সুপ্রিম কোর্টে ‘সুপার মানডে’: জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও আমেরিকার সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ঐতিহাসিক রায়ের অপেক্ষা

সুপ্রিম কোর্টে ‘সুপার মানডে’: জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব, প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা ও আমেরিকার সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে ঐতিহাসিক রায়ের অপেক্ষা
প্রতিনিধি । ওয়াশিংটন ডিসি —
যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের চলতি মেয়াদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটিতে আজ দেশের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক এবং অভিবাসন নীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে এমন একাধিক ঐতিহাসিক রায় ঘোষণার অপেক্ষা চলছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দুটি বহুল আলোচিত নীতিকে ঘিরে আদালতের সিদ্ধান্তের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো দেশ।
একদিকে রয়েছে জন্মসূত্রে মার্কিন নাগরিকত্ব (Birthright Citizenship) সীমিত করার উদ্যোগ; অন্যদিকে প্রেসিডেন্টের স্বাধীন ফেডারেল সংস্থাগুলোর কর্মকর্তাদের অপসারণের ক্ষমতা নিয়ে সাংবিধানিক প্রশ্ন। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই মামলার রায় শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের রাজনৈতিক বিজয় বা পরাজয় নির্ধারণ করবে না, বরং আগামী কয়েক দশকের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষমতার ভারসাম্য, সংবিধানের ব্যাখ্যা এবং ফেডারেল সরকারের কাঠামোকেও প্রভাবিত করতে পারে। (EL PAÍS English)
জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব: ১৫০ বছরেরও বেশি পুরোনো বিতর্ক নতুন করে আলোচনায়
সবচেয়ে আলোচিত মামলাটি ট্রাম্প প্রশাসনের নির্বাহী আদেশকে কেন্দ্র করে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় ফিরে এসে এমন একটি আদেশ জারি করেন, যার লক্ষ্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া কিন্তু যাদের বাবা-মা কেউই মার্কিন নাগরিক বা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা নন—সেসব শিশুর স্বয়ংক্রিয় নাগরিকত্ব সীমিত করা। (Legal Defense Fund)
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রচলিত আইন অনুযায়ী, দেশটির মাটিতে জন্মগ্রহণকারী অধিকাংশ শিশু জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই মার্কিন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই নীতির ভিত্তি ১৮৬৮ সালে গৃহযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে গৃহীত সংবিধানের ১৪তম সংশোধনী, যেখানে বলা হয়েছে—“যুক্তরাষ্ট্রে জন্মগ্রহণকারী এবং তার এখতিয়ারের অধীন সব ব্যক্তি মার্কিন নাগরিক।” (AP News)
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি হলো, “subject to the jurisdiction thereof” বা “যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারের অধীন” শব্দবন্ধের ব্যাখ্যা এতদিন ভুলভাবে করা হয়েছে। তাদের মতে, অবৈধভাবে অবস্থানকারী অভিবাসীদের সন্তানদের ক্ষেত্রে এই বিধান প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়। বিপরীতে অধিকাংশ সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ, নাগরিক অধিকার সংগঠন এবং একাধিক অঙ্গরাজ্য বলছে, এই ব্যাখ্যা প্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক ঐতিহ্য ও দীর্ঘদিনের বিচারিক নজিরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। (AP News)
এ কারণে নির্বাহী আদেশটি প্রকাশের পরপরই একাধিক ফেডারেল আদালত তা স্থগিত করে দেয় এবং এখন পর্যন্ত এটি কার্যকর হয়নি। (American Civil Liberties Union)
প্রেসিডেন্ট কতটা ক্ষমতাবান?
আজকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে—প্রেসিডেন্ট কি স্বাধীন ফেডারেল সংস্থার কর্মকর্তাদের ইচ্ছামতো অপসারণ করতে পারবেন?
এই মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ফেডারেল ট্রেড কমিশন (FTC)-এর সাবেক কমিশনার রেবেকা স্লটারের অপসারণ। ট্রাম্প প্রশাসন তাকে পদচ্যুত করলে বিষয়টি আদালতে গড়ায়। দীর্ঘদিন ধরে ১৯৩৫ সালের ঐতিহাসিক ‘Humphrey’s Executor’ মামলার নজির অনুসারে প্রেসিডেন্টের এই ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতিরা আজ সেই প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো নজির উল্টে দিয়ে প্রেসিডেন্টের অপসারণ ক্ষমতা বহুলাংশে সম্প্রসারণ করেছেন। (Reuters)
রয়টার্স, অ্যাক্সিওস এবং অন্যান্য মার্কিন গণমাধ্যমের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের প্রেসিডেন্টদের জন্য স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর ওপর আরও সরাসরি প্রভাব বিস্তারের পথ খুলে দিতে পারে। (Reuters)
তবে আদালত একই সঙ্গে ইঙ্গিত দিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভের মতো কিছু প্রতিষ্ঠান বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা ভোগ করতে পারে এবং সেগুলোর স্বাধীনতা এখনও সুরক্ষিত থাকতে পারে। (Reuters)
কেন এই রায়গুলো এত গুরুত্বপূর্ণ?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সুপ্রিম কোর্টের ৬-৩ রক্ষণশীল সংখ্যাগরিষ্ঠতা ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো নিয়ে বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত দিয়েছে। আজকের রায়গুলো সেই ধারারই অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। (Reuters)
একদিকে যদি জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব বিষয়ে আদালত ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষে যায়, তবে তা মার্কিন অভিবাসন ইতিহাসের অন্যতম বড় পরিবর্তন হিসেবে বিবেচিত হবে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্টের অপসারণ ক্ষমতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে “Unitary Executive Theory” বা “একক নির্বাহী তত্ত্ব” আরও শক্তিশালী ভিত্তি পেতে পারে, যা প্রেসিডেন্টকে ফেডারেল প্রশাসনের ওপর নজিরবিহীন নিয়ন্ত্রণ দিতে পারে। (Reuters)
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
সাংবিধানিক আইনবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, এই মামলাগুলোর ফলাফল শুধু ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য নয়, ভবিষ্যতের সব প্রেসিডেন্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে। সমর্থকদের মতে, জনগণের নির্বাচিত প্রেসিডেন্টের হাতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। সমালোচকদের আশঙ্কা, এতে ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বেড়ে যেতে পারে। (Reuters)
ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাই আজকের দিনটিকে অনেকে ‘সুপার মানডে ফর দ্য কনস্টিটিউশন’ হিসেবে আখ্যায়িত করছেন। কারণ সুপ্রিম কোর্টের এই সিদ্ধান্তগুলো শুধু বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকেই নয়, আগামী প্রজন্মের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো ও রাষ্ট্রক্ষমতার সংজ্ঞাকেও নতুনভাবে নির্ধারণ করতে পারে।
#SupremeCourt #DonaldTrump #BirthrightCitizenship #USPolitics #USConstitution #ImmigrationNews #SCOTUS #BreakingNews #America #TrumpAdministration #LegalNews #FederalGovernment #USNews #WeeklyCalifornierChithi #BanglaNewsUSA




এখনও কোনো মন্তব্য নেই। আলোচনাটি শুরু করুন।