২৩ বছরের যুদ্ধের শেষ প্রহর: ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনা, কিন্তু শেষ হচ্ছে কি আমেরিকার প্রভাব?

২৩ বছরের যুদ্ধের শেষ প্রহর: ইরাক ছাড়ছে মার্কিন সেনা, কিন্তু শেষ হচ্ছে কি আমেরিকার প্রভাব?
সাদ্দাম হোসেনের পতন থেকে আইএসবিরোধী যুদ্ধ—দুই দশকের বেশি সময় ধরে রক্ত, বিপুল অর্থব্যয় ও রাজনৈতিক অস্থিরতার পর আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাক থেকে শেষ মার্কিন সেনাসদস্যও চলে যাওয়ার কথা। এই প্রত্যাহার ইরাকের সার্বভৌমত্ব পুনরুদ্ধারের প্রতীক, নাকি নতুন নিরাপত্তাশূন্যতার সূচনা—তা নিয়েই এখন বড় প্রশ্ন।
ডেস্ক রিপোর্ট । মধ্যপ্রাচ্যে। সাপ্তাহিক ক্যালিফোর্নিয়ার চিঠি
বাগদাদের ওপর দিয়ে একসময় যে মার্কিন যুদ্ধবিমানগুলো রাতের আকাশ চিরে উড়ে গিয়েছিল, ২৩ বছর পর সেই দীর্ঘ সামরিক অধ্যায়ের শেষ দৃশ্য রচিত হতে যাচ্ছে নীরবে। কামানের গর্জন নয়, এবার বিদায়ের ঘোষণা এসেছে হোয়াইট হাউসের কূটনৈতিক ভাষায়—আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে ইরাক থেকে যুক্তরাষ্ট্রের অবশিষ্ট সব সেনা প্রত্যাহার করা হবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি ১৪ জুলাই হোয়াইট হাউসে বৈঠকের পর এ সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেন। পেন্টাগনও জানিয়েছে, ২০২৪ সালে ওয়াশিংটন ও বাগদাদের মধ্যে সম্মত হওয়া ধাপে ধাপে সামরিক মিশন সমাপ্তির প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এই প্রত্যাহার সম্পন্ন হচ্ছে। বর্তমানে ইরাকে থাকা মার্কিন সেনাদের বড় অংশ সরাসরি যুদ্ধের পরিবর্তে পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও ইসলামিক স্টেট বা আইএসবিরোধী সহযোগিতায় নিয়োজিত। (AP News)
এই ঘোষণা নিছক কয়েক হাজার সেনার ঘাঁটি গুটিয়ে নেওয়ার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে ২০০৩ সালের একটি বিতর্কিত আক্রমণ, একটি রাষ্ট্রের পতন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিস্তার, আবু গারিবের মতো নির্যাতনের কলঙ্ক, আইএসের উত্থান, ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে দুই দশকের বিতর্ক।
একটি যুদ্ধের শুরু, যার ভিত্তিই পরে ভেঙে পড়ে
২০০৩ সালের ২০ মার্চ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন বাহিনী ইরাকে আক্রমণ শুরু করেছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের প্রধান যুক্তি ছিল—সাদ্দাম হোসেনের সরকার গণবিধ্বংসী অস্ত্র তৈরি করছে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি হয়ে উঠেছে।
বাগদাদ দখল এবং সাদ্দাম সরকারের পতনের পর পরিচালিত দীর্ঘ অনুসন্ধানে সেই কথিত অস্ত্রভান্ডারের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। ফলে যুদ্ধের নৈতিক ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে বিশ্বজুড়ে গভীর প্রশ্ন ওঠে। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রে আক্রমণের পক্ষে উপস্থাপিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা দাবিটিই শেষ পর্যন্ত অসত্য বা গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ প্রমাণিত হয়।
যুদ্ধের সমর্থকেরা এখনো যুক্তি দেন, সাদ্দাম হোসেন ছিলেন নির্মম একনায়ক। তাঁর শাসনামলে কুর্দিদের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার, রাজনৈতিক বিরোধীদের হত্যা, নির্যাতন এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রে আগ্রাসনের ইতিহাস ছিল। সেই শাসনের অবসান ইরাকিদের নির্বাচনী রাজনীতি ও সাংবিধানিক কাঠামো নির্মাণের সুযোগ দিয়েছে।
এই যুক্তি সম্পূর্ণ অস্বীকার করা কঠিন। কিন্তু সমালোচকেরা পাল্টা প্রশ্ন করেন—একজন স্বৈরশাসককে সরানোর নৈতিক দাবি কি মিথ্যা বা অপ্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ চালানোর আইনগত বৈধতা তৈরি করে? এবং শাসক অপসারণের পর রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, প্রশাসন ও সামাজিক কাঠামো রক্ষার দায়িত্ব যদি দখলকারী শক্তি পালন করতে ব্যর্থ হয়, তবে সেই অভিযানের সাফল্য কীভাবে বিচার করা হবে?
