যুক্তরাষ্ট্রে F-1 ও J-1 স্টুডেন্ট ভিসায় বড় পরিবর্তন: ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন DHS নিয়মে কী বদলাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য?

যুক্তরাষ্ট্রে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন যুগ: F-1 ও J-1 ভিসার ৩০ বছরের নিয়ম বদলে দিল DHS—স্বপ্নের পথে নতুন অনিশ্চয়তা, নাকি আরও শক্তিশালী নজরদারি?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক | সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি
একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে বসে হয়তো কোনো বাংলাদেশি, ভারতীয় কিংবা নাইজেরিয়ান শিক্ষার্থী তাঁর থিসিসের শেষ অধ্যায় লিখছেন। অন্যদিকে কোনো গবেষক ল্যাবরেটরিতে রাতভর পরীক্ষা চালাচ্ছেন। এতদিন তাঁদের একটি নিশ্চয়তা ছিল—যতক্ষণ তাঁরা বৈধভাবে শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত, ততক্ষণ যুক্তরাষ্ট্রে থাকার আইনি ভিত্তি ছিল “Duration of Status (D/S)”।
কিন্তু সেই দীর্ঘদিনের কাঠামো এখন ইতিহাস হতে চলেছে।
মার্কিন Department of Homeland Security (DHS) এমন একটি চূড়ান্ত বিধিমালা প্রকাশ করেছে, যা F-1 (Student Visa), J-1 (Exchange Visitor) এবং সংশ্লিষ্ট কিছু ভিসা ক্যাটাগরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রে থাকার নিয়ম আমূল বদলে দেবে। নতুন নিয়ম ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ থেকে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে।
এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক শিক্ষা ব্যবস্থার দর্শন পরিবর্তনেরও ইঙ্গিত।
যে নিয়ম তিন দশক ধরে চলেছে, সেটিই এখন বদলে যাচ্ছে
১৯৯০-এর দশক থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে “Duration of Status (D/S)” ব্যবস্থা কার্যকর ছিল।
এর অর্থ ছিল—
শিক্ষার্থী বৈধভাবে পড়াশোনা চালিয়ে গেলে নির্দিষ্ট মেয়াদের ভিসা শেষ হলেও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান বৈধ থাকত।
বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন, গবেষণা, OPT কিংবা উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন ধাপ তুলনামূলকভাবে নমনীয় ছিল।
শিক্ষাজীবনের প্রকৃত দৈর্ঘ্যের সঙ্গে আইনি অবস্থান যুক্ত থাকত।
নতুন নিয়মে সেই ধারণার পরিবর্তে আসছে Fixed Period of Admission।
অর্থাৎ, শিক্ষার্থীকে আর “স্ট্যাটাস” অনুযায়ী নয়, বরং I-94-এ নির্দিষ্ট শেষ তারিখ (Admit Until Date) দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। সাধারণভাবে এটি প্রোগ্রামের মেয়াদের সঙ্গে যুক্ত থাকবে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে চার বছরের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে। অতিরিক্ত সময় লাগলে USCIS-এর কাছে Extension of Stay আবেদন করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কেন শিক্ষার্থীদের দ্রুত ফিরে আসতে বলছে?
গত কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জরুরি পরামর্শ দিয়েছে—
যদি সম্ভব হয়, ১৫ সেপ্টেম্বরের আগেই যুক্তরাষ্ট্রে ফিরে আসুন।
কারণ—
যারা নতুন নিয়ম কার্যকরের আগে বৈধ D/S অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করবেন, তাঁদের জন্য একটি ট্রানজিশনাল ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু পরে নতুন করে প্রবেশ করলে নতুন বিধিমালা প্রযোজ্য হতে পারে।
এ কারণেই আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অফিসগুলো ভ্রমণ পরিকল্পনা নতুন করে পর্যালোচনা করতে বলছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো কী?
নতুন বিধিমালায় কয়েকটি পরিবর্তন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—
“Duration of Status (D/S)” ব্যবস্থা বাতিল।
I-94-এ নির্দিষ্ট শেষ তারিখ উল্লেখ থাকবে।
অতিরিক্ত সময়ের জন্য Extension of Stay আবেদন বাধ্যতামূলক হতে পারে।
F-1 শিক্ষার্থীদের Grace Period ৬০ দিন থেকে কমে ৩০ দিন হবে।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন, একাডেমিক লক্ষ্য পরিবর্তন এবং কিছু ক্ষেত্রে ট্রান্সফারের ওপর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ আসছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য এর অর্থ কী?
বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর হাজারো শিক্ষার্থী যুক্তরাষ্ট্রে যান।
বিশেষ করে—
STEM
Public Health
Computer Science
Engineering
Business
PhD Research
এসব ক্ষেত্রে অনেক প্রোগ্রাম চার বছরেরও বেশি সময় ধরে চলতে পারে।
নতুন ব্যবস্থায়—
দীর্ঘমেয়াদি গবেষণার শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত আবেদন করতে হতে পারে।
প্রশাসনিক জটিলতা বাড়তে পারে।
USCIS প্রসেসিং সময় নতুন উদ্বেগ তৈরি করতে পারে।
সমর্থকদের যুক্তি: “এটি নিরাপত্তা ও জবাবদিহির জন্য প্রয়োজন”
DHS-এর অবস্থান হলো—
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্ট্যাটাস আরও কার্যকরভাবে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হবে।
ভিসা অপব্যবহার কমবে।
অভিবাসন ব্যবস্থায় সমতা আসবে।
অন্যান্য নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসার মতো এখানেও নির্দিষ্ট সময়সীমা থাকবে।
সমর্থকদের মতে, আধুনিক অভিবাসন ব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি অপরিহার্য।
সমালোচকদের প্রশ্ন: “নিরাপত্তার নামে কি অনিশ্চয়তা?”
অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংগঠন এবং অনেক বিশেষজ্ঞ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
তাঁদের যুক্তি—
গবেষণা সবসময় নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হয় না।
পিএইচডি প্রোগ্রাম প্রায়ই চার বছরের বেশি দীর্ঘ হয়।
Extension অনুমোদনে বিলম্ব হলে শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তায় পড়বেন।
যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে তুলনামূলক কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।
একাডেমিক স্বাধীনতা বনাম প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ
এই বিতর্ক নতুন নয়।
আমেরিকান শিক্ষাব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে একটি দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল—
“বিশ্বের সেরা মেধা আমেরিকায় আসবে, গবেষণা করবে, উদ্ভাবন করবে।”
কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন, জাতীয় নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে।
ফলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীকে এখন কেবল শিক্ষার্থী নয়, অভিবাসন ব্যবস্থার অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
ইতিহাস কী বলে?
অভিবাসন ইতিহাসবিদ Mae M. Ngai তাঁর বিখ্যাত বই Impossible Subjects: Illegal Aliens and the Making of Modern America-এ দেখিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি কখনোই শুধু সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের বিষয় নয়; এটি জাতীয় পরিচয়, নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার প্রতিফলন।
আজকের এই পরিবর্তনও সেই দীর্ঘ ইতিহাসের নতুন অধ্যায়।
শিক্ষা শুধু অর্থনীতি নয়, সফট পাওয়ারও
বিশ্ববিদ্যালয়গুলো শুধু শিক্ষার্থী ভর্তি করে না।
তারা—
ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানী তৈরি করে।
গবেষণা অর্থনীতি চালায়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক শক্তিশালী করে।
যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রভাব (Soft Power) বাড়ায়।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর মার্কিন অর্থনীতি, গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিলিয়ন ডলারের অবদান রাখেন। ফলে তাঁদের জন্য নিয়ম কঠোর হলে তার প্রভাব বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার এবং স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।
যা এখনই করা উচিত
যারা বর্তমানে F-1 বা J-1 ভিসায় আছেন, তাঁদের জন্য বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ—
I-20 বা DS-2019-এর মেয়াদ ভালোভাবে যাচাই করুন।
I-94 তথ্য নিয়মিত পরীক্ষা করুন।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।
যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে ভ্রমণের আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের International Student Office-এর সঙ্গে পরামর্শ করুন।
দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বা প্রোগ্রাম হলে আগেভাগেই পরিকল্পনা করুন।
উপসংহার
এই পরিবর্তনকে কেউ বলছেন “প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সংস্কার”, আবার কেউ দেখছেন “আন্তর্জাতিক শিক্ষার ওপর নতুন চাপ” হিসেবে।
চূড়ান্ত মূল্যায়ন সময়ই করবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ কেবল একটি ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; এটি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতিতে এক ঐতিহাসিক মোড়।
#USA #StudentVisa #F1Visa #J1Visa #StudyInUSA #USImmigration #InternationalStudents #Bangladesh #HigherEducation #CaliforniaLetter




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।