের অভিযোগ ও প্রমাণ আছে কি না।
পদত্যাগ: অসুস্থতা, না কি রাজনৈতিক চাপ?
মো. সাহাবুদ্দিন ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৮ সালের এপ্রিলে। কিন্তু মেয়াদের প্রায় দুই বছর বাকি থাকতেই ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই তিনি পদত্যাগ করেন।
পদত্যাগপত্রে তিনি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কিডনি-সংক্রান্ত জটিলতা এবং অটোনমিক নিউরোপ্যাথির মতো গুরুতর স্বাস্থ্যসমস্যার কথা উল্লেখ করেন। তিনি দাবি করেন, শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে সাংবিধানিক দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে উঠেছিল।
রয়টার্স জানিয়েছে, ৭৬ বছর বয়সী সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ এমন এক রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল সময়ে ঘটেছে, যখন শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে দেশে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তাঁর পদত্যাগের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন।
সাহাবুদ্দিনের বক্তব্য—কোনো রাজনৈতিক চাপ নয়, শারীরিক অসুস্থতাই তাঁর পদত্যাগের একমাত্র কারণ। তিনি আরও জানিয়েছেন, উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশে বা বিদেশে যাওয়াই এখন তাঁর প্রধান পরিকল্পনা।
তবে আন্তর্জাতিক ও দেশীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সরকারের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব, শেখ হাসিনার সঙ্গে তাঁর অতীত রাজনৈতিক সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য রাজনৈতিক চাপের কথাও এসেছে। রয়টার্সের একটি পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকার তাঁর পদে বহাল থাকা নিয়ে অস্বস্তিতে ছিল—যদিও সাহাবুদ্দিন নিজে এসব দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এখানেই সাংবাদিকতার একটি মৌলিক দায়িত্ব সামনে আসে: স্বাস্থ্যগত কারণ তাঁর আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা; রাজনৈতিক চাপ একটি সংবাদমাধ্যমভিত্তিক দাবি। প্রমাণ ছাড়া দ্বিতীয়টিকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে লেখা যাবে না।
কেন তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবি উঠছে?
সাহাবুদ্দিনের সমালোচকেরা প্রধানত তিন ধরনের রাজনৈতিক ও নৈতিক অভিযোগ সামনে আনছেন।
প্রথমত, তাঁরা বলছেন, শেখ হাসিনার সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় তিনি ওই সরকারের রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ ছিলেন।
দ্বিতীয়ত, ২০২৪ সালের আন্দোলন ও সহিংসতার সময় রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি যথেষ্ট দৃশ্যমান বা সক্রিয় ভূমিকা রাখেননি—এমন অভিযোগ তোলা হচ্ছে।
তৃতীয়ত, শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে তাঁর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য রাজনৈতিক অবিশ্বাস বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি বলেছিলেন, শেখ হাসিনা তাঁর কাছে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। পরে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সেই পদত্যাগের কোনো দালিলিক প্রমাণ তাঁর কাছে নেই। এই বৈপরীত্য ঘিরে তখনই তাঁর পদত্যাগের দাবি উঠেছিল।
এনসিপির নেতারা অভিযোগ করছেন, সাহাবুদ্দিন তাঁর পদত্যাগপত্রে এমন ভাষ্য তৈরি করেছেন, যা ভবিষ্যতে তাঁকে একটি “নিরাপদ প্রস্থান” দিতে পারে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং সদস্যসচিব আখতার হোসেন তাঁকে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস বলেছে, শুধু পদত্যাগের মাধ্যমে তাঁর দায় শেষ হয়ে যায় না; অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রচলিত আইনে বিচার করতে হবে। ইনকিলাব মঞ্চও তাঁর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের হত্যাকাণ্ড ও দমন-পীড়নে সহায়ক ভূমিকার অভিযোগ তুলেছে।
কিন্তু এসব বক্তব্যের বড় অংশ এখনো রাজনৈতিক অভিযোগ। আদালতে গ্রহণযোগ্য বিচারের জন্য প্রয়োজন হবে নির্দিষ্ট অপরাধ, নির্দিষ্ট ঘটনা, ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা, আইনগত উপাদান এবং বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ।
“তিনি অমুক সরকারের রাষ্ট্রপতি ছিলেন”—এটি রাজনৈতিক পরিচয়। নিজে নিজে এটি ফৌজদারি অপরাধ নয়।
“তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেননি”—এটি গুরুতর নৈতিক প্রশ্ন হতে পারে। কিন্তু নীরবতা সব পরিস্থিতিতে ফৌজদারি দায় সৃষ্টি করে না।
“তিনি অপরাধে সহায়তা করেছেন”—এটি বিচারযোগ্য অভিযোগ হতে পারে, তবে তখন দেখাতে হবে তিনি কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, কী নির্দেশ দিয়েছেন, কোন ক্ষমতা ব্যবহার করেছেন এবং সেই কাজের সঙ্গে অপরাধের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক কী।
সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ আসলে কী বলে?
