যুক্তরাজ্যে জন্মহার রেকর্ড নিম্নে, পরিবার গঠনের স্বপ্ন কি এখন বিলাসিতা?

জীবনযাত্রার ব্যয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ আর ‘নিঃসন্তান প্রজন্ম’: ব্রিটেনের তরুণরা কেন সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | বিশেষ ফিচার
একসময় পরিবার, সন্তান আর স্থায়ী সংসার ছিল ব্রিটিশ মধ্যবিত্ত জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ২০২৬ সালের ব্রিটেনে সেই চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বাড়িভাড়া, মর্টগেজ, শিশুর যত্নের ব্যয়, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান খরচ—সব মিলিয়ে নতুন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে, যেখানে বহু তরুণ-তরুণী সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা স্থগিত করছেন, কেউ কেউ একেবারেই তা বাতিল করে দিচ্ছেন।
সাম্প্রতিক সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে জন্মহার ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। ২০২৫ সালে সেখানে মোট জীবিত জন্মের সংখ্যা ছিল ৫৮৫,৩৯৬—যা ১৯৭৭ সালের পর সর্বনিম্ন। একই সঙ্গে মোট উর্বরতা হার (Total Fertility Rate) কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১.৩৯-এ, যেখানে জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখতে প্রয়োজন ২.১।
সন্তান এখন ভালোবাসার সিদ্ধান্ত নয়, অর্থনীতির সমীকরণ
বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমান প্রজন্মের জন্য সন্তান নেওয়া ক্রমেই অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিণত হচ্ছে।
ব্রিটেনের বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারণী সংস্থার প্রতিবেদনে দেখা গেছে, উচ্চ বাসাভাড়া, বাড়ির মূল্যবৃদ্ধি, ব্যয়বহুল চাইল্ডকেয়ার, ছাত্রঋণের চাপ এবং কর্মজীবনের অনিশ্চয়তা তরুণদের পরিবার গঠনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে।
অনেক তরুণ দম্পতি মনে করেন, সন্তানের জন্য আর্থিকভাবে নিরাপদ পরিবেশ তৈরি না করতে পারলে অভিভাবক হওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীনতার শামিল।
বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদদের মতে, আধুনিক নগরজীবনে একটি শিশুকে বড় করে তোলার খরচ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি। আবাসন ব্যয় এখন পরিবারের সবচেয়ে বড় আর্থিক বোঝা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পরিচালিত একাধিক গবেষণায়ও আবাসন ব্যয় ও জন্মহারের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
‘বেবি বুস্ট’ থেকে ‘বেবি বাস্ট’
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পশ্চিমা বিশ্বে যে ‘বেবি বুম’ দেখা গিয়েছিল, আজ তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে।
লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস (LSE)-এর গবেষকেরা বলছেন, বিশ্বব্যাপী উর্বরতার হার দ্রুত কমছে। ১৯৫০ সালে প্রতি নারীর গড় সন্তানসংখ্যা ছিল প্রায় ৫; বর্তমানে তা নেমে এসেছে ২.২-এ। যুক্তরাজ্যে সেই হার আরও কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কেবল অর্থনৈতিক সংকটের ফল নয়; এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও।
নারীর স্বাধীনতা, ক্যারিয়ার ও নতুন জীবনদর্শন
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংখ্যা গবেষকরা বলছেন, নারীদের শিক্ষা ও কর্মজীবনের বিস্তার পরিবার গঠনের সময়সূচি বদলে দিয়েছে। আজকের অনেক নারী প্রথমে শিক্ষা, ক্যারিয়ার, আর্থিক নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।
একই সঙ্গে বিবাহের গড় বয়স বেড়েছে, দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কে জড়ানোর প্রবণতা কমেছে এবং অনেকেই সন্তানবিহীন জীবনকে সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে দেখছেন।
রেকর্ড বয়সে মা-বাবা
অফিস ফর ন্যাশনাল স্ট্যাটিস্টিকস (ONS)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো মায়েদের গড় বয়স ৩১.১ বছর এবং বাবাদের গড় বয়স ৩৪ বছরে পৌঁছেছে। ১৯৭৫ সালে যা ছিল যথাক্রমে ২৬.৪ এবং ২৯.৫ বছর।
জনসংখ্যাবিদদের মতে, সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত যত দেরি হয়, শেষ পর্যন্ত সন্তানের সংখ্যা তত কমে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে।
বইয়ের পাতায় জনসংখ্যা সংকট
ব্রিটিশ জনসংখ্যাবিদ ও লেখক Paul Morland তাঁর বহুল আলোচিত বই No One Left এবং Tomorrow’s People-এ সতর্ক করেছেন যে নিম্ন জন্মহার কেবল জনসংখ্যা নয়, অর্থনীতি, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জাতীয় শক্তিকেও প্রভাবিত করতে পারে।
একই ধরনের উদ্বেগ তুলে ধরা হয়েছে The Empty Cradle গ্রন্থে। সেখানে বলা হয়েছে, উন্নত দেশগুলোতে জন্মহার পতন ভবিষ্যতে শ্রমশক্তি সংকট, পেনশন ব্যবস্থার চাপ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাসের কারণ হতে পারে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে?