সাদ্দাম গেলেন, রাষ্ট্রও ভেঙে পড়ল
সাদ্দাম সরকারের পতনের পর যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন প্রশাসন ইরাকি সেনাবাহিনী ভেঙে দেয় এবং বাথ পার্টির সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক সরকারি কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করে। এই সিদ্ধান্তে একদিকে পুরোনো দমনমূলক কাঠামো অপসারিত হয়, অন্যদিকে অস্ত্র ব্যবহারে প্রশিক্ষিত ও ক্ষুব্ধ লাখো মানুষের সামনে রাষ্ট্রীয় জীবনে ফিরে আসার পথ বন্ধ হয়ে যায়।
পরবর্তী সময়ে সাবেক সেনাসদস্য, বাথপন্থী কর্মকর্তা, সুন্নি বিদ্রোহী এবং উগ্রপন্থী নেটওয়ার্কের একটি অংশ নতুন সশস্ত্র প্রতিরোধে যুক্ত হয়। আল-কায়েদা ইন ইরাকের উত্থান এবং পরে ইসলামিক স্টেটের বিকাশের পেছনে এই রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিপর্যয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে বহু গবেষক মনে করেন।
ইরাকের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, একটি সরকারকে পরাজিত করা এবং একটি কার্যকর রাষ্ট্র নির্মাণ করা এক বিষয় নয়। সামরিক বাহিনী কয়েক সপ্তাহে রাজধানী দখল করতে পারে, কিন্তু সামাজিক আস্থা, গ্রহণযোগ্য প্রতিষ্ঠান, ন্যায়বিচার ও রাজনৈতিক সমঝোতা যুদ্ধবিমান দিয়ে তৈরি করা যায় না।
যুদ্ধের মূল্য: ট্রিলিয়ন ডলার, অগণিত জীবন
Brown University-এর Costs of War প্রকল্পের হিসাবে, ২০০৩ থেকে ২০২৩ সালের শুরুর দিক পর্যন্ত ইরাক ও সিরিয়া-সম্পর্কিত মার্কিন যুদ্ধব্যয়, ভবিষ্যৎ সেনা-চিকিৎসা এবং প্রতিবন্ধিতা ব্যয়সহ মোট আর্থিক দায় প্রায় ২ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। শুধু ইতোমধ্যে ব্যয় হওয়া ও প্রতিশ্রুত মার্কিন অর্থের পরিমাণই প্রায় ১ দশমিক ৭৯ ট্রিলিয়ন ডলার বলে গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। (Costs of War)
এই সংখ্যাগুলোও যুদ্ধের পূর্ণ মূল্য প্রকাশ করে না। কারণ অর্থের হিসাব করা গেলেও হারিয়ে যাওয়া শৈশব, মানসিক আঘাত, ভেঙে যাওয়া পরিবার, ধ্বংস হওয়া হাসপাতাল, স্কুল এবং সামাজিক বন্ধনের সঠিক আর্থিক মূল্য নির্ধারণ সম্ভব নয়।
Brown University-এর বিস্তৃত হিসাবে, ২০০১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন ও পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ সংশ্লিষ্ট প্রত্যক্ষ সহিংসতায় ৯ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৪ লাখ ৩২ হাজারের বেশি বেসামরিক নাগরিক। যুদ্ধের কারণে চিকিৎসাব্যবস্থা, খাদ্যনিরাপত্তা, অবকাঠামো ও অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যে পরোক্ষ মৃত্যু ঘটেছে, তা এই হিসাবের বাইরে। (Costs of War)
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের সরকারি তথ্যে অপারেশন ইরাকি ফ্রিডমে ৪ হাজার ৪১৯ জন মার্কিন সামরিক সদস্যের মৃত্যু নথিভুক্ত রয়েছে। পরবর্তী অপারেশন নিউ ডনে আরও ৭৪ জন মারা যান। হাজার হাজার সেনা আহত হয়েছেন; অনেকে শারীরিক ক্ষতের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত নিয়ে দেশে ফিরেছেন। (U.S. Department of War)
কিন্তু ইরাকি সমাজের ক্ষয়ক্ষতি ছিল আরও ব্যাপক। নিহত মানুষের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পদ্ধতি ও হিসাব আলাদা হলেও এ বিষয়ে মতভেদ নেই যে যুদ্ধ, দখল, বিদ্রোহ, সাম্প্রদায়িক সংঘাত ও আইএসের নৃশংসতায় কয়েক লাখ ইরাকি প্রাণ হারিয়েছেন এবং লাখ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়েছেন।