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতিকে দুই স্তরের সুরক্ষা দেয়।
প্রথম সুরক্ষা: দাপ্তরিক কাজের জন্য আদালতে জবাবদিহি নয়
৫১(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে, রাষ্ট্রপতি তাঁর দপ্তরের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বা দায়িত্ব পালনের দাবি করে কোনো কাজ করলে কিংবা কোনো কাজ থেকে বিরত থাকলে, সে জন্য তাঁকে কোনো আদালতে জবাবদিহি করতে হবে না। তবে সেই কাজের কারণে সরকারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার অক্ষুণ্ন থাকে।
এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রপতির পদে থেকে দাপ্তরিক ক্ষমতা প্রয়োগের ক্ষেত্রে।
অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি হিসেবে—
কোনো সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত নেওয়া,
কোনো প্রস্তাব অনুমোদন বা প্রত্যাখ্যান করা,
দায়িত্বের আওতায় কোনো কাজ করা,
কিংবা দায়িত্বের অংশ হিসেবে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া—
এসব বিষয়ে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে আদালতে জবাবদিহির বাইরে রাখা হয়েছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে দেওয়া ব্যাখ্যায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমান বলেছেন, এই সুরক্ষা শুধু রাষ্ট্রপতির কার্যকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে করা কাজের ক্ষেত্রে পদত্যাগের পরও ৫১(১)-এর সুরক্ষা বহাল থাকতে পারে।
দ্বিতীয় সুরক্ষা: পদে থাকা অবস্থায় গ্রেপ্তার বা ফৌজদারি মামলা নয়
৫১(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির কার্যভারকালে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি কার্যধারা দায়ের বা চালু রাখা যাবে না এবং তাঁকে গ্রেপ্তার বা কারাবন্দী করার জন্য কোনো পরোয়ানাও জারি করা যাবে না।
কিন্তু এই দ্বিতীয় সুরক্ষার ভাষাই বলে দেয়—এটি কার্যভারকালের সঙ্গে যুক্ত।
সাহাবুদ্দিন পদত্যাগ করায় তিনি আর আসীন রাষ্ট্রপতি নন। ফলে পদে থাকা অবস্থায় গ্রেপ্তার না করার যে সাময়িক সুরক্ষা ছিল, তা আর স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহাল থাকার কথা নয়।
এর মানে এই নয় যে তাঁকে এখনই গ্রেপ্তার করা যাবে। এর মানে হলো, তিনি এখন আর শুধু পদমর্যাদার কারণে গ্রেপ্তার-অযোগ্য নন।
তাঁকে গ্রেপ্তার করতে হলেও ফৌজদারি কার্যবিধি, প্রমাণ, মামলার উপাদান এবং আদালতের যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি কি আজীবন এবং সর্বব্যাপী?