হাউস অব লর্ডস লাইব্রেরির সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, কম জন্মহার এবং দ্রুত বয়স্ক হয়ে ওঠা জনসংখ্যা আগামী কয়েক দশকে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।
কম শিশু মানে ভবিষ্যতে কম কর্মী, কম করদাতা এবং বেশি অবসরপ্রাপ্ত নাগরিক।
অবশ্য কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অটোমেশন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এই চাপের কিছুটা মোকাবিলা করা সম্ভব হতে পারে।
একটি নীরব সামাজিক বিপ্লব
ব্রিটেনে সন্তান না নেওয়ার প্রবণতা শুধু একটি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান নয়; এটি আধুনিক সমাজের গভীর পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি।
যে প্রজন্ম একসময় বাড়ি, গাড়ি ও সন্তানকে সফল জীবনের প্রতীক ভাবত, সেই প্রজন্মের উত্তরসূরিরা এখন স্বাধীনতা, মানসিক স্বাস্থ্য, ক্যারিয়ার ও আর্থিক স্থিতিশীলতাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
ফলে প্রশ্নটি আর কেবল “কেন মানুষ কম সন্তান নিচ্ছে?” নয়।
প্রশ্নটি হলো—আধুনিক পৃথিবী কি এমন এক সমাজে রূপ নিচ্ছে, যেখানে সন্তান নেওয়া ধীরে ধীরে একটি ব্যয়বহুল স্বপ্নে পরিণত হচ্ছে?
SEO Title
UK Birth Rate Crisis: কেন সন্তান নিতে পিছিয়ে যাচ্ছে ব্রিটেনের তরুণ প্রজন্ম?
SEO Slug
uk-birth-rate-crisis-young-people-delaying-parenthood-cost-of-living
britain-fertility-decline-cost-of-living-crisis-2026
uk-young-generation-childbirth-economic-pressure
Meta Description
যুক্তরাজ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে তরুণরা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দিচ্ছেন। জন্মহার নেমেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। জানুন এর কারণ, প্রভাব ও ভবিষ্যৎ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জন্য আকর্ষণীয় ক্যাপশন
🇬🇧 ব্রিটেনে নতুন বাস্তবতা!
একসময় পরিবার গড়া ছিল স্বপ্ন। এখন অনেক তরুণ-তরুণীর কাছে সেটি বিলাসিতা।
বাড়িভাড়া, মর্টগেজ, শিশুর যত্নের ব্যয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ—সব মিলিয়ে যুক্তরাজ্যে জন্মহার নেমেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে।
তাহলে কি পশ্চিমা বিশ্ব প্রবেশ করছে ‘নিঃসন্তান প্রজন্মের যুগে’?
সম্পূর্ণ বিশ্লেষণ পড়ুন 👇
#UK #UnitedKingdom #BirthRate #FertilityCrisis #CostOfLiving #PopulationCrisis #Parenthood #FamilyPlanning #Demography #Economy #Childcare #HousingCrisis #Europe #GlobalTrends #BanglaNews #FeatureStory #InternationalNews #MahbubAhmed #UKNews #PopulationChange #FutureSociety




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।