সন্ত্রাসবাদ সূচকে অগ্রগতি, পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সংলাপ: বাংলাদেশের কূটনীতি কি নতুন বাস্তবতার পথে?

বিশ্ব নিরাপত্তা সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান উন্নত হলেও পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা ঘিরে উঠছে প্রশ্ন, বিতর্ক ও সম্ভাবনার নতুন সমীকরণ।
ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের নতুন অধ্যায়, নাকি পুরোনো বিতর্কের প্রত্যাবর্তন?
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্ক বরাবরই আবেগ, ইতিহাস এবং নিরাপত্তা-রাজনীতির এক জটিল সমীকরণ। সম্প্রতি বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের নিরাপত্তা ও সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা জোরদারের আলোচনা নতুন করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ঠিক এমন সময়েই আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মূল্যায়নকারী প্রতিষ্ঠান Numbeo-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বিশ্বের নিরাপদ নগর ও রাষ্ট্রগুলোর তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান আগের তুলনায় উন্নত হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠেছে—বাংলাদেশ যখন নিজস্ব নিরাপত্তা সক্ষমতা বৃদ্ধি করে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন করছে, তখন পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা কতটুকু?
বাংলাদেশের নিরাপত্তা সূচকের উন্নতি: কী বলছে আন্তর্জাতিক তথ্য?
বিশ্বব্যাপী জীবনযাত্রার মান, অপরাধপ্রবণতা ও নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংস্থার মূল্যায়নে গত এক দশকে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটসহ প্রধান নগরীগুলোতে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা, সন্ত্রাসবিরোধী গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং জঙ্গিবাদ দমনে ধারাবাহিক অভিযান আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়েছে।
বিশেষ করে ২০১৬ সালের হলি আর্টিজান হামলার পর বাংলাদেশ যে কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী কৌশল গ্রহণ করে, তা আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের নজর কাড়ে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাসবাদ দমনের একটি সফল উদাহরণ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে।
কেন পাকিস্তান?
প্রশ্নটি এখানেই।
যে পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক নিরাপত্তা আলোচনায় সন্ত্রাসবাদ, জঙ্গি নেটওয়ার্ক এবং সীমান্ত নিরাপত্তা সংকটের সঙ্গে আলোচিত হয়েছে, সেই রাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর প্রস্তাব অনেকের কাছে বিস্ময়কর।
সমালোচকদের মতে, পাকিস্তান এখনও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা অঙ্গনে একটি বিতর্কিত নাম। ওসামা বিন লাদেনের অ্যাবোটাবাদে অবস্থান, আফগান তালেবান প্রশ্ন, বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের কার্যক্রম নিয়ে দেশটি দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে রয়েছে।
বাংলাদেশের অনেক মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, ১৯৭১ সালের গণহত্যার দায় স্বীকার কিংবা আনুষ্ঠানিক ক্ষমা প্রার্থনার প্রশ্ন নিষ্পত্তি না করে নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে অগ্রসর হওয়া জনমনে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
আবার অন্য পক্ষ কী বলছে?
কূটনীতির ভাষা ভিন্ন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী শত্রু বলে কিছু নেই; স্থায়ী হয় কেবল জাতীয় স্বার্থ।
তাদের যুক্তি, পাকিস্তান বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সামরিক শক্তিধর মুসলিম রাষ্ট্র। দেশটির সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানেরও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ, মানবপাচার, আর্থিক জালিয়াতি ও আন্তঃদেশীয় অপরাধ মোকাবিলায় তথ্য বিনিময় বাংলাদেশের জন্য উপকারী হতে পারে।
তারা আরও মনে করিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব, তুরস্ক কিংবা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোও নিজেদের স্বার্থে বহু বিতর্কিত রাষ্ট্রের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বজায় রাখে।
ইতিহাসের ছায়া: যে প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না
বাংলাদেশ-পাকিস্তান সম্পর্কের আলোচনায় ১৯৭১ কখনোই অনুপস্থিত নয়।
বিশ্বখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তাঁর বিখ্যাত বই The Rape of Bangladesh-এ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নৃশংসতার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছিলেন।
মার্কিন গবেষক গ্যারি জে. ব্যাস তাঁর আলোচিত গ্রন্থ The Blood Telegram-এ দেখিয়েছেন, কীভাবে আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো সেই সময়ের মানবিক বিপর্যয়ের প্রতি পর্যাপ্ত গুরুত্ব দেয়নি।
বাংলাদেশের নাগরিক সমাজের একটি অংশ মনে করে, ইতিহাসের এই দায় ও ন্যায়বিচারের প্রশ্ন অমীমাংসিত রেখে নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে এগোনো মানে অতীতকে উপেক্ষা করা।
অন্যদিকে বাস্তববাদী কূটনীতিকরা বলেন, ইতিহাস স্মরণ রাখতে হবে, কিন্তু ভবিষ্যৎও নির্মাণ করতে হবে।
দক্ষিণ এশিয়ার নতুন নিরাপত্তা বাস্তবতা
বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তা বলতে আর শুধু সন্ত্রাসবাদ বোঝায় না।
এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে—
সাইবার হামলা
ডিপফেক ও তথ্যযুদ্ধ
আন্তঃদেশীয় অপরাধ
মানবপাচার
অর্থপাচার
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নিরাপত্তা ঝুঁকি
জলবায়ুজনিত নিরাপত্তা সংকট
এই নতুন বাস্তবতায় আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র একা নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে না।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও নিরাপত্তা সংলাপের নজির রয়েছে। ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার চেয়ে নিয়ন্ত্রিত সংলাপ অনেক সময় অধিক কার্যকর।
সমালোচনা বনাম সমর্থন: বিতর্ক কোথায়?
সমালোচকদের বক্তব্য
১৯৭১ সালের প্রশ্ন এখনও নিষ্পত্তিহীন।
পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এখনও বিতর্কমুক্ত নয়।
নিরাপত্তা সহযোগিতা রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে ভুলভাবে ব্যাখ্যা হতে পারে।
জাতীয় স্মৃতি ও জনমতের সংবেদনশীলতা উপেক্ষিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সমর্থকদের বক্তব্য
জাতীয় স্বার্থই কূটনীতির মূল ভিত্তি।
সন্ত্রাস, সাইবার অপরাধ ও মানবপাচার মোকাবিলায় তথ্য বিনিময় জরুরি।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য সংলাপ প্রয়োজন।
সহযোগিতা মানেই অতীত ভুলে যাওয়া নয়।
শেষ কথা
বাংলাদেশ আজ আর ১৯৭১ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্র নয়। আবার পাকিস্তানও ১৯৭১ সালের সেই রাষ্ট্র নেই। কিন্তু ইতিহাসের স্মৃতি, জাতীয় আবেগ এবং বাস্তব কূটনীতির মধ্যকার ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
পাকিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য সুযোগ নাকি ঝুঁকি—এর উত্তর সময়ই দেবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত, গণতান্ত্রিক সমাজে এই বিতর্ক থাকা স্বাভাবিক, কারণ রাষ্ট্র শুধু সরকারের নয়; রাষ্ট্র নাগরিকেরও।
আর তাই প্রশ্ন তোলার অধিকার যেমন আছে, তেমনি জাতীয় স্বার্থের পক্ষে যুক্তি দেওয়ার অধিকারও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
#SouthAsia #Geopolitics #Bangladesh #Pakistan #Security #CounterTerrorism #ForeignPolicy #InternationalRelations #Analysis #BanglaNews #WeeklyCalifornierChithi #WorldPolitics #Diplomacy #BangladeshNews #CurrentAffairs #EditorialAnalysis



এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।