অনলাইন সাংবাদিকতার পথিকৃৎ তৌফিক ইমরোজ খালিদী

বাংলাদেশে সংবাদ যখন কাগজের পাতায় আর টেলিপ্রিন্টারের গতিতে চলত, তখন ইন্টারনেটে ২৪ ঘণ্টার সংবাদপ্রবাহের স্বপ্ন দেখেছিলেন তৌফিক ইমরোজ খালিদী। তাঁর জীবন তাই একজন সম্পাদকের জীবনীই নয়—বাংলাদেশি সাংবাদিকতার বদলে যাওয়ার ইতিহাসও।
পূর্ণাঙ্গ কলাম
তৌফিক ইমরোজ খালিদী শুধু একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রধান সম্পাদক ছিলেন না। তিনি এমন এক পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, যা সংবাদকে কাগজের পাতা থেকে তুলে এনে পাঠকের হাতের পর্দায় পৌঁছে দেয়। বাংলাদেশে অনলাইন সাংবাদিকতার বিস্তৃত ইতিহাসে তাঁর নাম তাই একজন সম্পাদক হিসেবে যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে নতুন একটি সংবাদধারার নির্মাতাদের একজন হিসেবেও।
লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ অক্টোবর ২০২৬, ৫৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা ও দ্য ডেইলি স্টার জানিয়েছে, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের পর তাঁকে সেন্ট বার্থোলোমিউ’স হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
মৃত্যুসংবাদটি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন তাঁর গড়া সংবাদমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের ২০ বছর পূর্তির প্রস্তুতি চলছিল। ২০০৬ সালের ২৩ অক্টোবর সাইটটি উন্মুক্তভাবে সংবাদ প্রকাশ শুরু করে। তার কয়েক সপ্তাহ আগে খালিদীর আকস্মিক চলে যাওয়া যেন একটি অসমাপ্ত আয়োজনের মাঝখানে থামিয়ে দিল দীর্ঘ কর্মযাত্রাকে।
সংবাদকক্ষ থেকে ডিজিটাল যাত্রা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে পড়াশোনা শেষে খালিদীর সাংবাদিকতা শুরু হয় ১৯৮৯ সালে, সানডে এক্সপ্রেস-এ। পরে কাজ করেছেন দ্য ডেইলি স্টার ও দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস-এ। কূটনীতি, ব্যবসা, অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে প্রতিবেদন এবং সম্পাদনার অভিজ্ঞতা তাঁকে সংবাদকক্ষের নানা স্তর চিনতে সাহায্য করে। ২০০০ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত তিনি বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রযোজক ও উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেন। তাঁর কর্মজীবনের এই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করেছে দ্য ডেইলি স্টার–এর শোকসংবাদও।
কিন্তু তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় তৈরি হয় দেশে ফিরে। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিজস্ব ইতিহাস অনুযায়ী, এর পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠানটি ২০০৫ সালে অনলাইনে সংবাদ সরবরাহকারী সংস্থা হিসেবে কাজ শুরু করেছিল। ২০০৬ সালে নতুন ব্যবস্থাপনায় সেটি রূপ নেয় ২৪ ঘণ্টার অনলাইন সংবাদমাধ্যমে। খালিদী তখন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন।
‘অনলাইন সংবাদ’ তখন আজকের মতো স্বাভাবিক ধারণা ছিল না। সংবাদপত্রের ওয়েবসাইট মানেই অনেকের কাছে ছাপা সংস্করণের অনুলিপি। বিডিনিউজের উদ্যোগ ছিল আলাদা: খবর প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না পরদিনের কাগজের; সংবাদ চলবে দিন-রাত, বাংলায় ও ইংরেজিতে। প্রযুক্তি ছিল মাধ্যম, কিন্তু পরিবর্তনের মূলে ছিল সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত—পাঠককে সংবাদ পাওয়ার সময় ও পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া।
প্রথম হওয়ার চেয়ে কঠিন: আস্থা গড়া