না।
রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি কোনো রাজতান্ত্রিক “রাজা ভুল করতে পারেন না” নীতি নয়। আধুনিক গণতন্ত্রে দায়মুক্তির উদ্দেশ্য ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে তোলা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকে প্রতিদিনের রাজনৈতিক প্রতিশোধমূলক মামলা থেকে রক্ষা করা।
সাংবিধানিক আইনবিদ এ ভি ডাইসি তাঁর Introduction to the Study of the Law of the Constitution গ্রন্থে “আইনের শাসন” বলতে বোঝান—কোনো ব্যক্তি সাধারণ আইনের ঊর্ধ্বে নন। তবে সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট কার্যসম্পাদনের জন্য সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা থাকতে পারে।
ওয়াল্টার ব্যাজহট তাঁর The English Constitution গ্রন্থে রাষ্ট্রের “dignified” এবং “efficient” অংশের পার্থক্য তুলে ধরেছিলেন। রাষ্ট্রপতি বা রাজা অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের মর্যাদাগত ধারাবাহিকতার প্রতীক; কিন্তু সেই প্রতীকী মর্যাদা অপরাধের লাইসেন্স নয়।
বাংলাদেশের ৫১ অনুচ্ছেদও মূলত একই ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করে—
একদিকে রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক স্বাধীনতা,
অন্যদিকে সরকারের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার,
এবং দাপ্তরিক সীমার বাইরে ব্যক্তিগত অপরাধের সম্ভাব্য বিচার।
আইনজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নিচের বিষয়গুলো সাধারণত রাষ্ট্রপতির দাপ্তরিক দায়মুক্তির বাইরে থাকতে পারে:
রাষ্ট্রপতি হওয়ার আগের কোনো অপরাধ;
ব্যক্তিগত দুর্নীতি;
অবৈধ আর্থিক লেনদেন;
ব্যক্তিগত ক্ষমতার অপব্যবহার;
রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কহীন ফৌজদারি কাজ;
ব্যক্তিগতভাবে কোনো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র বা সহায়তায় অংশগ্রহণ।
টিবিএস ও বিডিনিউজের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত আইনজ্ঞদের বক্তব্যেও বলা হয়েছে, ৫১ অনুচ্ছেদ রাষ্ট্রপতির সব ধরনের কর্মকাণ্ডের জন্য পূর্ণ দায়মুক্তি দেয় না। দাপ্তরিক দায়িত্বের বাইরে সংঘটিত অপরাধের বিচার সম্ভব।
“পুরপোর্টেড এক্সারসাইজ” বা দায়িত্ব পালনের দাবি—সবচেয়ে জটিল জায়গা
৫১(১) অনুচ্ছেদের ইংরেজি ভাষ্যে শুধু “exercise” নয়, “purported exercise” কথাটিও আছে—অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি বাস্তবে বৈধ ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন, নাকি ক্ষমতা প্রয়োগের দাবি করে কোনো কাজ করেছেন, সেই সীমান্তও সুরক্ষার মধ্যে পড়তে পারে।
এটি খুব বিস্তৃত ভাষা।
ধরা যাক, রাষ্ট্রপতি এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিলেন যা পরে আদালত অসাংবিধানিক বলে মনে করল। শুধু সিদ্ধান্তটি ভুল বা অসাংবিধানিক হলেই তাঁর ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায় তৈরি হবে না। কারণ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা না থাকলে রাষ্ট্রপতির প্রতিটি সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মামলায় অবরুদ্ধ হতে পারে।
কিন্তু যদি প্রমাণ হয়, কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির দপ্তরকে ব্যক্তিগত অপরাধ ঢাকার আড়াল হিসেবে ব্যবহার করেছেন—তখন প্রশ্ন উঠবে, কাজটি আদৌ দাপ্তরিক ছিল, নাকি দাপ্তরিক পরিচয়ের আড়ালে ব্যক্তিগত অপরাধ।
এই সীমারেখা সংসদীয় বক্তৃতা, রাজনৈতিক মিছিল বা ফেসবুক পোস্টে চূড়ান্ত করা যায় না। শেষ পর্যন্ত তা নির্ধারণ করতে হবে আদালতকে।
এখনই গ্রেপ্তারের দাবি কেন আইনের শাসনের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে?
একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে তদন্ত হওয়া উচিত—এটি গণতান্ত্রিকভাবে গ্রহণযোগ্য অবস্থান।
কিন্তু “আগে গ্রেপ্তার, পরে অভিযোগ খোঁজা”—এটি আইনের শাসন নয়।
গ্রেপ্তার কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার নয়, জনতার ক্ষোভ প্রশমনের অনুষ্ঠানও নয়। এটি একটি আইনগত প্রক্রিয়া, যার জন্য প্রয়োজন:
১. সুনির্দিষ্ট আমলযোগ্য অপরাধের অভিযোগ;
২. প্রাথমিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য বা প্রমাণ;
৩. প্রযোজ্য আইনের ধারা;
৪. তদন্তের প্রয়োজনীয়তা;
৫. পলায়ন, প্রমাণ নষ্ট বা সাক্ষী প্রভাবিত করার বাস্তব আশঙ্কা;
৬. এবং বিচারিক তদারকি।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাবিবুর রহমানের বক্তব্য অনুযায়ী, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট আমলযোগ্য ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে মামলা না হয়, ততক্ষণ শুধু রাজনৈতিক দাবির ভিত্তিতে গ্রেপ্তারের সুযোগ নেই।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুবার দেখা গেছে—আজকের বিজয়ী পক্ষ গতকালের শাসকদের বিচার করতে গিয়ে এমন প্রক্রিয়া তৈরি করেছে, যা পরে আবার তাদের বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হয়েছে।
ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধের মধ্যে পার্থক্য ফলাফলে নয়, প্রক্রিয়ায়।
প্রতিশোধ বলে: “লোকটি অপরাধী, তাকে ধরো।”
ন্যায়বিচার বলে: “অভিযোগ কী, প্রমাণ কোথায়, আইন কী বলে, আদালত কী সিদ্ধান্ত দেয়?”
আবার দায়মুক্তিকে ঢাল বানানোও সমান বিপজ্জনক
সাহাবুদ্দিনের সমালোচকদের উদ্বেগ একেবারে ভিত্তিহীন বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না।
বাংলাদেশে সাংবিধানিক পদ, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং রাজনৈতিক আনুগত্য বহুবার জবাবদিহি এড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। রাষ্ট্রপতির পদটি অনেকাংশে আনুষ্ঠানিক হলেও সংকটকালে সংসদ ভেঙে দেওয়া, প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ, জরুরি পরিস্থিতি এবং ক্ষমতার ধারাবাহিকতার প্রশ্নে এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, সংসদ বিলুপ্তি এবং রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় সাহাবুদ্দিন কেন্দ্রীয় সাংবিধানিক ভূমিকায় ছিলেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও তাঁকে ওই উত্তাল রূপান্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাতিষ্ঠানিক চরিত্র হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তাঁর ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসের প্রশ্ন থাকতেই পারে:
তিনি কি যথেষ্ট স্বাধীন ছিলেন?
তিনি কি রাজনৈতিক নির্দেশনার বাইরে সংবিধান রক্ষার চেষ্টা করেছিলেন?
২০২৪ সালের সহিংসতায় তিনি কেন আরও দৃশ্যমানভাবে কথা বলেননি?
শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র বিষয়ে তাঁর দুই ধরনের বক্তব্যের কারণ কী?
ক্ষমতার পালাবদলে তাঁর সিদ্ধান্তগুলো কতটা সাংবিধানিক, কতটা রাজনৈতিক ছিল?
