যুক্তরাজ্যে ‘বদলে গেল স্বপ্নের হিসাব’: ৫ বছরের বদলে ১০-১৫ বছর অপেক্ষা, স্থায়ী বসবাসের নতুন নীতিতে উদ্বেগে লাখো অভিবাসী

দক্ষ কর্মী, স্বাস্থ্যকর্মী ও আন্তর্জাতিক পেশাজীবীদের জন্য কঠিন বাস্তবতা; সরকার বলছে ‘নিয়ন্ত্রণ’, সমালোচকেরা বলছেন ‘মাঝপথে নিয়ম বদল’
লন্ডন: প্রতিনিধি
যুক্তরাজ্যে বসবাসরত লাখো বৈধ অভিবাসীর জন্য স্থায়ী বসবাসের স্বপ্ন হঠাৎ করেই অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। দেশটির সরকার অভিবাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কারের অংশ হিসেবে এমন একটি নীতিগত পরিবর্তনের পথে হাঁটছে, যার ফলে বহু কর্মভিত্তিক ভিসাধারীর জন্য Indefinite Leave to Remain (ILR) বা স্থায়ী বসবাসের যোগ্যতা অর্জনের সময়সীমা ৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ১০ বছর করা হচ্ছে। কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা খাতের নির্দিষ্ট কর্মীদের জন্য সেই অপেক্ষা ১৫ বছর পর্যন্ত দীর্ঘ হতে পারে। (Mayer Brown)
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক পরিবর্তন নয়; বরং এমন একটি সিদ্ধান্ত যা আগামী এক দশকে যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজার, উচ্চশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিভা আকর্ষণের সক্ষমতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।
‘আমরা পাঁচ বছরের প্রতিশ্রুতিতে এসেছিলাম’
২০২১ সালের পর থেকে যুক্তরাজ্যে আসা বহু দক্ষ কর্মী, প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, বিশ্ববিদ্যালয় গবেষক এবং স্বাস্থ্যকর্মী যুক্তরাজ্যের বিদ্যমান নিয়মের ভিত্তিতেই তাদের জীবন পরিকল্পনা করেছিলেন। চাকরি পরিবর্তন, বাড়ি কেনা, সন্তানের শিক্ষা, এমনকি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব অর্জনের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও গড়ে উঠেছিল পাঁচ বছর পর স্থায়ী বসবাসের প্রত্যাশাকে কেন্দ্র করে।
কিন্তু নতুন প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় সেই হিসাব বদলে যাচ্ছে।
বিভিন্ন অভিবাসী সংগঠনের ভাষ্য, অনেক পরিবার ইতোমধ্যে ভিসা ফি, ইমিগ্রেশন হেলথ সারচার্জ (IHS), আইনজীবী ব্যয় এবং প্রশাসনিক খাতে হাজার হাজার পাউন্ড ব্যয় করেছে। এখন আরও পাঁচ থেকে দশ বছর অস্থায়ী অবস্থানে থাকতে হলে তাদের আর্থিক চাপ বহুগুণে বেড়ে যাবে। (The Guardian)
সরকারের যুক্তি: “স্থায়ী বসবাস একটি অধিকার নয়, অর্জন”
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো অভিবাসন ব্যবস্থাকে আরও “নিয়ন্ত্রিত, নির্বাচিত এবং ন্যায্য” করা।
সরকারের ‘Restoring Control over the Immigration System’ শ্বেতপত্রে বলা হয়েছে, যারা দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাজ্যের অর্থনীতি ও সমাজে অবদান রাখবেন, তাদেরই স্থায়ী বসবাসের সুযোগ দেওয়া হবে। সরকারের ভাষায়, “Settlement is a privilege, not a right” — অর্থাৎ স্থায়ী বসবাস কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়, বরং অর্জনের বিষয়। (GOV.UK)
সরকার আরও দাবি করছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে নিট অভিবাসন ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছিল। ফলে জনসেবা, আবাসন ও অবকাঠামোর ওপর চাপ বেড়েছে। নতুন নীতির লক্ষ্য সেই চাপ কমানো। (Reuters)
সমালোচকদের প্রশ্ন: “খেলা শুরু হওয়ার পর নিয়ম বদল?”
সবচেয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হলো—এই নতুন নিয়ম কি ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে থাকা অভিবাসীদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে?
এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর দীর্ঘ সময় পাওয়া যায়নি। ফলে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে লাখো মানুষের মধ্যে।
অভিবাসী অধিকারকর্মীরা বলছেন, মানুষ যখন যুক্তরাজ্যে এসেছে, তখন তাদের সামনে পাঁচ বছরের একটি স্পষ্ট পথনকশা ছিল। সেই নিয়মের ওপর ভিত্তি করেই তারা জীবনের বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন যদি মাঝপথে নিয়ম বদলে দেওয়া হয়, তবে সেটি আইনি ও নৈতিক—দুই দিক থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত অসংখ্য মতামত ও চিঠিতে অভিবাসীরা এটিকে “cruel”, “unfair” এবং “retrospective punishment” হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। (The Guardian)
সবচেয়ে বড় ধাক্কা স্বাস্থ্যসেবা ও কেয়ার সেক্টরে?