প্রযুক্তিগতভাবে নতুন কিছু চালু করা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের স্থায়ী পরিচয় গড়ে ওঠে পাঠকের আস্থায়। খালিদীর সহকর্মীদের স্মৃতিচারণে বারবার এসেছে তথ্য যাচাই, সূত্র উল্লেখ এবং গুজবের ওপর নির্ভর না করার newsroom-সংস্কৃতির কথা। বিডিনিউজের একটি স্মরণপ্রতিবেদনে গবেষক ও সাংবাদিক আফসান চৌধুরী বলেন, সংবাদকে মতামত থেকে আলাদা রাখার চেষ্টা ছিল খালিদীর গুরুত্বপূর্ণ অবদান। এটি সহকর্মীর মূল্যায়ন—স্বাধীন কোনো নিরীক্ষার ফল নয়; তবু একজন সম্পাদক কী ধরনের পেশাগত মানদণ্ড গড়তে চেয়েছিলেন, তার ইঙ্গিত দেয়।
এই মানদণ্ডের পরীক্ষা হয় ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কের জায়গায়। সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু দ্রুত খবর দেওয়া নয়; তথ্য যাচাই করে জনস্বার্থের বিষয় সামনে আনা, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নেওয়া, ভুল হলে তা সংশোধন করা এবং চাপের মুখেও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের দায় বহন করা। খালিদীর নেতৃত্বাধীন প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন সময়ে ওয়েবসাইট অপ্রাপ্য হওয়া, প্রতিবেদন সরানোর চাপ এবং আইনি জটিলতার মুখোমুখি হয়েছিল বলে সংবাদমাধ্যমগুলো প্রতিবেদন করেছে। ২০২৩ সালে সাইটটি অপ্রাপ্য হওয়ার ঘটনায় কারণ নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল—দ্য ডেইলি স্টার জানায়, তখন প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিরাও কী ঘটেছে তা বোঝার চেষ্টা করছিলেন। অতএব, প্রতিটি ঘটনার পেছনে একই উদ্দেশ্য বা দায়ী পক্ষ ছিল—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না।
আরেকটি আইনি অধ্যায়ও তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। দুর্নীতি দমন কমিশন ২০২০ সালে তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়ের বাইরে সম্পদ অর্জনের অভিযোগে মামলা করে; খালিদী অভিযোগ অস্বীকার করেন। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে দুদকের আবেদনের পর আদালত মামলার কার্যক্রম প্রত্যাহার করে তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন। অভিযোগকে প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; একই সঙ্গে মামলাটি দীর্ঘ সময় ধরে চলার বাস্তবতাও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও জবাবদিহির আলোচনায় উপেক্ষা করা যায় না।
একজন মানুষ, একটি প্রতিষ্ঠান—এবং তার সীমা
কোনো প্রতিষ্ঠানের পথিকৃৎকে স্মরণ করতে গিয়ে তাঁকে একাই পুরো ইতিহাসের রচয়িতা বানানো সহজ। বাস্তবতা আরও জটিল। অনলাইন সংবাদমাধ্যম গড়ে ওঠে সম্পাদক, প্রতিবেদক, আলোকচিত্রী, প্রযুক্তিবিদ, ডেস্ককর্মী এবং পাঠকের সম্মিলিত শ্রমে। বিডিনিউজের প্রথম দিককার সাফল্যও ছিল একটি দলের কাজ; খালিদীর ভূমিকা ছিল সেই দলকে নেতৃত্ব দেওয়া, প্রতিষ্ঠানটির সম্পাদকীয় পরিচয় গড়ে তোলা এবং নতুন মাধ্যমকে টেকসই করার চেষ্টা করা।
তাঁর উত্তরাধিকার তাই শুধু একটি ওয়েবসাইট নয়। তা হলো—বাংলাদেশে ২৪ ঘণ্টার ডিজিটাল সংবাদপ্রবাহ সম্ভব, বাংলা ও ইংরেজি অনলাইন সংবাদ একই প্রতিষ্ঠানে পাশাপাশি চলতে পারে, এবং খবরের বিশ্বাসযোগ্যতা গড়তে স্পষ্ট সূত্র ও যাচাইকে পেশাগত নিয়মে পরিণত করা যায়—এই ধারণাগুলোকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করার প্রয়াস।
এই উত্তরাধিকারকে অন্ধ প্রশংসায় ঢেকে রাখলে তাঁর কাজের প্রকৃত গুরুত্বও বোঝা যাবে না। একটি সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিদিন নতুন করে অর্জন করতে হয়। প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত নিষ্ঠা প্রতিষ্ঠানকে শুরু করতে পারে, কিন্তু তা টিকিয়ে রাখে স্বচ্ছ নীতি, স্বাধীন সম্পাদনা, ভুল সংশোধনের সংস্কৃতি, কর্মীদের নিরাপত্তা এবং পাঠকের কাছে জবাবদিহি। খালিদীর মৃত্যুর পর এই প্রশ্নগুলো আরও জরুরি: তাঁর সহকর্মীরা কীভাবে প্রতিষ্ঠানটির সম্পাদকীয় মান রক্ষা করবেন, নেতৃত্ব কীভাবে ভাগ হবে, আর নতুন প্রজন্ম কীভাবে সেই কাজকে এগিয়ে নেবে?