২০১১ সালের বিদায় এবং ২০১৪ সালের প্রত্যাবর্তন
বারাক ওবামা প্রশাসন ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ইরাকে মার্কিন যুদ্ধ মিশনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘোষণা করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের ইতিহাসে দিনটিকে ইরাকে প্রায় নয় বছরের যুদ্ধের সমাপ্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। (U.S. Department of War)
তবে সেই বিদায় স্থায়ী হয়নি।
২০১৪ সালে আইএস মসুল দখল করে এবং ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে কথিত ‘খিলাফত’ ঘোষণা করে। ইরাকি সেনাবাহিনীর বহু ইউনিট প্রায় প্রতিরোধ ছাড়াই ভেঙে পড়ে। বাগদাদের অনুরোধে মার্কিন বাহিনী আবার ইরাকে ফিরে আসে। শুরু হয় অপারেশন ইনহেরেন্ট রিজলভ।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য, প্রশিক্ষণ এবং ইরাকি বাহিনী, কুর্দি পেশমার্গা ও স্থানীয় যোদ্ধাদের স্থল অভিযানের সমন্বয়ে আইএস তার দখলকৃত অঞ্চল হারায়। ২০১৭ সালে ইরাক সরকার সামরিক বিজয় ঘোষণা করলেও সংগঠনটি পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি; ছোট ছোট সেল ও মরুভূমিভিত্তিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে তারা হামলার সক্ষমতা ধরে রেখেছে।
এই বাস্তবতাই বর্তমান প্রত্যাহারের বিরোধীদের প্রধান উদ্বেগ।
সমর্থকদের যুক্তি: সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আর বিলম্ব নয়
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে প্রথম এবং সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো ইরাকের সার্বভৌমত্ব।
একটি দেশের মাটিতে বিদেশি সেনাবাহিনীর অনির্দিষ্টকাল উপস্থিতি সেই রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও জনগণের আত্মমর্যাদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ইরাকের বহু রাজনৈতিক দল, নাগরিক এবং ধর্মীয় গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, আইএসের কথিত ভূখণ্ডগত শাসনের অবসানের পর বিদেশি সেনা থাকার প্রয়োজনীয়তা আর আগের মতো নেই।
মার্কিন উপস্থিতি ইরাককে ওয়াশিংটন ও তেহরানের সংঘাতের যুদ্ধক্ষেত্রেও পরিণত করেছে। ২০২০ সালে বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি এবং ইরাকি মিলিশিয়া নেতা আবু মাহদি আল-মুহান্দিস নিহত হন। ঘটনাটি ইরাকের অনুমতি ছাড়া তার ভূখণ্ডে সংঘটিত হওয়ায় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল।
প্রত্যাহারের সমর্থকেরা বলেন, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত ইরাকিদেরই নিতে হবে। বিদেশি বাহিনী যত দিন থাকবে, তত দিন দেশীয় নেতারা নিরাপত্তা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কঠিন দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি হলো—সামরিক উপস্থিতি বন্ধ হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রশিক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য, অস্ত্র, অর্থনীতি, শিক্ষা ও কূটনৈতিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখা সম্ভব। ট্রাম্প ও আল-জাইদি দুজনই ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কেন্দ্র হবে তেল, জ্বালানি, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্ব। (AP News)
সমালোচকদের আশঙ্কা: ইতিহাস কি আবার ফিরে আসবে?