এসব প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন।
কিন্তু সব প্রশ্নের উত্তর ফৌজদারি আদালতে হয় না। কিছু প্রশ্নের উত্তর সংসদীয় তদন্তে, কিছু স্বাধীন কমিশনে, কিছু ইতিহাসের নথিতে এবং কিছু রাজনৈতিক জবাবদিহির মাধ্যমে আসে।
তদন্ত মানেই গ্রেপ্তার নয়।
সমালোচনা মানেই অপরাধ নয়।
দায়মুক্তি মানেই নির্দোষতাও নয়।
নাহিদ ইসলামদের দাবির রাজনৈতিক শক্তি ও দুর্বলতা
এনসিপির দাবি জনরোষের একটি অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে। ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত ও আহতদের পরিবার এবং রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার মানুষের কাছে শুধু পদত্যাগ যথেষ্ট মনে না হওয়াই স্বাভাবিক।
তাঁরা প্রশ্ন করতে পারেন—রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে থাকা ব্যক্তি যখন গণহত্যা, নির্যাতন বা ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের সময় নীরব থাকেন, তখন তাঁর নৈতিক দায় থাকবে না কেন?
এই প্রশ্ন শক্তিশালী।
তবে এনসিপির অবস্থানের বিরুদ্ধে আরেকটি রাজনৈতিক প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন। তাঁর যুক্তি, ২০২৪ সালের ক্ষমতা পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা সাহাবুদ্দিনের কাছেই শপথ নিয়েছিলেন। তখন তাঁকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে মেনে নিয়ে পরে বিচার দাবি করা রাজনৈতিকভাবে অসংগত।
এই যুক্তিও পুরোপুরি অবান্তর নয়, তবে আইনগতভাবে চূড়ান্তও নয়।
কারও কাছে শপথ নেওয়া তাঁর সব পূর্ববর্তী বা পরবর্তী কাজকে ক্ষমা করে দেওয়ার সমান নয়। সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য তাঁকে সাময়িকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়ে থাকতে পারে। সেই স্বীকৃতি কোনো সম্ভাব্য ব্যক্তিগত অপরাধের দায় মুছে দেয় না।
আবার এনসিপিও শুধু “অপরাধ করেছেন” বললেই দায়িত্ব শেষ করতে পারে না। কোন অপরাধ, কখন, কীভাবে, কোন প্রমাণে—সেটি স্পষ্ট করতে হবে।
২০২৪ সালের সহিংসতার জন্য রাষ্ট্রপতির ফৌজদারি দায় সম্ভব?
তাত্ত্বিকভাবে অসম্ভব নয়, কিন্তু বাস্তবে অত্যন্ত কঠিন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো উচ্চপদস্থ ব্যক্তি সরাসরি গুলি না চালিয়েও দায়ী হতে পারেন—যদি প্রমাণ হয় তিনি অপরাধের পরিকল্পনা, নির্দেশ, সহায়তা, অনুমোদন বা আড়াল করার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
কিন্তু সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে তাঁর সাংবিধানিক ক্ষমতা, বাস্তব সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভূমিকা এবং সহিংসতার সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগসূত্র প্রমাণ করতে হবে।
শুধু তিনি রাষ্ট্রপতি ছিলেন—এতে কমান্ড রেসপনসিবিলিটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্টি হয় না।
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র মূলত প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভা। রাষ্ট্রপতি অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদকে প্রধানত আনুষ্ঠানিক হিসেবে বর্ণনা করেছে।
তবে আনুষ্ঠানিক পদ মানেই শূন্য দায়িত্ব নয়। যদি গোপন বৈঠক, লিখিত নির্দেশ, যোগাযোগ, সিদ্ধান্ত বা অপরাধের সহায়তার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়, তখন তদন্তের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
আইনের ভাষায় পরিচয় নয়, আচরণ বিচার্য।
দুর্নীতির অভিযোগ থাকলে কী হবে?