খবরের পর্দায় রয়ে যাওয়া ছাপ
অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসকে শুধু ওয়েবসাইটের জন্মতারিখ দিয়ে মাপা যায় না। মাপতে হয় পাঠকের অভ্যাসে তার প্রভাব দিয়ে—কখন খবর পড়া হবে, কোথায় পাওয়া যাবে, কোন ভাষায় পাওয়া যাবে, আর কোনো খবরের উৎস কীভাবে যাচাই করা হবে। তৌফিক ইমরোজ খালিদীর কাজ এই অভ্যাস বদলের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত।
একজন মানুষ চলে গেলে তাঁর তৈরি প্রতিষ্ঠান তাঁর হয়ে কথা বলে না; তাকে প্রতিদিন নিজের কাজ দিয়ে কথা বলতে হয়। খালিদীর স্মৃতির প্রতি সবচেয়ে কার্যকর শ্রদ্ধা হবে সেই newsroom-সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখা, যেখানে দ্রুততার চেয়ে নির্ভুলতা, আনুগত্যের চেয়ে স্বাধীনতা এবং আলোচনার চেয়ে যাচাই করা তথ্যের গুরুত্ব বেশি।
বাংলাদেশের অনলাইন সাংবাদিকতার ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক পথিকৃৎ—আরও নির্ভুলভাবে বললে, সেই ইতিহাসের অন্যতম প্রধান নির্মাতা। তাঁর যাত্রা শেষ হয়েছে; কিন্তু যে সংবাদযুগের দরজা তিনি খুলতে সাহায্য করেছিলেন, তার দায়িত্ব এখন তাঁর সহকর্মী ও পরবর্তী প্রজন্মের হাতে।
আমরা যা জানি / যা এখনো স্পষ্ট নয়
যা জানা:
তৌফিক ইমরোজ খালিদী ২ অক্টোবর ২০২৬ লন্ডনে ৫৯ বছর বয়সে মারা গেছেন।
১৯৮৯ সালে সাংবাদিকতা শুরু; দ্য ডেইলি স্টার, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ও বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে কাজ করেছেন।
২০০৬ সালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক হন।
তাঁর বিরুদ্ধে দুদকের করা মামলা ২০২৪ সালে প্রত্যাহার করা হয় এবং আদালত তাঁকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেন।
যা এখনো স্পষ্ট নয়:
পরিবারের পক্ষ থেকে জানাজা ও দাফনের সময়-স্থান জানানো হয়নি বলে প্রাথমিক প্রতিবেদনগুলো জানিয়েছে।
বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের পরবর্তী সম্পাদকীয় নেতৃত্ব ও পরিচালনা নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা পাওয়া যায়নি।
সূত্র ও যাচাই নোট
মৃত্যুসংবাদ ও চিকিৎসাসংক্রান্ত তথ্য বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা এবং দ্য ডেইলি স্টার–এর প্রতিবেদনের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া হয়েছে। কর্মজীবন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম গঠনে তাঁর ভূমিকা যাচাইয়ে দ্য ডেইলি স্টার এবং বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের নিজস্ব ইতিহাস ব্যবহার করা হয়েছে। দুদকের মামলার ফলাফল দ্য ডেইলি স্টার–এর আদালত-সংক্রান্ত প্রতিবেদন থেকে যাচাই করা হয়েছে। স্মরণপ্রতিবেদনে সহকর্মী ও ঘনিষ্ঠজনের বক্তব্য তাঁদের মূল্যায়ন হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে, স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।
সরাসরি সূত্র
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা: বিশিষ্ট সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদী আর নেই
The Daily Star: Graft case against bdnews24.com editor-in-chief withdrawn
#তৌফিকইমরোজখালিদী #বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর #অনলাইনসাংবাদিকতা #ডিজিটালসাংবাদিকতা #বাংলাদেশমিডিয়া #সাংবাদিকতা #স্মরণকলাম




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।