বিরোধীরা ২০১১ সালের অভিজ্ঞতার দিকে ইঙ্গিত করেন। তাঁদের মতে, তখনও বলা হয়েছিল ইরাকি বাহিনী দেশ রক্ষায় প্রস্তুত। মাত্র তিন বছর পর আইএস মসুল দখল করে এবং রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলে।
বর্তমানে আইএস আর বড় শহর নিয়ন্ত্রণ করে না, কিন্তু তার আদর্শ, বিচ্ছিন্ন সেল এবং সীমান্তবর্তী অঞ্চলে পুনর্গঠনের সক্ষমতা পুরোপুরি শেষ হয়নি। মার্কিন পরামর্শক, গোয়েন্দা প্রযুক্তি, বিমান নজরদারি এবং বিশেষ অভিযানের সহায়তা চলে গেলে ইরাকি বাহিনীর কিছু সক্ষমতা দুর্বল হতে পারে।
আরও বড় উদ্বেগ ইরানঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে নিয়ে। ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেস বা পিএমএফের অনেক ইউনিট আইএসের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু এর ভেতরের কয়েকটি শক্তিশালী গোষ্ঠীর সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে এবং তারা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর পাশাপাশি নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষমতা ধরে রেখেছে।
বিদেশি সেনা চলে গেলে এই গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। অন্যদিকে তাদের সমর্থকেরা বলেন, পিএমএফ ইরাকি রাষ্ট্রের অনুমোদিত বাহিনী এবং আইএসের বিরুদ্ধে দেশের অস্তিত্ব রক্ষায় তারা বড় ত্যাগ স্বীকার করেছে। সব ইউনিটকে একইভাবে ‘ইরানের প্রতিনিধি’ হিসেবে দেখানো ইরাকের বাস্তবতাকে অতিরিক্ত সরলীকরণ।
এই দুই অবস্থানের মাঝখানেই ইরাকের কঠিন সত্য: যে বাহিনী একসময় রাষ্ট্রকে রক্ষা করেছে, সেটিই যদি নির্বাচিত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব দুর্বল হয়।
সেনা প্রত্যাহার মানেই কি মার্কিন প্রভাবের অবসান?
সামরিক উপস্থিতির সমাপ্তিকে আমেরিকার সম্পূর্ণ প্রস্থান হিসেবে দেখা ভুল হবে।
যুক্তরাষ্ট্র ইরাকের তেল ও জ্বালানি খাত, আর্থিক ব্যবস্থা, অস্ত্র সরবরাহ, কূটনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রভাবশালী অংশীদার থাকবে। ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য এবং ইরাকের তেল আয়ের আন্তর্জাতিক লেনদেন ব্যবস্থার কারণে ওয়াশিংটনের আর্থিক প্রভাব বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
একইভাবে ইরানও ইরাক থেকে হারিয়ে যাচ্ছে না। ধর্মীয়, বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সম্পর্কের মাধ্যমে তেহরানের প্রভাব গভীরভাবে প্রোথিত। ফলে মার্কিন সেনা চলে যাওয়ার পর ইরাক প্রকৃত অর্থে স্বাধীন নীতি গ্রহণ করবে, নাকি ইরানের দিকে আরও ঝুঁকে পড়বে—এ প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ।
তবে ইরাককে কেবল ওয়াশিংটন ও তেহরানের দাবার বোর্ড হিসেবে দেখাও ঔপনিবেশিক মানসিকতার আরেক প্রকাশ। দেশটির নিজস্ব সমাজ, জাতীয়তাবাদ, তরুণ জনগোষ্ঠী, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, ব্যবসায়ী শ্রেণি এবং শক্তিশালী রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা রয়েছে। ইরাকিরা বারবার বিদেশি হস্তক্ষেপের পাশাপাশি নিজেদের দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও রাস্তায় নেমেছেন।
যুদ্ধ শেষে যে প্রশ্নগুলো থেকে যায়