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য আলামত পাওয়া গেলে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন।
এই অবস্থান আইনের দৃষ্টিতে তুলনামূলকভাবে পরিমিত।
কারণ ব্যক্তিগত দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ, ঘুষ বা অর্থ পাচারের অভিযোগ রাষ্ট্রপতির স্বাভাবিক সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ নয়। সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকলে দুর্নীতি দমন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা আইন অনুযায়ী অনুসন্ধান করতে পারে।
তবে এখানেও দুটি বিপদ রয়েছে।
প্রথম বিপদ—দায়মুক্তির নামে তদন্তই না করা।
দ্বিতীয় বিপদ—ক্ষমতাচ্যুত ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে প্রমাণ ছাড়াই দুর্নীতির মামলা তৈরি করা।
একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে তদন্ত সংস্থা সরকারের প্রতিশোধের হাতিয়ার হবে না, আবার সাবেক ক্ষমতাবানদের রক্ষাকবচও হবে না।
বাংলাদেশের সামনে তিনটি সম্ভাব্য পথ
এক. রাজনৈতিক চাপের মুখে দ্রুত গ্রেপ্তার
এটি আন্দোলনকারী দলগুলোকে তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি দিতে পারে। কিন্তু সুনির্দিষ্ট মামলা ও প্রমাণ ছাড়া গ্রেপ্তার করা হলে তা আদালতে দুর্বল হয়ে পড়বে এবং সাহাবুদ্দিন নিজেকে রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হিসেবে উপস্থাপনের সুযোগ পাবেন।
এতে রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
দুই. দায়মুক্তির অজুহাতে সব অভিযোগ বন্ধ করে দেওয়া
এটি রাষ্ট্রপতি পদকে প্রায় অসীম সুরক্ষা দেওয়ার শামিল হবে। ভবিষ্যতের রাষ্ট্রপতিরা মনে করতে পারেন, দাপ্তরিক পরিচয়ের আড়ালে যেকোনো আচরণই বিচারের বাইরে থাকবে।
এটিও বিপজ্জনক।
তিন. স্বাধীন, নথিভিত্তিক প্রাথমিক অনুসন্ধান
সবচেয়ে যুক্তিসংগত পথ হতে পারে—
অভিযোগগুলো লিখিত ও নির্দিষ্ট করা;
দাপ্তরিক এবং ব্যক্তিগত কাজ আলাদা করা;
স্বাধীন আইনজ্ঞদের মতামত নেওয়া;
প্রয়োজন হলে সংসদীয় বা বিচারিক অনুসন্ধান কমিশন গঠন;
প্রাথমিক প্রমাণ মিললে নিয়মিত মামলা;
এবং আদালতের অনুমোদন ছাড়া কোনো রাজনৈতিক গ্রেপ্তার না করা।
এই প্রক্রিয়াই ন্যায়বিচার ও সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী শেখায়?
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সাবেক প্রেসিডেন্টের দাপ্তরিক কাজের দায়মুক্তি ও ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের বিচারযোগ্যতার মধ্যে পার্থক্য করার চেষ্টা করেছে। বিভিন্ন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণ নীতি হলো—রাষ্ট্রপ্রধানের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের জন্য বিশেষ সুরক্ষা থাকতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগত অপরাধ বা ক্ষমতার বাইরের কাজের জন্য অনির্দিষ্ট দায়মুক্তি নেই।
ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রাজিল, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও বিচার হয়েছে। এসব ঘটনার সাফল্য বা ব্যর্থতা নির্ভর করেছে বিচারব্যবস্থা কতটা স্বাধীন, অভিযোগ কতটা প্রমাণভিত্তিক এবং প্রক্রিয়াটি কতটা রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ছিল তার ওপর।
দক্ষিণ কোরিয়ায় সাবেক প্রেসিডেন্টদের বিচার গণতান্ত্রিক জবাবদিহির উদাহরণ হয়েছে। আবার কিছু দেশে সাবেক রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে মামলা প্রতিপক্ষ দমনের অস্ত্র হয়েছে।