সম্ভবত সবচেয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া এসেছে সামাজিক সেবা (Social Care) খাত থেকে।
এই খাতে কর্মরত বহু বিদেশি কর্মী বছরের পর বছর কম বেতন, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং জনবল সংকটের মধ্যে কাজ করছেন। অথচ নতুন প্রস্তাবে তাদের জন্য স্থায়ী বসবাসের পথ আরও দীর্ঘ হতে পারে। মানবাধিকার সংগঠন ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো একে “অমানবিক” বলে অভিহিত করেছে। (The Guardian)
সমালোচকদের যুক্তি, ব্রিটেনের বৃদ্ধ জনগোষ্ঠী এবং স্বাস্থ্যসেবা খাত ইতোমধ্যেই বিদেশি কর্মীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। এমন পরিস্থিতিতে কঠোর নীতি দক্ষ কর্মীদের কানাডা, অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের মতো দেশে চলে যেতে উৎসাহিত করতে পারে।
অর্থনীতির জন্য ঝুঁকি নাকি প্রয়োজনীয় সংস্কার?
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিবাসন গবেষণা প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন গবেষক বলছেন, অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক যতই থাকুক, বাস্তবতা হলো যুক্তরাজ্যের বহু খাত এখনও আন্তর্জাতিক দক্ষ জনশক্তির ওপর নির্ভরশীল। (Migration Observatory)
বিশেষ করে—
NHS ও স্বাস্থ্যসেবা
প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
প্রকৌশল ও নির্মাণ
বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা
আর্থিক খাত
এই ক্ষেত্রগুলোতে আন্তর্জাতিক কর্মীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যদিকে নীতির সমর্থকেরা বলছেন, যুক্তরাজ্যের শ্রমবাজারে দীর্ঘদিন ধরে বিদেশি শ্রমিকের ওপর অতিনির্ভরতা তৈরি হয়েছে। নতুন নিয়ম স্থানীয় কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়ন ও নিয়োগে প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও উৎসাহিত করবে।
ইতিহাসের আলোয় বর্তমান বিতর্ক
অভিবাসন নিয়ে ব্রিটিশ রাজনীতির ইতিহাস নতুন নয়।
লেখক ও ইতিহাসবিদ ডেভিড গুডহার্ট তাঁর আলোচিত বই The Road to Somewhere-এ লিখেছিলেন, বিশ্বায়নের যুগে দক্ষ অভিবাসন অর্থনীতিকে শক্তিশালী করলেও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে পরিচয় ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে অর্থনীতিবিদ ফিলিপ মার্টিনসহ বহু গবেষক যুক্তি দিয়েছেন, উন্নত অর্থনীতিগুলোর প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে দক্ষ অভিবাসন প্রায় অপরিহার্য।
এই দুই বাস্তবতার সংঘাতই আজকের ব্রিটিশ অভিবাসন বিতর্কের কেন্দ্রে অবস্থান করছে।
সামনে কী?
সরকারের ‘Earned Settlement’ বা “অর্জিত স্থায়ী বসবাস” মডেল নিয়ে এখনও বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা চলছে। এতে কিছু ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান, উচ্চ আয়ের চাকরি, কর প্রদান, ভাষাগত দক্ষতা ও সামাজিক সংযুক্তির ভিত্তিতে অপেক্ষার সময় কমানোর সুযোগ থাকতে পারে। (Paragon Law)
তবে অভিবাসী সংগঠনগুলোর প্রধান দাবি একটাই—যারা পুরোনো নিয়মের অধীনে যুক্তরাজ্যে এসেছেন, তাদের জন্য পুরোনো শর্ত বহাল রাখতে হবে।
কারণ তাদের মতে, একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু তার আইন নয়, বরং সেই আইনের প্রতি মানুষের আস্থা।
আজকের বিতর্ক তাই কেবল ভিসা বা বসবাসের অনুমতি নিয়ে নয়; এটি বিশ্বাস, প্রতিশ্রুতি এবং একটি দেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে।
ব্রিটেনের অর্থনীতি হয়তো কঠোর অভিবাসন নীতি চায়, কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গেছে—সেই নীতির মূল্য কি শেষ পর্যন্ত দক্ষ মানুষদের আস্থাহানি হয়ে দাঁড়াবে?
#UKImmigration #ILR #UKVisa #BritishCitizenship #SkilledWorkerVisa #MigrationPolicy #UKNews #ImmigrationReform #NHSWorkers #InternationalStudents #Britain #BanglaNews #Diaspora #UKSettlement #GlobalTalent




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।