ইরাক যুদ্ধের সবচেয়ে অস্বস্তিকর শিক্ষা সম্ভবত এই—একটি যুদ্ধ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া তুলনামূলক সহজ, কিন্তু তার ফল কোথায় গিয়ে শেষ হবে তা কোনো মহাশক্তিই পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
বব উডওয়ার্ডের Plan of Attack, জর্জ প্যাকারের The Assassins’ Gate এবং রাজীব চন্দ্রশেখরনের Imperial Life in the Emerald City বইগুলোতে যুদ্ধপূর্ব সিদ্ধান্ত, দখল-পরবর্তী প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা এবং বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নীতিনির্ধারণের বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। এসব গ্রন্থের একটি অভিন্ন শিক্ষা হলো—যুদ্ধক্ষেত্রের সামরিক জয় রাজনৈতিক দূরদর্শিতার বিকল্প হতে পারে না।
ইরাকের ক্ষেত্রেও সাদ্দাম সরকার দ্রুত পতন হয়েছিল, কিন্তু সেই পতনের পর যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা পূরণ করতে লেগেছে এক প্রজন্মের জীবন।
আজ মার্কিন সেনা চলে যাচ্ছে। কিন্তু যে পরিবারগুলো সন্তান হারিয়েছে, যারা শরণার্থী শিবিরে বড় হয়েছে, যারা বোমাবিধ্বস্ত স্কুলে শৈশব কাটিয়েছে—তাদের কাছে যুদ্ধ শেষ হওয়ার তারিখ এক নয়।
পুনর্গঠনে অগ্রগতি, তবু ক্ষত গভীর
ইরাক গত কয়েক বছরে তুলনামূলক নিরাপত্তা ও পুনর্গঠনের পথে অগ্রসর হয়েছে। UNDP জানিয়েছে, আইএস-পরবর্তী স্থিতিশীলতা কর্মসূচির মাধ্যমে হাজার হাজার স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে; ৫০ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের নিজ এলাকায় ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়াতেও সহায়তা দেওয়া হয়েছে। (UNDP)
তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি মানেই পূর্ণ গণতান্ত্রিক স্থিতিশীলতা নয়। Human Rights Watch-এর মূল্যায়নে, সংঘাত কমলেও ইরাকে দায়মুক্তি, দুর্বল বিচারব্যবস্থা, নাগরিক পরিসর সংকুচিত হওয়া, নারী ও সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্য এবং অপর্যাপ্ত সরকারি সেবা এখনো বড় সমস্যা। (Human Rights Watch)
অর্থাৎ ইরাকের ভবিষ্যৎ শুধু আইএসকে দমন করা বা বিদেশি সেনাকে বিদায় দেওয়ার ওপর নির্ভর করছে না। নির্ভর করছে দুর্নীতি কমানো, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, সশস্ত্র গোষ্ঠীকে বেসামরিক কর্তৃত্বে আনা, তেলনির্ভর অর্থনীতিকে বহুমুখী করা এবং তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর।
আফগানিস্তানের ছায়া, তবে ইরাক একই দেশ নয়
২০২১ সালে আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনীর বিশৃঙ্খল প্রত্যাহারের স্মৃতি এখনো তাজা। তালেবান কয়েক সপ্তাহের মধ্যে কাবুল দখল করেছিল। তাই ইরাক প্রত্যাহারের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে আফগানিস্তানের তুলনা উঠছে।
তবে দুই দেশের বাস্তবতা এক নয়।
ইরাকে কার্যকর কেন্দ্রীয় সরকার, নির্বাচিত সংসদ, তেলসমৃদ্ধ অর্থনীতি, বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তা বাহিনী, আঞ্চলিক সরকার এবং বহু আন্তর্জাতিক অংশীদার রয়েছে। আইএসও বর্তমানে তালেবানের মতো দেশব্যাপী সংগঠিত বিকল্প সরকার নয়।
