জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব রক্ষায় ঐতিহাসিক রায়; ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ বাতিল করল সুপ্রিম কোর্ট

জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব রক্ষায় ঐতিহাসিক রায়
ট্রাম্পের নির্বাহী আদেশ বাতিল করল সুপ্রিম কোর্ট: ১৪তম সংশোধনীর শক্তি, অভিবাসন রাজনীতি এবং আমেরিকার আত্মপরিচয়ের নতুন অধ্যায়
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট এমন একটি রায় দিয়েছে, যা শুধু অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎ নয়, বরং আমেরিকার সাংবিধানিক আত্মপরিচয়, নাগরিকত্বের ধারণা এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের ভিত্তিকেও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।
৩০ জুন ২০২৬ সালে ঘোষিত এই ঐতিহাসিক রায়ে আদালত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সেই নির্বাহী আদেশ বাতিল করে দেয়, যার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া নির্দিষ্ট শ্রেণির শিশুদের জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব (Birthright Citizenship) থেকে বঞ্চিত করা। প্রধান বিচারপতি জন রবার্টসের নেতৃত্বে সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা স্পষ্ট ভাষায় জানান, মার্কিন সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীকে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে পুনর্ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা কোনো প্রেসিডেন্টের নেই। (Reuters)
এই রায়কে ইতোমধ্যেই অনেকে ২১শ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে বর্ণনা করছেন। কারণ এটি কেবল একটি প্রশাসনিক নীতি বাতিল করেনি; বরং ১৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠিত একটি সাংবিধানিক নীতিকে পুনরায় দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। (Reuters)
১৪তম সংশোধনী: গৃহযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে জন্ম নেওয়া এক প্রতিশ্রুতি
১৮৬৮ সালে মার্কিন গৃহযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে যুক্ত হয় ১৪তম সংশোধনী। এর নাগরিকত্ব ধারায় বলা হয়:
“যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী এবং এর বিচারিক কর্তৃত্বের অধীন সকল ব্যক্তি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক।”
এই ধারাটি মূলত কুখ্যাত Dred Scott v. Sandford রায়ের প্রতিক্রিয়া হিসেবে গৃহীত হয়েছিল, যেখানে আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মানুষদের নাগরিকত্ব অস্বীকার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৮৯৮ সালের ঐতিহাসিক মামলা United States v. Wong Kim Ark-এ সুপ্রিম কোর্ট ঘোষণা করে যে যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী প্রায় সব শিশুই নাগরিক, তাদের পিতামাতার অভিবাসন অবস্থান যাই হোক না কেন। (Reuters)
এই নজিরই আজকের রায়ের কেন্দ্রে ছিল।
ট্রাম্পের পরিকল্পনা কী ছিল?
২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নির্বাহী আদেশ ১৪১৬০ জারি করেন। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিলেও অবৈধ অভিবাসী কিংবা অস্থায়ী ভিসাধারীদের সন্তানদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে না। প্রশাসনের যুক্তি ছিল, ১৪তম সংশোধনীর “subject to the jurisdiction thereof” বাক্যাংশের অর্থ অতীতে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। (Wikipedia)
কিন্তু মানবাধিকার সংগঠন, সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ এবং বহু অঙ্গরাজ্য সরকার এর বিরুদ্ধে আদালতে যায়। মামলাগুলো শেষ পর্যন্ত সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছে যায় এবং “Trump v. Barbara” নামে ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠে। (Wikipedia)
আদালত কী বলেছে?
সুপ্রিম কোর্টের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতে বলা হয়েছে, জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের প্রশ্নে সংবিধানের ভাষা, ইতিহাস এবং পূর্ববর্তী বিচারিক নজির এতটাই স্পষ্ট যে কোনো প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে সেটি পরিবর্তন করতে পারেন না। আদালত পুনরায় নিশ্চিত করেছে যে ১৪তম সংশোধনীর নাগরিকত্ব ধারা এখনও কার্যকর এবং তা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া শিশুদের সাংবিধানিক সুরক্ষা প্রদান করে। (Reuters)
রায়ের ফলে প্রতি বছর জন্ম নেওয়া সম্ভাব্য প্রায় আড়াই লাখ শিশুর নাগরিকত্ব প্রশ্নে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তা আপাতত দূর হয়েছে। (Reuters)
একটি বৃহত্তর প্রশ্ন: আমেরিকান হওয়া মানে কী?