বাংলাদেশ কোন পথ নেবে—এটি নির্ভর করবে সাহাবুদ্দিনের প্রতি রাজনৈতিক ভালোবাসা বা ঘৃণার ওপর নয়; প্রতিষ্ঠানগুলো আইনের প্রতি কতটা অনুগত, তার ওপর।
বিচার চাইতে হলে অভিযোগের তালিকা প্রকাশ করা হোক
যেসব দল সাহাবুদ্দিনের গ্রেপ্তার দাবি করছে, তাদের উচিত একটি সুসংগঠিত অভিযোগপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করা। সেখানে থাকতে হবে—
অভিযুক্ত কাজের তারিখ;
তাঁর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভূমিকা;
সংশ্লিষ্ট আইনের ধারা;
সাক্ষ্য, নথি বা যোগাযোগের প্রমাণ;
কাজটি কেন রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ নয়;
এবং কেন গ্রেপ্তার ছাড়া তদন্ত সম্ভব নয়।
এতে জনসাধারণও বুঝতে পারবে—এটি ন্যায়বিচারের দাবি, নাকি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অপমান করার আয়োজন।
একইভাবে সাহাবুদ্দিনেরও উচিত শুধু ৫১ অনুচ্ছেদ দেখিয়ে সব প্রশ্ন উড়িয়ে না দেওয়া। তিনি রাষ্ট্রপতি হিসেবে কোন কোন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, শেখ হাসিনার পদত্যাগপত্র নিয়ে তাঁর বক্তব্য কেন বদলেছে এবং ২০২৪ সালের সংকটে তাঁর ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ লিখিত ব্যাখ্যা প্রকাশ করা।
সাংবিধানিক দায়মুক্তি আদালতের মামলা ঠেকাতে পারে; ইতিহাসের প্রশ্ন ঠেকাতে পারে না।
সম্পাদকীয় মূল্যায়ন: রাষ্ট্রপতির বিচার নয়, আইনের শাসনের পরীক্ষা
মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য অপরাধের প্রমাণ থাকলে তদন্ত ও বিচার অবশ্যই হওয়া উচিত। রাষ্ট্রপতি পদ কোনো অপরাধীর নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে না।
কিন্তু রাজনৈতিক স্লোগান, জনতার ক্ষোভ কিংবা অতীত সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হলে সেটিও ন্যায়বিচার হবে না।
আইনের শাসন মানে কেবল ক্ষমতাবানকে বিচারের মুখোমুখি করা নয়; অজনপ্রিয় ব্যক্তিকেও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার অধিকার দেওয়া।
আজ সাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে প্রমাণ ছাড়াই গ্রেপ্তারকে বৈধ করা হলে কাল একই নজির অন্য রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, বিচারক বা নাগরিকের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।
রাষ্ট্রপতির দায়মুক্তি সীমিত হওয়া উচিত।
রাষ্ট্রের প্রতিশোধও সীমিত হওয়া উচিত।
আর সত্য অনুসন্ধান হওয়া উচিত সীমাহীন।
বাংলাদেশের সামনে তাই ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা ও সাংবিধানিক দায়মুক্তির মাঝখানে তৃতীয় একটি পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে—স্বাধীন তদন্ত, প্রকাশ্য প্রমাণ, নিরপেক্ষ আদালত এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত বিচার।
সাহাবুদ্দিন দোষী না নির্দোষ—এ সিদ্ধান্ত রাজপথ দেবে না, বঙ্গভবনও দেবে না। দিতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে আদালতকে।
আর সেই আদালত যদি স্বাধীন না হয়, তবে বিচার শুধু একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির হবে না—বিচারাধীন হয়ে পড়বে বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিজেই।
#মোহাম্মদ_সাহাবুদ্দিন #রাষ্ট্রপতি #সংবিধান #দায়মুক্তি #আইনের_শাসন #বাংলাদেশ_রাজনীতি #Article51 #BangladeshPolitics




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।