তারপরও আফগানিস্তানের শিক্ষা উপেক্ষা করা যায় না: একটি বাহিনীকে অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ দেওয়া যথেষ্ট নয়; জনগণের আস্থা, নেতৃত্বের বৈধতা, দুর্নীতিমুক্ত কমান্ড এবং যুদ্ধের রাজনৈতিক কারণ মোকাবিলা না করলে বাহিনী সংকটের মুহূর্তে ভেঙে পড়তে পারে।
একটি ন্যায্য মূল্যায়ন
মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে শুধু বিজয় বা পরাজয়ের ভাষায় বিচার করলে ইরাকের জটিল বাস্তবতা হারিয়ে যাবে।
এটি ইরাকি সার্বভৌমত্বের জন্য প্রয়োজনীয় ও বহু প্রতীক্ষিত পদক্ষেপ। কোনো বিদেশি বাহিনীর উপস্থিতি অনির্দিষ্টকাল স্থায়ী হওয়া উচিত নয়। একই সঙ্গে প্রত্যাহারের পর নিরাপত্তার সব সমস্যা স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাধান হয়ে যাবে—এমন ধারণাও বিপজ্জনক।
যুক্তরাষ্ট্রের দায়িত্ব সেনা সরিয়ে নেওয়ার মধ্য দিয়ে শেষ হয়ে যায় না। যে যুদ্ধ ভ্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য ও দুর্বল পরিকল্পনার ভিত্তিতে শুরু হয়েছিল, তার মানবিক ও রাজনৈতিক পরিণতির প্রতি ওয়াশিংটনের দীর্ঘমেয়াদি দায় রয়েছে। পুনর্গঠন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যুদ্ধাহত মানুষ, শরণার্থী এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা করা সেই দায়ের অংশ।
ইরাকি নেতৃত্বের দায়িত্ব আরও প্রত্যক্ষ। বিদেশি সেনার উপস্থিতিকে সব ব্যর্থতার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করার সময় শেষ হচ্ছে। এখন জনগণের কাছে জবাবদিহি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, আইনের শাসন এবং সব সশস্ত্র বাহিনীকে রাষ্ট্রের একক কর্তৃত্বে আনার কঠিন পরীক্ষা শুরু হবে।
শেষ সেনাটি চলে গেলে
৩০ সেপ্টেম্বর যখন শেষ মার্কিন সামরিক বিমানটি ইরাকের আকাশ ছাড়বে, তখন হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে ২৩ বছরের একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে।
কিন্তু ইতিহাসে সামরিক অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠা কখনো শুধু সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে লেখা হয় না। তার পরের অধ্যায় লেখা হয়—যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে একটি সমাজ কীভাবে উঠে দাঁড়ায়, অপরাধের দায় কীভাবে স্বীকার করা হয় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অতীতের ভুল থেকে কী শিক্ষা নেয়—তার মাধ্যমে।
ইরাকের সামনে এখন এক বিরল সুযোগ: অন্য শক্তির ছায়ায় নয়, নিজের জনগণের সম্মতি ও নিজস্ব রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ভিত্তিতে ভবিষ্যৎ নির্মাণের সুযোগ।
এই সুযোগ ব্যর্থ হলে ইতিহাস হয়তো আবার ফিরে আসবে—নতুন পতাকা, নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং নতুন কোনো বিদেশি অভিযানের রূপ নিয়ে।
আর সফল হলে ৩০ সেপ্টেম্বর কেবল একটি সেনা প্রত্যাহারের দিন থাকবে না; এটি হয়ে উঠতে পারে ইরাকের দীর্ঘ অসমাপ্ত স্বাধীনতার সত্যিকারের সূচনা।
#Iraq #USTroops #IraqWar #MiddleEast #WorldNews #californierchithi
#Iraq #USTroops #MiddleEast #BanglaNews




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।