এই মামলার কেন্দ্রে ছিল শুধু আইন নয়, পরিচয়ের প্রশ্নও।
বিখ্যাত মার্কিন ইতিহাসবিদ Jill Lepore তাঁর “These Truths” গ্রন্থে লিখেছেন, আমেরিকার ইতিহাস আসলে নাগরিকত্বের ধারণাকে ক্রমশ বিস্তৃত করার ইতিহাস। একইভাবে Alexis de Tocqueville উনিশ শতকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন যে আমেরিকার শক্তি তার রক্তসূত্রে নয়, বরং নাগরিক আদর্শে।
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব সেই আদর্শেরই একটি প্রতীক। এটি এমন এক ধারণা, যেখানে রাষ্ট্র বলে—“তুমি এখানে জন্মেছ, তাই তুমি আমাদেরই একজন।”
কেন এই রায় এত গুরুত্বপূর্ণ?
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি ট্রাম্প প্রশাসনের ব্যাখ্যা গৃহীত হতো, তাহলে ভবিষ্যতে জন্ম নেওয়া লক্ষ লক্ষ শিশুর নাগরিক পরিচয় অনিশ্চিত হয়ে যেত। নতুন একটি শ্রেণি তৈরি হতো, যারা যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নিয়েও নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পেত না।
ইতিহাসে এমন পরিস্থিতি বহু দেশে রাষ্ট্রহীন (Stateless) জনগোষ্ঠী তৈরির কারণ হয়েছে। জাতিসংঘ দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছে যে নাগরিকত্বহীনতা সামাজিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য এবং বৈষম্যের অন্যতম উৎস।
এই প্রেক্ষাপটে সুপ্রিম কোর্টের রায় কেবল একটি সাংবিধানিক ব্যাখ্যা নয়; এটি মানবিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নেও গুরুত্বপূর্ণ। (Axios)
অভিবাসন রাজনীতির নতুন বাস্তবতা
তবে এই রায়ের মাধ্যমে অভিবাসন বিতর্কের সমাপ্তি হয়নি।
ট্রাম্পপন্থী অনেক রাজনীতিক ইতোমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তারা কংগ্রেসের মাধ্যমে নতুন আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে পারেন। যদিও অধিকাংশ সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, ১৪তম সংশোধনীর ভাষা এবং দীর্ঘদিনের বিচারিক নজিরের কারণে এমন প্রচেষ্টা সফল হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। (The Guardian)
অন্যদিকে অভিবাসী অধিকারকর্মীরা এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিজয় হিসেবে দেখলেও সতর্ক করছেন যে আশ্রয়নীতি, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং নির্বাসন সংক্রান্ত আরও অনেক মামলা এখনও আদালতে বিচারাধীন। (Axios)
ইতিহাসের আদালতে
আমেরিকার ইতিহাসে কিছু রায় সময়ের সীমানা অতিক্রম করে জাতীয় পরিচয়ের অংশ হয়ে যায়।
Brown v. Board of Education বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে, Obergefell v. Hodges সমঅধিকারের পক্ষে এবং এখন “Trump v. Barbara” জন্মসূত্রে নাগরিকত্বের প্রশ্নে সেই তালিকায় যুক্ত হওয়ার পথে।
যুক্তরাষ্ট্র যখন স্বাধীনতার ২৫০তম বার্ষিকীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন সুপ্রিম কোর্টের এই রায় যেন একটি বার্তা পুনরায় স্মরণ করিয়ে দিল—আমেরিকার শক্তি কেবল সীমান্তে নয়, বরং সংবিধানের সেই প্রতিশ্রুতিতে, যা জন্ম, বর্ণ, ধর্ম বা পারিবারিক অবস্থানের ঊর্ধ্বে উঠে নাগরিকত্বকে একটি মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। (Reuters)
#BirthrightCitizenship #SupremeCourt #DonaldTrump #ImmigrationPolicy #USConstitution #14thAmendment #AmericanPolitics #USNews #WeeklyCalifornierChithi #TheUSAPage




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।